মুহূর্তের ভাষ্যকার

রঘু রাই কেবল আলোকচিত্রী ছিলেন না, ছিলেন শিল্পী। খুব, খুব বড়মাপের শিল্পী, যাঁর কাজ দেখামাত্র চেনা যেত, এটাই রঘু রাইয়ের ফ্রেম। ওঁর সঙ্গে তুলনা চলতে পারে একমাত্র ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ের-ব্রেসঁ-র। তাঁর ছবি দেখলেও চেনা যেত একলহমায়।

রঘু রাই সারা ভারত ঘুরে-ঘুরে ছবি তুলেছেন। ভারতের রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক ইতিহাসকে প্রতি পদে তিনি নথিবদ্ধ করে গিয়েছেন ওঁর ফ্রেমে। কিন্তু সেই ছবির ভাষা আন্তর্জাতিক। কোথাও স্থান-কাল অতিক্রান্ত নয়, কিন্তু ভাষা ও আঙ্গিকে সেই ছবি বিশ্বজনীন। তা ভারতের ব্যস্ত পথঘাট হতে পারে, হতে পারে ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার কঠিনতম মুহূর্তগুলি, অথবা ইন্দিরা গান্ধী থেকে দলাই লামা, সত্যজিৎ রায় থেকে অমিতাভ বচ্চনদের আশ্চর্য সব ছবি। ব্যক্তি হোক বা ঘটনা, রঘু রাইয়ের ছবি তাকে চেনাত অনন্য এক দৃশ্যভাষে, যাতে তাঁর নিজস্ব ছবি তোলার চিহ্নগুলি প্রতীয়মান হয়ে থাকত।

সেইসব ছবির বেশিরভাগই ‘ক্যান্ডিড’ মুহূর্ত। কিন্তু তাঁর ফ্রেমগুলো এত আগ্রহব্যঞ্জক, যে তা একটি দৃশ্যের অন্য দৃষ্টিকোণ তুলে ধরে। বাস্তবকেই তাঁর ক্যামেরায় তুলে ধরছেন রঘু রাই, কিন্তু তার মধ্যে রয়ে যাচ্ছে কিছুটা অবাস্তব বা পরাবাস্তবের কিছু পরত, যদি মন দিয়ে খুঁটিয়ে দেখা যায়।

রঘু রাইয়ের ফ্রেমে সত্যজিৎ রায়

আরও পড়ুন: আজকের ভারতে হয়তো রঘু রাইয়ের অস্তিত্বই থাকত না! একান্ত সাক্ষাৎকারে অনুরাগ কাশ্যপ…

স্থিরচিত্র এমনই একটি মাধ্যম, যা মুহূর্তকে ধরে রাখে। যার অতীত নেই, ভবিষ্যৎও নেই, আছে কেবল ওই মুহূর্তটুকু। সেই মুহূর্তকে ধরে রাখার জন্য চোখ দরকার, দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। এখন ফোটোগ্রাফি প্রায় ছেলেখেলা হয়ে গেছে। হাতে-হাতে মোবাইল। সকলেই ছবি তুলছে। তাতে ক্ষতি নেই। অনেকেই হয়তো ভাল ছবিও তুলছে। কিন্তু রঘু রাইয়ের সাধনা থেকে এই শিক্ষাটা গ্রহণ করা উচিত, যে কীভাবে আমি আমার অবজেক্টকে দেখব। মানুষ হোক বা প্রাণী, তাঁর সাদা-কালো ছবিতে যে অননুকরণীয় আলোছায়ায় ধরা দিত, তা অভূতপূর্ব।

একথা মানতেই হবে, রঘু রাইয়ের খুব প্রিয় শহর ছিল কলকাতা। উনি কলকাতায় অসংখ্য ছবি তুলেছেন। নানা সময়ে, নানা পর্বে। কলকাতার যে বৈচিত্র্য, তা রঘু রাইকে মজিয়ে রেখেছিল। রঘু রাইয়ের সঙ্গে কলকাতা নিয়ে কত কথা যে হয়েছে! রঘু রাইয়ের একটা বিশেষ অনুভূতি ছিল, কলকাতায় এলেই মন ভাল হয়ে যায়। কারণ, এই শহরে সকলের মুখে হাসি।

বেশ কয়েক দশক ধরে আমাদের জাতীয় জীবনের যাবতীয় ওঠাপড়া তাঁর ক্যামেরায় ধরে রেখেছিলেন রঘু রাই। এমন মহান একজন শিল্পী চলে গেলেন। পড়ে রইল তাঁর অগুনতি কাজ, যা আমাদের ফেলে আসা সময়কে চেনাবে, এবং শেখাবে, সময়কে কীভাবে লেন্সে ধরে রাখতে হয়।