সাংবাদিকের স্পর্ধা
‘যুগান্তর’-এ শিক্ষনবীশ সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর, মাস তিনেক কাটতেই ঘটে গেল এক কাণ্ড! সংবাদ সংস্থাগুলি টেলিপ্রিন্টারে যে-সব খবর পাঠাত, তা ইংরেজি বড় হরফে লেখা, এক-দুই বা কয়েকটি স্লিপ, তা থেকে খবর করতাম। ঠিক অনুবাদ নয়, স্লিপে যা এসেছে, তার মোদ্দা কথা, রাজনৈতিক বিষয়াদির দিক— বিশ্লেষণ মিলিয়ে খবর। প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, নেতা প্রমুখ মানুষের জনসভায় বক্তৃতা থাকলে, গুরুত্ব বুঝে বড় ও ছোট খবর। অনেক সময়েই সে-সব বক্তৃতার ক্ষেত্রে, সংবাদ সংস্থাগুলি যে-সব খবর পাঠাত, তা চার-পাঁচ স্লিপের হলে, সার কথাগুলি প্রথমেই কয়েক লাইনে দিয়ে দিত। তা দিয়েই খবর হয়ে যেত।
তেমনই সে-দিন, সংবাদসংস্থা ‘পিটিআই’ পাঠিয়েছিল— প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ওড়িশা সফরকালে এক জনসভায় ভাষণের খবর। এই খবরের ছ’খানি স্লিপ আলপিন এঁটে, চিফ সাব-এডিটর নন্দদা পাঠিয়েছিলেন আমার টেবিলে। ওই স্লিপসমূহের সার কথাটি পড়ে, আমার লাগল ন্যাড়া-ন্যাড়া। আমি বাকি স্লিপগুলিতে চোখ বোলাতে থাকলাম। পঞ্চম স্লিপে নীচের দিকে দেখলাম, পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ইন্দিরা গান্ধী। বলেছেন, ‘জঙ্গলের রাজত্ব চলছে বাংলায়।’
বাংলায় তখন দ্বিতীয় বামফ্রন্ট-সরকার সবে এসেছে। কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নিয়ে অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের সূত্রপাত করলেও, মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর সম্পর্কে কোনও বিরোধাভাস ছিল না। তবে গোঘাট অঞ্চলে, শরিকি বিবাদ ছিল সিপিএম-ফরোয়ার্ড ব্লকের, খুনখারাপিও ঘটেছিল, মেদিনীপুরে জমিজমার সংঘর্ষ ঘটছিল। উত্তরবঙ্গে এক নার্সের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে শোরগোল পড়েছিল। বারাকপুরে নিখোঁজ দুই বালকের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল রেললাইনের ধারে।
সন্ধে হলে একে-একে তারা ফুটে উঠত ‘যুগান্তর’-এর অফিসে!
পড়ুন: ‘সংবাদ মূলত কাব্য’ পর্ব ৩৮…
‘পিটিআই’-এর পঞ্চম স্লিপে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাংলা সম্পর্কে অসন্তোষের ওই কঠোরোক্তিকে খবরের গোড়ায় এনে, বড়সড়ভাবে ‘সংবাদ’ করে দিলাম আমি। রাতে চলে আসার সময়ে দেখলাম, কাগজের পাতা সাজানোর সময়ে আমার লেখা খবরটি, প্রথম পাতায় প্রধান খবর (লিড) হিসেবে যাচ্ছে— ‘বাংলায় জঙ্গলের রাজত্ব চলছে: ইন্দিরা।’
‘যুগান্তর’-এ যোগ দেওয়ার পর থেকে, বাড়িতে চারটি বাংলা-ইংরেজি সংবাদপত্র পেতাম। অফিস, কাগজ কেনার টাকা দিত। পরদিন সকালে উঠে সংবাদপত্রগুলি দেখে মনে হল, এত বড় খবর কেউ করল না! দুপুরের পর অফিসে গিয়ে মনে হল চারদিক থমথম করছে। অমিতাভ চৌধুরী গম্ভীর, নিউজ-এডিটর দেবব্রত মুখোপাধ্যায় চুপচাপ। কয়েক মিনিটের মধ্যে ‘রাইটার্স’ থেকে সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্য ফেরার সময়ে আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে, অমিতদার ঘরে ঢুকলেন। অনিলদার ওই তাকানো মনে হল রক্তচক্ষু।

