ভাষা, দৃশ্যময়

Representative Image

বাসে বা ট্রামে করে শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছেন, হঠাৎ দেখলেন দু’জন ব্যক্তি একে অপরের দিকে তাকিয়ে খুব ঘন-ঘন হাই তুলছে। সেই হাই তোলা দেখে আপনারও হাই তোলার ইচ্ছে জাগতে পারে, সেটার একটা বৈজ্ঞানিক দিকও আছে। কিন্তু এইরকম ঘটলে একবার নিজের পকেটটা দেখে নেবেন, কারণ ততক্ষণে আপনার পকেট গড়ের মাঠ হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা প্রবল। অথবা, আপনি সদ্য ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে বাইরে এসেছেন বাস বা অটো ধরার জন্য। বাস বা অটোতে উঠেছেনও, হঠাৎ দেখলেন একজন আপনাকে দেখে ভ্রু নাচাচ্ছে, তাহলে তক্ষুনি সাবধান হয়ে যান। অথবা সন্ধেবেলা আপনার বাড়ির সামনে কেউ একটা ফাউন্টেন পেন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাহলে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি কোনও বাড়ির তালা ভাঙার জন্য যন্ত্র চাইছে। এইগুলো বাংলার নিম্নস্তরের অপরাধীদের মধ্যে প্রচলিত কিছু ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন তারা এই ইঙ্গিতের ব্যবহার করেই অপরাধ জগতের ধারাকে বজায় রেখেছে। যদি খোলা বাজারে দু’জন ব্যক্তিকে রুমাল নাড়িয়ে কোনও জিনিস কেনাবেচা করতে দেখেন, তাহলে এবিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে যে, সেগুলো চোরাই মাল!

অপরাধ জগতের ভাষা ও ইঙ্গিতের ইতিহাস মূলত সমাজের গোপন স্তরগুলির ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িয়ে। প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন প্রান্তিক ও পেশাভিত্তিক গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ রক্ষা ও বাইরের নজর এড়াতে আলাদা ভাষা বা সংকেত ব্যবহার করত। ইউরোপে মধ্যযুগে চোর-ডাকাতদের মধ্যে ‘cant’ নামে এক ধরনের গোপন ভাষার প্রচলন ছিল, যা সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য। একইভাবে ভারতে ঔপনিবেশিক যুগে ঠগি সম্প্রদায়ের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে গোপন শব্দ ও ইশারা ব্যবহার করত, যাতে ব্রিটিশ প্রশাসন তাদের পরিকল্পনা ধরতে না পারে। বাংলার ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। উনিশ ও বিশ শতকে শহুরে অপরাধ বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে চোর, পকেটমার, দালাল প্রভৃতি গোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ ভাষার বিকাশ ঘটে। এই ভাষা শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইশারা, চোখের চাহনি, হাতের সংকেত, এমনকী শরীরের ভঙ্গিমাও যোগাযোগের অংশ হয়ে ওঠে। কারণ, সব সময়ে কথা বলা সম্ভব নয়, অনেক সময়ে ভিড়ের মধ্যে বা পুলিশের সামনে নীরবে বার্তা আদান-প্রদান করতে হয়। তাই ইঙ্গিতভিত্তিক যোগাযোগ, অপরাধ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে। এই ভাষা ও ইঙ্গিত সময়ের সঙ্গে বদলেছে। নতুন শব্দ যুক্ত হয়েছে, পুরনো শব্দের অর্থ বদলেছে, আবার প্রযুক্তির প্রভাবে মোবাইল ও ডিজিটাল মাধ্যমেও নতুন ধরনের ভাষা তৈরি হয়েছে। তবে মূল উদ্দেশ্য একই থেকেছে, গোপনীয়তা বজায় রাখা, দ্রুত যোগাযোগ করা এবং নিজেদের গোষ্ঠীকে আলাদা পরিচয় দেওয়া। বাংলার অপরাধী জগতে অনেক সময় শোনা গিয়েছে, ‘ওই যে বিড়ি আসছে’। তার মানে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে বোঝানো হচ্ছে। আবার যদি শোনা যায়, ‘ওই রাস্তার মোড়ে সিগারেট দাঁড়িয়ে আছে’ মানে কলকাতা পুলিশের কোনও আধিকারিক সেখানে উপস্থিত। গবেষণা করে জানা গিয়েছে, পুলিশের পোশাকের ধরণের উপর ভিত্তি করে এইরকম নামকরণ করেছে অপরাধীরা। বাংলার অপরাধীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পকেটমারদের। তাদের আবার নিজস্ব অঞ্চল ভাগ করা থাকে। পকেটমারদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে রাজাবাবু বলা হয়। এই রাজাবাবু শিক্ষানবীশ পকেটমারদের ট্রেনিং দেয়। পকেটমারি এমন এক পেশা যা এখনও অপরাধজগতের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। গবেষণা বলছে, বাংলার অপরাধ জগতের প্রায় ৮০% পুরুষ পকেটমারির সঙ্গে যুক্ত। এদের মধ্যে আবার ৯৫% অবিবাহিত।

