৫ অক্টোবর, ১৭৮৯ সাল। মেঘলা সকাল। পারি।
শহরের চাতালগুলোতে সাধারণ খেটে খাওয়া মেয়েরা একজোট হচ্ছেন। বাজারে রুটি নেই। খাবারের আগুন দাম। মাত্র তিনমাস আগে মারমুখী জনতার হাতে পতন হয়েছে বাস্তিই-র। আর দু’মাস আগে ডিক্রি জারি হয়েছে জনতার পক্ষে। জাতীয় সংবিধান সভা ১৯টি ধারার প্রচলন করেছে, যার ফলে সামন্ততন্ত্র উবে গেছে। কিন্তু পুরনো শাসনব্যবস্থা (অসিয়াঁ রেজিম) এখনও যায়নি।
ডিক্রি জারি না করে উপায়ই বা ছিল কী!
জুলাই মাসের শেষের দিক। ফ্রান্সের গ্রামগুলোতে তখন আতঙ্ক আর অস্থিরতার ঢেউ। টানা পাঁচ বছর ধরে ফসলহানির কারণে চাষিরা উদ্বেগে। বাতাসে ষড়যন্ত্রের গুজব, অভিজাতরা সাধারণ মানুষকে অনাহারে রেখে ফের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করতে চাইছে। বাস্তিই-র পতনের পর দেশ ছেড়ে দলে-দলে অভিজাতরা চলে যাচ্ছে দেখে মানুষের বদ্ধমূল ধারণা হল, কিছু একটা ষড়যন্ত্র চলছে। হয়তো শুধুই সময়ের অপেক্ষা, বিদেশি সেনাবাহিনী নিয়ে দেশে ফিরে নিশ্চয়ই আবার তারা নিজেদের অধিকার কায়েম করবে। নিজেদের সুরক্ষার তাগিদেই চাষিরা জোট বাঁধতে শুরু করল। হাতে তুলে নিল অস্ত্র। ইতিহাসে এই অধ্যায়ের নাম ‘লা গ্রন্দ প্যর’ বা ‘মহাতঙ্ক’। চাষিদের কয়েকটি দল সামন্ত প্রভুদের প্রাসাদ বা ‘শাতো’-র ওপর হামলা চালিয়ে বিভিন্ন পাওনা বা করের নথিপত্র পুড়িয়ে দিল। কয়েকজন সামন্ত প্রভু নিজেদের অধিকার ছেড়ে দিতে বাধ্য হল। এনো, আলসাস, বার্গান্ডি, ফ্রঁশ-কোঁতে— এইসব অঞ্চলে হঠাৎই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ল হু হু করে। শুধু শাতো-ই নয়, মঠও ধ্বংস হল। লুঠ হতে থাকল একের পর এক খামারবাড়ি।

আরও পড়ুন: গ্রহণে ও বর্জনে মহাত্মা গান্ধী! লিখছেন সুদিঘ্ন দাস…
সংবিধান সভার তরফ থেকে কোনও পদেক্ষেপ না নিলে আর চলছিল না। শক্তি প্রয়োগ করে বিদ্রোহ যে দমন করা যাবে না, সেকথা বুঝেই তড়িঘড়ি একটি বিল প্রস্তুত করা হল। যদিও নোয়াই বা ডিউক দেগিয়োঁ-র মতো কয়েকজন অভিজাত মানুষ সাধারণ নাগরিকের সপক্ষে ছিলেন, কিন্তু অধিকাংশ অভিজাতই সেই অধিবেশন মুলতবি করতে চাইলেন। তাঁদের গ্রাহ্য করা হল না। কোনওরকম ক্ষতিপূরণ ছাড়াই সামন্তদের সমস্ত রকমের অধিকার, পাওনা, ব্যক্তিগত দাসত্বের চুক্তি লুপ্ত হয়ে গেল। শুধু বিলের শেষে রাজা ষোড়শ লুইকে ‘স্বাধীনতার পুনরুদ্ধারকারী’ হিসেবে ঘোষণা করা হল।
বিল পাশ হতে রাত দুটো বেজে গেল। পারি শহরে মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল আর মানুষ আনন্দ উৎসবে মেতে উঠল। পারি-র আর্চবিশপ এই আনন্দের অনুষ্ঠানে একটি বন্দনাসংগীত আয়োজনের প্রস্তাব করলেন আর বাকিরা চাইল, প্রতি বছর ৪ আগস্ট জাতীয় ভোজের আয়োজন হোক।

