স্বজ্ঞানে স্বর্গলাভ
ডাক্তার তাঁহার ব্যাগটি কোলের উপর হইতে নামাইয়া রাখিয়া বলিলেন…বলবার বেশি কিছু নেই। আন্দাজ আটটার সময়ে আমি এসে দেখলাম দীপনারায়ণবাবু ওই পালঙ্কে বসে অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখে হেসে বললেন— এই শীতে আপনি এত শিগগির আসবেন ভাবিনি, চা খান। আমি বললাম— আচ্ছা, আগে ইনজেকশনটা দিই। চাঁদনি উপস্থিত ছিলেন, শকুন্তলা আজ উপস্থিত ছিলেন না। আমি দীপনারায়ণবাবুর নাড়ি দেখলাম, নাড়ি বেশ ভাল। তখন সিরিঞ্জে লিভার এক্সট্র্যাক্ট ভরে তাঁর বাহুতে ইনজেকশন দিলাম। ইন্ট্রামাস্কুলার ইনজেকশন, হাঙ্গামা কিছু নেই, কিন্তু দীপনারায়ণ বাবু আস্তে-আস্তে শুয়ে পড়লেন। দেখলাম, তাঁর চোখের পাতা ভারী হয়ে বুজে আসছে; তিনি কথা বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু বলতে পারলেন না। আমি তখনই তাঁকে অ্যাড্রেনালিন দিলাম, তারপর আর্টিফিসিয়াল রেসপিরিশন দিতে লাগলাম। কিন্তু কোনও ফল হল না, তিন-চার মিনিটের মধ্যে তাঁর ফুসফুসের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেল…
পাণ্ডেজি বলিলেন, ‘মৃত্যুর কারণ কী, তা আপনি বুঝতে পারেননি?’
ডাক্তার বলিলেন, ‘লক্ষণ দেখে মনে হয়েছিল— এনাফিলেটিক শক্। কিন্তু এখন দেখছি তা নয়।’
‘তবে কী হতে পারে?’
‘ঠিক বুঝতে পারছি না। হয়তো কোনও বিষ।’
পাণ্ডেজি ব্যোমকেশের দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন, ব্যোমকেশ বলিল, ‘কিউরারি বিষ হতে পারে কি?’
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ কাহিনির একনিষ্ঠ পাঠক-পাঠিকা মাত্রেই জানেন, এ-কাহিনির নাম—‘বহ্নিপতঙ্গ’।এ-কাহিনিতে অপরাধী, দীপনারায়ণকে হত্যার জন্য খুব সকৌশলে ডাক্তারের লিভার এক্সট্রাক্টের ভায়াল বদলে, কিউরারি ভায়াল রেখে এসেছিল। অপরাধীর নাম উল্লেখ করে, রহস্যকাহিনির রসভঙ্গ করলাম না।
শরদিন্দুর ব্যোমকেশ কাহিনি ছাড়াও, দুনিয়ার গোয়েন্দাসাহিত্যে, কিউরারি বিষের উল্লেখ আছে। শরদিন্দুরও আগে, আর্থার কোনান ডয়েলের হোমস কাহিনি, ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য সাসেক্স ভ্যাম্প্যায়ার’-এও কিউরারির খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আছে। পশ্চিমি কাহিনির হাত ধরে সারা দুনিয়ায় কিউরারি পরিচিতি, তার উপর বিজ্ঞানের স্পটলাইট পড়লেও, এক সময়ে কিউরারি ছিল, সভ্যজগতের সঙ্গে সম্পর্কহীন আলো-আঁধারির মায়াবি-রহস্যময় অরণ্যজগতের, জনজাতিদের জীবনধারণের অন্যতম কৌশল। দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ভেনেজুয়েলার দুর্গম অরণ্যসঙ্কুল অঞ্চলের জনজাতিরা বন্যপশু শিকারের জন্য তিরের ডগায় কিউরারি মাখিয়ে দিতেন। সেই তির যত বড় জাঁদরেল জানোয়ারের গায়েই লাগুক-না-কেন, সেই জানোয়ার কিউরারির বিষক্রিয়ায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা পড়ত।
কিউরারির মতো বিষ একমাত্র সরাসরি রক্তে প্রবেশ করলেই তবেই তার বিষক্রিয়া প্ৰকাশ পায় ,নচেৎ নয়। তাই বিষের প্রভাবে মৃত শিকারের মাংস ভক্ষণ সম্পূর্ণ নিরাপদ। প্রথমেই এ-প্রসঙ্গে বলে রাখি, কিউরারি বা কুরারি কোনও একটি নির্দিষ্ট বিষ নয়। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বহু এমন প্রজাতির গাছ-গাছড়া আছে, যাদের নির্যাস মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করলে একই ধরনের বিষক্রিয়া প্রকাশ পায়। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন জনজাতির মানুষরা এমন বিভিন্ন গাছ-গাছড়ার মূল লতা-পাতা চেঁচে জলে ফুটিয়ে, গাঢ় চটচটে ‘লেই’ বানাত, অনেকটা বাবল্গামের মতো। তারপর এই চটচটে পেস্টকে তিরের আগায় মাখিয়ে নিত। সুতরাং এই ‘লেই’, বিভিন্ন উদ্ভিদের একাধিক সমগোত্রীয় ও অসমগোত্রীয় নানা বিষাক্ত উপক্ষারের মিশ্রণ। প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতির কিছু হেরফের করেই বিভিন্ন জনজাতির মানুষরা তিরের আগায় মাখিয়ে, শিকারের জন্য বিভিন্ন ধরনের মিশ্রণ বানাত। শিকারের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত এই ধরনের মিশ্রণকে, জনজাতিদের কেউ বলত, ‘উরারি’, কেউ-বা বলত ‘উরারা’, ‘উরালি’, ‘উরারে’।
কবর খুঁড়ে আনা মৃতদেহ ও আর্সেনিক! একটি রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড!
