ফ্যাশন ও প্যাশন

সিনেমার পর্দা থেকে ছলকে পড়ে ফ্যাশন আর স্টাইল সমাজে ছড়িয়ে যায়— এটাই দস্তুর। একটা সময় ছিল, যখন বাঙালি পর্দায় প্রমথেশ বড়ুয়াকে দেখে পাঞ্জাবির পুট অল্প ছিঁড়ে নিয়ে গায়ে চড়াত আর মুখে দুঃখ মেখে ঘুরে বেড়াত। উত্তমকুমারকে দেখে ইউ-কাট চুল কাটত আর অল্প ঘাড় বেঁকিয়ে বা অন্যদিকে তাকিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করত; এবং পরত ধুতির সঙ্গে কলার দেওয়া হাফ শার্ট (বাবু শার্ট)। তবে আমার শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে পা বাড়ানোর সময়কালে, অর্থাৎ সাতের দশকের বাঙালি যুবক-সম্প্রদায়কে দেখেছি, ফ্যাশন এবং পোশাক-আশাক নিয়ে তাঁরা বেশ ঘেঁটে রয়েছে। যেন কোনও দিশা নেই, খানিক এলোমেলো।

সাতের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, উত্তমকুমারের রশ্মি-উজ্বলতা হারাতে থাকে। অথচ স্টাইল আইকন হিসাবে উনিই থেকে গিয়েছিলেন, কারণ চিন্তাশীল-আঁতেল মনের কাছে বাস করা তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন স্টাইলের ব্যাপারে বেশ উদাসীন। তখনকার বাংলা ছবির নায়করা, যাঁরা সদ্য আত্মপ্রকাশ করছেন সে-সময়ে, তাঁরা যুবসমাজের হতাশা-সংক্রান্ত ছবিতে অভিনয় করে নাম করেছেন। তাই সেখানে ‘ফ্যাশন’ আর ‘স্টাইল’ দুই নিষিদ্ধ শব্দ। ধুতি পরে বিপ্লব হয় না, ফলে বাঙালি তার ট্রেডমার্ক ধুতি-পাঞ্জাবি ছেড়ে পায়জামা পরতে শিখেছে; এবং একইসঙ্গে বুঝেছে যে, পায়জামার ঔদাসীন্য শরীরে নিয়ে কবিতা লেখা যায়, আড্ডা দেওয়া যায়, এমনকী প্রেম বা বিপ্লব করাও যায় কিন্তু আপিস করা যায় না। সুতরাং নিতান্ত বাধ্য হয়ে চাকরির জগতে মাথা গোঁজার অভিপ্রায়ে নিজেদের পোশাক হিসাবে বেছে নিতে হচ্ছে টেরিকটের প্যান্ট আর তাতে গুঁজে-পড়া জামা।

আরও পড়ুন: বিনোদনজগতের ঠিক করে দেওয়া সৌন্দর্যের মাপকাঠিতেই কি চলতে হবে নারীকে?
লিখছেন সৈয়দ তৈসিফ আহমেদ…

মনের মধ্যে ‘এ-লড়াই বাঁচার লড়াই’ আউড়িয়ে ঘাড়ের ওপরে এক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত গম্ভীর মুখ ঝোলানো— এই ছিল বাঙালি যুবক। হিন্দি সিনেমার ক্ষেত্রে ফর্সা-সুন্দর মুখ আর পরনে ধোপদুরস্ত জামাকাপড়— এসব দেখা অভ্যেস হলেও, শহরের মানুষ কিন্তু সেটাকে নিজের করে নিতে পারেনি। ফ্যাশনহারা বাঙালি যুবকদের সম্বল তখন একমাত্র আওয়াজ দেওয়ার প্যাশন। আমার বড়-হয়ে-ওঠার উত্তর কলকাতায় তাই কেউ মুখে ক্রিম মাখলে বা গায়ে পারফিউম দিলে তার নাম হয়ে যেত ‘লেডিজ’ অথবা কেউ ফর্সা হলে আর তার ত্বক মসৃণ হলে তার নাম হত ‘লাল্টু’। আরও এক কলকাতা ছিল এই শহরের মধ্যে। সেই পার্ক স্ট্রিট, এলিয়ট রোড, সদর স্ট্রিট তখন মধ্যবিত্ত মানুষদের দূর থেকে সন্তর্পণে আলগোছে দেখার জায়গা হলেও উচ্চবিত্ত পরিবারের ইংরেজি মাধ্যম ইস্কুল থেকে পাশ করা কিছু বাঙালি ছেলে-ছোকরাদের সেখানে দেখা যেত। তারা এলভিস প্রিস্‌লে, বনিয়েম, আব্বা, বিট্‌লসের লং প্লেয়িং রেকর্ড কেনে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দোকান থেকে এবং রেকর্ডের মলাটে দেওয়া ছবি দেখে প্যান্ট-জামা বানায় আর চুল কাটে। তবে তারা সংখ্যায় ভীষণ কম ছিল, এবং তারা উচ্ছন্নে গেছে এটাই ধরে নেওয়া হত, কারণ মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে বিট্‌লসের অপর নাম ‘বিটলে’। সেই ছেলেদের নামকরণ হয়েছিল ‘টেঁসুয়া’।