একটু পর আমারও ডাক পড়ল অমিতদার ঘরে। অমিতদা আমাকে বললেন, ‘এ-খবর তুমি কোথায় পেলে?’ সঙ্গে-সঙ্গে আমি বললাম, “‘পিটিআই’-এ’। আনানো হল ‘পিটিআই’-এর সেই খবরের ক্রিড। আমি পঞ্চম স্লিপের নীচের লাইনগুলি দেখিয়ে দিলাম। পড়তে-পড়তে অমিতদা বললেন, ‘গুড’। হেসে অনিলদা আমার পিঠে আদরের চাপড় দিয়েই ছুটলেন, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। পরদিন সব সংবাদপত্রেই বের হল মুখ্যেমন্ত্রী জ্যোতি বসুর পাল্টা বিবৃতি।
‘যুগান্তর’-এ শিক্ষনবীশ পদে যোগ দিলেও, সম্পাদক তুষারকান্তি ঘোষকে আমি তখনও দেখিনি। পরে অবশ্য তাঁর সঙ্গে দেখা, দু’একটি কথা বলা এবং চমকপ্রদ দু’একটি ঘটনাও আছে। সে-সব পরে। তবে ‘যুগান্তর’-এ যোগ দেওয়ার ঢের আগে, ১৯৭৪ সালে, তমলুকের ‘বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’-এ আমি তুষারকান্তি ঘোষকে দেখেছিলাম।
শ্যামলকান্তি দাশের সঙ্গে আমার চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল ১৯৭২-৭৩ সাল থেকেই। তমলুকে ১৯৭৪-এ ‘বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’-এর শেষে, বাড়তি একটি দিন চেয়ে নিয়ে শ্যামলকান্তি ওই দিনটিতে সারা বাংলা কবিসম্মেলন ডেকে দেয়। শ্রীরামপুরে আমাকে ও আমার বন্ধু পল্লব বন্দ্যোপাধ্যায়কে শ্যামলকান্তি সবিশেষ আমন্ত্রণ জানায়। আমারা গিয়েছিলাম। তুষারকান্তি ঘোষ তমলুকে সেই কবিসম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন। তুষারকান্তি ঘোষের চমকপ্রদ ‘বিচিত্র কাহিনী’ ও ‘আরও বিচিত্র কাহিনী’ বই দু’টি সে-সময়ে আমি পড়েছিলাম। তুষারকান্তি ঘোষকে তমলুকে আমি সে-কথা জানিয়েছিলাম।


আমি যখন ‘যুগান্তর’-এ যোগ দিলাম, তখন তুষারকান্তি ঘোষের বয়স ৮৬/৮৭। ওই বয়সেও বারাসাতের বাসভবন থেকে রোজ আসতেন। দুপুরে এসে সন্ধ্যার সময়ে ফিরে যেতেন। তাঁর পিএ ছিলেন বুলুবাবু। তাঁকে চিনতাম। আলাপ-পরিচয় হয়েছিল। আমার খুব কৌতূহল হয়েছিল, তুষারকান্তি ঘোষের সঙ্গে দেখা করার। বয়স্ক সহকর্মীদের মুখে এ-ক’দিনে তুষারকান্তি ঘোষের হরেক গল্প শুনেছি।
আমি সম্পাদক তুষারকান্তি ঘোষের সঙ্গে দেখা করার জন্য উসখুস করছি দেখে, মৃত্যুঞ্জয় মাইতি বললেন, ‘যাও না, অ্যাকাউন্টের পিছনে ওই যে গোলঘর, ওখানে তুষারবাবু বসেন।’ সেই গোলঘরে একাধিক দরজা। উঁকিঝুঁকি দিচ্ছি। বুলুবাবু বললেন, ‘আসুন, ভেতরে আসুন।’ ঢুকতে তুষারকান্তি ঘোষকে বুলুবাবু বললেন, ‘আমাদের নতুন সাব-এডিটর, ট্রেনি।’ তুষারকান্তি শুধোলেন, ‘কী নাম তোমার?’ নাম বলতেই তুষারকান্তি বললেন, ‘বদ্যি-বাঙাল, দেশের বাড়ি কোনখানে?’ বরিশাল বলতেই, ফের তুষারকান্তি বললেন, ‘বদ্যি-বাঙাল-বরিশাল— কমিউনিস্ট, তাই না?’ চুপচাপ রইলাম। আমাকে স্তম্ভিত করে এইবার তুষারকান্তি বললেন, “মৃদুল…মৃদুল… তুমি আমার ‘বিচিত্র কাহিনী’, ‘আরও বিচিত্র কাহিনী’ বইদুটো পড়েছিলে বলেছিলে না?”