রাজা ষোড়শ লুই দেশপ্রেমের পরিচয় দিতে গিয়ে বিপ্লবের সঙ্গে কিছুটা সমঝোতা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু যাজক আর অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্ষমতালোপের বিষয়টি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। নাগরিকদের এক বিশাল সমাবেশে যদিও তিনি বিপ্লবের প্রতীক তেরঙ্গা ককেড (লাল-সাদা-নীল রিবনের চাঁদমালার মতো গোল এক ব্যাজ) গ্রহণ করলেন। কিন্তু অগাস্ট ডিক্রি জারির বেশ কয়েক সপ্তাহ পরেও তিনি এই আদেশনামাগুলোর অনেক অনুচ্ছেদের কোনও অনুমোদন দিলেন না। রাজার এই অনীহার কারণেই গ্রীষ্মের এই সময় জুড়ে প্রচণ্ড অনিশ্বাচয়তার বাতাবরণ শুরু হল ফ্রান্সে। ‘অসিয়াঁ রেজিম’-কে ভেঙে ফেলার জন্য ‘আগস্ট ডিক্রি’ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মনে হয়েছিল বটে যে, একরাতের মধ্যেই একটা অচলায়তন ভেঙে গেল। কিন্তু বাস্তবে তা হল না। কৃষকরা চাইছিল, ডিক্রি অবিলম্বে কার্যকর হোক। উল্টোদিকে অভিজাতরা তো ক্ষুব্ধ ছিলই। সঙ্গে গির্জাও তাদের প্রাপ্য বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কর (টিথ বা টাইথ) বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিবাদ করল। গির্জার সম্পত্তি রাষ্ট্রের মালিকানাভুক্ত। এই ধারণা থেকে শেষ পর্যন্ত গির্জার জমি দখল শুরু হতে থাকল। গির্জা আর বিপ্লবের এই সরাসরি বিরোধই পরে রক্তক্ষয়ী চেহারা নিল। এবং তার সবচেয়ে বড় মাশুল দিল সাধারণ মানুষ।
তীব্র খাদ্যাভাব। রুটির দাম আকাশছোঁয়া। এই পরিস্থিতিতে রাজপরিবারের উদাসীনতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের পথই বেছে নিল মানুষ।
‘মানুষ’ শব্দটি উচ্চারণ করলে নারীর কথা মনে হয় না আজও, তাই না? কিন্তু এই সশস্ত্র বিপ্লব শুরু করল নারীই। প্যারিসের সমস্ত অস্ত্রাগার হানা দিয়ে বন্দুক, ছুরি আর কামান লুঠ করল তারা। তারপর রওনা হল ১২ মাইল দূরের ভার্সাই প্রাসাদের উদ্দেশে, কাদা আর অবিরাম বৃষ্টির বুক চিরে। ইতিহাসে এটিই ‘ভার্সাইয়ের নারী মার্চ’ বা ‘ব্ল্যাক মার্চ’ নামে পরিচিত।

সাধারণ মানুষের এই সশস্ত্র বিদ্রোহ ফরাসি বিপ্লবের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
রাজতন্ত্রের ভিত নড়ে গেল। পরদিন বিকেলের মধ্যেই ক্ষুব্ধ জনতা রাজপ্রাসাদের সীমানা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল। রাজা ষোড়শ লুইকে নারীদের অধিকার ও বিপ্লবী সনদে সই করতে বাধ্য করল এবং পুরো রাজপরিবারকে বন্দি করে নিয়ে এল প্যারিসে।
কিন্তু এই বিশাল রাজনৈতিক জয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার সত্য। ‘ব্ল্যাক মার্চ’ প্রমাণ করে যে, বিপ্লব নারীর অবদানকে কীভাবে খাটো করে দেখে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার কেন্দ্রে আছে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুই নারী চরিত্র: একপক্ষে বাজারের দরিদ্র, সাহসী শ্রমজীবী নারীরা— পোয়াসার্দ বা মাছওয়ালিরা, যারা ছিল এই বিদ্রোহের মূল চালিকাশক্তি; আর অন্যপক্ষে ছিলেন সাধারণ মানুষের ঘৃণার পাত্রী, রানি মারি আঁতোয়ানেত। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ এই ইতিহাসকে নতুন করে লিখল। যে শ্রমজীবী নারীরা বিপ্লব সফল করলেন, তাঁদের নাম ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হল। আর অন্যদিকে, রানিকে করা হলো চরম অপমান ও কুৎসার শিকার, যার শেষ পরিণতি ছিল গিলোটিনে তাঁর নৃশংস মৃত্যু।

কালো রিবন এবং প্রাসাদের ভোজসভা