পড়ুন: বিষ-রূপ দর্শন পর্ব ৬…
ইউরোপীয় দেশের সাহেবরা যখন বাণিজ্যের জন্য, ধর্ম প্রচারের আগ্রহে কিংবা নিছক অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের এসব দুর্গম অরণ্য-অঞ্চলে পাড়ি দিলেন, তাঁরা জনজাতিদের এমন আশ্চর্য শিকার পদ্ধতি দেখে, তাজ্জব বনে গেছিলেন। সাহেবি জিভের বদান্যতায়, শিকারের জন্য জনজাতিদের বানানো ওইসব মিশ্রণই অপভ্রংশ হয়ে হল— ‘কুরারি’ বা ‘কিউরারি’ (curare)। কিউরারি বা কুরারি নামের ব্যুৎপত্তি নিয়ে আরও একটা মতবাদ প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন— গুয়ানার মাকুশি জনজাতির মানুষরা, স্থানীয় এক গাছের (Strychnos toxifera) লতাকে বলত ‘মাউয়া কুরি’, যা ছিল তাঁদের ওই শিকারের জন্য বানানো বিষাক্ত মিশ্রণের অন্যতম উপাদান। এই ‘মাউয়া কুরি’ থেকেই সাহেবেদের ‘কুরারি’ শব্দের উৎপত্তি।
দক্ষিণ আমেরিকার অরণ্য-আঁধার পেরিয়ে, আধুনিক সভ্যতার আলোকে কুরারির উত্তোরণ ইউরোপীয় সাহেবদের হাত ধরেই।তবে, এ-উত্তরণ এক দিনে তো ঘটেনি। ত্রয়োদশ শতক থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলোর মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের দুর্গম অরণ্য সঙ্কুল অঞ্চল গুলো নিয়ে দুর্বার আগ্রহ ছিল। মূলত অ্যাডভেঞ্চার, ব্যাবসা-বাণিজ্য কিংবা খ্রিস্টানধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্য সাহেবদের থাকলেও, গোপনে ছিল উপনিবেশ স্থাপনের বাসনা। পরবর্তী সময়ে, ইউরোপীয় জাতিগুলো পৃথিবীর অন্যান্য মনুষ্য জাতির তুলনায় নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণের উদ্দেশ্যে, নৃতত্ত্ব বিষয়ক গবেষণার জন্যও এই সব জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে পাড়ি দিতেন। এঁদের হাত ধরেই বিভিন্ন সময়ে কুরারি এসে পৌঁছাল ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। তবে তা এত সহজে হয়নি।
ইতালীয় ইতিহাসবিদ ও ভূ-পর্যটক পিটার মার্টিয়ের ডি’অ্যাঙলিরিয়া ষোড়শ শতকে, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সময়ে স্থানীয় জনজাতিদের মধ্যে শিকারের জন্য পয়জন ডার্ট ও তিরের মাথায় বিষ ব্যবহারের কথা লিখেছিলেন। লিখেছিলেন, সেই বিষাক্ত তিরের ভয়াবহতার কথা, যার সামান্য স্পর্শ— কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যু ডেকে আনে। স্থানীয় জনজাতিরা নাকি, ওই বিষাক্ত তির ছুঁড়েই ইউরোপীয় সাহেবদের পঞ্চাশজনের এক দলকে সাবাড় করে দিয়েছিল! সে বর্ণনাও দিয়েছেন মার্টিয়ের ডি’ অ্যাঙলিরিয়া। মূলত, তাঁর ভ্রমণ কাহিনির মাধ্যমেই কুরারির সঙ্গে পশ্চিমি দুনিয়ার প্রাথমিক পরিচিতি।
১৫৯৫ নাগাদ, স্যার ওয়াল্টার রেলিগ প্রথম কুরারির স্যাম্পল ইংল্যান্ডে নিয়ে আসে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে সাহেবরা, জনজাতিদের থেকে চুরি করে কিংবা বলপূর্বক বাগিয়ে, কুরারি নিজেদের দেশে নিয়ে এসেছিলেন এক প্রকার স্যুভেনির বা স্মারক হিসেবে। কিন্তু তখনও, এর উপাদান, রসায়ন, এসব সম্পর্কে সাহেবদের ধারণা ছিল না। এমনকী, কোন-কোন উদ্ভিদ থেকে জনজাতির মানুষরা এই বিষাক্ত ককটেল তৈরি করে, তাও সাহেবরা জানতেন না। কুরারি, পশ্চিমি বিজ্ঞানের বিচার-বিশ্লেষণের উপাদান হতে— আরও দেড়-দু’শতাব্দী লাগল। কুরারিকে নিয়ে শুরু হল রাসায়নিক গবেষণা, মানবদেহে তার কার্যকলাপ নিয়ে শুরু হল পর্যালোচনা।