বাঙালি উত্তমকুমারকে দেখে ইউ-কাট চুল কাটত

সেই সময়ে দেশে একটা ঝড় এল, যার নাম অমিতাভ বচ্চন। সে তাঁর পূর্বসূরি নায়কদের মতো ফর্সা আর সুন্দর দেখতে নয়, বরঞ্চ সিরিঙ্গে লম্বা আর বেশ রুক্ষ। সে বেলবটম প্যান্ট আর জামা পরে। কখনও জামাতে পেটের কাছে গিঁট দিয়ে দেদার মারামারি করতে শুরু করল পর্দায় আর দুষ্টু লোকেদের মারতে লাগল। কখনও আবার বেলবটম প্যান্ট আর ডোরাকাটা গেঞ্জি পড়ে নায়িকাদের সঙ্গে খুনসুটি করতে লাগল। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গেই দেখা গেল আরও দুজনকে— একজন ভারী চেহারার দুষ্টু লোক এবং অন্যজন রোগা পুলিশ অফিসার। দুজনের পরনেই কিন্তু একইরকমের পোশাক, প্যান্ট আর এক-রঙা হাফ শার্ট— আর সেই শার্টের বুকে আর পেটে এক জোড়া করে পকেট। যারা একটু-আধটু ইংরেজি সিনেমা দেখত, তারা এই পোশাক আফ্রিকার জঙ্গল নিয়ে তৈরি সিনেমায় দেখেছে। এর পোশাকি নাম সাফারি স্যুট, জঙ্গল-সাফারিতে পরার জন্যে এক আরামদায়ক পোশাক। কিন্তু দেখা গেল, এই পোশাক বম্বের মাফিয়া, ডাকাত আর পুলিশের গায়ে দিব্যি মানিয়ে গেছে। অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে আমাদের পাড়ার দাদাদের এক ‘সন্দেহে শুঁকে বুড়ো মুখে নাহি তোলে’ অবস্থা হল। সেলুনে গিয়ে ওঁর মতো চুল কাটা যায়, ওরকম প্যান্ট পরা যায়, এমনকী মাথা অল্প নীচু করে অন্তর্ভেদী একটা চাহনি অবধি চেষ্টা করা যায়, কিন্তু ওইরকম বুকের বোতাম-খোলা জামা আর ডোরাকাটা গেঞ্জি! বচ্চনের পোশাক-আশাক নকল না করতে পারলেও, কলকাতায় বাকি দুজনের পোশাক-আশাকের প্রভাব দিব্যি পৌঁছে গেল। প্রথমে অবাঙালি ব্যবসায়ীদের সেই পোশাকে দেখা গেলেও, অচিরেই উচ্চপদস্থ বাঙালিরা সাফারি স্যুট পরে অফিস যেতে শুরু করল। যুবসম্প্রদায়ের জন্যে পড়ে রইল শুধু পেটের কাছ থেকে পরা বেলবটম প্যান্ট আর চওড়া বেল্ট। তার সঙ্গে পলিয়েস্টারের তৈরি বেশ বড়সড় কলারওয়ালা জামা।