এই ঐতিহাসিক যাত্রাকে কেন ‘ব্ল্যাক মার্চ’ বলা হয়, তা বুঝতে আমাদের যেতে হবে ভার্সাই প্রাসাদের বিলাসবহুল হলে। ১ অক্টোবর, ১৭৮৯ সালে রাজার দেহরক্ষীরা নতুন আসা একদল রাজকীয় সৈন্যের জন্য এক বিশাল ভোজসভার আয়োজন করে। মদ আর আমোদের স্রোতে ভেসে সেই রাতে রাজদরবারের অভিজাতরা বিপ্লবের বিরুদ্ধে উস্কানি দিতে শুরু করেন। দরবারের নারীরা রানির অস্ট্রিয়ান বংশের প্রতীক হিসেবে কালো রঙের রিবন বা ব্ল্যাক ককেড এবং রাজতন্ত্রের সাদা রিবন বিলি করেন। প্যারিসের ক্ষুধার্ত মানুষের কানে খবর পৌঁছায় যে, রাজার সৈন্যরা বিপ্লবের লাল-সাদা-নীল রঙের রিবন মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়েছে।
প্যারিসের যে মায়েরা নিজের সন্তানদের না খেয়ে মরতে দেখছিলেন, তাঁদের কাছে রাজপ্রাসাদের এই অপচয় ও উপহাস সহ্য হল না। জঁ-পল মারা-র মতো কট্টরপন্থী সাংবাদিকরা তাঁদের পত্রিকায় এই ঘটনাকে ‘দেশদ্রোহিতা’ হিসেবে তুলে ধরলেন। কাদা-বৃষ্টির ‘কালো রাস্তা’ এবং রানির ‘কালো রিবন’-এর প্রতি ক্ষোভ— এই দুই মিলে জন্ম নিল ‘ব্ল্যাক মার্চ’।
৫ ও ৬ অক্টোবরের আসল ঘটনা
মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পুরো পরিস্থিতি ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল।
৫ অক্টোবর, ১৭৮৯ (যাত্রার শুরু): প্যারিসের বাজার থেকে কয়েকজন নারীর ড্রাম বাজিয়ে শুরু করা প্রতিবাদ দ্রুত ৭,০০০ মানুষের এক বিশাল আর্মিতে রূপ নেয়। বর্শা, ছুরি আর কামান নিয়ে টানা ছ’ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজে সন্ধ্যায় তাঁরা ভার্সাই পৌঁছন। রাজা লুই কয়েকজন নারী প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করেন এবং শস্যভাণ্ডার খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু প্রাসাদের বাইরের ক্ষুব্ধ জনতা রাজাকে বিশ্বাস করেনি।
৬ অক্টোবর, ১৭৮৯ (প্রাসাদ আক্রমণ): ভোর ৬টার দিকে কিছু বিক্ষোভকারী প্রাসাদের একটি অরক্ষিত গেট খুঁজে পায়। জনতা ভেতরে ঢুকে রানির খোঁজে তাণ্ডব শুরু করে এবং তাঁর দেহরক্ষীদের হত্যা করে তাদের মাথা বর্শার ডগায় গেঁথে দেয়। রানি মারি আঁতোয়ানেত খালি পায়ে এক গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে রাজার ঘরে পালিয়ে কোনওমতে প্রাণ বাঁচান।
ব্যালকনির সেই দৃশ্য: প্রাসাদের নিচে জড়ো হওয়া রক্তপিপাসু জনতাকে শান্ত করতে সেনাপ্রধান লাফায়েত রানিকে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান। এক নাটকীয় মুহূর্তে লাফায়েত হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে রানির হাতে চুম্বন করেন। এই সম্মান দেখে ক্ষুব্ধ জনতা শান্ত হয়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘রানি দীর্ঘজীবী হোন!’
বন্দি রাজার প্রত্যাবর্তন: জনতা দাবি করে, রাজাকে তাঁদের সঙ্গে পারি-তে ফিরতে হবে। সেদিন বিকেলে এক অদ্ভুত শোভাযাত্রা পারির দিকে রওনা হয়। সামনে রক্ষীবাহিনী, মাঝে রাজার গাড়ি, আর চারপাশ ঘিরে বিজয়ী নারীদের স্লোগান, ‘আমরা রুটিওয়ালা, রুটিওয়ালার বউ আর তাদের ছোট ছেলেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছি!’
