গান্ধী: গ্রহণে, বর্জনে

প্রতি বছর ২ অক্টোবর এলেই যেন এদেশে ‘মহাত্মা’ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে স্মরণ করার হিড়িক পড়ে। অফুরন্ত প্রার্থনাসভা, সরকারি অনুষ্ঠান, মূর্তি-চিত্র-স্মৃতিসৌধে মাল্যদান, মন্ত্রী-সান্ত্রী আর রাজনৈতিক কর্তা-ব্যক্তিদের উদাত্ত ভাষণ, একাডেমিক বক্তৃতা, বই প্রকাশ, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি— বিস্তর আয়োজন দেখা যায় চারপাশে! স্বাধীনতা-উত্তর ভারত রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে তিনি ‘জাতির জনক’; ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত ঐক্যবদ্ধ মুক্তি-সংগ্রামের এমন এক অবিসংবাদী নেতা, যাঁর অহিংস প্রতিরোধের কৌশল পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রশংসা ও অনুসরণের জন্ম দিয়েছিল। বিগত সাত-আট দশকে, তাঁর প্রতিকৃতি ভারতবর্ষের দৈনন্দিন দৃশ্যমানতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া, ২ অক্টোবর এখন শুধু ‘গান্ধী জয়ন্তী’ বা জাতীয় ছুটির দিন নয়, ২০০৭ সাল থেকে এই দিনটি রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে পালিত আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবসও। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বোধ ও বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলেও গান্ধী হয়ে উঠেছেন অহিংস প্রতিরোধের এক অবিস্মরণীয় ‘আইকন’।

বস্তুত, ‘জাতি’ (Nation) হিসেবে আমরা স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হতে পেরেছিলাম মূলত তাঁর কারণেই—এমনটাই মনে করা হয়। আবার, প্রতিবেশী পাকিস্তানের বিপরীতে, আমাদের দেশের ধর্মীয় ও ভাষাগত বৈচিত্র্য নিয়ে আমরা যে গর্ব করতে পারতাম— এর নেপথ্যেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে স্বীকার করা হত। কিন্তু এখানেই ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস। তিনি যত বেশি স্মরণীয়, তাঁকে নিয়ে সমালোচনাও ঠিক ততটাই স্থায়ী। তিনি একই সঙ্গে পূজিত ও প্রত্যাখ্যাত, রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্‌যাপিত এবং প্রতিস্পর্ধী রাজনৈতিক মতাদর্শের কাছে তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, সর্বজনীন ‘প্রতীক’ রূপে পরিবেশিত এবং বিভিন্ন যুগ ও প্রেক্ষিতে বারবার পুনর্নির্মিতও। তাঁকে কেউ জাতির নৈতিক বিবেক হিসেবে দেখেছেন; কেউ বা দেখেছেন ঔপনিবেশিক তথা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের সর্বশ্রেষ্ঠ সংগঠক হিসেবে, আবার কেউ তাঁর জাতপাত, ধর্মবোধ, শ্রেণিচেতনা, অর্থনৈতিক ভাবনা কিংবা রাজনৈতিক কৌশলের সমালোচনা করেছেন আগাগোড়া। এই চিরায়ত দ্বান্দ্বিকতাই বোধহয় গান্ধীর বিপুল ব্যক্তিত্বের পুঁজি!

গান্ধীর জীবনকাল— ১৮৬৯ থেকে ১৯৪৮— রবীন্দ্রনাথের অনুরূপ; তাঁর অবস্থান যেন দুই শতাব্দীর মধ্যিখানে দাঁড়ানো এক অক্ষয় বটের মতো! যদিও এই সময়কালের ভিতর গান্ধীর জীবন ফুরোয় না। প্রথাসিদ্ধভাবে তাঁর একটি ‘জীবনী’ অবশ্যই আছে, তবে, একই সঙ্গে, রয়েছে একাধিক উত্তরজীবনও! যার ঐতিহাসিক শুরুয়াত ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তাঁর হত্যার পরে— স্মৃতিতে, রাষ্ট্রীয় প্রতীকে, রাজনৈতিক ভাষায়, সামাজিক আন্দোলনে, সর্বোপরি, বিরোধিতায় ও পুনর্ব্যাখ্যায়।

এই অর্থে গান্ধী, ইতিহাসে স্থির হয়ে থাকা কোনও মূর্তি নন। তিনি বরং এক চলমান ঐতিহাসিক বিতর্ক।

