ক্ষমা
শনিবার দুপুর। খিদিরপুরের একটা মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নীলা মোবাইল ফোনটার দিকে তাকিয়ে। ফোনটা বেশ কিছুক্ষণ ধরে বেজে চলেছে। নীলা নামটা দেখেই কলটা কেটে দিল। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আবার ফোন। চোখে-মুখে বিরক্তি নিয়ে আবার ফোনটা কেটে দিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল নীলা।
হঠাৎ পাশ থেকে সেই পরিচিত গলা: পাওনাদার?
নীলা বুঝতে পারে এটা নীলাব্জ, ‘তুমি কি আজকাল লোকের ফোনেও আড়ি পাতছ?’
নীলাব্জ: দেখলাম, একজন বারবার ফোন করছে আর তুমি বারবার কেটে দিচ্ছ, ধরছ না। নিশ্চয় এড়িয়ে যেতে চাইছ।
নীলা: তোমার কী?
নীলাব্জ: পাওনাদার হলে পালানোর একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারি।
নীলা: না, পাওনাদার না।
নীলাব্জ: প্রেমিক?
নীলা: একটা মেয়ে।
নীলাব্জ: ওহ! প্রেমিকা?
নীলা চোখ পাকায়: তোমার মাথায় কি সারাক্ষণ এইসবই ঘোরে?
মৌলবাদ কখনও ভাল, কখনও খারাপ?
পড়ুন ‘নীলা-নীলাব্জ’ পর্ব ২৯…
আবার ফোনটা বেজে ওঠে। এবার নীলা ওটাকে বের করে সাইলেন্ট করে দেয়।
নীলাব্জ: বেচারি! ধরে বলে দাও, না কথা বলতে চাও না।
নীলা: ও জানে।
নীলাব্জ: তাহলে ফোন করছে কেন?
নীলা: ক্ষমা চাইতে।
নীলাব্জ : তাহলে তো তোমার ধরা উচিত! ক্ষমা চাইলে করবে না?
নীলা: আরে! ক্ষমা চাইলেই ক্ষমা করতে হবে নাকি?
নীলাব্জ: কেন? কী করেছে?
নীলা: সেটা ইম্পর্ট্যান্ট না।
নীলাব্জ: অবশ্যই ইম্পর্ট্যান্ট। তোমার জন্মদিনে উইশ করতে ভুলে গেছে আর তোমাকে খুন করার চেষ্টা করেছে— দুটো কি এক?
নীলা: ঘটনা শুনে তুমি ঠিক করবে আমার কী করা উচিত? তুমি কি জাজ নাকি? তুমি কি জানো, আমি কীসে কতটা কষ্ট পেতে পারি?
নীলাব্জ: না। কিন্তু ক্ষমা ব্যাপারটা তো অপরাধের ওপর কিছুটা নির্ভর করে। মানে প্রেমে মিথ্যে কথা বলা আর ধর্মের নামে, ঈশ্বরের নামে জনসাধারণকে মিথ্যে বলা তো এক নয় তাই না? লেভেল আছে সব কিছুর। কোনটা ক্ষমার যোগ্য আর কোনটা…
নীলা: বেশ। ধরা যাক একটা মেয়েকে তার খুব কাছের এক পুরুষ বন্ধু রেপ করেছে। ধর্ষক জেল খেটে দশ বছর পরে বেরিয়ে এসে বলল, আমি পালটে গেছি, আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে ক্ষমা করে দাও। মেয়েটার ক্ষমা করা উচিত?
নীলাব্জ: হ্যাঁ।
নীলা একটু অবাক হয়ে তাকায়।

নীলা: হ্যাঁ?
নীলাব্জ: যদি রেপিস্ট সত্যি অনুতপ্ত হয় আর মেয়েটি যদি পারে, তাহলে ক্ষমা করা উচিত।
নীলা: বাহ! লোকটা রেপ করল আর শেষে দায়িত্ব পড়ল মেয়েটার ঘাড়ে, মহান হয়ে ক্ষমা করে দেওয়ার?
