ডেটলাইন: পর্ব ৫৪

গল্পের দুপুরবেলা

‘আমাদের এই কুঠিবাড়ির এক তলাতেই পোস্ট-আফিস, বেশ সুবিধে, চিঠি আসবামাত্রই পাওয়া যায়। পোস্ট-মাস্টারের গল্প শুনতে আমার বেশ লাগে। বিস্তর অসম্ভব কথা বেশ গম্ভীর ভাবে বলে যান।’ ১৮৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাজাদপুরের কাছারিবাড়িতে বসে প্রিয়জনকে চিঠি লিখছেন রবীন্দ্রনাথ।

জমিদারি সামলানোর কাজে শিলাইদহ, সাজাদপুর আর পতিসরে তাঁর ঘনঘন যাতায়াত ছিল। যদিও তিনি নিজে সাজাদপুরকে কুঠিবাড়ি বলেছেন, এলাকার মানুষ কিন্তু বলে কাছারিবাড়ি। কুঠিবাড়ি আর কাছারিবাড়ির মধ্যে ফারাক আছে। কুঠিতে থাকতেন জমিদার, সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। আর কাছারি উন্মুক্ত ছিল প্রজাদের খাজনা আদায়ের জন্য। শিলাইদহে একটি আলাদা কাছারিবাড়ি দেখেছি, যেখানে নায়েব, গোমস্তা আর জমিদারির কর্মচারীরা হিসেবনিকেশ করতেন। শিলাইদহের নামডাক অনেক বেশি, পদ্মায় বোটে কাটানো কবির দিনরাত সোনার ফসলে ভরা, চরাচরব্যপী জ্যোৎস্নায় চেনা মানুষের অচেনা হয়ে ওঠার কাহিনি জোড়াসাঁকো পর্যন্ত পৌঁছত না, তাই রক্ষে। কিন্তু আমার দেখা তিনটি জমিদারবাড়ির মধ্যে সেরা সাজাদপুর।

‘শিলাইদহ থেকে শান্তিনিকেতন’ তথ্যচিত্রের শুটিং-এ সাজাদপুরে পৌঁছে মনে হল, একটা ছোটগল্পের ভেতর ঢুকে পড়লাম। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ‘গল্পের দুপুরবেলা’ খুঁজে পেলাম দোতলার লাল মেঝের ঘরটার বড় জানালার শিকের ফাঁকে, যেখান থেকে নিচে তাকালে এখনও দেখা যায় একটা চৌকো চৌহদ্দি, পোস্ট-অফিসের স্মৃতি। সেই ডাকঘর আর নেই, কিন্তু রয়েছে ঘরের পাশে ঘোরানো সিঁড়ি, যেখান দিয়ে প্রায় রোজ দুপুরবেলা দোতলায় উঠে আসতেন পোস্টমাস্টার, জমিদারবাবুর সঙ্গে গল্প করার লোভে। রবিবাবুরও ছিল গল্প শোনার নেশা। গঞ্জের আলুনি দিনে আষাঢ়ে কাহিনির মশলা যথেষ্ট উপভোগ করতেন, স্বীকার করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ‘গল্পগুচ্ছ’-র অনেক গল্পই সাজাদপুরে বসে লেখা, এমনকী, ‘পোস্টমাস্টার’-ও।

রবীন্দ্রনাথের পদ্মাবোট ভেঙে খাট তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশে!
পড়ুন ‘ডেটলাইন’-এর আগের পর্ব…

সাজাদপুর কাছারিবাড়ি

প্রিয় ভাইঝিকে চিঠিতে রসিকতা করে শুনিয়েছেন অলীক দু-চারটে গল্প। নির্জন দুপুরে কবির মুখোমুখি বসে পোস্টমাস্টার বলছেন, ‘এ দেশের লোকের গঙ্গার উপর এমনি ভক্তি যে এদের কোনো আত্মীয় মরে গেলে তার হাড় গুঁড়ো করে রেখে দেয়, কোনো কালে গঙ্গার জল খেয়েছে এমন লোকের যদি সাক্ষাৎ পায় তা হলে তাকে পানের সঙ্গে সেই হাড়গুঁড়ো খাইয়ে দেয় আর মনে করে তার আত্মীয়ের একটা অংশের গঙ্গালাভ হল।’