১৮১২ নাগাদ, বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ব্রডি লন্ডনের রয়েল সোস্যাইটির সভ্যদের সামনে গিনিপিগের শরীরে কুরারি বিষের প্রভাব পরীক্ষা করে দেখান। তিনি দেখান, কুরারির প্রভাবে গিনিপিগের সমস্ত শরীর প্যারালাইজড হয়ে পড়লেও, হৃদযন্ত্র তখনও দিব্যি সচল। মানব-শরীরের উপর কুরারির প্রভাব বুঝতে, সমকালীন অনেক বৈজ্ঞানিকই বিভিন্ন পশুর উপর কুরারির প্রভাব পরীক্ষা করেছিলেন।
কার্যপদ্ধতি ও নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে আমাদের দেহে মূলত দু’রকমের পেশি আছে। ঐচ্ছিক ও অনৈচ্ছিক পেশি। প্রথম প্রকার পেশিগুলোর সঞ্চালন ও নিয়ন্ত্রণ আমরা নিজেদের ইচ্ছাঅনুযায়ী করতে পারি। যেমন ধরা যাক হাত ও পায়ের পেশি। আমাদের কঙ্কালকে বেষ্টন করে যেসব পেশি-সজ্জার সমাহার, তাদের বেশিরভাগই ঐচ্ছিক পেশি। এইসব ঐচ্ছিক পেশির মধ্যে, অন্যত গুরুত্বপূর্ণ হল— ডায়াফ্রাম বা মধ্যচ্ছদা, যা বক্ষ-গহ্বর থেকে উদরকে পৃথক করে। এবং অপরটি হল ইন্টারকস্টাল (এক্সটার্নাল ও ইন্টারনাল) যা বুকের খাঁচাকে ভরাট করে রাখে।
আমাদের ফুসফুসের নিজস্ব কোনও পেশি নেই। উপরোক্ত এই দুই পেশির সংকোচন-প্রসারনেই ফুসফুসে বায়ুর প্রবেশ ও নির্গমন ঘটে, অর্থাৎ প্রশ্বাস ও নিশ্বাস সংঘটিত হয়। কঙ্কাল সন্নিবিষ্ট ঐচ্ছিক পেশিগুলোর কাজকর্ম সম্পন্ন হয় স্নায়ু মাধ্যমে আগত নির্দেশ অনুযায়ী।
অ্যাসেটাইলকোলিন নামক এক নিউরোট্রান্সমিটারের মাধ্যমে, স্নায়ুদল রাসায়নিক সংকেত এসব পেশিতে বহন করে নিয়ে আসে। অ্যাসেটাইলকোলিনকে গ্রহণ করার জন্য, এইসব পেশিতে নিকোটিনিক রিসেপ্টর নামে একধরনের রিসেপ্টর থাকে। তারা স্নায়ুদলের মাধ্যমে প্রেরিত অ্যাসেটাইলকোলিনের রাসায়নিক বার্তা গ্রহণ করে। কুরারি নিকোটিনিক রিসেপ্টরের খাঁজে চেপে বসে। ফলে তারা আর অ্যাসেটাইলকোলিনকে গ্রহণ করতে পারে না। ফলে, পেশি তার সংকোচন-প্রসারনের জন্য স্নায়ুদলের মাধ্যমে প্রেরিত, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সংকেতও আর পায় না। ফলে ঐচ্ছিক পেশিরা শিথিল অর্থাৎ প্যারালাইজড হয়ে পড়ে।
কুরারির বিষক্রিয়ার প্রভাব শুরু হয় দেহের উর্ধাঙ্গের পেশিসমূহ থেকে। ক্রমে তা দেহের নীচের দিকে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। প্রথমে চোখের পাতা ভারী হয়ে চোখ বুজে আসে। তারপর, গলার স্বর জড়িয়ে গিয়ে, আক্রান্ত বাকশক্তিহীন হয়ে পড়ে। তারপর যখন কুরারি বুকের ডায়াফ্রাম ও ইন্টাকষ্টাল পেশিকেও প্যারালাইজড করে দেয়, তখন আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে আক্রান্তের গোটা শরীরটাই প্যারালাইজড হয়ে পাথরের মতো নিথর হয়ে যায়।
কুরারির যত কারিকুরি ঐচ্ছিক পেশির উপর, সে মস্তিষ্ককে কোনওভাবেই আক্রমণ করে না। তাই কুরারির বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সমস্ত শরীর প্যারালাইজড হয়ে গেলেও, সে সম্পূর্ণ সচেতন থাকে। তাঁর চারপাশে কী ঘটছে সমস্ত কিছু সে বুঝতে পারে, ব্যথা-যন্ত্রণা, স্পর্শ সে অনুভব করতে পারে, কিন্তু বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা তার থাকে না। তার শরীর তখন জগদ্দল পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে গেছে। তারপর শ্বাস নিতে না পেরে একসময়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অর্থাৎ, একেবারে সজ্ঞানে স্বর্গারোহণ। কুরারির বিষক্রিয়া ফুসফুস এবং হৃদপিণ্ডকেও কোনওভাবে প্রভাবিত করে না। আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুস কর্মক্ষম থাকে, হদযন্ত্রের ছন্দও স্বাভাবিক থাকে।