শ্রমজীবী সাধারণ নারীদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা
এই বিপ্লবের মূল শক্তি ছিলেন বাজারের সাধারণ খেটে খাওয়া মেছুনিরা। আজীবন কঠিন পরিশ্রম করা এই নারীরা শারীরিকভাবে যেমন শক্তিশালী ছিলেন, তেমনই রাজনৈতিকভাবেও সচেতন ছিলেন। কিন্তু তাঁদের এই জয়ের পরপরই পুরুষ বিপ্লবী নেতারা ভয় পেয়ে যান। তাঁরা ভাবলেন, গরিব নারীরা যদি রাজাকে তাড়াতে পারে, তবে তাঁরা সমাজও বদলে দিতে পারে।
তাই পুরুষ সমাজ তাঁদের অবদানকে ছোট করতে এক প্রচারণা শুরু করে দিল। পত্রিকায় লেখা হল— এটি কোনও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নয়, বরং ক্ষুধার জ্বালায় ‘মহিলাদের এক উন্মাদ আচরণ’। রাজপন্থীরা এ-ও রটিয়ে দিল যে, প্রাসাদে কোনও নারী যানইনি, পুরুষরাই স্কার্ট-ব্লাউজ পরে নারী সেজেছিল! ১৭৯৩ সালের মধ্যে বিপ্লবীরা নারীদের সমস্ত রাজনৈতিক ক্লাব নিষিদ্ধ করে দিল।


মারি আঁতোয়ানেত এবং চরম কুৎসা
শ্রমজীবী নারীদের যেমন অবজ্ঞা করা হল, রানি মারি আঁতোয়ানেতকে তেমনই বানানো হল বিপ্লবের প্রধান খলনায়ক। ফরাসি আইন অনুযায়ী নারীদের সরাসরি শাসন করার অধিকার ছিল না, তাই রানিরা পর্দার আড়াল থেকে প্রভাব খাটাতেন। পুরুষ বিপ্লবীরা নারীর এই গোপন ক্ষমতাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ‘অস্বাভাবিক’ মনে করতেন।
আন্ডারগ্রাউন্ড প্রেস বা পত্রিকাগুলো রানির বিরুদ্ধে অত্যন্ত নোংরা ও অশ্লীল প্রচারণা চালাত। সস্তা চটি বইয়ে তাঁর নামে মিথ্যা যৌন কেলেঙ্কারি ও নিজের ছেলের সঙ্গে সম্পর্কের মতো জঘন্য অপবাদ ছড়ানো হয়। ১৭৯৩ সালে তাঁর বিচার এবং গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড কেবল একজন শাসকের শাস্তি ছিল না; এটি ছিল মূলত সমাজের সব নারীর প্রতি এক হুঁশিয়ারি— কোনও নারী যদি পুরুষদের রাজনীতিতে নাক গলায়, তবে তার পরিণতি এমনই।
দুই মেরুর সেতু: অলিম্প দ্য গুজ (Olympe de Gouges)
এই দুই মেরুর ট্র্যাজেডিকে যিনি নিজের জীবন দিয়ে অনুভব করেছিলেন, তিনি হলেন নারীবাদের অগ্রদূত অলিম্প দ্য গুজ। বিপ্লবের ‘পুরুষ ও নাগরিকের অধিকার সনদ’-এ নারীদের বাদ দেওয়া দেখে ১৭৯১ সালে তিনি লিখলেন— ‘নারী ও নারী নাগরিকের অধিকার সনদ।’
রাষ্ট্রব্যবস্থার এই ফাঁদটি ধরে ফেলেছিলেন অলিম্প। এক সাহসী পদক্ষেপে তিনি তাঁর এই নারী ইশতেহারটি রানি মারি আঁতোয়ানেতকে উৎসর্গ করেন এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজে রানিকেও একজন সহযোদ্ধা নারী হিসেবে পাশে চান। তিনি তাঁর বিখ্যাত লাইনে লিখেছিলেন: ‘নারীর যদি ফাঁসির মঞ্চে ওঠার অধিকার থাকে, তবে তাঁর সংসদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলারও সমান অধিকার আছে।’
তাঁর এই কথাটি এক নির্মম সত্যে পরিণত হল। পুরুষ বিপ্লবী নেতারা তাঁর এই সম-অধিকারের দাবি সহ্য করতে পারেনি। ১৭৯৩ সালের নভেম্বর মাসে, রানি মারি আঁতোয়ানেতের ফাঁসির মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, অলিম্প দ্য গুজকেও গিলোটিনে হত্যা করা হয়। বিপ্লবী সরকারি পত্রিকা তখন লিখেছিল, ‘অলিম্প নিজের নারীসুলভ গুণাবলি ভুলে একজন রাষ্ট্রনেতা হতে চেয়েছিলেন, তাই আইন তাঁকে যোগ্য শাস্তি দিয়েছে।’