আরও পড়ুন: জেন জি ও গান্ধী! লিখছেন সম্প্রীতি চক্রবর্তী…

২

‘মহাত্মা’ কিন্তু কোনও জন্মগত পরিচয় ছিল না; ছিল না নিছক একটি সরকারি অভিধা। ‘মহাত্মা’ হয়ে ওঠা ছিল একটি জটিল ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। গান্ধীর রাজনৈতিক মতাদর্শ ও নৈতিক ব্যক্তিত্ব নির্মিত হয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে— দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবিদ্বেষের মুখোমুখি হওয়া, সত্যাগ্রহের বিকাশ, ভারতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ, পায়ে হেঁটে ভারত দর্শন, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন, চরকা ও স্বদেশির প্রচার, গ্রামসমাজের সঙ্গে সম্পর্ক ও শহুরে জাতীয়তাবাদকে বৃহত্তর গণ-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা এবং ব্যক্তিগত ধর্মীয়-নৈতিক ব্যবহারকে রাজনৈতিক ভাষ্যের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া— সমস্তটার ভিতর দিয়েই ঘটেছিল ‘মহাত্মা’ রূপে তাঁর নির্মাণ।

গান্ধী ক্রমাগত নিজেকে ভাঙার মধ্য দিয়ে গড়েছেন। শুনতে ও শিখতে পারার ব্যতিক্রমী ক্ষমতা, এবং বিপরীত প্রমাণের মুখোমুখি হলে নিজের মত পরিবর্তন করার মানসিক প্রস্তুতি, তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যান্য রাজনীতিকদের থেকে— এমনকী, আমাদের সময়ের রাজনীতিকদের থেকেও— স্পষ্টভাবে পৃথক করে। তিনি ক্রমাগত নিজের পূর্বধারণাগুলিকে প্রশ্ন করতেন এবং একই সঙ্গে তাঁর সহকর্মী ও সমালোচকদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে মতবিনিময়ও করতেন। তাঁর সুবিশাল রচনাবলি এর জ্বলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত! লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি তাঁর একসময়ের রক্ষণশীল পূর্বধারণা পরিত্যাগ করে তুলনামূলকভাবে অধিক সাম্যবাদী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।

ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতির গভীরে যে বর্ণবাদী মানসিকতার শিকড় রয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবে গান্ধীর মনের ভিতরেও জাল বিস্তার করেছিল। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর অবস্থানের শেষ পর্যায়ে এসে গান্ধী তাঁর বর্ণবাদী অবস্থান থেকে বর্ণবাদ-বিরোধী অবস্থানে পৌঁছেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর চিন্তার আরও বিবর্তন ঘটে। জীবনের শেষ কয়েক দশকে তিনি নীতিগত ও ধারাবাহিকভাবে বর্ণবাদের বিরোধিতা করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকার সময় গান্ধী ভারতীয়দের সংগ্রামকে আফ্রিকানদের নিজস্ব সংগ্রাম থেকে পৃথক করে দেখেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এই অবস্থানটিও পরিবর্তিত হয়েছিল। যুবাকালে জাতপাতের ঘৃণ্য রূপটিকে তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি, তবে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর, ভারতে দলিতদের প্রতি যে নির্মম আচরণ করা হত, তা দেখে গভীরভাবে বিচলিত হতে শুরু করেন। এরপর, বিশ শতকের দুইয়ের দশকে অসাধারণ সমাজ-সংস্কারক নারায়ণ গুরুর অনুগামীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, এবং সর্বোপরি, তিনের দশকে দলিতদের মহান মুক্তিদূত বি. আর. আম্বেদকরের দ্বারা প্ররোচিত ও চ্যালেঞ্জিত হয়ে গান্ধী জাতপাত সম্পর্কে আরও র‍্যাডিকাল অবস্থান গ্রহণ করতে শুরু করেন। তিনি শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করেছিলেন, ভারতের অগ্রগতির পথে সেটি একটি বড় বাধা। একই কথা খাটে, নারীদের সামাজিক অবস্থান প্রসঙ্গে তাঁর মত পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও। চিরাচরিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার নিগড়ে আবদ্ধ গান্ধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে মহিলাদের প্রকাশ্য অংশগ্রহণ কিংবা জনপরিসরে নারী-পুরুষের সমান উপস্থিতিকে সমর্থন করেননি শুরুতে। সেই তিনিই আবার, নানাজনের সান্নিধ্যে ও নানা পরিস্থিতির চাক্ষুষ শিক্ষায় এমন গতানুগতিক মনোভাব বদলে ফেলে, দলে দলে নারীদের কারাবরণে উৎসাহিত করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। এছাড়া আরও নানা ক্ষেত্রে তাঁর মত পরিমার্জিত হয়েছে। তিনি ক্রমাগত শিখেছেন এবং নিজেকে পরিবর্তিত করেছেন।

১৬ এপ্রিল, ১৯৩৮। কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে কথালাপের পর…