বিজ্ঞানী ব্রডি যে গিনিপিগটির উপর কুরারির পরীক্ষা করেছিলেন, পরীক্ষার সময়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত গিনিপিগটিকে বিজ্ঞানী ব্রডি হাপরের সাহায্যে কৃত্রিমভাবে গিনিপিগটির ফুসফুসে বায়ু প্রবেশ করিয়ে, ফুসফুসকে চালু রাখেন। মিনিট কুড়ি কৃত্রিমভাবে শ্বাসক্রিয়া চালু রাখায়, গিনিপিগটি বেঁচে যায়। আধুনিক সময়েও কুরারি আক্রান্ত ব্যক্তিকে বাঁচাতে, এই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হয়। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুস চালু রাখাই প্রথম কাজ। তা না হলে, অক্সিজেনের অভাবে হৃদযন্ত্র ও মস্তিক কয়েকমিনিটের মধ্যেই বন্ধ হয়ে সেই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটবে। তাই, আক্রান্ত ব্যক্তিকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে স্থিতিশীল রাখাই তখন গুরুত্বপূর্ণ, যাতে চিকিৎসার সুযোগ অন্তত পাওয়া যায়। এই সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে এসেরিনের মতো অ্যান্টিডোট দেওয়া হয়, যা ক্রমে কুরারির বিষক্রিয়াকে প্রশমিত করে দেয়।
এ-সুযোগে শরীরও তার নিজস্ব বিপাক ক্রিয়ায় কিডনির মাধ্যমে মূত্র দিয়ে কিউরারিকে বার করে দেয়। ক্রমে পক্ষাঘাতগ্রস্ত দশা কেটে গিয়ে শরীরের সাড় ফিরে আসে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কুরারির বিষক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস চালু করলে, আক্রান্ত ব্যক্তির বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নব্বই শতাংশ।
কুরারি শরীরকে এমনভাবে প্যারালাইজড করে দেয় যে, স্বাভাবিক প্রতিবর্ত ক্রিয়া বা রিফ্লেক্সে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতাও শরীরের থাকে না। তাই, বেঞ্জামিন ব্রডির উপরোক্ত পরীক্ষার পর থেকেই, কুরারিকে নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে শল্য চিকিৎসার জন্য পেশি শৈথিল্যকারী ওষুধ বা মাসল রিল্যাক্স্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তেমন একটা চিন্তাভাবনা ইউরোপীয় চিকিৎসক মহলে আলোড়ন ফেলেছিল। ইউরোপীয় চিকিৎসকরা তখন যন্ত্রণাহীন অপারেশনের জন্য হন্যে হয়ে অ্যানাস্থেটিক খুঁজছেন। কিন্তু, কুরারির মতো সাংঘাতিক বিষকে চিকিৎসার জন্য মানব শরীরে প্রয়োগ করার আগে, মানবদেহে তার নিরাপদ ডোজ নির্ধারণ করতে হবে। ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা টিউব কুরারিতে নির্দিষ্ট একটি উদ্ভিদ উপক্ষারের প্রাধান্য লক্ষ করলেও, উদ্ভিদটিকে তখনও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। আর, ইউরোপীয় পর্যটকরা মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যেসব টিউব কুরারির স্যাম্পেল এনেছে, তা বিভিন্ন উদ্ভিদের উপক্ষারের মিশ্রণ যাদের সবারই একই ধরনের বিষক্রিয়া আছে। তাই সেই চটচটে আঠালো মিশ্রণ সরাসরি মানব দেহে প্রয়োগ করাও নিরাপদ নয়।
কুরারির যত কারিকুরি ঐচ্ছিক পেশির উপর, সে মস্তিষ্ককে কোনওভাবেই আক্রমণ করে না। তাই কুরারির বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সমস্ত শরীর প্যারালাইজড হয়ে গেলেও, সে সম্পূর্ণ সচেতন থাকে। তাঁর চারপাশে কী ঘটছে সমস্ত কিছু সে বুঝতে পারে, ব্যথা-যন্ত্রণা, স্পর্শ সে অনুভব করতে পারে, কিন্তু বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা তার থাকে না। তার শরীর তখন জগদ্দল পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে গেছে। তারপর শ্বাস নিতে না পেরে একসময়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অর্থাৎ, একেবারে সজ্ঞানে স্বর্গারোহণ। কুরারির বিষক্রিয়া ফুসফুস এবং হৃদপিণ্ডকেও কোনওভাবে প্রভাবিত করে না। আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুস কর্মক্ষম থাকে, হদযন্ত্রের ছন্দও স্বাভাবিক থাকে।