নীলাব্জ: দায়িত্ব বলিনি। বললাম, ক্ষমা করতে পারলে ভাল।
নীলা: কেন ভাল?
নীলাব্জ: কারণ লোকটা দশ বছর জেল খেটেছে। আইন তার শাস্তি দিয়েছে। এখন মেয়েটা যদি সারাজীবন শুধু ওই লোকটার প্রতি ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকে, তাতে আর কার শাস্তি হচ্ছে?
নীলা: তার মানে জেল খেটে বেরলেই সব হিসেব চুকল?
নীলাব্জ: আমি কি বললাম সব চুকল? লোকটা যদি সত্যিই অনুতপ্ত হয় তাহলে…
নীলা: কার লাভ? মেয়েটার কী লাভ?
নীলাব্জ: অনেকের লাভ। এই রেপিস্ট লোকটি আর এই ঘৃণ্য কাজটি করবে না…
নীলা: কিন্তু ক্ষমা মানেই তো চুকিয়ে দেওয়া। সব কুছ ঠিকঠাক হ্যায়! মেনে নেওয়া।
নীলাব্জ: না। ক্ষমা মানে অপরাধটা ঠিক ছিল বলা নয়। ক্ষমা মানে শাস্তি মাফ করাও নয়।
নীলা: তাহলে ক্ষমা মানে কী?
নীলাব্জ: ক্ষমা মানে আমি আর তোমার অপরাধটাকে আর বয়ে নিয়ে বেড়াব না।

নীলা: আঁতেলমার্কা কথা! যে অত্যাচার করল, তার অপরাধের বোঝাটাও এবার ভিক্টিমকেই নামিয়ে রাখতে হবে!
নীলাব্জ: নামিয়ে রাখতে হবে। নিজেকে তো বাঁচতে হবে রে বাবা! লেট গো করতে হয়!
নীলা: তুমি কিছু বোঝো না নীলাব্জ। কিছু অপরাধ মনে রাখা দরকার।
নীলাব্জ একটু ভাবে: আচ্ছা, মনে রাখা আর ঘৃণা করে যাওয়া কি এক জিনিস?
নীলা: কিছু-কিছু ক্ষেত্রে হ্যাঁ। ধর্ষককে আমি ঘৃণা না করে কী করব? ভালবাসব?
নীলাব্জ: মাঝখানে আর কিছু নেই?
নীলা: তোমার এই ক্ষমা-ক্ষমা শুনলে মনে হচ্ছে এরপর বলবে এক গালে চড় মারলে অন্য গাল বাড়িয়ে দাও।
নীলাব্জ: তাতে ভুলটা কোথায়? পাল্টা চড় না মারার মধ্যে একটা শক্তি আছে। সংযমের মধ্যে…
নীলা: শক্তি নয়, দুর্বলতা। কারণ তুমি তাকে শেখাচ্ছ, আমাকে চাইলেই তুমি মারতে পারো। আমি কিছু বলি না।
নীলাব্জ: না। আমি শুধু বলছি, তুমি আমাকে মারলেও আমি কিছুতেই তোমার মতো হব না।
নীলা: আর সে আবার মারলে?
নীলাব্জ: আইনের পথে হাঁটব, কিন্তু প্রতিশোধ নেব না।
নীলা: এ আবার কেমন ক্ষমা? আইন দেখাচ্ছ, শাস্তিও দিচ্ছ, এদিকে বলছ ক্ষমা করেছি!
নীলাব্জ: তুমি ক্ষমা আর ন্যায়বিচারকে গুলিয়ে ফেলছ।
নীলা: আমি কিচ্ছু গোলাচ্ছি না। তুমি বাজে বকছ। তুমি নিজে মহাত্মা সেজে ভিক্টিমকে জ্ঞান দিচ্ছ— ছেড়ে দাও, ভুলে যাও, ক্ষমা করো। এতে অপরাধীর সুবিধে। আর তাই তুমিও অপরাধীর দলে।
নীলাব্জ: আরে বাবা! মানুষ যদি ক্ষমা করতে না শেখে, তার ফলও তো আমরা দেখি।
নীলা: কী ফল?