শিলাইদহ থেকে আড়াই ঘণ্টা, ঢাকা থেকে আর ঘণ্টাখানেক বেশি। তবু যত মানুষ শিলাইদহে যায়, তার তুলনায় খুব সামান্য লোক আসে সাজাদপুরে। একপক্ষে ভাল, নিরিবিলিতে অন্যরকম রবি ঠাকুরকে দেখা হয়ে যায়। শিলাইদহের রবীন্দ্রনাথ গভীর দর্শনের বই পড়েন, ‘আমার সোনার বাংলা’ গান লেখেন আর সাজাদপুরের রবীন্দ্রনাথ আমজনতার জন্য গল্প লেখেন, স্ত্রী মৃণালিনীকে চিঠিতে জানান, সাজাদপুরে কত ভাল ঘি পাওয়া যায়। শিলাইদহের মতো এই জমিদারিও কিনেছিলেন রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। ১৯১৮-’৪০ সালে নাটোরের রানি ভবানীর থেকে। বছর চল্লিশেকের রবীন্দ্রনাথ যখন কলকাতার কোলাহল ছেড়ে সাজাদপুরের নির্জনতায় প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতেন, মন ভরে চিঠি লিখতেন ইন্দিরাকে, ‘অন্য কোনো জায়গার তুলনায় এখানে আমি লেখার জন্য বেশি উৎসাহ পাই।’

টেবিল, চেয়ার, বিছানা, পিয়ানো, হারমোনিয়ামে সাজানো মিউজিয়ামে তিনটে জিনিস আমার মনে গেঁথে গেল। গোলটেবিল, পাখি আর বোন চায়নার ডিনার প্লেট। কেন, বলছি। টেবিলটার এমনি কোনও বিশেষত্ব নেই, বহু বনেদি বাড়িতেই দেখা যায়। কিন্তু একটু ছুঁয়েই আমার সারা গায়ে কাঁটা দিল। এই টেবিলে বসে ‘গীতাঞ্জলি’-র অনেক কবিতা অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। পালকিটা দেখেই মনে পড়ে গেল, ‘তুমি যাচ্ছ পাল্কিতে, মা, চড়ে। দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে’। নিজে পালকিতে চড়ে জমিদারি পরিদর্শন করতে বেরোতেন যখন, তখনই কি মনে আঁকা হয়ে গেছিল ‘বীরপুরুষ’? আর কাচের শোকেসে রাখা হালকা কাজ করা বিদেশি ডিনার প্লেট দেখে হাঁ হয়ে গেলাম। সেই আমলে এই টেকনোলজি? প্রতিটা প্লেটের নিচটা ফাঁপা, একদিকে ছোট্ট গর্ত আছে। সেখান দিয়ে গরম জল ঢুকিয়ে প্লেটের ওপরের খাবার গরম রাখা হত।

এই টেবিলে বসে ‘গীতাঞ্জলি’-র অনেক কবিতা অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্রনাথ

একে তো ভারত থেকে এসেছি, তায় রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তথ্যচিত্রের শ্যুটিং করছি, উচ্ছ্বসিত হয়ে স্থানীয় রবি-অনুরাগীদের খবর দিলেন কিউরেটর। এমনই একজন গবেষক একটা মন ভাল করা তথ্য দিলেন। ‘ভালোবেসে সখী, নিভৃতে যতনে/ আমার নামটি লিখো। তোমার মনের মন্দিরে’ প্রেম পর্যায়ের এই বহুবার শোনা গানটি নাকি নারী নয়, বাড়ির কথা ভেবে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই তথ্যের সত্যতা আমি গত আঠেরো বছরেও যাচাই করিনি, কারণ আমার বিশ্বাস করতে ভাল লাগে যে, কবিরা এমন করতেই পারেন।