তাই, প্রথমেই প্রয়োজন টিউব কুরারির সেই মিশ্রণ থেকে প্রধান উপক্ষারটিকে পৃথক করা। তবেই সেটা চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী হতে পারে। কিন্তু সে-যুগে দাঁড়িয়ে এমন চিন্তা-ভাবনা কল্পবিজ্ঞানের সামিল। ১৮৯৫ নাগাদ ফার্মাসিস্ট রুডল্ফ বোহেম, কুরারির একটা সরলীকৃত শ্রেণিবিভাগ করেন। বিভিন্ন ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা কুরারির স্যাম্পল পশ্চিমি দুনিয়ায় নিয়ে এসেছিল, সেগুলো বেশিরভাগই ছিল বাঁশের খোলের ভিতরে, নয়তো কুমড়ো অথবা লাউজাতীয় কোনও সবজির খোলের ভিতরে। যাকে বলা হত ক্যালাবাস। দক্ষিণ আমেরিকার জনজাতিরা মূলত এই দুইয়ের মধ্যেই বিষের ককটেল সংরক্ষণ করত।
বোহেম দেখলেন, বাঁশের খোলের কুরারি আর ক্যালাবাসের খোলের কুরারির প্ৰকৃতি কিঞ্চিৎ ভিন্ন, একটি আঠালো-চটচটে, অপরটি মণ্ডের মতো। দুইয়ের রঙ-গন্ধ-স্বাদেও ভিন্নতা আছে। বোহেম, রাসায়নিক পরীক্ষা করে বুঝলেন— বাঁশের মধ্যে প্রাপ্ত কুরারি আর কুমড়োর খোলের কুরারি দুইই বহুবিধ উদ্ভিদ উপক্ষারের মিশ্রণ হলেও, এই দুই কুরারির মধ্যে সুস্পষ্ট রাসায়নিক চরিত্রগত পার্থক্য আছে। অর্থাৎ, এই দুই কুরারির মধ্যেই এমন কোনও প্রধান উপক্ষার আছে, যারা রাসায়নিকভাবে ভিন্ন।
বোহেম আপাতত কুরারির দুটো শ্রেণিবিভাগ করলেন। বাঁশের খোল থেকে যে কুরারির পেস্ট পেয়েছেন, তার নাম দিলেন টিউব কুরারি। আর, কুমড়োর খোলে যে-ধরনের কুরারি পেয়েছেন, তার নাম দিলেন ক্যালাবাস কুরারি। তবে, বোহেম কোনও কুরারি থেকেই প্রধান উপক্ষারটিকে বিশুদ্ধ রূপে পৃথক করতে পারলেন না। কুরারিকে আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানের উপযোগী হয়ে উঠতে গেলে, বিশুদ্ধ রূপে তার পৃথকীকরণ প্রয়োজন।
বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দুই বৈজ্ঞানিক অটোলোয়ই আর হেনরি ডেল, মানবদেহের স্নায়ুর কার্যপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাঁরা বুঝতে চাইছিলেন, মস্তিষ্ক থেকে কীভাবে নির্দেশ স্নায়ু দ্বারা বাহিত হয়ে, নির্দিষ্ট অঙ্গে পৌঁছয়? স্নায়ুর শেষপ্রান্ত আর অঙ্গের মধ্যে এক চিলতে অণুবীক্ষণিক ফাঁক, কীভাবে রাসায়নিক নির্দেশ সেই ফাঁকটুকু অতিক্রম করে? এই গবেষণা করতে গিয়েই তাঁরা খোঁজ পেলেন, অ্যাসিটাইলকোলিনের। অ্যাসিটাইলকোলিনই সেই জৈবরাসায়নিক বার্তাবহ, যা মস্তিকের নির্দেশকে স্নায়ুর শেষপ্রান্ত থেকে ‘টার্গেট’ অঙ্গে বহন করে নিয়ে যায়, অর্থাৎ সে স্নায়ুর শেষ প্রান্ত আর অঙ্গের মধ্যবর্তী যে অণুবীক্ষণিক ফাঁক, সেখানে এক রাসায়নিক সেতুর মতো কাজ করে। এই আবিষ্কারের জন্য, ১৯৩৬ নাগাদ এই দুই বিজ্ঞানী যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেলেন।
অ্যাসিটাইলকোলিনের ক্রিয়াকলাপ বিস্তারিত বোঝার জন্য, এই দুই বৈজ্ঞানিক এমন অনেক রাসায়নিক ব্যবহার করেছিলেন, যারা অ্যাসিটাইলকোলিনের প্রভাবকে বিঘ্নিত করে। তাদের মধ্যে অন্যতম টিউবার কুরারি। সুতরাং, এই গবেষণার মাধ্যমে কুরারি মানব স্নায়ুতে কীভাবে কাজ করে, তার একটা পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা পাওয়া গেল, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কুরারির ব্যবহারের সম্ভাবনাকে সুপ্রশস্ত করল।