নীলাব্জ: দাঙ্গা।
নীলা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
নীলাব্জ: একজন আমার লোককে মারল। আমি তার লোককে মারলাম। সে আমার ভাইকে মারল। আমি তার ছেলেকে মারলাম। তারপর আমার ছেলে, তার ছেলে— চলতেই থাকল। এটা কি সুস্থ আচরণ?
নীলা: বাহ! তাহলে দাঙ্গায় যদি আমার বাবাকে মেরে ফেলে, বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, তখন তুমি আমাকে বলবে ক্ষমা করে দাও?
নীলাব্জ: হ্যাঁ। নির্বোধকে তো ক্ষমা করতে হবেই। নাহলে এ চলতেই থাকবে।
নীলা: দুষ্কৃতিকে নির্বোধ বলছ? কী যা তা বলছ তর্কের খাতিরে? তুমি পাগল!
নীলাব্জ: হতে পারি।
নীলা: চোখের সামনে বাবাকে খুন হতে দেখেও?
নীলাব্জ: হ্যাঁ।
নীলা: তুমি পারতে?
নীলাব্জ একটু চুপ করে।
নীলাব্জ: জানি না পারতাম কি না। কিন্তু পারা উচিত বলে মনে করি।
নীলা: এই জন্যই ক্ষমা নিয়ে কথা বলা সহজ। আঘাতটা যখন অন্যের গায়ে লাগে, তখন সবাই গান্ধী।
নীলাব্জ: হতে পারে। কিন্তু তুমি বলো, আমি যদি সেই খুনিটাকে গিয়ে মেরে ফেলি, কী বদলাবে?
নীলা: অন্তত সে শাস্তি পাবে।
নীলাব্জ: শাস্তি দেওয়ার জন্য আইন আছে। আমি কে?
নীলা: আর আইন যদি কিছু না করে?
নীলাব্জ: তবুও খুন করে তো আর বাবাকে ফেরাতে পারবে না।
নীলা: সব কিছু ফেরত পাওয়ার জন্য করা হয় না। কখনও প্রতিশোধও ন্যায়।
নীলাব্জ: এই কথাটাই তো প্রত্যেক দাঙ্গাবাজ ভাবে।
নীলা চুপ।
নীলাব্জ হাসে: লেঙ্গি মেরেও সে বুঝতে পারে না সে অন্যায় করেছে। সে নিজের দিকটা ভাবে। নিজের কৃতকর্মের হাজারটা যুক্তি খুঁজে বের করে। এরা নিজেদেরকে বুঝিয়ে ফেলে যে সে কোনও অন্যায় করেনি। তাই…
নীলা: তাই ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
নীলাব্জ: ইয়েস। এরা কোনওদিন ক্ষমা চাইতে আসবে না।
নীলা: ভেরি গুড! তাই আমিও কোনওদিন করবও না এদের ক্ষমা।
নীলাব্জ: সারাজীবন?
নীলা: দরকার হলে।
নীলাব্জ: প্রত্যেক পক্ষই ভাবে, প্রথম অন্যায়টা অন্য পক্ষ করেছে। তাই আমার প্রতিশোধ ন্যায়সংগত। এই করে হাজার-হাজার বছর কেটে যায়।
নীলা: তাহলে ক্ষমা করে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে?
নীলাব্জ: না। ঠিক কিছু হবে না। কিন্তু কোনও একজনকে তো থামতে হবে?
নীলা: আর সেই একজন কি সবসময় ভিক্টিম?
নীলাব্জ: না। কিন্তু অপরাধী যদি না থামে?
নীলা: তাই তো বলছি! যে ক্ষমাই চায় না তাকে কেন ক্ষমা করব?