আরও পড়ুন: তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়াই নতুন আইনের উদ্দেশ্য? লিখছেন দেবত্রী ঘোষ…

বাংলার অপরাধ জগতের একটা বড় অংশ জুড়ে, এই পকেটমার, চেন টানা পার্টি, বেশ্যাদের দালাল, জুয়ারি, ডাকাত। এদের সবার নিজস্ব এক রীতি আছে। এরাও ভগবান এবং কুসংস্কারে বিশ্বাসী। অপরাধজগতের লোকেরা কালী, নারায়ণ, কার্তিক, চণ্ডী এবং শীতলা দেবীর পুজো করে থাকে। গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলার চোরেরা চুরি করতে যাওয়ার পথে, যদি কুকুরের ডাক শোনে, সেটা তাদের কাছে অশুভ সংকেত। আবার যদি তৃতীয় লিঙ্গের কারোর সঙ্গে তাদের মুখোমুখি হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে তারা সেইদিন আর চুরি করতে যায় না। চুরির জায়গায় আধখাওয়া বিড়ির টুকরো ফেলে আসা তাদের কাছে শুভ। শুধু তাই নয়, অনেকসময়ে চুরি করা বাড়িতে মলত্যাগও শুভ হিসেবে মানা হয়। পকেটমাররা কাজে বেরনোর সময়ে, কেউ যদি পিছনে ডাকে, সেটা তাদের জন্য অশুভ। যদি কোনও বাসে বা ট্রামে উঠতে গিয়ে পা পিছলে যায়, সেক্ষেত্রে তারা সেই বাস বা ট্রাম ছেড়ে দেয়। সেটাও অশুভ লক্ষণ। পকেটমারি করার আগে যদি সুন্দরী বিবাহিত মহিলার দর্শন তারা পান, তাহলে সেদিন তাদের আমদানি ভাল হবে। কারণ সুন্দরী মহিলা দর্শন পকেটমারির আগে ভগবান দর্শনের সমতুল্য। বড় ডাকাতি করার আগে পাঁঠাবলি দেওয়া ডাকাতদের জন্য শুভ বলে ধরা হয়। তবে শুধু কুসংস্কার কিংবা রীতিনীতি নয়, অপরাধ জগতের মানুষদের মধ্যে যে শব্দের আদানপ্রদান হয়, সেই শব্দ কোনও ডিকশনারিতে পাওয়া যাবে না। ‘বারুয়া’ বলা হয় পুলিশের ইনফারমারদের। ‘ঘোড়া’ মানে, তাদের কাছে বেআইনি রিভালবার। তাদের ভাষায় পাখি মানে সোনার জিনিস। ‘ভিত্‌তর’ শব্দের অর্থ জেলখানা। অপরাধ জগতে নামকরা মস্তানদের বলা হয় দেঁতো আর খুদে মস্তানদের বলা হয় দেঁতো পুটি। বাংলার অপরাধ-জগতের ভাষা কোনও একক ভাষার উত্তরাধিকার নয়, এটি এক বহুভাষিক ছায়া-সংস্কৃতির ফল। উনিশ ও বিশ শতকে রেললাইন, কয়লাখনি আর বন্দরকে কেন্দ্র করে যে বিপুল শ্রমিক অভিবাসন ঘটেছিল, তার সঙ্গেই বাংলায় প্রবেশ করে ভোজপুরি, মাগধি, হিন্দি ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন উপভাষা। এই মানুষগুলো শুধু শ্রম নয়, তাদের ভাষাকেও সঙ্গে করে এনেছিল। অপরাধ-চক্রের ভেতরে যখন এই বহুভাষিক মানুষেরা একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করল, তখন প্রয়োজন হল এমন এক যোগাযোগ ব্যবস্থার, যা দ্রুত, কার্যকর এবং সর্বোপরি গোপন থাকবে। সেখানেই জন্ম নিল এক মিশ্র ভাষা। যেখানে বাংলা শব্দের সঙ্গে ভোজপুরি বা হিন্দি শব্দ জুড়ে গিয়ে তৈরি হল, নতুন শব্দ। তবে গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শব্দের ব্যবহার কিছু ক্ষেত্রে পরিবেশধর্মী। যখন বাস বা ট্রামে বিড়ি বা সিগারেট খাওয়ার ছাড়পত্র ছিল, তখন একজন পকেটমার অন্যজনকে বিড়িলাগা বলে ডাকত। এর অর্থ, এইবার পকেটমারার সঠিক সময়। বাসের পাদানিতে দাঁড়িয়ে নীচু-চাক্‌কা বললে এর অর্থ দাঁড়ায়, বাস থেকে ওঠা বা নামার সময়ে যাত্রীদের পকেট মারতে। অপরাধ জগতে মেয়ে চোরদের কুড়ি চরখা বলা হয়ে থাকে। হাওড়া রেলইয়ার্ডের কয়লা চোরদের বলা হত কেচুআ। 