দেশে একটা ঝড় এল, যার নাম অমিতাভ বচ্চন

অবশেষে বাঙালি যুবকদের কপাল খুলল এক বাঙালির হাত ধরেই। শ্যামলা গায়ের রং, উচ্চতা ছ-ফিটের চেয়ে বেশ কিছুটা কম— কিন্তু তার স্টাইলই আলাদা। চামড়ার আর ডেনিমের জ্যাকেট, ফুলহাতা গেঞ্জি, গলায় একটা মাফলার জড়ানো আর মাথায় একটা টুপি-প্যান্ট। কিছুদিনের মধ্যেই এই দলে যোগ দিল ডেনিমের জিন্‌স, চকমকে গ্যাবাডিন আর জাম্পস্যুট। একটু হেলে দাঁড়ানো, আঙুল তুলে কথা বলা আর একটু ভাঙা বাংলা তাও আবার উচ্চকণ্ঠে— বাঙালি প্রথম একটা আইকন খুঁজে পেল নিজেদের মধ্যে থেকে, যার একটা নিজস্ব ‘সোয়্যাগ’ আছে। তারা চকমকে শার্ট-প্যান্ট পরতে শিখল, পা কিছুটা ফাঁক করে দাঁড়াতে শিখল, শিখল দুষ্টু হাসি হাসতে। কলেজে, পাড়ার মোড়ে, চায়ের ঠেকে— সব জায়গায় মিঠুন চক্রবর্তী।

ড্রেন-পাইপ, বেলবটম, ফ্লেয়ার্স— সবই বাঙালি পরে দেখেছে কিছুটা আলগোছে আর সন্তর্পণে, কারণ ফ্যাশন করার জন্যে সেইসব প্যান্ট পরা যেতে পারে, কিন্তু নিত্য ব্যবহারের জন্যে এইসব প্যান্ট বেশ অস্বস্তিকর। বেলবটম আর ফ্লেয়ার্স— এই দু’ধরনের প্যান্টের ঘের অনেক সময়ে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াত— গড়পড়তা বাঙালি যুবকের উচ্চতা যেহেতু অমিতাভ আর মিঠুনের থেকে অনেকটাই কম। এইসব প্যান্ট পরলে হোঁচট খেয়ে বেইজ্জত হওয়ার সম্ভাবনা থাকত আর তলার দিকটা রাস্তার কাদায় দ্রুত নোংরা হয়ে যেত। বাঙালির সৃজনশীল মন সেখানে রক্ষাকর্তা হয়ে দাঁড়াল। প্যান্টের তলার হেমে যোগ হল একটা চেন। ইংরেজি সিনেমার কাউবয়ের ভূমিকায় জন ওয়েনকে অনুসরণ করে নতুন ধরনের এক জুতো জনপ্রিয় হয়ে উঠল শহরের যুবকদের মধ্যে, কেননা কলকাতার পথঘাট খোঁড়াখুঁড়ির জন্য টেক্সাসের পথঘাটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে থাকে। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের চিনেপাড়ায় গিয়ে জুতো বানানোর এক হিড়িক তৈরি হল— যে-জুতোর ছুঁচলো দিকটায় পেতলের একটা স্ট্রিপ লাগানো আর আজকের রবারের হিলের বদলে কাঠের হিল। সেই জুতো পড়লে জুতোর ক্ষয়ক্ষতি বেশ কম হয় আর ওই কাঠের হিলের ‘ঠক-ঠক’ আওয়াজ অনেকটা বচ্চন আর মিঠুনের পদধ্বনির সঙ্গে মেলে।

কলেজে, পাড়ার মোড়ে, চায়ের ঠেকে— সব জায়গায় মিঠুন চক্রবর্তী

মিঠুন চক্রবর্তীর হাত ধরেই অবশেষে বাঙালি জিন্‌স আর জিন্‌সের জ্যাকেট পড়তে শিখে গেল। এই জিন্‌স প্যান্টটা ভীষণভাবে মনে ধরল বাংলার যুব-সম্প্রদায়ের কারণ এর সঙ্গে জামা, গেঞ্জি, পাঞ্জাবি সব কিছুই দিব্যি পরা যায়। সে-কারণেই আটের দশকের মাঝামাঝি হইহই করে কলকাতায় এসে গেল স্ত্রেচ জিন্‌স, অ্যাসিড ওয়াশ, শট-গান ওয়াশ আর তার সাথে কর্ডের প্যান্ট। রক্সি সিনেমা থেকে নিউ এম্পায়ারের মাঝের বেট্রাম স্ট্রিটে সারি দিয়ে জিন্‌সের প্যান্ট বানানোর কারিগর— খলিল আমেদ, হলিউড টেলর, এ জলিল, অ্যাডামস— সমস্ত দোকানেই সকাল থেকে বিকেল অবধি ভিড়। পাড়ার দর্জির দোকানগুলো কিছুদিনের মধ্যেই এই শিল্প আয়ত্ত করে ফেলল আর মানিকতলা-রাজাবাজার-কাঁকুড়গাছির সব দোকানের ডিসপ্লেতে দেখা গেল বিভিন্নরকমের জিন্‌স আর কর্ডের প্যান্ট। কলকাতার অদূরে বজবজের কাছে চটাতে খুলে গেল রেডিমেড জিন্‌সের বিভিন্ন কারখানা। অনেকে সেখান থেকে সস্তায় প্যান্ট কিনে এনে দীক্ষিত হল ‘মার দিয়া কেল্লা, দেখেছিস জেল্লা’ মন্ত্রে। 

