সার্জারি করা তীক্ষ্ণ চোয়াল, পুরু ঠোঁট এবং উন্নত বক্ষ। নির্মেদ তলপেট, নিখুঁত নিতম্ব। গর্ভাবস্থায় স্ফীতি হতেই পারে, তবে ফিরতে হবে দ্রুত। এত সময় নেই আমাদের, বুঝলেন! মনে রাখবেন, আপনার এই যে গগনচুম্বী কেরিয়ারের ভিত, তার আস্তানা কিন্তু আমাদের কাঁধেই গাড়া। যখন-তখন কাঁধ আলগা করলেই কিন্তু সপাটে আছাড়। কাজেই সুগভীর নাভির কাছে মখমল অববাহিকা বজায় রাখার দায় আপনার। মোমে মাজা মসৃণ পা কীভাবে কায়েম রাখবেন, সে আপনি বুঝুন। আমাদের লাগবে একটি আপাদমস্তক বিনোদন-উপত্যকা। না পারলে বলে দেবেন, আপনাকে খরচার খাতায় ফেলে দিয়ে আমরা অন্য লোক দেখে নেব। নির্দয় জোতদার যেমন রুগ্ণ কৃষক চিতেয় উঠলে তার ছেলেকে একপিস ‘আহা’ করার পরেই মনে করিয়ে দিত খাজনা, আমরাও তেমনি স্মরণ করিয়ে দেব মূলত আপনি দর্শনধারী। তখন কিন্তু আপনাকে ‘পাশের বাড়ির বউদি’ বলে খ্যাকখ্যাক ট্রোল করতে পিছপা হব না আমরা। সে আপনি ক্যাটরিনা হোনবা দীপিকা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় লাইপোসাকশন করাবেন, বাচ্চা ভুলে জিমে ভর্তি হবেন, প্রয়োজনে স্লিম টি-তে চুমুক দেবেন লিটার-লিটার! বোটক্স, ফিলার এবং ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট সার্জারিকে মনে করবেন দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক প্রাতঃকর্ম।
আসলে, সৌন্দর্য নামক যে আধুনিক সার্কাসটি আমরা নিউজফিড থেকে শিখেছি, তাতে জ্যান্ত মানুষের ভাগ অতি সামান্য, বাকিটা আলোর কারসাজি, ক্যামেরার কান্নিক, মেক-আপের পরত, ফিল্টার, অস্ত্রোপচার, অনাহার এবং ডিজিটাল কারিগরির যৌথ উৎপাদন। সেখানে ত্বকের রোমকূপ নেই, চোখের কোলে টসকানো নেই। নেই পেটে ভাঁজ পড়া-পড়ির গল্প, কিংবা স্তনের ক্ষেত্রে মাধ্যাকর্ষণের সূত্র। দিনের পর দিন এই পরীক্ষাগার-প্রস্তুত শরীর দেখতে-দেখতে আমাদের চোখ এমনভাবে অশিক্ষিত হয়ে উঠেছে যে, রক্তমাংসের নারী সামনে এসে দাঁড়ালেই বরং তাঁকে অস্বাভাবিক মনে হয়। মুখে বয়সের রেখা দেখলে বোধ হয় বিরক্ত, শরীরে চর্বি দেখলে মনে হয় ঠকে গেলাম। পান থেকে চুন খসেছে কি খসেনি, বিজ্ঞাপনে দেওয়া প্রতিশ্রুতির ত্রুটিপূর্ণ সরবরাহ বলে খাপ বসাই আমরা। আমি যে ভোক্তা এবং আমার ক্ষমতা ডিজিটাল-দুনিয়ায় নেহাত কিছু কম নয়, এ-দিব্যদৃষ্টি খুলেছে আমাদের সদ্য।
আরও পড়ুন : মধ্যবয়সে মাতৃত্ব মানেই সমাজের ছিছিক্কার?
লিথছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্য়ায়…
প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। সাইবার-বুলিং তো আপনাদেরই কৃতকর্মের পরিণাম। একটা সুপরিকল্পিত কাঠামোগত গ্যাঁড়াকলের আমরা এক-একটা সংঘবদ্ধ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ামাত্র। তাতে অবশ্য আপনাদের কাঁচকলা। বিনোদন নামে যে-দীর্ঘ শোষণব্যবস্থাটি অত্যন্ত সুকৌশলে নারীদের জন্য এক অবাস্তব এবং অসম্ভব সৌন্দর্যের মানদণ্ড তৈরি করে, তাদের নিরাপত্তাহীনতাকে পুঁজি করে মুনাফা লুণ্ঠন করে এবং ফিল্টার করা, প্লাস্টিক সার্জারি করা বদনকে স্বাভাবিক বলে গা-জোয়ারি চালিয়ে দেয়, তারপর আমাদের এই দাবি কি খুবই অন্যায্য মনে হচ্ছে? পুঁজিবাদী এবং বিনোদনজগৎ নারীদের শরীরের যে-রূপটি পর্দায় এবং ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে তুলে ধরে, তা মূলত এক ধরনের ডিজিটাল এবং সার্জিক্যাল জালিয়াতি, সে কি আর জানতে বাকি নেই আমাদের? তবুও তো কিছু একটা নিয়ে থাকতে হবে রে ভাই! যেনতেনপ্রকারেণ, এই বিরক্তিকর জীবনের বৈতরণিটি পার করতে হবে।
আসলে কী জানেন, আমরা যে মূলত ইতর, এটুকু বুঝতে গেলে যে-সামান্য অবকাশের প্রয়োজন হয়, সেটুকুও আপনারা আমাদের দেননি। খোলা আকাশের নীচেও একটা অন্তর্জালের খাঁচায় কয়েদ রেখেছেন। গরাদের জায়গায় তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, এই যা পার্থক্য। আমরাও তাই ডিজিটাল নেশা করে পড়ে থেকে বন্দিযাপনকে ভুলে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছি। আবারও বলছি, দোষ আমাদের নয়। ফেসবুক বন্ধ করলে ইন্সটা খুলি, ইন্সটা করতে-করতে হোয়াতে টরাং-টরাং করে মেসেজ ঢুকে যায়। ভাববার জো কোথায়! ওদিকে যদিও-বা ভাত ঠান্ডা হচ্ছে বলে এগুলো বন্ধ করলাম, এদিকে আবার ল্যান্ডস্কেপে নেটফ্লিক্স খুলে গেল। তারপর ধরুন প্রাইম নোটিফিকেশন ঝুলিয়ে দিয়ে বলল, আটটা এপিসোড দেখেছ, বাকি দুটো কে দেখবে শুনি? গুচ্ছের আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। চুমুকের পর চুমুক দিয়ে যাও।
কত বড় দায়িত্ব পালন করছি, ভেবে দেখেছেন? আপনাদের এই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে কারা? আমরা— এই অগুনতি ভাবলেশহীন বডি-শেমাররা! কী ভাবেন, সে-বোধ আমাদের নেই? খুব আছে। আমাদের প্রতিটি কাঁচা টিটকিরি আপনাদের পণ্যের জন্য বিনা খরচের বিজ্ঞাপন। কাজেই ইতরামি করছি জেনেও তার লাইসেন্স আমাদের হাতে তুলে রেখেছে আপনাদের ইয়া-ইয়া প্রতিষ্ঠান। নারীর শরীরের বেলায় বাক্-স্বাধীনতার ষোলো আনা প্রয়োগ না করলে চলে? ধর্ম, কর্পোরেট লুঠ আর ক্ষমতাবানের সামনে যে-স্বাধীনতা অনেক আগেই বন্ধক দিয়ে এসেছি, তার অবশিষ্ট দাপটটুকু অন্তত কোনও নারীর পেটের ভাঁজে দেখাব না? বাকি সব ব্যাপারে তো চুপ করেই গিয়েছি।
