শিশিরকুমার ভাদুড়ীর জীবন শুরু হয় অধ্যাপনা দিয়ে। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনা। তখন থেকেই এবং যখন নাটকের জগতে ঢুকলেন, তখনও তাঁর বন্ধু বা সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন সাহিত্যিক, ভাষাবিদ, অলংকরণকার-রা। অর্থাৎ, সাহিত্যের বাতাবরণ তাঁকে সারাজীবনই ঘিরে রেখেছে। উপরন্তু মঞ্চের জন্য নাটক বাছতে গিয়েও তাঁকে সারাজীবন সাহিত্যের সঙ্গে সংযোগ রেখে চলতে হয়েছে। গল্প খুঁজতে গিয়ে, নানারকম চরিত্রের রসদ খুঁজতে গিয়ে। ঘনিষ্ঠজনদের স্বাক্ষ্য বলে, দেশ-বিদেশের সাহিত্য পড়তে ও পড়ার পরে তা নিয়ে অনুগামীদের সঙ্গে আলোচনা করতে ভারি ভালবাসতেন তিনি।
কিন্তু তবু নিজে কোনওদিন লেখেননি কেন? নাটক, গল্প, আত্মকাহিনি বা নাট্যশিক্ষার্থীদের জন্য প্রবন্ধ কিছুই লেখেননি কেন? সামান্য কিছু চূর্ণ লেখা ছাড়া তাঁর কিছুই প্রায় নেই। অথচ তাঁর সম্পর্কে কৌতূহলী-মাত্রেই জানেন, কত লেখাকে তিনি নিজের কলমের ছোঁয়ায় ছুটন্ত করে তুলেছেন। তাঁর সম্পাদনায়-সংযোজনে সেজে এক-একটা লেখা মূলের থেকে ভিন্ন মাত্রায় চলে গেছে। শিশিরকুমারের এই কলম চালানোর হাত থেকে ছাড় পাননি এমনকী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও। দু’জনের বিখ্যাত দুই উপন্যাসের শেষ পরিণতিটা বদলে দিয়েছেন তিনি মঞ্চে আনতে গিয়ে। দুই ক্ষেত্রেই তাঁর যুক্তিজালে পরাস্ত হয়ে রবি ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র অনুমতি দিয়েছেন এই বদলানোর। সেই বদলগুলো কিন্তু বড় সামান্য ছিল না! ছিল একেবারে অন্তিম পরিণতির বদল। যাতে কাহিনির আদর্শের বদল ঘটে গিয়েছিল! ঘটনাগুলো মনে করা যাক।
আরও পড়ুন: শরৎচন্দ্র কি সত্যিই সাম্প্রদায়িক ছিলেন? লিখছেন আশিস পাঠক…
শরৎচন্দ্রের ‘দেনাপাওনা’ অবলম্বনে ‘ষোড়শী’ করলেন ১৯২৭-এ। কর্নওয়ালিশ নাট্যমন্দিরে। সেই নাট্যরূপের কতটা শরৎবাবুর আর কতটা অন্য কারও সে-তর্কে আপাতত না ঢুকে শুধু দেখি, কাহিনির মঞ্চরূপান্তরে শুধু নামেই বদল নয়, নাটকের পরিণতিতেও প্লটের বদল। মূল উপন্যাসে মারা যাচ্ছে ষোড়শী ওরফে অলকা। নাটকে কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী জীবানন্দ, যে চরিত্রে শিশিরবাবু প্রবাদপ্রতিম অভিনয় করবেন। অর্থাৎ পুরোপুরি উল্টো!

