নিঃসঙ্গ সম্রাজ্ঞী

Representativae Image

মহীশুরের কৃষ্ণরাজেন্দ্র হাসপাতালের একটি ঘরে তখন নিস্তব্ধতা। কয়েক মুহূর্ত আগেও চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যস্ত পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু সব চেষ্টা শেষ হয়েছে। ঘরের বাতাসে হঠাৎ যেন শূন্যতা নেমে এসেছে। হাসপাতালের কর্তব্যরত আধিকারিক আর দেরি না করে টেলিফোনের রিসিভার তুলে নিলেন। এই সংবাদ সাধারণ কোনও পরিবারের জন্য নয়, পৌঁছে দিতে হবে মহীশুর রাজপ্রাসাদে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে সরাসরি ফোন গেল রয়্যাল প্যালেসে। প্যালেসের টেলিফোন অপারেটর খবরটির গুরুত্ব বুঝে এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। দ্রুত সংযোগ করে দিলেন ওয়াদিয়ার মহারাজার সচিব—প্যালেসের ভাষায় ‘হুজুর সেক্রেটারি’— মহামান্য টি. থুম্বু চেট্টির সঙ্গে।

—‘স্যর, দেয়ার ওয়াজ এ কল ফ্রম দ্য হসপিটাল। দে কল্ড টু ইনফর্ম দ্যাট দ্য পেশেন্ট ইজ নো মোর। শি এক্সপায়ার্ড জাস্ট আ ফিউ মিনিটস এগো।’ ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। রিসিভারটি ধীরে নামিয়ে রাখলেন থুম্বু চেট্টি। এই সংবাদ তাঁকেই এখন মহারাজাকে জানাতে হবে। শুধু তাই নয়, খবর পৌঁছে দিতে হবে মৃতার সঙ্গীদের কাছেও। কারণ, যিনি চলে গেলেন, তিনি কোনও সাধারণ অতিথি নন। তিনি ছিলেন মহীশুর রাজপরিবারের অতিথি। কিন্তু, তারও আগে তিনি ছিলেন সমগ্র ভারতবর্ষের এক বিস্ময়। ভারতে যার কণ্ঠ প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ডে বন্দি হয়েছিল, যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই সংগীতপ্রেমীদের চোখ জ্বলে উঠত, যাঁর গান শুনতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাত— তিনি আর কেউ নন, গওহর জান। আজ তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত তার ভিটে-মাটি থেকে বহুদুরে মহীশুর রাজ্যের এক হাসপাতালে।

আরও পড়ুন: প্রায় ছয় প্রজন্মের শিক্ষার্থী তৈরি করেছেন অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়!
লিখছেন তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার…

শুধু একজন গায়িকা বললে তো তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের, সাংস্কৃতিক সমাজের এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাছাড়া খুব সহজ করে বলতে গেলে, আজকের ভাষায় যাকে ‘সুপারস্টার’ বলা হয়, সেই অভিধার সঙ্গে গওহরজানের পরিচয়ের অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল সর্বভারতীয়; তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল স্বতন্ত্র; আর তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল কিংবদন্তির মতো। আর তাই তো তিনি ছিলেন গওহর জান।

কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত পরিহাস— যে-নারী একসময়ে হাজার-হাজার মানুষের করতালিতে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন, যাঁর নাম ছিল সাফল্যের প্রতীক, তাঁর জীবনাবসান ঘটল নিজের শহর কলকাতা থেকে বহু দূরে, মহীশুরের এক হাসপাতালের নির্জন কক্ষে।

একসময়ে তাঁর গাওয়া গান ধরা পড়েছিল দু’শোরও বেশি গ্রামোফোন রেকর্ডে। সমসাময়িক অধিকাংশ শিল্পীর তুলনায় তাঁর পারিশ্রমিক ছিল অনেক বেশি। কলকাতার চিৎপুর, জাকারিয়া স্ট্রিট-সহ একাধিক এলাকায় ছিল তাঁর বাড়ি। অর্থ, খ্যাতি, প্রভাব— কোনও কিছুরই অভাব ছিল না।

গওহর জানের জীবনকাহিনি সামন্ততান্ত্রিক রাজদরবারের শেষ অধ্যায় থেকে আধুনিক রেকর্ডিং যুগের যান্ত্রিক সূচনালগ্নে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের রূপান্তরের এক সুবিশাল সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ।