আমাদের দিকে এখন আর গোলাবারুদ নিক্ষেপ করে বিশেষ লাভ নেই। আপনাদের আদরের পুঁজিবাদে নারীর শরীর একটি ‘প্লাস্টিক’ প্রকল্প— যাকে ইচ্ছামতো কেটে, ছেঁটে, টেনে, শুষে বা ফুঁড়ে দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা যায়। শরীরের কোনও অংশ যে নিজের নিয়মে ফুলতে, ঝুলতে, কুঁচকাতে বা অসমঞ্জস হতে পারে, এই সামান্য সত্যটি মেনে নিলেই বাজারে মন্দা লাগে। আপনারাই তো শিখিয়েছেন, পেটের সামান্য স্ফীতি শত্রুপক্ষের দখল করা জমি, সেলুলাইট নিয়মানুবর্তিতার অভাব, আর বলিরেখা সময়ের অনুপ্রবেশ। কাজেই আধুনিক রূপচর্চার বাজারে নারী এক অনন্তকালীন ‘নির্মাণাধীন প্রজেক্ট’-এ। আর সেই উদ্ভট নির্মাণের কাঁচামাল হিসেবে হাজির করেছেন লাইপোসাকশন, বোটক্স, ফিলার, নানাবিধ কসমেটিক সার্জারি। আমরা নাহয় গোবরের চ্যাং, কিন্তু আপনারা! ছুরি-কাঁচিময় ব্যথা-যন্ত্রণাকে ডাকছেন আত্মযত্ন বলে, চরম ঝুঁকির সর্বনাম দিয়েছেন আত্মবিশ্বাস, আর সামাজিক চাপের সমার্থক নাকি ‘সেল্ফ লাভ’। কী দুর্দান্ত এক শাঁখের কড়াত আপনাদের! যার নীচে শুয়ে থাকাটাকেও বলা হচ্ছে ক্ষমতায়ন; প্রথমে নিজের শরীরকে ঘৃণা করতে শেখাও। তারপর চেকনাই মাদক দিয়ে বুঁদ করে রাখো। বাহ্যিক বা কারিগরি দিক থেকে মুখমণ্ডলে লাগাতার কাটাছেঁড়া করে, সেখানে মানবিক অভিব্যক্তি বা আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের প্রবেশকে নিষিদ্ধ করেছেন কঠোরভাবে। চামড়ার ওপর তথ্যের বা মেক-আপের চরম প্রাচুর্য, কিন্তু ভেতরের মানুষটিই তো বেপাত্তা!
এই আজব মিথের যৌথ পাহারাদার বাজার ও গণমাধ্যম, যার মধ্যে আমাদের ভূমিকা হল সদাসর্বদা ফুট কেটে চলা। অথচ প্রসাধনশিল্প, ডায়েট-ব্যবসা, এবং কসমেটিক সার্জারির বিপুল সাম্রাজ্য নারীর অসন্তুষ্টি এবং অতৃপ্তির ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা নারী এই ব্যবস্থার সবচেয়ে অকেজো ক্রেতা। তাই সর্বস্ব দিয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাসকে করো জুতোপেটা। এর বেলায় কিন্তু আপনাদের মুখে কুলুপ। দিবারাত্রি নারীর কানের গোড়ায় এমন কিছু বলে যাও যাতে তার ‘যথেষ্ট’ থাকার যে-ধারণা, তার চোদ্দোগুষ্টির ষষ্ঠী পুজো হয়ে যায় যেন। তুমি শুধু ফুসমন্তর দিয়ে যাও— বয়সের ছাপ মানেই অনাদর, মেদের স্বাভাবিক সঞ্চয় অযত্ন, আর যৌবনকে অনির্দিষ্টকাল যাবৎ প্রদর্শন করে যাওয়াই সাফল্য।
আমাদের দৌড় নাহয় ওই মন্তব্য-ঘরের ট্রোল অবধি। কিন্তু আপনারা সৌন্দর্য-মিথের এই হট্টমেলায় নারীদের মধ্যে চিরস্থায়ী প্রতিযোগিতার কী দুর্দান্ত বন্দোবস্তটাই না করেছেন! বয়স বাড়ার অত্যন্ত স্বাভাবিক এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া-কে অপরাধ বা চরম ব্যর্থতা, এমনকী বিকলাঙ্গতা হিসেবেও তুলে ধরার পরিকল্পিত খপ্পর বানিয়েছেন। প্রৌঢ়ার অবিরত মগজধোলাই চলছে, তরুণী তাঁর বাজারদর কেড়ে নিতে এসেছে; আর তরুণীকে পাখিপড়া শেখানো হচ্ছে, ওই