এর বছরকয়েক বাদেই, ১৯৪০-এর দশকে বিজ্ঞানী হ্যারল্ড কিং লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত, এক টিউবার কুরারির স্যাম্পেল থেকে প্রধান উপক্ষারটিকে বিশুদ্ধভাবে তার ক্লোরাইড রূপে পৃথক করলেন। যেহেতু টিউবার কুরারির স্যাম্পেল থেকে তিনি উপক্ষারটিকে পৃথক করেছিলেন, তাই এর নাম তিনি রাখলেন ডি-টিউবোকুরারিন। চিকিৎসা জগতেও এখন কুরারি বলতে মূলত এই টিউবোকুরারিনকেই বোঝানো হয়।
১৯৫০ নাগাদ ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে শল্য চিকিৎসার সময়ে ক্লোরোফর্ম ও অন্যান্য অ্যানাস্থেটিক ড্রাগের সঙ্গে মাসল রিল্যাক্সান্ট হিসেবে টিউবোকুরারিনের ব্যবহার শুরু হল। আর তার প্রায় একযুগ পরেই কুরারি ব্যবহৃত হল খুনের অস্ত্র হিসেবে।
ঘটনাটা আমেরিকার। নিউজার্সির রিভারডেল হসপিটাল। রিভারডেল, প্রাইভেট হাসপাতাল। গোটা আশি বেড আছে, আর গোটা কয়েক ডিপার্টমেন্ট। এর মধ্যে সার্জারি ডিপার্টমেন্টের বেশ নাম-ডাক আছে। সার্জারি ডিপার্টমেন্টের হেড তখন মারিও জ্যাস্কেলভিচ। বছর চল্লিশের খুব প্রতিভান সার্জেন এবং গবেষক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নামকরা মেডিক্যাল পত্রিকাতেও তাঁর গবেষণাপত্র ছাপা হয়। এই রিভারডেল হসপিটলেই ১৯৬৫ নাগাদ কয়েকজন রোগীর অকস্মাৎ মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য ঘনাল। সবকটি মৃত্যুই সার্জারি ডিপার্টমেন্টে।
প্রথম মৃত্যু ঘটল, এক বছর সত্তরের প্রৌঢ়র। হার্নিয়া অপারেশনের জন্য সার্জারি বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু পরেরদিনই আকস্মিকভাবে মারা গেলেন। কিছুদিন পর মারা গেল, চার বছরের এক বাচ্চা মেয়ে। অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশনের জন্য ভর্তি হয়েছিল। অপারেশনও হয়েছিল ভালভাবেই। দিন দু’য়েক হাসপাতালে ভর্তি রেখে ছেড়েও দিত, কিন্তু সেও মারা গেল অদ্ভুতভাবে। ওই বছরই এভাবেই মারা গেল আরও চারজন। অথচ, রোগীদের কারও অবস্থাই সংকটজনক ছিল না। সুতরাং এমন আকস্মিক মৃত্যু সন্দেহজনক।
হাসপাতালে তখন, নতুন দুই সার্জেন কিছুদিন হল যোগ দিয়েছেন। তাঁরাও প্রতিভাবান। তাঁরা লক্ষ্য করলেন, সার্জারি বিভাগে যত পেশেন্ট রহস্যজনক মারা যায়, তার বেশিরভাগ তাঁদেরই পেশেন্ট। সুতরাং, ব্যাপারটা আর কাকতলীয় রইল না। কেউ কি তাঁদের ডাক্তারি কেরিয়ার বদনাম করার উদ্দেশ্যে কোনও ষড়যন্ত্র করছে? এই দুই সার্জেন সবকটি মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করলেন। তাঁরা আশ্চর্য হয়ে গেলেন— প্রত্যেকটি মৃত্যু ঘটেছে ভোররাতে। যখন পেশেন্টরা প্রায় সকলেই ঘুমায়। প্রত্যেক পেশেন্টেরই তখন স্যালাইনের ড্রিপ চলছিল। কিন্তু তাঁরা কেউই সে-সময়ে ডিউটিতে থাকেন না। তাঁরা হাসপাতালের সমস্ত ডাক্তার-নার্সের ডিউটি প্রফাইল পরীক্ষা করে দেখলেন, প্রতি ভোর রাতে সার্জারি ওয়ার্ডের একজন ডাক্তারই রুটিন ভিজিটে আসেন। তিনি ডাঃ জ্যাস্কেলভিচ! তাঁদের ডিপার্টমেন্ট-হেড। আরও একটা আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ করা গেল, যে-সব পেশেন্টের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটেছে, তাঁরা কেউই কিন্তু ডাঃ জ্যাস্কেলভিচের পেশেন্ট নয়। তাঁর পেশেন্টরা অক্ষতই আছে! কিন্তু, শুধু অনুমানের ভিত্তিতে ডিপার্টমেন্ট-হেডের বিরুদ্ধে হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা মুখের কথা নয়!