সুতরাং, দৈবত্ব ও ধিক্কারের মাঝামাঝি কোনও স্থান থেকে তাঁর লেখাপত্তর খুঁটিয়ে পড়লে আমাদের পক্ষে এটা অনুধাবন করা নিতান্তই কঠিন হবে না যে, গ্রহণ ও বর্জনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তাঁর নিজের ভিতরেও চলেছিল অনবরত, আজীবন। এখানেও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত সাযুজ্য। কখনও তিনি নিজেকে ‘সন্ত’ বা অত্যুচ্চ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝঞ্ঝা পার হয়ে, নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে ভুল শুধরে নিতে অগ্রসর হয়েছেন। আত্মজৈবনিক রচনা, ‘The Story of My Experiments with Truth’-এর প্রতি পৃষ্ঠায় তাই দেখি তাঁর আত্মনির্মাণের সবুত।

৩

গান্ধীর সমকালে তাঁর সমালোচকদের কোনও কমতি ছিল না। বাম ও সমাজবাদী নেতৃত্ব, জিন্না ও মুসলিম লিগ, বি. আর. আম্বেদকর, হিন্দু মহাসভা ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠন—প্রত্যেকেই নিজের মতো করে গান্ধীর রাজনৈতিক পদ্ধতি, সমাজনীতি, অর্থনৈতিক চিন্তা, জাতপাত সম্পর্কে অবস্থান কিংবা অহিংসার কৌশল নিয়ে তীব্র বিরোধিতা করেছিল। অর্থাৎ, গান্ধীর বিতর্কিত হয়ে ওঠা তাঁর জীবৎকালেই। বলাই বাহুল্য, সেসব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। তা নিয়ে অনুপুঙ্খ চর্চা যথেষ্টই হয়েছে, যা এই স্বল্প পরিসরে কুলিয়ে ওঠা অসম্ভব। স্বভাবতই, আমাদের কারবার গান্ধী-উত্তর ভারতবর্ষে গান্ধীর গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস নিয়ে। অবশ্য বলতে দ্বিধা নেই, সেইসব গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানও আসলে গান্ধীর ঐতিহাসিক উপস্থিতির একরকম ‘স্বীকৃতি’!

স্বাধীন ভারতে গান্ধীর মতবাদ সম্পর্কে প্রথম যে প্রত্যাখ্যানটির আমাদের সামনে আসে, সেটি ছিল ভেরিয়ার এলউইনের আত্মজীবনী, ‘The Tribal World of Verrier Elwin: An autobiography’ (১৯৬৪)। এলউইন ছিলেন এক ব্রিটিশ বিশপের পুত্র এবং পরবর্তীকালে মধ্য ভারতের আদিবাসীদের পরম সুহৃদ ও অন্যতম প্রধান নৃতাত্ত্বিক গবেষক। গান্ধী তাঁকে ভালভাবেই চিনতেন এবং একসময় এলউইন নিজেকে তাঁর শিষ্য বলেও মনে করতেন। পরবর্তী জীবনে মহাত্মার নৈতিক সাহস এবং ধর্মীয় বহুত্ববাদের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখেও এলউইন গান্ধীর দু’টি অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। প্রথমত, মদ্যপান নিষেধের পক্ষে গান্ধীর প্রচারকে তিনি আদিবাসী সংস্কৃতির পক্ষে ক্ষতিকর বলে মনে করতেন। কারণ সেখানে ঘরে তৈরি মদ ছিল একই সঙ্গে পুষ্টির একটি উৎস এবং আর্থিক স্বাবলম্বন এবং নৃত্য ও সংগীতের সহায়ক। দ্বিতীয়ত, গান্ধীর ব্রহ্মচর্যের মহিমাকীর্তনকেও তিনি মানেননি; তাঁর মতে, সেটি সকলের জন্যই ক্ষতিকর ও অপ্রাসঙ্গিক।

গত শতকের সাত ও আটের দশকে, গান্ধীবাদী আদর্শের প্রতি দ্বিতীয় প্রত্যাখ্যানটি ধেয়ে আসে মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবীদের দিক থেকে। অবশ্য এর একটি সূত্র গান্ধীর সমসাময়িক বিশিষ্ট মার্কসবাদী তাত্ত্বিক রজনী পাম দত্তের ‘India Today’-তেই নিহিত ছিল। যাই হোক, তাঁদের সমালোচনার তুলনায় এলউইনের বক্তব্য ছিল নিতান্তই মৃদু— এমনকী, কিছুটা দ্বিধাগ্রস্তও। এই পণ্ডিতদের অনেকেই তখন নকশালপন্থীদের সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত করে দেখেছিলেন। মাও-অনুপ্রাণিত এই বিদ্রোহীরা যেখানে গান্ধীর মূর্তি পেত, সেখানেই তার শিরশ্ছেদ করত। এমন বইও লেখা হয়েছিল যেখানে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, গান্ধী একই সঙ্গে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং ভারতীয় পুঁজিপতি শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, গান্ধীর অহিংসা আসলে একটি কৌশল—যার মাধ্যমে জনগণকে বিপ্লবী পথ থেকে সরিয়ে আনা হয়েছিল।