গওহর জান উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ে ‘আইলিন অ্যাঞ্জেলিনা ইয়ার্ড’ নামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ‘উইলিয়াম রবার্ট ইয়ার্ড’ ছিলেন একজন আর্মেনিয়ান খ্রিষ্টান এবং একটি কারখানার ইঞ্জিনিয়ার। মা ‘ভিক্টোরিয়া হেমিংস’ ছিলেন একজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মহিলা। তিনি কবিতা ও সংগীতে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর কন্যা অ্যাঞ্জেলিনার ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

স্বামীর সঙ্গে ভিক্টোরিয়ার বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ফলে, তিনি ও তরুণী অ্যাঞ্জেলিনা নতুন করে জীবন ও জীবিকার খোঁজে বেনারসে চলে আসেন। সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং শৈল্পিক বিকাশের তাগিদে তাঁরা দু’জনেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন যার ফলে ভিক্টোরিয়ার নতুন নাম হয় ‘বড়ি মালকা জান’ এবং অ্যাঞ্জেলিনার নাম রাখা হয় গওহর জান।

বেনারস ছিল গওহরের প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। তাঁর মা, ভিক্টোরিয়া— যিনি ততদিনে একজন দক্ষ কবি ও গায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাঁর কড়া নজরদারিতে গওহর শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যের কঠোর অনুশীলনে মন দেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর ওঠানামার মধ্যে দিয়ে গিয়ে পরবর্তীকালে তাঁরা কলকাতায় চলে যাওয়া মনস্থীর করেন। স্বাভাবিক ছিল, কারণ কলকাতা তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং অযোধ্যার নির্বাসিত নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের মতো বহু গুণী মানুষের আশ্রয়স্থল।

কলকাতার এই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গওহর বিভিন্ন ঘরানার কিংবদন্তি ওস্তাদদের অধীনে ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি এবং কত্থক নৃত্যে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। ফলতঃ ১৮৮০-র দশকের শেষের দিকে দ্বারভাঙার মহারাজার দরবারে কিশোরী গওহরের প্রথম সংগীত পরিবেশনা এক অতুলনীয় প্রতিভার আগমনী বার্তা ঘোষণা করে। কিন্তু ভাগ্য যে তাঁর জন্য আরও অন্য কিছু গড়ছিল, সেটা হয়তো গওহর ভাবতেও পারেননি।

ইতোমধ্যে ১৯০২ সালে ফ্রেড গায়েসবার্গ ও গ্রামোফোন কোম্পানির ভারতে আগমনে ঘটে যায় এক যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত বিপ্লব। শোনা যায়, তৎকালীন অভিজাত শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পীরা এই রেকর্ডিং প্রযুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে, মোমের চাকতিতে কণ্ঠ বন্দি করলে সংগীতের পবিত্রতা নষ্ট হবে, ঘরানার গোপন কৌশল প্রতিযোগীদের কাছে ফাঁস হয়ে যাবে এবং সংগীত তার আধ্যাত্মিক সংযোগ হারাবে।

কিন্তু গওহর জানের মধ্যে ছিল এক বিরল ও আধুনিক ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা। তিনি এই প্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনাকে বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন। পুরোনোর পাশাপাশি নতুনকে গ্রহণ গ্রহণ করতে হবে— এই সত্যকে তিনি মেনে নিয়েছিলেন, আর তাই তো ৮ নভেম্বর, ১৯০২ সালে কলকাতার ‘বালকান হোটেল’-এর একটি অস্থায়ী রেকর্ডিং স্টুডিওতে পা রেখে তিনি ভারতের প্রথম শিল্পী হিসেবে গ্রামোফোনে গান রেকর্ড করেন। তখনও হয়তো তিনি ভাবতে পারেননি যে তাঁর এই পদক্ষেপে, ইতিহাস হয়ে থাকল সেই দিনটি। আর সময় সাক্ষী ছিল অদূর ভবিষ্যতে, গওহর হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সামগ্রিক পরিকাঠামোকে বদলে দিয়েছিলেন।

প্রথাগত রাগসংগীত ছিল মূলত ইম্প্রোভাইজেশনের ওপর নির্ভরশীল, যা রাজদরবারের মেহফিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গাওয়া হত। কিন্তু নতুন এই প্রযুক্তি— গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডে মাত্র তিন মিনিট কোনও গান রেকর্ড করার সুযোগ ছিল। গওহর এই তিন মিনিটের মধ্যে সংগীতের মূল ভাব বজায় রেখে তা সংক্ষিপ্ত করার কৌশল আবিষ্কার করেন।