ইশারা, চোখের চাহনি, হাতের সংকেত, এমনকী শরীরের ভঙ্গিমাও যোগাযোগের অংশ হয়ে ওঠে। কারণ, সব সময়ে কথা বলা সম্ভব নয়, অনেক সময়ে ভিড়ের মধ্যে বা পুলিশের সামনে নীরবে বার্তা আদান-প্রদান করতে হয়। তাই ইঙ্গিতভিত্তিক যোগাযোগ, অপরাধ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে। এই ভাষা ও ইঙ্গিত সময়ের সঙ্গে বদলেছে। নতুন শব্দ যুক্ত হয়েছে, পুরনো শব্দের অর্থ বদলেছে, আবার প্রযুক্তির প্রভাবে মোবাইল ও ডিজিটাল মাধ্যমেও নতুন ধরনের ভাষা তৈরি হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাংলার জেলখানার কয়েদীদের মধ্যে আবার এক ধরনের শব্দের চল বেশি। তাদের কাছে, কুপিয়া মানে জেলের ভিতরে সেল। খাববুস মানে জেলের খাবার। যদি কেউ বলে ‘আজ দালাইলামা খাবো’, তার মানে সে গাঁজা খাবে। জেলের মধ্যে ময়লাখোর বলে কাউকে ডাকা হলে, তার মানে সে সমকামী। যদি কেউ বলে ‘দোকানে আজ মাল আসবে’, তার মানে মলদ্বারে লুকিয়ে গাঁজা আসবে। এইরকম আরও অদ্ভুত শব্দে ভর্তি জেলখানার নিজস্ব শব্দকোষ। জেলের ভিতর পরিচিত পুলিশ কর্মীকে বাবা বলে সম্বোধন করে কয়েদীরা। তাদের কাছে ধোঁয়া শব্দের অর্থ আগ্নেয়াস্ত্র।