গান্ধীকে নিয়ে মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি মৌলিক গলদ থেকে গিয়েছিল। তাঁরা এই বিষয়টিকে গুরুত্বই দেননি যে, গান্ধীর অহিংসার প্রতি আনুগত্যের উৎস ছিল মানুষের প্রাণ নেওয়ার প্রতি তাঁর গভীর অনীহা। অন্তত মাও যে অর্থে চিনা প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি সান ইয়াত-সেনকে শর্তসাপেক্ষে প্রশংসা করেছিলেন, গান্ধীকেও সেই অর্থে কিছুটা স্বীকৃতি দেওয়া উচিত ছিল তাঁদের। মাওয়ের মতে, সান ইয়াত-সেন একটি প্রাথমিক জাতীয় চেতনার ভিত গড়ে দিয়েছিলেন, যার ওপর পরে একটি উন্নততর সমাজতান্ত্রিক চেতনা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সচেতনভাবে না হলেও, গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন কী সেরকমই কিছু করেনি?

৪

গান্ধী, গান্ধীবাদী ও মার্কসবাদীদের মধ্যেকার আদর্শগত সংঘাত ও বিতর্কগুলি ব্যক্তিগত ও বৌদ্ধিক— উভয় দিক থেকেই আমাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু এখন, একুশ শতকের এই তৃতীয় দশকে, ভারতে গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রধান আক্রমণ আসছে সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শিক প্রান্ত থেকে। গত দশ-বারো বছর ধরে ভারতের ক্ষমতায় রয়েছে হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থা, এবং গান্ধীর অহিংসার দর্শন ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতি তাঁর অঙ্গীকার তাদের কাছে বিরক্তিকর ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য। এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি ‘জাতির জনক’; তাঁর জন্মদিন জাতীয় ছুটির দিন এবং মুদ্রার নোটে তাঁর মুখমণ্ডল মুদ্রিত। কিন্তু জনপরিসরের আবহে গান্ধীর প্রতি বিরূপতা ক্রমশ বেড়েছে ও বেড়েই চলেছে।

ভারতে গান্ধী কেন ক্রমশ অজনপ্রিয় হয়ে উঠছেন, তা বুঝতে হলে পঁচাত্তর বছর আগে তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতির দিকে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নাথুরাম গডসে গান্ধীকে হত্যা করেন। গডসে ছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস—একটি গোপনীয় ধরনের আধা-সামরিক সংগঠনের একনিষ্ঠ সদস্য। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আরএসএস ভারতে একটি হিন্দু ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বিশ্বাসী ছিল এবং এখনও সেই বিশ্বাস বহন করে। সংগঠনটির নেতারা ও কর্মীরা মনে করেন, জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং তাদের ধর্মের ভারতীয় উৎসের কারণে হিন্দুরাই এই ভূখণ্ডের স্বাভাবিক ও চিরস্থায়ী শাসক। মুসলমান ও খ্রিস্টানদের প্রতি তাঁদের বিশেষ সন্দেহ রয়েছে, কেননা এই ধর্মগুলির উৎপত্তি এবং তাদের প্রধান পবিত্র তীর্থস্থানগুলি ছবি ভারতের বাইরে অবস্থিত।

অন্যদিকে গান্ধীর বিশ্বাস ছিল, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে ভারতবর্ষ তার সকল নাগরিকের সমান অধিকারভুক্ত। ১৯৪৭ সালের আগস্টে উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার পর ভারতে থেকে যাওয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করার জন্য তিনি প্রবলভাবে কাজ করেছিলেন। কলকাতায় এবং পরে দিল্লিতে তিনি অনশন করেছিলেন। দিল্লির অনশন চলাকালীন তিনি ব্রিটিশ হাই-কমিশনের দপ্তরের বিপরীত দিকে অবস্থিত একটি বাড়িতে ছিলেন। পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে ব্রিটিশ ডেপুটি হাই কমিশনার লন্ডনের উচ্চতর কর্তৃপক্ষকে লিখেছিলেন: ‘day in and day out, too, Muslims of all classes of society, many of whom had also suffered personal bereavements in the recent disturbances, came to invoke his [Gandhi’s] help. Normally too fearful even to leave their homes, they came to him because they had learned and believed that he had their interests at heart and was the only real force in the Indian Union capable of preserving them from destruction.’

ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য গান্ধীর এই প্রচেষ্টা আরএসএস-এর প্রধান, এম. এস. গোলওয়ালকরকে ক্ষুব্ধ করেছিল। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে দিল্লিতে আরএসএস-এর একটি সভা সম্পর্কে পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, ‘মুসলমানদের প্রসঙ্গে’ গোলওয়ালকর মন্তব্য করেছিলেন: ‘no power on Earth could keep them in Hindustan. They would have to quit the country. Mahatma Gandhi wanted to keep the Muslims in India so that the Congress may profit by their votes at the time of election. But, by that time, not a single Muslim will be left in India. …Mahatma Gandhi could not mislead them any longer. We have the means whereby such men can be immediately silenced, but it is our tradition not to be inimical to Hindus. If we are compelled, we will have to resort to that course too.’