নীলাব্জ: কারণ ক্ষমা করার জন্য তার অনুমতি লাগে না।
নীলা: অনুশোচনা নেই, অপরাধবোধ নেই, তবু তাকে ক্ষমা?
নীলাব্জ: হ্যাঁ।
নীলা: এটা তো আরও হাস্যকর।
নীলাব্জ: খুন-রেপ বাদ দাও। অন্য একটা উদাহরণ দিই।
নীলা: তোমার উদাহরণ আমি জানি। প্রেমে লেঙ্গি।
নীলাব্জ হাসে: লেঙ্গি মেরেও সে বুঝতে পারে না সে অন্যায় করেছে। সে নিজের দিকটা ভাবে। নিজের কৃতকর্মের হাজারটা যুক্তি খুঁজে বের করে। এরা নিজেদেরকে বুঝিয়ে ফেলে যে সে কোনও অন্যায় করেনি। তাই…
নীলা: তাই ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
নীলাব্জ: ইয়েস। এরা কোনওদিন ক্ষমা চাইতে আসবে না।
নীলা: ভেরি গুড! তাই আমিও কোনওদিন করবও না এদের ক্ষমা।
নীলাব্জ: সারাজীবন?
নীলা: দরকার হলে।
নীলাব্জ: কেন?
নীলা: কারণ সে আমাকে কষ্ট দিয়েছে।
নীলাব্জ: সে তো জানেও না তুমি এখনও রেগে আছ।
নীলা: তাতে কী?
নীলাব্জ: কিছু না। সে হয়তো নতুন বান্ধবী নিয়ে দার্জিলিং ঘুরছে, মোমো খাচ্ছে। আর তুমি দশ বছর ধরে মাথার মধ্যে তাকে কাঠগড়ায় তুলছ। নিজের ব্লাড প্রেশার বাড়াচ্ছ।
নীলা: আমাকে কষ্ট দিয়ে সে দিব্যি ভাল থাকবে আর আমাকেই তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে? দারুণ বিচার!
নীলাব্জ: এই জন্যই তো বলছি, ক্ষমাটা তার জন্য নয়। তোমাকে দোকানদার ঠকালে তুমি কি দোকানদারকে উল্টে ঠকাতে যাও?
নীলা: সেটা ক্ষমা নয়, লেট গো করা অর্থাৎ বন্ধনমুক্ত হওয়া বা ছেড়ে দেওয়া। অন্যায় করল যে, তার কিছু করার নেই, আর যত দায়ভার নাকি আমার!
নীলাব্জ: বেশ, ধরে নিলাম লেট গো আর ক্ষমা আলাদা। তুমি লেট গো করতে পারো না?
নীলা: কেন পারব না? আমি কি লেট গো করিনি?
নীলাব্জ: কিন্তু ওই রাগটা যে তোমার মধ্যে…
নীলা চটে যায়: আমি ক্ষমা করতে চাই না। আমি লেট গো করেছি। আমি তার ওপর আর রাগ করে জীবন নষ্ট করছি না; কিন্তু আজও মনে করি, সে যা করেছিল তা ক্ষমার অযোগ্য।
নীলাব্জ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ‘পারলাম না।’
নীলা: পারার কী আছে এতে?
নীলাব্জ: কিছু না। শুধু বোঝাতে চেয়েছিলাম, এত ঘৃণা ধরে রাখাটাও তোমারই ক্ষতি। ক্ষমাটা তার দরকার নেই। ক্ষমাটা তোমার দরকার। তোমার নিজের…
নীলা: অনেক হাবড়ি-প্যাঁচাল হয়েছে নীলাব্জ। আমার কী দরকার, আমি জানি। তুমি বেশি ঘাঁটাতে এলে তোমাকেও ক্ষমা করব না।
নীলাব্জ: যাব্বাবা! আমি কী করলাম?
নীলা: ভাবো বসে! আপাতত আমি চললাম। আমার অন্য কাজ আছে।