বহু বছর আগে, কলকাতা পুরভোটের দিন বিকেলে, গিরীশ পার্ক এলাকায় গুন্ডাদের গুলি লাগে, সাব-ইনস্পেক্টর জগন্নাথ মণ্ডলের কলার বোনে। তবে মোটর বাইকে চড়াও হওয়া ওই মস্তানদের বলা হয়েছিল স্রেফ ‘সওদাবাজি’ করতে। ‘সওদাবাজি’। না, ব্যবসা-বাণিজ্য বা দরদস্তুর করার কথা বলা হচ্ছে না। এখানে ‘সওদা’ মানে ‘বোমা’। কাজেই, ‘সওদাবাজি’ মানে ‘বোমাবাজি’, অন্য কিছু নয়। বোমাকে অবশ্য ‘বল’, ‘আলু’ও বলা হয়। আর বন্দুকের গুলি বা কার্তুজকে ‘কাঠি’ বা ‘কাটি’ কিংবা ‘সিগারেট’। এসআই জগন্নাথবাবুকে যারা গুলি করেছিল, তাদের উপর নির্দেশ ছিল, অপোনেন্ট পার্টি এরিয়ায় ‘গুদাল’, মানে গণ্ডগোল করছে। তাই, ‘সওদাবাজি’ করতে হবে ওদের হটাতে। সেটাই করা হচ্ছিল। সবই চলছিল পরিকল্পনা মাফিক। কিন্তু হঠাৎ একজন বেমক্কা গুলি ছুড়ে দিল পিস্তল থেকে। আর তাতেই লুটিয়ে পড়লেন পুলিশ অফিসার।

অন্য একটি ঘটনায় দেখা গিয়েছিল, গিরীশ পার্কের হিরে ব্যবসায়ী কিশোর হিরাওয়াতকে, প্রথমে অপহরণ করা হয়েছিল। মুক্তিপণ চেয়ে ফোনও এসেছিল বাড়িতে। কিন্তু দু’দিন পর তাঁর গুলিবিদ্ধ দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অপরাধীদের দল ধরা পড়ার পর জানা গিয়েছিল, গব্বার সমস্যার কথা। অপরাধ-জগতের ভাষায়, ‘গব্বা’ মানে অপহৃতকে লুকিয়ে রাখার ডেরা। কিশোরকে যারা অপহরণ করেছিল, তারা তখন ছিল ওই লাইনে কাঁচা। ঠিকঠাক গব্বা জোগাড়ের আগেই, অপহরণ করে ফেলেছিল তারা। ঝুঁকি হয়ে গিয়েছে দেখে, ভয় পেয়ে হিরে ব্যবসায়ীর মাথায় গুলি করা হয়। এই শহরের ভিড়ের ভেতরেই হয়ত এখনও কোথাও নীরবে আদান-প্রদান হচ্ছে সংকেত, কারও ভ্রুর সামান্য নড়াচড়া, কারও মুখে হালকা করে উচ্চারিত ‘বিড়ি’ শব্দ, কিংবা এক মুহূর্তের অসতর্কতায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া একটি মানিব্যাগ। আমরা সেই ভিড়ের মধ্যেই হেঁটে যাই, প্রতিদিনের মতোই, অথচ কিছুই টের পাই না। আমাদের অগোচরেই, আমাদের চোখের সামনেই গড়ে উঠছে আরেকটি শহর। এক অদৃশ্য ভাষার শহর, যেখানে শব্দ আছে, অর্থ আছে, কিন্তু তা শুধুই কিছু নির্দিষ্ট মানুষের কাছে বোধগম্য। আমরা সেই ভাষার শব্দ শুনি, কিন্তু তার ভেতরের গল্প, তার গোপন সংকেত, তার অন্ধকার বাস্তব, সবই আমাদের অজানাই থেকে যায়।