নতুন দুই ডাক্তার তক্কে-তক্কে ছিলেন। তাঁরা একদিন সুযোগ বুঝে হাসপাতালে ডাঃ জ্যাস্কেলভিচের লকার তল্লাশি করলেন। লকারে কুরারির আঠারোটা ভায়াল। বেশিরভাগই খালি, বাকি গুলোর অর্ধেক ভর্তি। ডাঃ জ্যাস্কেলভিচ অ্যানাস্থেসিওলজিস্ট নন, সার্জেন। তাঁর জিম্মায় অতগুলো কুরারির ভায়াল থাকা অস্বাভাবিক ব্যাপার। নতুন দুই ডাক্তার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সব জানালেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসল। তাদের প্রাইভেট হাসপাতাল। এতগুলো অস্বাভাবিক মৃত্যু, তাদের হাসপাতালের রেপুটেশনের উপরেও তো প্রভাব ফেলছে। তাই, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডাঃ জ্যাস্কেলভিচের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলেন। তাঁরা দেখলেন, কুরারির ভায়ালগুলোর মধ্যে কয়েকটা জ্যাস্কেলভিচ কিনেছে, বাকিগুলো হাসপাতালের স্টক থেকেই নিয়েছে সে। কিন্তু এতগুলো কুরারির ভায়ালের তাঁর দরকার কী, আর কোথায় সে এগুলোর ব্যবহার করেছে— জ্যাস্কেলভিচের কাছে এসব প্রশ্নের সদুত্তর চাইল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

জ্যাস্কেলভিচ অম্লানবদনে জানাল, সে বেশ কিছুদিন ধরে কুকুরের উপর কুরারির প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। সে সার্জেন ছাড়াও একজন গবেষক। তাই মাঝেমধ্যেই এমন নানা ওষুধ নিয়ে গবেষণাও করে। এখনও তাই-ই করছে। আর, গবেষণার ব্যাপারে একটু তো গোপনীয়তা রাখতেই হয়। তাই এমন লুকোছাপা। এমনকী জ্যাস্কেলভিচ তার গবেষণাগারও ঘুরিয়ে দেখালেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। সবকিছু দেখে শুনে জ্যাস্কেলভিচের বিরুদ্ধে জোরালো কোনও প্রমাণ পেলেন না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, তবে রহস্যের কাঁটা দূর হল না। জ্যাস্কেলভিচকে নিয়ে কোথাও একটা সন্দেহ রয়েই গেল। জ্যাস্কেলভিচও রিভারডেল হাসপাতালে ইস্তফা দিয়ে অন্য এক হাসপাতালে চাকরি নিলেন। জ্যাস্কেলভিচ স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেওয়ায় রিভারডেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তাঁরাও আর এ-ব্যাপার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলেন না। এ-ব্যাপারটা একপ্রকার হাসপাতালের গোপন নথিতেই বন্দি হয়ে রইল।
ফের আলোড়ন উঠল প্রায় একযুগ বাদে। ১৯৭৬ নাগাদ, বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর দপ্তরের লেটার বাক্সে একটা বেনামি চিঠি পাওয়া গেল। চিঠির মর্ম এই— প্রায় এক যুগ আগে, এদেশের কোনও এক প্রাইভেট হাসপাতালে বেশ কয়েকজন রোগী রহস্যজনক ভাবে মারা গেছিলেন, সেই সংখ্যাটা চল্লিশের কম হবে না। আমার ধারণা, এর পিছনে সেই হাসপাতালেরই একজন ডাক্তারের হাত ছিল। আপনাদের কাছে অনুরোধ, আপনারা সে-ব্যাপারে একটু তদন্ত করুন। চিঠিতে প্রেরকের কোনও নাম নেই। কোন হাসপাতালের কোন ডাক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ— সে-সবও কিছু উল্লেখ নেই। নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে এমন উড়ো চিঠি অনেক আসে। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমস এই চিঠিটাকে গুরুত্ব দিল। তাঁরা, তাঁদের ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট মেরন ফার্বারকে দায়িত্ব দিলেন ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার।