সে-সময়ে জার্মানির কারখানায় রেকর্ডিংগুলো যখন তৈরির জন্য পাঠানো হত, তখন চাকতিতে শিল্পীদের নাম চেনার কোনও উপায় ছিল না। তাই গান শেষ হওয়ামাত্রই শিল্পীকে নিজের নাম ঘোষণা করতে হত। গওহর তাঁর প্রতিটি রেকর্ডিংয়ের শেষে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ইংরেজিতে উচ্চকণ্ঠে বলতেন— ‘মাই নেম ইজ গওহর জান!’ এই একটি বাক্য তাঁর নিজস্ব সিগনেচার স্ট্যাম্পে পরিণত হয় এবং অচিরেই তাঁকে উপমহাদেশের ঘরে-ঘরে এক পরিচিত নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

১৯০২ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে তিনি বাংলা, উর্দু, গুজরাটি, তামিল ও আরবি-সহ ২০টিরও বেশি ভাষা ও উপভাষায় ৬০০-রও বেশি গান রেকর্ড করেন। এর ফলে রাজপ্রাসাদের বন্ধ দেওয়াল থেকে সংগীত  সাধারণ মধ্যবিত্তের বসার ঘরে পৌঁছে যায়— সংগীতের এক অভূতপূর্ব গণতন্ত্রীকরণ ঘটে।

গহরজানের নাম তখন শুধু সংগীতের জগতে সীমাবদ্ধ ছিল না। অভিজাত সমাজ, রাজদরবার, নবাবি আসর, এমনকী সাধারণ মানুষের আলোচনাতেও তিনি ছিলেন সমান পরিচিত। তাঁর পোশাক, অলঙ্কার, গয়না, ঘোড়ার গাড়ি, আচার-আচরণ— সবই মানুষের কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছিল। সংবাদপত্রে তাঁকে নিয়ে খবর প্রকাশিত হত, তাঁর অনুষ্ঠান নিয়ে আগ্রহ থাকত, আর তাঁর জীবন নিয়ে নানা গল্প ছড়িয়ে পড়ত মানুষের মুখে-মুখে।

তাঁর গান গওহরকে বিশ্বজোড়া খ্যাতির সঙ্গে-সঙ্গে বিপুল অর্থসম্পদও এনে দেয়। কথিত, সে-যুগে প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য তিনি ১,০০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিতেন— যা ছিল তৎকালীন সময়ে এক বিশাল অঙ্ক। অনুষ্ঠান বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন আপসহীন। যে কেউ নিমন্ত্রণ জানালেই তিনি রাজি হয়ে যেতেন না। শিল্পীর সম্মান তাঁর কাছে ছিল সর্বাগ্রে। মধ্যভারতের এক রাজপরিবারের নিমন্ত্রণ তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন— এমন কথাও সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়। সেই সময়ে, বিশেষ করে একজন মহিলা শিল্পীর পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল অকল্পনীয় সাহসের পরিচয়। শোনা যায়, কলকাতার বাইরে কোনও অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময়ে তাঁর জন্য কখনও-কখনও একটি সম্পূর্ণ রেলওয়ে কামরা বুক করা হত। কতটা সত্য, কতটা কিংবদন্তি— তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু এ-নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে তাঁর যাতায়াত, তাঁর উপস্থিতি এবং তাঁর অনুষ্ঠানকে ঘিরে আয়োজন ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি জানতেন, তাঁর শিল্পের মূল্য কত। আর সেই মূল্য আদায় করতেও তিনি কখনও দ্বিধা করেননি। কলকাতায় তাঁর একটি বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ি ছিল, তিনি লক্ষাধিক টাকার গয়না পরতেন। তাঁর বিলাসের চরম উদাহরণ স্বরূপ একটি গল্প মুখে-মুখে শোনা যেত যে, একবার তাঁর পোষা বিড়ালের বাচ্চা হওয়ার খুশিতে ২০,০০০ টাকা খরচ করে এক জাঁকজমকপূর্ণ পার্টি দিয়েছিলেন।