মানুষের বিরহে কাতর হয় আমাদের মতো হরিপদ কেরানির দল, কবিদের মানায় গাছ, আকাশ, জ্যোৎস্না, এমনকী বাড়ির জন্য অশ্রুপাত। সাজাদপুরের এই বাড়িটি তাঁর এত পছন্দের ছিল যে, ছেড়ে যাওয়ার সময় বেদনাবিধুর বিরহের সুর বেজেছিল তাঁর কলমে। শরিকি মামলায় হেরে গিয়ে সাজাদপুরের বাড়ি বেহাত হয়ে যায় ঠাকুর পরিবারের। তাই জমিদার রবীন্দ্রনাথ বাধ্য হয়েছিলেন প্রিয় বাড়িকে বিদায় জানাতে। কিন্তু এই দুনিয়ার আজব কিসসা কত সময় যে হারে, শেষমেষ তার কপালেই জয়ের টিকা জ্বলজ্বল করে। যে শরিকরা মামলা-মোকদ্দমা করে ছিনিয়ে নিল সাজাদপুরের গল্প-বলা বাড়ি, তাদের কে মনে রেখেছে? শতাব্দী পেরিয়ে আজও সেটা রবীন্দ্রনাথের কাছারিবাড়ি। ‘সোহাগে-আদরে’ সে ধরে রেখেছে রবিকেই।

ভুলেই গিয়েছিলাম, সাজাদপুরেরও আছে এক নদী। পদ্মার মতো বিশাল, দু’কুল ছাপানো না হলেও ভারি রোম্যান্টিক। নাম তার, করতোয়া। একসময় নাকি কাছারিবাড়ির একদম গা দিয়ে বয়ে যেত। এখন অবশ্য দেখে বোঝার উপায় নেই। কাছারিবাড়ির সামনে পাকা রাস্তা আর তার দু-ধারে বাজার। নভেম্বরের যে দুপুরবেলা আমরা গিয়েছিলাম সেখানে, সেটা ছিল ভারি মায়াময়। ঠিক এরকম নয়, তবে আর একরকম মায়া টের পাবেন পতিসর গেলে। এখান থেকে একশো কিলোমিটার মতো হবে। সাজাদপুরের মতো গঞ্জ নয়, একেবারে পাড়াগাঁ। বাসে গিয়ে যে জায়গায় নামলাম, সেখান থেকে বেশ খানিকটা দূর কাছারিবাড়ি। তখনই আমি প্রথম ‘নছিমন’ চড়েছিলাম। আমাদের গ্রামবাংলায় যাকে চলতি ভাষায় ‘ভ্যানো’ বলে শুনেছি। বাতিল বা চোরাই বাইকের ইঞ্জিনের সঙ্গে লোহার বা কাঠের বসার পাটাতন জোড়া। চারপাশে পা ঝুলিয়ে বসে লোক। আর কিছু না পাওয়ায় আমি আর ক্যামেরাম্যান উঠলাম নছিমনে। এত ভাঙাচোরা রাস্তা যে, ঝাঁকুনিতে হাড়গোড় ভাঙার যোগাড়। তার ওপর ঠা-ঠা রোদ, মনে আছে মাথায় তোয়ালে দিয়ে বসেছিলাম। পতিসরের কাছারিবাড়িটি সাদামাটা, জমিদারি ঠাটবাট নেই। বাংলার গ্রামের বর্ধিষ্ণু পরিবারের বাড়ি যেমন হয়। অথচ, এখান থেকেই কৃষিবিপ্লবের পরিকল্পনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আমেরিকা থেকে কৃষিবিজ্ঞান শিখে আসা পুত্র রথীন্দ্রনাথকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন হতদরিদ্র চাষিদের অবস্থা ফেরানোর। রথীন্দ্রনাথ এখানে মাটি পরীক্ষার ল্যাবরেটরি বানিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে নোবেল পুরস্কার থেকে পাওয়া টাকার অনেকটা দিয়ে তৈরি করেছিলেন কৃষি ব্যাঙ্ক। সেখান থেকে ঋণ নিতে পারত চাষীরা। সমবায় তৈরির কথা তাঁর মাথায় এসেছিল পতিসরের কাছারিবাড়িতে বসেই। বংশপরম্পরায় এখানকার মানুষ এত কৃতজ্ঞ ঠাকুর পরিবারের কাছে যে, এই গ্রামের শিশুরা কথা বলতে শিখেই আবৃত্তি করে, ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে। বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ গ্রামের ধার দিয়ে বয়ে চলা নাগর নদীই নাকি রবি ঠাকুরের প্রেরণা। তবে ‘তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে। সব গাছ ছাড়িয়ে। উকি মারে আকাশে’— তাঁরা ছাড়াও এই কবিতার দাবিদার শান্তিনিকেতনের লোক, শুনে মুষড়ে পড়েছিলেন গাঁয়ের মানুষ।