ফার্বার কাজ শুরু করলেন। কিন্তু এমন নাম গোত্রহীন কোনও চিঠি থেকে তদন্তের প্রাথমিক সূত্র খোঁজাই দায়। ফার্বার তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে-দিতে এমন অদ্ভুত চিঠির প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তাঁর বন্ধুটি ফরেন্সিক বিভাগে কাজ করে। এমন চিঠির কথা শুনে, সে ফার্বারকে বলল— ‘তোমার এই চিঠিটার ব্যাপার শুনে, একটা ঘটনা আমার মনে পড়ে যাচ্ছে ভায়া। বছর দশেক আগে, নিউ জার্সির রিভারডেল হাসপাতালের এক ডাক্তারের বিরুদ্ধে এমন এক অভিযোগ উঠেছিল। তদন্ত বেশিদূর এগোয়নি। হাসপাতাল অথরিটি ইনভেস্টিগেট করেছিল। থানা পুলিশ হয়নি, তাই মিডিয়া, পাবলিক কিছু জানতে পারেনি। আমরা ফরেন্সিক ফিল্ডের দু একজন জানি ব্যাপারটা।’
ফার্বার ভাবলেন, আর কোনও লিড যখন হাতে নেই, এটা দিয়েই অন্ধকারে তির ছুঁড়ে দেখা যাক, কোথায় গিয়ে ঠেকে! ফার্বার রিভারডেল হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। সে-হাসপাতালের তখন পড়তি দশা। ফার্বার বহু কাঠ-খড় পুড়িয়ে, রিভারডেল হাসপাতালের সে-সময়কার ফাইল-পত্তর দেখার সুযোগ পেলেন। তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করলেন, সে-সময়কার প্রত্যেক ডাক্তারের রেকর্ড, জ্যাস্কেলভিচের ডাক্তারি কেরিয়ারের খতিয়ান, প্রত্যেকটি রোগীর মৃত্যুর রিপোর্ট। তারপর ফার্বার কথা বললেন সেইসব রোগীর পরিবারের সঙ্গে।
ফার্বার, ডাঃ জ্যাস্কেলভিচের সঙ্গেও যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করেছিলেন। ফোন, চিঠি, টেলিগ্রাম— কিন্তু কোনওটাই ফলপ্রসূ হয়নি। ডাঃ জ্যাস্কেলভিচ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের সব চেষ্টাই এড়িয়ে গেছে। এরপর, ফার্বারের তদন্তের রিপোর্ট বেরোল, ১৯৭৬-এর জানুয়ারির ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকায়, ধারাবাহিকভাবে। হাসপাতালের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে, প্রায় তেরটি রহস্যজনক মৃত্যুর খোঁজ পেয়েছিলেন ফার্বার। সবকটির সঙ্গেই ডাঃ জ্যাস্কেলভিচের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ তিনি পেয়েছিলেন। এছাড়াও, আরও আটটি মৃত্যু সন্দেহজনক, যাঁদের ডেথ-সার্টিফিকেট ইস্যু করেছিলেন জ্যাস্কেলভিচ। ফার্বার অবশ্য তাঁর প্রতিবেদনসমূহে সরাসরি ডাঃ জ্যাস্কেলভিচের নাম উল্লেখ করেননি। তিনি লিখেছিলেন ‘ডাঃ এক্স’।

‘ডাঃ এক্স’-এর কুকীর্তি মিডিয়াতে প্রকাশিত হতেই হইচই পড়ে গেল। স্থানীয় প্রশাসন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করল। জ্যাস্কেলভিচ আর কী করে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াবেন! কোর্টের শমনে হাজিরা দিতেই হল। নতুন করে তদন্ত শুরু হল দশ বছর আগের সমস্ত রহস্যজনক মৃত্যুর। বিচারকের নির্দেশে, পাঁচজন ভিক্টিমের দেহ কবর থেকে তুলে ফরেনসিকে পাঠানো হল। এর মধ্যে তিনজনের দেহাবশেষে কুরারি পাওয়া গেল। তারপর শুরু হল জ্যাস্কেলভিচের শুনানি। প্রায় ৩৪ সপ্তাহ ধরে শুনানি চলল। কিন্তু, জ্যাস্কেলভিচ জাঁদরেল এক ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞকে, তাঁর ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল। মৃতদেহে প্রাপ্ত কুরারি সংক্রান্ত ফরেনসিক তখনও পোক্ত নয়। জ্যাস্কেলভিচের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ফরেনসিকের সেইসব দুর্বলতাগুলোকেই আদালতে চিহ্নিত করলেন। ফলে, শেষমেষ জ্যাস্কেলভিচকে দোষী প্রমাণ করতে তদন্তকারীরা সক্ষম হল না। আলদালতের বিচারে, ভিক্টিমদের পরিবারের একটাই সান্ত্বনা পুরস্কার জুটল— আদালত, জ্যাস্কেলভিচের সার্জারির লাইসেন্স বাতিল করেছিল। জ্যাস্কেলভিচ সে-দিন বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেও, বহু আধুনিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন জ্যাস্কেলভিচই আসল দোষী ছিল। শুধু উপযুক্ত ফরেন্সিক প্রমাণের অভাবে পার পেয়ে গেছে।