যদিও বিপ্লবের ইতিহাস থেকে নারীকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা এই প্রথম নয়। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের— বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবেও নারীরাই আক্ষরিক অর্থে সেই স্ফুলিঙ্গটি জ্বালিয়েছিলেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এক সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছিল। অথচ ফরাসি বিপ্লবের মতোই, এখানেও পুরুষ রাজনৈতিক নেতারা ঘটনার বয়ান এমনভাবে নতুন করে সাজিয়েছিলেন, যাতে নারীদের সচেতন রাজনৈতিক কৌশলপ্রণেতা হিসেবে না দেখিয়ে কেবল খাদ্যের প্রয়োজনে রাস্তায় নামা ‘আকস্মিক’ বিক্ষোভকারী হিসেবে দেখানো হয়।
পুরুষ-শাসিত সমাজের অপপ্রচার ও প্রকৃত সত্যের পার্থক্য
আধুনিক গণতন্ত্রের পথ নারীর রক্ত ও শ্রমে চিহ্নিত। ইতিহাসবিদরা এই ঘটনার বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলোকে একত্রিত করে শেষ অবধি একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র দাঁড় করিয়েছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর পুরুষ ইতিহাসবিদরা ‘পোয়াসার্দ’ শব্দটিকে ‘অমার্জিত বা অভদ্র মাছ বিক্রেতা নারী’ হিসেবে অবমাননাকর অর্থে ব্যবহার করলেও, আধুনিক আর্কাইভ গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই নারীরা আসলে অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর (গিল্ড) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বড় কোনও উৎসবের সময় রাজার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী অধিকার তাদের ছিল; এর ফলে বিপ্লবের আগে একমাত্র তাঁরাই ছিলেন নিম্নবিত্ত নাগরিক, যাদের একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর ছিল। ভার্সাই অভিমুখে সেই অভিযান কোনও বিশৃঙ্খল দাঙ্গা ছিল না; বরং ‘জনগণের পিতা’ হিসেবে রাজাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতেই এই অভিযান।
ইতিহাসবিদরা দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি ধারণাকেও ভুল প্রমাণ করেছেন— যেখানে দাবি করা হত যে, এই অভিযানের নেতৃত্বে গোপনে ‘নারীর ছদ্মবেশধারী পুরুষ’-রা ছিল। ৬ অক্টোবরের হাসপাতালের নথিপত্র (যেখানে নারীদের আঘাত ও মৃত্যুর তালিকা ছিল) এবং পারির বাজারগুলোর আর্থিক হিসেবের নথির মধ্যে পারস্পরিক তুলনা করে ইতিহাসবিদরা প্রমাণ করেছেন যে, মিছিলে অংশগ্রহণকারী নারীদের অধিকাংশই ঠিক তাই ছিলেন যা তাঁরা দাবি করেছিলেন— অর্থাৎ, কঠোর পরিশ্রমী মা, কাপড় ধোয়ার কাজে নিয়োজিত নারী এবং বাজারের বিক্রেতা।
পারি শহরের ধুলোমাখা নথিপত্র থেকে এই নামগুলোকে সামনে নিয়ে আসার মাধ্যমে নারীবাদী ইতিহাসচর্চা ফরাসি বিপ্লব বিষয়ক প্রচলিত বয়ান বা আখ্যানকে বদলে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, পারির শ্রমজীবী নারীরা খাদ্য সংকটের কেবল নিষ্ক্রিয় শিকার ছিলেন না— বরং তাঁরা ছিলেন সক্রিয় রাজনৈতিক চালিকাশক্তি, যাঁরা ফ্রান্সের ক্ষমতার কাঠামোটি বুঝতেন এবং কৌশলগতভাবে তা ভেঙে দিয়েছিলেন।