শুধু ভারতীয় রাজন্যবর্গ নয়, ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গেও প্রয়োজনে মতবিরোধে জড়াতে দ্বিধা করেননি তিনি। আত্মসম্মানের প্রশ্নে গওহরজান কখনও মাথা নত করতে শেখেননি। তাঁর কণ্ঠ যেমন শক্তিশালী ছিল, তেমনই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাঁর বহু অনন্য প্রতিবাদের গল্পও শোনা যায়। তিনি কলকাতার রাস্তায় ছয় ঘোড়ায় টানা রাজকীয় গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়াতেন। তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর একজন সাধারণ ভারতীয় বাঈজির এই রাজকীয় চালচলনে ক্ষুব্ধ হয়ে একবার তাঁর ওপর বিশাল জরিমানা চাপান। কিন্তু তাতে গওহরকে জব্দ করা যায়নি। তিনি হাসিমুখে সেই জরিমানা মিটিয়ে দিয়ে তাঁর সেই গাড়িভ্রমণ অব্যাহত রাখেন। তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত স্বাধীনচেতা নারী, যিনি কোনও ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি।

গওহর জান ছিলেন ঐতিহ্যবাহী ‘তবায়েফ’ সংস্কৃতির প্রতিনিধি। তিনি বুঝিয়েছেন যে, তবায়েফরা ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীত, নৃত্য এবং পরিশীলিত আদবকায়দার আসল অভিভাবক। যে যুগে সাধারণ ঘরের নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রাখা হত, সেই যুগে তবায়েফরা ছিলেন সুশিক্ষিত, স্বাধীন সম্পদের মালিক এবং বড়ো অঙ্কের করদাতা।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটিশ রাজের ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা এবং তার প্রভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত অভিজাত ভারতীয় সংস্কারকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। শুরু হয় তীব্র নৃত্য-বিরোধী আন্দোলন, যার ফলে বাঈজি সংস্কৃতিকে অবদমিত করা সম্ভব হয় এবং উচ্চমানের নারী শিল্পীদের সাধারণ যৌনকর্মীর সমতুল্য ভাবা শুরু হয়। রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, গওহর নিজেকে ক্রমশ একাকী ও সামাজিক কলঙ্কের মুখোমুখি আবিষ্কার করেন। এমনকী মহাত্মা গান্ধীর কংগ্রেস তহবিলের জন্য গান গেয়ে দেশাত্মবোধের পরিচয় দিলেও, সমাজের এই নৈতিক পরিবর্তনের স্রোত থেকে তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি।

শুধু ভারতীয় রাজন্যবর্গ নয়, ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গেও প্রয়োজনে মতবিরোধে জড়াতে দ্বিধা করেননি তিনি। আত্মসম্মানের প্রশ্নে গওহরজান কখনও মাথা নত করতে শেখেননি। তাঁর কণ্ঠ যেমন শক্তিশালী ছিল, তেমনই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাঁর বহু অনন্য প্রতিবাদের গল্পও শোনা যায়। তিনি কলকাতার রাস্তায় ছয় ঘোড়ায় টানা রাজকীয় গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়াতেন। তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর একজন সাধারণ ভারতীয় বাঈজির এই রাজকীয় চালচলনে ক্ষুব্ধ হয়ে একবার তাঁর ওপর বিশাল জরিমানা চাপান। কিন্তু তাতে গওহরকে জব্দ করা যায়নি। তিনি হাসিমুখে সেই জরিমানা মিটিয়ে দিয়ে তাঁর সেই গাড়িভ্রমণ অব্যাহত রাখেন।

প্রেমের গান মুঠো-মুঠো যিনি বিলি করেছেন, ব্যক্তিগত জীবনে সেই গওহর জান আজীবন এক নিঃশর্ত ভালবাসার সন্ধান করেছিলেন, যার ফলে বারবার তিনি মানুষের দ্বারা প্রতারিতও হয়েছিলেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি সম্পর্কই ছিল বিপর্যয়কর। এমনকী তাঁর জন্মদাতা পিতাও হঠাৎ ফিরে এসে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি দাবি করে মামলা ঠুকে দেন, যার ফলে নিজের পিতৃপরিচয় প্রমাণ করতে গওহরকে আদালতে চরম অপমানও সহ্য করতে হয়।