আমাদের বয়সি কিশোরদের স্টাইল বা ফ্যাশন বলতে কিছু ছিল না। ইস্কুলে অমিতাভের মতো কান-ঢাকা চুল বা মিঠুনের ঝুলপি-চাঁছা চুলের ফ্যাশন কোনওটাই চলত না, প্যান্ট আর শার্ট তো অনেক দূরের কথা! প্যান্ট আর জামা হবে ঢিলেঢালা। টাইট ফিটিং পড়লেই এক্কেবারে কানের গোড়ায়। অবশেষে একদিন মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হলেন মাইকেল জ্যাকসন। ব্যাগি প্যান্ট আর ব্যাগি শার্ট, দুটোই ঢিলেঢালা। এইবার কিছু তো বলতে পারবে না বাপ! ম্যাগিয়া-হাতা জামা, যা মেয়েদের ব্লাউজ ছিল, তা চলে এল আমাদের পরনে শার্ট হয়ে। ইস্কুলে পরা যাবে না তো কী হয়েছে, ইস্কুলের পরে টিউশনক্লাসে তো পরে যাওয়া যায়! সঙ্গে জিন্‌সের প্যান্ট তো রয়েছেই‍!

অবশেষে একদিন মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হলেন মাইকেল জ্যাকসন

সময়ের সঙ্গে কলকাতা-বম্বে-দিল্লির দূরত্ব কমতে লাগল আর ফ্যাশন স্ট্রিট, বান্দ্রা ব্যান্ডস্ট্যান্ড, সরোজিনী মার্কেট, জন্তরমন্তর চলে এল কলকাতার কাছে। পর্দার দিকে তাকিয়ে বা ম্যাগাজিনের পাতা থেকে ফ্যাশন শেখা বা পোশাক দেখার দিন আস্তে-আস্তে মনের মধ্যে সেপিয়া রং নিতে শুরু করল। হাত বাড়ালেই নতুন ডিজাইন, নতুন সম্ভার। ফলে, নতুন শতাব্দী যখন আগমনী গান শুরু করার কথা ভাবছে, কলকাতার যুবসমাজ তখন ফ্যাশন-ট্রেন্ড আর পোশাকের রকমফের নিয়ে পিছিয়ে নেই। কিন্তু যতই জিন্‌স আর টি-শার্ট পড়তে শিখুক বাংলার যুবসমাজ, পুজোপার্বণে বা অনুষ্ঠানে সেই ‘ব্যাক টু বেসিক্‌স’— ধুতি বা পায়জামা, সঙ্গে পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবি আবার হবে গিলে করা আর সাবুদানার কাজ। ধুতি হবে ধাক্কা-পাড় আর কুচোনো। কোঁচা যাতে ভালভাবে দেখা যায়, সেইজন্যে পাঞ্জাবি হাঁটুর একটু ওপরে থেমে যাবে। পুঁজিবাদী ধুতি আর সংগ্রামী পায়জামা সহাবস্থান করে থাকে অনুষ্ঠানবাড়িতে। এখন আর পাড়ায়-পাড়ায় পাঞ্জাবি গিলে দেওয়ার জন্যে বা ধুতি কোঁচানোর জন্যে ধোপা পাওয়া যায় না ঠিকই, তবু তাতেও কি ফ্যাশন কমেছে? দরকার হলে নতুন কেনা হবে, কিন্তু পাঞ্জাবির গিলে আর ধুতির কোঁচা যেন ঠিক থাকে। এই ফ্যাশন মহালয়ার সকালের বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মতো, চিরন্তন বাঙালি।