সিংহদরজাটা বেশ জমকালো। খোলাই ছিল। ঢুকে প্রথমে কারওকেই দেখলাম না। একটু হাঁকডাক করতে বেরিয়ে এলেন যে মুসলমান বৃদ্ধ, তাঁকে যদি শুধু খাটো লুঙ্গি আর মলিন গেঞ্জি পরে থাকার কারণে কিউরেটর না বলি, অন্যায় হবে। অনেক চেনাশোনা বিশেষজ্ঞর তুলনায় বেশিমাত্রায় রবীন্দ্রমনস্ক তিনি। তিন পুরুষ বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন এই কাছারিবাড়ি। বললেন, তাঁর দাদু ছিলেন ঠাকুরদের নায়েব, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী। কালেভদ্রে যে দু-চারজন পর্যটক আসে পতিসরে, তাদের যত্ন করে ঘুরিয়ে দেখান তিনিই। কালীগ্রাম পরগনার জমিদারির দায়িত্ব নিয়ে পতিসরে এসে সম্ভবত প্রথম এত দারিদ্র আর অশিক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন জোড়াসাঁকোর নাগরিক আভিজাত্যে অভ্যস্ত রবীন্দ্রনাথ। ‘গোরা’, ‘ঘরে বাইরে’-র মতো উপন্যাস লেখার ফাঁকে তিনি নিয়ম করে জঙ্গল সাফ করাতেন, কুয়ো কাটাতেন, এমনকী, সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে চাষিদের বাঁচাতে সালিশি সভা পর্যন্ত বসাতে হত তাঁকে। তিন-তিনটি স্কুল তৈরি করেছিলেন কালীগ্রামে, তার মধ্যে ‘রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউট’ এখনও আছে, দেখলাম। রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার করা অনেককিছুই আছে এ-বাড়ির মিউজিয়ামে, কিন্তু শিলাইদহ বা সাজাদপুরের মতো গোছানো নয়। ঝুল, ধুলোর কথা বাদই দিলাম, বিবর্ণ খাট বা বেত ছিঁড়ে যাওয়া আরামকেদারা কষ্ট দেয়। অসহায়ভাবে জানালেন ‘দীর্ঘদিন মাইনে না পাওয়া’ কিউরেটর, প্রচুর আসবাব চুরি হয়ে গেছে।

তবে আসল শকটা বাকি ছিল তখনও। এঘর-ওঘর ঘুরতে-ঘুরতে, ছবি তুলতে-তুলতে একজায়গায় দেখলাম ঘরের মাঝখানে বড়-বড় দুটো বাক্স, মুখ খোলা। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি, লালচে হয়ে আসা পাঁপড়ভাজার মতো কিছু টুকরো কাগজ। কিছু না ভেবে ক’টা হাতে তুলে নিতেই আরও ভেঙে গেল। তাকিয়েই আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার যোগাড়। এ হাতের লেখা তো আপামর বাঙালির চিরচেনা! আবার তাকালাম, রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে লেখা খাজনার হিসেব। একদা হয়তো খেরো খাতার বন্ধনে ছিল। মনে হল, আমি কেন সেই হতভাগ্য বাঙালি, যে এই অদ্ভুত কলঙ্কের অসহায় সাক্ষী হলাম! অবিশ্বাস্য শুনতে লাগলেও, সেই মুহূর্তে কেন যেন ফ্যান চালানোর কথা মনে হল কিউরেটর ভদ্রলোকের। দমকা হাওয়ায় উড়তে শুরু করেছে কাগজের টুকরো। ক্যামেরাম্যান তড়িতে রবীন্দ্রনাথের চেয়ারে ক্যামেরা নামিয়ে ছুটেছে সুইচ বন্ধ করতে। আমি ছুটোছুটি করছি আর কুড়োচ্ছি যেটুকু পারি। বৃদ্ধ প্রথমে হতচকিত, তারপর উনিও হুমড়ি খেয়ে পড়ে অমূল্য রতন কুড়োচ্ছেন। আবার তাদের বাক্সের ভেতর ঢোকানো হল, আমার অনুরোধে দু-টুকরো পিচবোর্ড জোগাড় করে আপাতত চাপা দিলেন বাক্সদুটোর মুখ।

আমার মনে হল, রবীন্দ্রনাথ আমাদের তিনজনের কাণ্ড দেখে খুব হাসছেন, ‘যা হারিয়ে যায়, তা আগলে বসে রইব কত আর।’