সেই কবে ১৯৭৪ সালে তমলুকে শ্যামলকান্তিদের কবিসম্মেলনে, তুষারকান্তি ঘোষকে সে-কথা বলেছিলাম, আর এটা ১৯৮৩ সাল! হতবাক হয়ে গেলাম আমি। এমন মানুষই তো পারেন, চার্চিলের ঠোঁট থেকে চুরুট টেনে নিতে! সে-গল্প শুনেছি ‘যুগান্তর’-এর প্রবীণ সহকর্মীদের মুখে। বলি তাহলে—
১৯৪২ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপে তখন তুঙ্গে উঠেছে। জার্মান বোমারু, লন্ডনে টেমস নদীর ব্রিজে বোমা ফেলেছে। কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল নির্বিকার, উদ্বেগহীন। যেন কিচ্ছুটি হয়নি। ব্রিটিশ পত্রিকাগুলি অবাক হয়ে এসব বলাবলি করছে। বাবা শিশিরকুমার ঘোষ প্রতিষ্ঠিত ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র রিপোর্টার তখন তুষারকান্তি ঘোষ, ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র লন্ডন অফিস থেকে তুষারকান্তি গেলেন প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সাক্ষাৎকার নিতে। সঙ্গে ফটোগ্রাফার। দরজা ঠেলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের ঘরে ঢুকতেই দেখা গেল, ভাবলেশহীন মুখে চার্চিল বসে চুরুট খাচ্ছেন। তুষারকান্তি খপ করে চার্চিলের চুরুট টেনে নিলেন! খিচিয়ে উঠে হুঙ্কার দিলেন চার্চিল, ‘হোয়াট ননসেন্স!’ ‘জাস্ট আ স্ন্যাপ স্যর!’— বললেন তুষারকান্তি। ফটোগ্রাফার ওই ছবি নিয়ে নিয়েছিলেন কয়েকটা। পরদিন ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’য় প্রথম পাতায় ছাপা হল— লন্ডন থেকে রেডিও-ফটো হয়ে আসা সেই ছবি।
সেই কবে ১৯৭৪ সালে তমলুকে শ্যামলকান্তিদের কবিসম্মেলনে, তুষারকান্তি ঘোষকে সে-কথা বলেছিলাম, আর এটা ১৯৮৩ সাল! হতবাক হয়ে গেলাম আমি। এমন মানুষই তো পারেন, চার্চিলের ঠোঁট থেকে চুরুট টেনে নিতে!
আর-একটি ঘটনা, সেটাও শুনেছি ‘যুগান্তর’-‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র বড়দের মুখে। তখনকার দিনে, মানে সে-কালে ব্রিটিশ শাসিত ও ব্রিটিশ শাসনমুক্ত দেশগুলি থেকে কেউ বিলেতে গেলে, লন্ডন বিমানবন্দরের অভিবাসন কাউন্টারে সইসাবুদ নয়, হাতের ছাপ দিতে হত। একবার তুষারকান্তি ঘোষ গিয়ে, এর বিরুদ্ধে তুমুল আপত্তি জানালেন। তিনি সই করতে রাজি, কিন্তু হাতের ছাপ দিতে নারাজ। ‘হিথরো বিমান বন্দর’-এ বেধে গেল হই-হুল্লোড়। বাইরে লন্ডন শহরে সান্ধ্য-সংবাদ ট্যাবলোগুলিতে এ-খবর বেরোতেই, ব্রিটিশ বিদেশদপ্তর এই বিধি প্রত্যাহার করে নিল। সই করে লন্ডন শহরে ঢুকলেন তুষারকান্তি ঘোষ।
এ-সব বড়দের মুখে শোনা। কিন্তু আমি যে-কয়েক বছর ‘যুগান্তর’-এ কাজ করছি, তুষারকান্তি ঘোষের সঙ্গে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। উপন্যাস হয়ে যাবে। আমি সংক্ষেপের মানুষ। চোখে দেখা একটি দু’টি বলতে-বলতে যাব।

প্রতিদিন দুপুরের ভেতরে, ইংরেজি ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র একটি ডামিকপি বের হত। পরের দিনের ডেটলাইন, অর্থাৎ তারিখ দিয়ে। তার প্রথম পাতাটিতে ইচ্ছে করে দু’তিনটি ভুল রাখা হত। অফিসে এসে গোলঘরটিতে বসে, তুষারকান্তি ওই ডামি ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’টি খুঁটিয়ে দেখতেন। লাল-নীল পেনসিল থাকত তাঁর হাতে। লাল পেনসিলে ভুল শুধরে দেওয়া ডামি কপিটি ফেরত আসত, ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র নিউজ ডিপার্টমেন্টে। গোলঘরে দু’একবার উঁকি দিয়ে দেখেছি, তুষারকান্তি ভুল সংশোধন করছেন, তাঁর হাতে লাল-নীল পেনসিল।
একবার ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র ডামির প্রথম পাতার ছবিটি লাল-পেনসিলে আড়াআড়িভাবে কেটে দিয়ে তুষারকান্তি ঘোষ লিখে দিলেন, ‘চেঞ্জ দ্য ফটো…’