একইরকম কাণ্ড হল রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসকে নাটকে আনার সময়েও। এই নাটক দিয়েই শিশিরকুমারের নবনাট্যমন্দির অর্থাৎ স্টার থিয়েটারের কেরিয়ার শেষ হয়েছিল। ১৯৩৬ সালে। এরপর পাক্কা পাঁচ বছর বসে থাকার পর আবার তিনি স্টেজ পান ১৯৪১-এ। শুরু হয় তাঁর বিখ্যাত শ্রীরঙ্গম পর্ব। যাই হোক, ‘যোগাযোগ’ নাটকের শেষে যেখানে নায়িকা কুমুদিনী ফিরে যাচ্ছে স্বামী মধুসূদনের ঘরে, সেখানে সে পায়ে গড় করে প্রণাম করত মধুসূদনকে। কুমুর মতো বিদ্রোহী, স্বাধীনচেতা মেয়ের পক্ষে যা অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথের মনোগত ইচ্ছা ছিল কুমুদিনী যাবে স্বামীর ঘরে, তবে তা চিরদিন থাকতে নয়, ফিরে আসতে। শিশিরবাবুর পরিকল্পনা শুনে তাই আপত্তি জানান রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেন, ‘তুমি আমার কুমুকে মামুলি হিঁদু করতে চাও?’ শিশিরকুমার তখন তাঁকে মনে করিয়ে দেন, কুমুদিনীর এই আত্মসমর্পণ দেখলে সমগ্র দর্শক সমাজ খুশি হবে। তার ফলে ‘দক্ষিণা’-টা মিলবে ভাল। এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ যে উত্তরটি দেন, সেটিও যুগ পেরিয়ে মনে রাখার মতো। তিনি শিশিরবাবুকে বলেন, “তুমি তো খুব দুষ্টু লোক হে।… যা খুশি করো গে। তোমার ‘যোগাযোগ’ লোকে কদিন মনে রাখবে? আমার ‘যোগাযোগ’ বরাবর থাকবে।”
এসব অন্তরঙ্গ কথার সাক্ষ্য ধরা আছে শিশিরকুমারের নাট্যকার বন্ধু তারাকুমার মুখোপাধ্যায়ের দিনলিপির মতো করে লেখা বই ‘অন্তরালের শিশিরকুমার’-এ।

রবীন্দ্রনাথ অবশ্য খুশি মনে মেনে নিয়েছিলেন ‘গোড়ায় গলদ’ নাটক নিয়ে স্নেহাস্পদ শিশিরের আবদার। ছিঁড়ে ফেলেছিলেন নিজের লেখা ওই নাটকের প্রথম পান্ডুলিপি। এই নাটক তিনি বোলপুরে শান্তিনিকেতনে ডেকে প্রাতরাশের পর তুলে দেন শিশিরকুমারের হাতে। কিন্তু নাটক শুনতে-শুনতে শিশিরকুমার খুঁতখুঁত করেন। তিনি বোঝেন, নাটক জমাতে চন্দ্রকান্ত চরিত্রটি তাঁকেই অভিনয় করতে হবে। এখন রবীন্দ্রনাথের ওই প্রথম খসড়ায় চন্দ্রকান্ত প্রথমার্ধেই নাটক থেকে বিদায় নিচ্ছেন। যে দর্শকরা শিশিরকুমারের নাম শুনে তাঁর অভিনয় দেখতে টিকিট কাটবেন, এতে তাঁরা অসন্তুষ্ট হবেন। এর জন্য শিশিরকুমার বলেন চন্দ্রকান্তকে নাটকে আগাগোড়া রাখতে। রবীন্দ্রনাথ সেই দাবি মেনে নিয়ে গোটা পান্ডুলিপি আগাগোড়া সংশোধন করে লেখেন এক রাত্রির মধ্যে দ্রুত। সেই নতুন খসড়ার নাম দেন ‘শেষরক্ষা’। ‘গোড়ায় গলদ’ শুধরে নিয়ে ‘শেষরক্ষা’। সেই নামেই শিশিরকুমার এটি মঞ্চে করতেন। চির-প্রতিদ্বন্দ্বী অহীন্দ্রবাবুর ‘চিরকুমার সভা’-র সঙ্গে দ্বৈরথটি জমত ভাল। সাধারণ রঙ্গালয়ে রবিবাবুর দুই কমেডির লড়াই দুই প্রতিভাধর অভিনেতার নেতৃত্বে। ‘চিরকুমার সভা’ তাঁর হাতছাড়া হয়েছিল বলে শিশিরবাবুর কিঞ্চিৎ দুঃখ ছিল।
তবে রবীন্দ্রনাথ চাইলেও শিশিরকুমার তাঁর ‘রক্তকরবী’ করেননি। রবীন্দ্রনাথ নিজেই মজা করে ঘনিষ্ঠ মহলে ওই নাটককে বলতেন ‘শক্তকরবী’। শিশিরবাবুরও মনে হয়েছিল, এই নাটকে ‘আইডিয়া’ যতখানি, বাস্তব ততখানি নয়। তার আগে ‘তপতী’ করে প্রবল ধাক্কা খেয়েছেন কর্নওয়ালিশে। সে-নাটকের মাত্র সাত-আটটি শো হয়েছিল। তার কতকগুলি আবার প্রায় ফাঁকা হলে। ‘রক্তকরবী’ নিয়ে শিশিরকুমার ঘনিষ্ঠ মহলে বলতেন নাট্যকার রূপকথা বা পুরাণের আড়াল না-রেখে বরং কয়লাখনির সরাসরি আবহে নাটকটি লিখলে ভাল হত। অর্থাৎ, তিনি চাইতেন বাস্তবোচিত আবহ। তবে নাটকটি পড়তে ভাল লাগায় বহুজনকে তিনি এটি পাঠ করে শোনাতেন। অনুগামী তারাকুমার মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, ‘যদি এমনটা হত যে সত্যিকারের এক খনিতে ঐসব কান্ড ঘটত, আর পৌরাণিক বা রূপক রং ও ঢং না দিয়ে বাস্তব রূপকেই অবলম্বন করা হত, তবে নাটক আরো রিয়েল হয়ে উঠত, প্রোডিউস করাও সহজ হত।’