কয়েক সপ্তাহ বাদে দিল্লিতে আরএসএস-এর সদস্য নাথুরাম গডসের হাতে গান্ধী নিহত হন। সংগঠনটিকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ করা হয় এবং এম. এস. গোলওয়ালকরকে কারারুদ্ধ করা হয়। পরে ভারতীয় সংবিধান মেনে চলার ব্যাপারে সম্মত হওয়ার পর আরএসএস-এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তী দশকগুলিতে তারা সারা ভারতে নিজেদের জনভিত্তি ক্রমশ বিস্তৃত করে। সেই সময় গান্ধীর যে মর্যাদা ছিল, তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তারা মাঝেমধ্যে তাঁর প্রশংসাও করত— যদিও তাঁকে বহু দেশপ্রেমিকের মধ্যে কেবল একজন দেশপ্রেমিক হিসেবেই উপস্থাপন করা হত। কিন্তু তাঁর আদর্শ এবং আরএসএস-এর মতাদর্শের মধ্যে ব্যবধান থেকে যায় বিরাট। ১৯৬৬ সালের একটি বইয়ে গোলওয়ালকর ভারতীয় মুসলমানদের নিন্দা করে তাঁদের ‘অভ্যন্তরীণ হুমকি’ হিসেবে চিত্রিত করতেও পিছপা হননি।

মুম্বইয়ের বিড়লা হাউসে‌। একটি ওজন যন্ত্রর ওপর। ১৯৪৫

৫

২০১৪ সালের মে মাস থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় রয়েছে। আরএসএস হল তাঁদেরই মূল আদর্শগত সংগঠন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তরুণ বয়সে আরএসএস-এ যোগ দিয়েছিলেন; তাঁর বহু মন্ত্রীও একই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্র, শিক্ষা ও প্রচারব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং একটি বিশাল ও অত্যন্ত কার্যকর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-ভিত্তিক প্রচারযন্ত্রের সাহায্যে বিজেপি ও আরএসএস ইতিহাসের প্রচলিত বয়ানকে নতুনভাবে নির্মাণ করার জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছে। ভারতের অতীতের মুসলিম শাসকদের নিষ্ঠুর লুণ্ঠনকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং আজকের মুসলমানদের তাঁদের পূর্বপুরুষদের কথিত কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে বলা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে গান্ধী ও তাঁর কংগ্রেস দলের নেতৃত্বকে অস্বীকার করা হয় এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের পক্ষপাতীদের প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়। ১৯৫০ সালের প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ভারতীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের চরিত্র নির্মাণে যে মৌলিক ভূমিকা পালন করেছিল, তা উপেক্ষা করা হয়। পরিবর্তে ভারতীয়দের বলা হয় যে, অনাদিকাল থেকেই ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

পেশাদার ইতিহাসবিদরা ব্যঙ্গ করে এই দাবিগুলিকে ‘হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস’ বলে কটাক্ষ করেন ঠিকই। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হল, এই বয়ান ক্রমশ আরও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করছে বিগত কয়েক বছরে। এই নতুন ইতিহাস-বয়ানে গান্ধীই প্রধান ঘৃণার পাত্র। তাঁকে অভিযুক্ত করা হয় অহিংসার প্রচারের মাধ্যমে ভারতীয়দের পৌরুষহীন করে তোলার জন্য; আধুনিকায়নপন্থী জওহরলাল নেহরুকে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরসূরি নির্বাচনের জন্য, কোনও অধিকতর ‘প্রকৃত হিন্দু’ ব্যক্তিকে নয়; পাকিস্তান সৃষ্টির পথ রোধ করতে না পারার জন্য; এবং ভারতে থেকে যাওয়া মুসলমানদের সমান নাগরিক অধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়ার জন্য।

বিজেপির সাংসদরা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসেকে ‘দেশভক্ত’ হিসেবে অভিহিত করেন; প্রতি বছর ৩০ জানুয়ারি গডসের প্রশংসা বর্তমান এক্স বা টুইটারে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে; মাঝেমধ্যেই গডসের মূর্তি স্থাপন এবং তাঁর স্মরণে মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে আসে। গান্ধীকে উপহাস করে এবং হিন্দুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে তৈরি ইউটিউব ভিডিওগুলি লক্ষ-লক্ষ বার দেখা হয়।