তাঁর প্রেমজীবনও ছিল সমান হতাশাজনক। তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, ব্যক্তিগত সচিব আব্বাসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত তিক্ততা এবং একের-পর-এক মামলার মধ্য দিয়ে সম্পর্কের অবসান ঘটে, যা তাঁর উপার্জিত সমস্ত অর্থ নিঃশেষ করে দেয়। এর পরপরই তাঁর মা, বড়ি মালকা জানের মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দেয়। একাকীত্ব, মামলার বিপুল ঋণ এবং মদ্যপান গওহরের শরীর ও মনকে দ্রুত গ্রাস করে নেয়। কলকাতার সমস্ত সম্পত্তি হারিয়ে এবং প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় তিনি কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হন।

শেষ বয়সে তিনি মহীশূরের মহারাজা কৃষ্ণ রাজা ওয়াদিয়ার (চতুর্থ)-এর দরবারে রাজসংগীতশিল্পী হিসেবে যোগ দেন। সেখানে সামান্য ভাতা এবং থাকার জায়গা পেলেও, তিনি ছিলেন তাঁর অতীত গৌরবের এক মলিন ছায়ামাত্র। ১৯৩০ সালের ১৭ জানুয়ারি, মহীশূরের এক হাসপাতালে নিঃসঙ্গ ও প্রায় বিস্মৃত অবস্থায় গওহর জান শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময়ে গওহর জানের পাশে পরিবার-পরিজনের কেউ ছিলেন না। না কোনও আত্মীয়। না কোনও বন্ধু। না সেই সব শুভানুধ্যায়ী, যারা একসময়ে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়াকেই নিজেদের সৌভাগ্য বলে মনে করতেন।

থাকার মধ্যে ছিলেন বৃদ্ধ রহমান মিঞা— বহু বছরের বিশ্বস্ত খিদমদ্গার। আর ছিলেন বছর পঁচিশের এক তরুণী, শরিফন। শেষ কয়েক বছরে এই দু’জনই ছিলেন গওহরের নিত্যসঙ্গী। সুখে-দুঃখে, অসুস্থতায়-সুস্থতায়, বাইরে যাওয়া থেকে শুরু করে ঘরের নিত্যদিনের কাজ— সবেতেই শরিফনের ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। রহমান মিঞাও মালকিনের সেবা করতেন একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস!

গওহরজানের মৃত্যুর সময়ে তাঁরাও হাসপাতালে ছিলেন না। তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন চামুণ্ডা পাহাড়ের পাদদেশে ‘দিলখুশ কটেজ’-এ। চিকিৎসকেরা নিশ্চয়ই আজ কিংবা কাল ছেড়ে দেবেন— এই আশাতেই দিন গুনছিলেন। বিবিজান ফিরলে আবার বাড়িটা আগের মতো প্রাণ ফিরে পাবে, আবার সুর ভেসে উঠবে, আবার অতিথিদের আনাগোনা হবে— হয়তো এমনই কোনও স্বপ্ন বুকের মধ্যে নিয়ে বসে ছিলেন তাঁরা। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফিরল না গোহরজান। ফিরে এল শুধু তাঁর মৃত্যুসংবাদ।

আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে তাঁর জীবনাবসান হলেও, তাঁর জীবনকে ঘিরে কৌতূহলের শেষ হয়নি। বরং গত দুই দশকে তাঁকে নিয়ে গবেষণার আগ্রহ যেন আরও বেড়েছে। সংগীত-ইতিহাস, গ্রামোফোনের বিবর্তন, ঔপনিবেশিক ভারতের সাংস্কৃতিক জীবন কিংবা নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস— প্রতিটি ক্ষেত্রেই গোহরজান একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। এর কারণও আছে।

গওহরজান শুধু একজন অসামান্য শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক যুগের পরিবর্তনের সাক্ষী। এমন এক সময়ে তিনি নিজের পরিচয় তৈরি করেছিলেন, যখন একজন মহিলা শিল্পীর সামাজিক অবস্থান আজকের মতো ছিল না। গান গাওয়াকে তখনও অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখতেন। সেই সমাজেই নিজের শিল্প, ব্যক্তিত্ব এবং আত্মবিশ্বাসের জোরে তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, যা সমসাময়িক বহু পুরুষ শিল্পীর পক্ষেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। হয়তো সেই কারণেই তাঁর জীবনকে কেবল সাফল্যের গল্প বলে দেওয়া যায় না। এটি একই সঙ্গে সংগ্রামের গল্প। বিশ্বাসের গল্প। বিশ্বাস ভঙ্গের গল্প। খ্যাতির গল্প। আর শেষ পর্যন্ত, এক গভীর নিঃসঙ্গতার গল্প।