শরৎবাবু একবার আত্মঘোষণার মতো করে বললেন, আমার সংলাপ একটা কুকুর বললেও তার মুখে তা দারুণ শোনায়। কথাটা শিশিরবাবুর কানে উঠতে দেরি হল না উভয় তরফের কিছু ‘শুভানুধ্যায়ী’-র সৌজন্যে। তাঁর কানে এই আত্মঘোষণা আত্মঅহমিকা বলে ঠেকল। বিশেষত যেহেতু তিনি হরবখতই শরৎবাবুর লেখা সংলাপ নিজের মতো করে বদলে নিয়ে বলে থাকেন। সংযোজন করেন অনেক কিছু, যেমন তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। সেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে চাণক্য করার সময় থেকেই। শিশিরবাবু এ-কথা শুনেও সরাসরি কোনও উত্তর শরৎবাবুকে দেননি। কিন্তু ‘বিজয়া’ নাটক এবার নামল যখন, রাসবিহারী চরিত্র করার সময় প্রচুর কথা বানিয়ে বলে যেতে লাগলেন। যথারীতি শুভানুধ্যায়ীদের একাংশ এবার এই খবর পৌঁছে দিলেন শরৎবাবুর কাছে। তিনি প্রতিক্রিয়ায় শিশিরকুমারকে আর বই না দিয়ে দিলেন অন্য থিয়েটারে। সেই নাটক মঞ্চসাফল্য পেল না। শিশিরকুমার তারাকুমারকে বলছেন, ‘আবার ছাতা ও খাতা বগলে (শরৎচন্দ্র) একদা আবির্ভূত। আমি স্বাগত জানালুম। বললেন, ওরা বোঁদে বেচে, তুমি কাঁচাগোল্লার ব্যাপারি, বই এনেছি। করতে হবে।’
একবার বন্ধু সুনীতিকুমার তাঁর নাটকের একটি আবেগবহুল জায়গা নিয়ে প্রশংসা করতে শুরু করলে তিনি সরাসরি বলেন, ‘সুনীতি তুমিও বোকা বনেছ! ওখানে উঁচু দরের কিছু নেই তো!’ এতে অবশ্য দু’জনের সম্পর্কচ্যুতি হয় নি। কারন ভাষাচার্য নিজের প্রিয় সহপাঠীটিকে চিনতেন। জানতেন, শিশির মনের কথা চেপে রাখতে পারে না।
আসলে রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্রের প্রতিভা ও সাহিত্যভাবনাকে শ্রদ্ধা করতেন শিশিরকুমার। কিন্তু দেশ-বিদেশের একেবারে সাম্প্রতিকতম সাহিত্য পড়ে তাঁর মনের ভেতরে একটা নিজস্ব মানদণ্ড গড়ে উঠেছিল। সঙ্গে ছিল নাট্যরীতি সম্পর্কেও নিজস্ব কিছু ধ্যানধারণা। সেখানে সমঝোতা করতেন না তিনি। স্পষ্টাস্পষ্টি কথা বলতেন। এ-ব্যাপারে তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল অটুট।
কেমন অটুট?
একবার বন্ধু সুনীতিকুমার তাঁর নাটকের একটি আবেগবহুল জায়গা নিয়ে প্রশংসা করতে শুরু করলে তিনি সরাসরি বলেন, ‘সুনীতি তুমিও বোকা বনেছ! ওখানে উঁচু দরের কিছু নেই তো!’ এতে অবশ্য দু’জনের সম্পর্কচ্যুতি হয় নি। কারন ভাষাচার্য নিজের প্রিয় সহপাঠীটিকে চিনতেন। জানতেন, শিশির মনের কথা চেপে রাখতে পারে না। তার একটি নিজস্ব বাচনরীতি আছে।
আর একবার এই সুনীতিকুমারই বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন, সে এত ভাল সাহিত্যবোদ্ধা, অথচ নিজে কিছু লেখে না কেন?
শিশিরকুমার ভাদুড়ীর উত্তর ছিল, ‘দেখো, কিছু মানুষ আছে যারা সাহিত্য লেখে। আর কিছু মানুষ আছে যারা সাহিত্য বলে, হু টকস্ লিটারেচার। আমি দ্বিতীয় দলে পড়ি।’
সত্যিই তো মঞ্চে মুখে-মুখে সাহিত্য বলে যেতেন তিনি।
সত্যিই তো তাঁর কথার ব্যঞ্জনায় বহু সময়ই জন্ম নিত যা, তা সাহিত্যেরই সমতুল।
এই না হলে শিশিরকুমার ভাদুড়ী!