গান্ধীর এই রাজনৈতিক ‘প্রত্যাখ্যানে’ কংগ্রেস দলের ভণ্ডামি ও অসদাচরণও সহায়ক হয়েছে। বহু দশক ক্ষমতায় থাকার সময় কংগ্রেস প্রায়ই গান্ধীর নাম উচ্চারণ করেছে, অথচ বাস্তবে তাঁর আদর্শ থেকে ক্রমশ দূরে সরে গেছে। কংগ্রেস নেতারা লোকদেখানোভাবে খাদি পরেছেন, অথচ স্বজনপোষণ ও দুর্নীতিকে উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন এবং মানবাধিকারকর্মীদের হয়রানি করেছেন। এই সমস্ত কিছুই করেছেন নিজেদের গান্ধীয় উত্তরাধিকারের একমাত্র বৈধ উত্তরসূরি হিসেবে দাবি করার সময়।

সেবাগ্রামে তাঁর কার্যালয়ের সামনে। ১৯৪০

৬

হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থার রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে-সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঘিরে এক বিশাল ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতিও নির্মিত হয়েছে। তাঁর অনুসারীরা যেখানে গান্ধীকে আক্রমণ করেন, সেখানে মোদি নিজে গ্রহণ করেছেন এক ধরনের কৌশলগত দ্ব্যর্থক অবস্থান। একদিকে তিনি বিনায়ক দামোদর সাভারকরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন— যিনি ছিলেন এক হিন্দু জাতীয়তাবাদী, গান্ধী ও মুসলমান উভয়েরই প্রবল বিরোধী এবং যাঁকে নাথুরাম গডসে তাঁর আদর্শিক গুরু বলে মনে করতেন। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে গান্ধীর বিপুল পরিচিতি সম্পর্কে সচেতন মোদি নিজের ভাবমূর্তি নির্মাণের কাজে তাঁকে ব্যবহার করেছেন। বিদেশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের নিয়ে তিনি আহমেদাবাদের গান্ধী আশ্রম পরিদর্শন করেছেন।

২০১৯ সালের ২ অক্টোবর, মহাত্মার ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে ‘The New York Times’ পত্রিকায় নরেন্দ্র মোদির লেখা গান্ধীকে প্রশংসা করে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধটি অত্যন্ত সুচতুরভাবে নির্মিত হয়েছিল। শুরুতে বলা হয়েছিল, কীভাবে এক মহান আমেরিকান, ড. মার্টিন লুথার কিং, গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন; এবং শেষে আর-এক মহান আমেরিকান, অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলা হয়েছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন: ‘In Gandhi, we have the best teacher to guide us. From uniting those who believe in humanity to furthering sustainable development and ensuring economic self-reliance, Gandhi offers solutions to every problem.’

তবে The New York Times-এ নরেন্দ্র মোদির নিবন্ধে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল যা বলা হয়নি, এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেটি। গান্ধী যে উদ্দেশ্যে সারাজীবন বেঁচেছিলেন— এমনকী, যে উদ্দেশ্যের জন্য তিনি জীবন দিয়েছিলেন— অর্থাৎ, আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি, সে-সম্পর্কে একটি শব্দও ছিল না। এই বাদ পড়া আকস্মিক ছিল না। কারণ ভারত এমন একটি দেশ, যা সমানভাবে সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের— এইপ্রকার ভাবনা নরেন্দ্র মোদি গান্ধীর সঙ্গে ভাগ করেন না।

মোদি নিজেকে সর্বাগ্রে একজন হিন্দু হিসেবে দেখেন; এমনকী, কখনও-কখনও নিজেকে এমন এক উদ্ধারকর্তা হিসেবেও উপস্থাপন করেন, যিনি তাঁর ধর্মাবলম্বীদের ওপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংঘটিত বাস্তব ও কল্পিত অপমান ও অবিচারের প্রতিশোধ নিতে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম দিকের একটি বক্তৃতায় মোদি ভারতীয়দের ‘বারোশো সাল কি গুলামি’— অর্থাৎ, মুসলমান ও খ্রিস্টান আক্রমণকারীদের হাতে বারোশো বছরের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার কথা বলেছিলেন।

গান্ধীর জন্মভূমিতে আজ তাঁর বিরুদ্ধে যে ব্যাপক বিরূপতা দেখা যাচ্ছে, তার বৃহত্তর প্রেক্ষাপট এটাই। এর কেন্দ্রে রয়েছে ধর্মীয় বহুত্ববাদের প্রতি তাঁর অবিচল অঙ্গীকার। মোদি নীরব থাকলেও বিজেপির শীর্ষ নেতারা ভারতের দুই কোটিরও বেশি মুসলমানের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে কটাক্ষ ও ভয় দেখিয়ে, কোনও কারণ বা প্ররোচনা ছাড়াই, তাঁদের ‘মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্য’ প্রমাণ করতে বলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিভিন্ন নির্বাচনে নির্বাচিত গুচ্ছ-গুচ্ছ বিজেপি প্রতিনিধিদের মধ্যে কতজন মুসলমান তার হিসেব কষলেই মনোভাবটি বোঝা যায়।

মোদি যেখানে বেছে-বেছে গান্ধীর প্রশংসা করেন, সেখানে তাঁকে সমর্থন ও ভোট দেওয়া অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন যে, গডসে গান্ধীকে হত্যা করে সঠিক কাজই করেছিলেন। এমনকী, তাঁদের কেউ-কেউ মনে করেন, গান্ধীর আরও আগেই নিহত হওয়া উচিত ছিল— বিশেষত তাঁর শেষ অনশনের আগে। সেই অনশনে তিনি ভারতে থেকে যাওয়া মুসলমানদের সমান অধিকার দেওয়ার জন্য ভারতীয়দের আহ্বান জানিয়েছিলেন; সেই মুসলমানেরা নিজেদের দেশপ্রেমের প্রকাশ হিসেবে এমন একটি দেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যে দেশ ছিল তাঁদেরও।

৭

বর্তমান ভারতের আরও বহু দিক রয়েছে, যা গান্ধী যে ভারত গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তার সঙ্গে খুব কমই সাদৃশ্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, স্বাধীনতার পর থেকে পরপর বিভিন্ন সরকার যে মাত্রায় প্রাকৃতিক পরিবেশের নির্বিচার লুণ্ঠনকে উৎসাহিত করেছে, তাতে গান্ধী নিশ্চয়ই আতঙ্কিত হতেন। পশ্চিমের সম্পদ ও শক্তিনির্ভর শিল্পায়নের মডেল অনুসরণ করার বিরুদ্ধে গান্ধী অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন। ১৯২৬ সালে তাঁর ‘Young India’ পত্রিকায় সম্পাদকীয় প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, “…make India like England and America is to find some other races and places of the earth for exploitation.”

ইংল্যান্ড ও আমেরিকা শিল্পায়নের সূচনাকালে যে বিপুল সম্পদ ও বাজারের সুবিধা পেয়েছিল, ভারতের কাছে তা ছিল না। ফলে দেশটিকে নিজের মানুষ ও নিজের পরিবেশের শোষণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। কংগ্রেস ও বিজেপি—উভয় আমলেই সবচেয়ে নির্মম আক্রমণ এসেছে বৃহৎ খনি সংস্থাগুলির কাছ থেকে। পরপর সরকার তাদের বিপুল আর্থিক লাভের সন্ধানে বন ধ্বংস, গ্রামবাসীদের উচ্ছেদ এবং বায়ু, জল ও মাটিকে দূষিত করার অবাধ অনুমতি দিয়েছে। সেই বিপুল আর্থিক লাভের একটি অংশ গেছে সেইসব রাজনীতিকদের কাছে, যারা রাষ্ট্রের ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অত্যন্ত অনুকূল শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দিয়েছেন ধনী ব্যবসায়ীদের।

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলির অনেকগুলিই ভারতে অবস্থিত। আমাদের মহান এবং তথাকথিত পবিত্র নদীগুলি অপরিশোধিত শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্যের কারণে জৈবিকভাবে মৃতপ্রায়। আমাদের ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলি দ্রুত নিঃশেষিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পাঠকদের উদ্দেশে লেখা নিবন্ধে আমাদের প্রধানমন্ত্রী গান্ধীর ‘টেকসই উন্নয়ন’-এর ধারণার প্রশংসা করতে পারেন, অথচ গান্ধীর নিজের দেশে সেই ধারণাগুলিই সবচেয়ে ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকিকে বাদ দিলেও, ভারতের পরিবেশগত পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক।

৮

এবার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিপজ্জনক পরিস্থিতির কথা ভাবুন। একজন স্বাধীনচেতা সম্পাদক হিসেবে গান্ধী নিশ্চয়ই এতে বিচলিত হতেন। ব্রিটিশ শাসন তাঁর লেখা ও অন্যান্য লেখকের মুদ্রিত কথার মাধ্যমে ‘অসন্তোষ’ সৃষ্টি করার অভিযোগে তাঁদের কারারুদ্ধ করেছিল। গান্ধী আশা করেছিলেন, ভারত স্বাধীন হলে নির্বিচারে গ্রেফতারের সুযোগ করে দেওয়া ‘দেশদ্রোহ’ আইনটি বাতিল করা হবে। কিন্তু তা এখনও বহাল রয়ে গেছে এবং সাংবাদিক, ছাত্রনেতা ও সমাজকর্মীদের কারারুদ্ধ করার জন্য ক্রমশ ব্যবহার করা হচ্ছে।

গান্ধী আজ বেঁচে থাকলে রাজনৈতিক শ্রেণির প্রতারণা ও মিথ্যাচারেও নিশ্চয়ই হতাশ হতেন; ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান তাঁকে দুঃখিত করত; নিম্নবর্ণের মানুষ ও নারীদের ওপর অব্যাহত আক্রমণ তাঁকে ব্যথিত করত। তাঁর দেশ বহু দিক থেকেই তার আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের দিকে পিঠ ফিরিয়েছে। আর সম্ভবত কোথাও এই বিচ্যুতি এতটা স্পষ্ট নয়, যতটা সংখ্যাগুরু হিন্দু সমাজের মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষে।

বড় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের জীবন ও উত্তরাধিকার সবসময়ই নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়, এবং সেটিই হওয়া উচিত। যেমন দাসপ্রথার সঙ্গে তাঁদের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার কারণে জর্জ ওয়াশিংটন ও টমাস জেফারসনের মতো মার্কিন ঐতিহাসিক ও প্রণম্য ব্যক্তিত্বদের নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে; অথবা সাম্রাজ্যবাদ এবং দুর্ভিক্ষে ভারতীয়দের মৃত্যুর প্রতি তাঁর উদাসীনতার কারণে ব্রিটেনের সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধনায়ক হিসেবে বিবেচিত উইনস্টন চার্চিলের উত্তরাধিকারও নতুনভাবে বিচার করা হয়েছে।

পুনর্মূল্যায়ন ও প্রতিমাভঙ্গ অবশ্যই অন্ধভক্তির চেয়ে অসীমভাবে শ্রেয়। স্বাধীনতার পরের প্রথম কয়েক দশকে গান্ধীর প্রতি যে নির্বিচার শ্রদ্ধা দেখানো হয়েছিল, তা হয়তো চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলিকে তখন আমরা যতটা সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন ছিল, ততটা দেখতে পারিনি বা দেখতে চাইনি। কিন্তু বর্তমানে যা ঘটছে, তা পুনর্মূল্যায়ন বা প্রতিমাভঙ্গ নয়; এটি পিতৃহত্যার মতো— সেই ব্যক্তির সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান, যিনি সম্ভবত অন্য যে কারও চেয়ে বেশি এই জাতিকে অস্তিত্বে আসতে সাহায্য করেছিলেন।

ভারতের এখনও গান্ধীর ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে— প্রজাতন্ত্রকে একটি ‘হিন্দু পাকিস্তান’-এর দিকে পিছলে যাওয়া থেকে রুখতে; পরিবেশ ধ্বংস এবং তার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতিকে থামাতে; জনজীবনের কথাবার্তায় অন্তত কিছুটা সৌজন্য ফিরিয়ে আনতে; এবং বর্তমানে এক কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রের চাপে যে নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমশ পিষ্ট হচ্ছে, সেগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে।

স্বাধীনতা প্রাপ্তির এই আট দশক পরে, যখন ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সামাজিক পরিস্থিতি কার্যত ভাঙনের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে, তখন এটা জোর দিয়ে বলা যায়, গান্ধীর মৃত্যুর পর তাঁর ভাগ্য ক্রমশ বুদ্ধের ভাগ্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে উঠছে— যে-দেশে তিনি তাঁর নৈতিক ও সামাজিক দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, সেই দেশেই তাঁকে অবজ্ঞা করা হয়; অথচ পৃথিবীর দূরবর্তী নানা প্রান্তে তিনি অনুসারী ও অনুরাগী লাভ করবেন, যেসব স্থানে তিনি কখনও যাননি, এমনকী, সম্ভবত যেসব স্থানের অস্তিত্ব সম্পর্কেও জানতেন না, সেখানেও তাঁকে সাদরে গ্রহণ করা হয়। অথচ আমরা ভারতীয়রা যেন গান্ধীকে আনুষ্ঠানিক গ্রহণ করার অছিলায় তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছি— যেমন একসময় এই দেশ বুদ্ধকেও প্রত্যাখ্যান করেছিল।

তাতে কী গান্ধীর আদৌ কিছু আসে যায়? গান্ধীর কথা ও কাজে প্রচারের কৃত্রিমতা নেই, গোপন অভিসন্ধি আড়াল করার চেষ্টা নেই, নিজের পদচিহ্ন মুছে ফেলার উদ্যোগ নেই, নেই কোনও ‘স্পিন’ বা পরিকল্পিত প্রচার-কৌশল, নেই নিজেকে আকর্ষণীয় বা নির্দোষ হিসেবে তুলে ধরার সচেতন তাগিদ। গান্ধীকে পড়া, গান্ধীকে নিয়ে গবেষণা করা— অর্থাৎ এমন এক মানুষের মুখোমুখি হওয়া, যাঁর অনুসারীরা তাঁকে শুদ্ধ ও নিখুঁত, এমনকী, ‘মহাত্মা’ বলেও দাবি করেছিলেন; অথচ যিনি নিজেকে জানতেন একজন ভ্রান্তিপ্রবণ ও অসম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে। অতএব, তাঁকে গ্রহণের মধ্যে ঝুঁকি নেই, কিন্তু প্রত্যাখ্যানে ক্ষতি অনেক।