যে বিগতযৌবন— এ হল তোমারই আসন্ন বিপর্যয়ের নমুনা। তরুণীর চোখে মধ্যবয়স্কা হয়ে উঠছেন কেবলই একটি আগাম সতর্কবার্তা— আলুনি হওয়া যৌবনের জলজ্যান্ত ছবি, যা থেকে তরুণীকে যে-কোনও মূল্যে দূরে থাকতে হবে। অন্যদিকে, সামাজিক চাপে দমছুট-কোণঠাসা-যৌবনোত্তীর্ণতরুণী, মাঝে অনেক সময় নিজের হারানো যৌবনের আক্ষেপে অনর্থক তীব্র প্রতিযোগিতায় নাম লেখাতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, যৌনতার স্বাভাবিক অধিকারকেও তো আপনারা মোটের ওপর টনকো ত্বকের একচেটিয়া পাওনাগণ্ডা বলে হুকুমনামা লিখেছেন। কাজেই বুঝতে আর বাকি থাকে না যে, নারীদের পারস্পরিক এই বিচ্ছিন্নতা আসলে কাঠামোগত শোষণেরই একটি সুনিপুণ ষড়যন্ত্র। কী অপূর্ব নকশা আপনাদের! দুই প্রজন্মের নারী যদি নিজেদের অভিজ্ঞতা, ক্ষত, আর কৌশল একবার ভাগ করে নিতে শুরু করে, তা হলে আপনাদের ঘটি-বাটি চাটি হওয়াটাকে আর আটকাবে কে! সে বড় বিপজ্জনক ব্যাপার হবে। তাই সহজ পন্থা হল প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো তাঁদের মঞ্চে খাড়া করা। দুই নারী পরস্পরের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে স্রেফ সময়ের নিদারুণ হামলার দুর্ভাবনায় ব্যস্ত থাকুক। আর ঠিক এই ঘোলা জলে অ্যান্টি-এজিং ক্রিম, আর কসমেটিক সার্জারির ব্রোশিওরের ফিরিস্তি দিয়ে আপনারাও লুটেপুটে নিন! ব্যাস, কেল্লাফতে!
নারীকে শুধু সুন্দর হলেই চলবে না; সুন্দর হওয়ার শ্রমটিও লুকিয়ে রাখতে হবে। মাঝের এই প্রস্তুতিপর্বের গোপন কথাটি রহিবে গোপনে। ভনভনিয়ে ঘুরতে থাকা তাগ করা ক্যামেরা লেন্সকে এড়িয়ে চলাটা তখন আবশ্যিক। ডাক্তারের চেম্বার থেকে মুখে ব্যান্ডেজ বেঁধে গাড়ি দুশোতে ছুটিয়ে মারুন না পোলে, আমার তাতে কী! নিখুঁত ত্বক, ধারালো নাক, আর রসালো ঠোঁটের মনোমুগ্ধকর পূর্ণাঙ্গ চমকটি এক্ষেত্রে আর্ট গ্যালারিতে টাঙিয়ে রাখা তৈলচিত্রের মতো, আমি শেষবেলায় হাঁ হয়ে চেয়ে থাকব।
আমাদের মতো চুনোপুঁটিদের কটুকথার আয়ু যতই ক্ষণস্থায়ী হোক, আপনারা এই যে কেবল দু-একটি নির্বাচিত বিষয়ে আমাদের সিরিয়ালসি নেন, কারণ আপনাদের এই পেল্লায় কারবারে সেগুলি এক-একটি খতরনাক গাড্ডা। পা দিলে আর ওঠে কার সাধ্যি! আমাদের স্রেফ অবজ্ঞা করলেই যেখানে ল্যাটা চুকে যায়, সাধারণ বুদ্ধিতে সেটাই তো করা উচিত বলে মনে হয়!কিন্তু না। কাজেই আপনাদের এই অনন্ত চক্রব্যূহে সেটাও যে জরুরি এক কাঠখড়, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে! মানুষের অভিযোজনক্ষমতা বিস্ময়কর; কিন্তু পুঁজিবাদের অভিযোজনক্ষমতা তার সাড়ে ষোলো গুণ। নারীবাদীরা এককালে যখন অবাস্তব সৌন্দর্য-মানদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেছিলেন, পুঁজিবাদ সেই প্রতিবাদের দাপটে পিছু তো হটলই না; উপরন্তু সেই প্রতিবাদকেও একটি পণ্যে পরিণত করে বিক্রি করতে শুরু করল। বিজ্ঞরা একে বলেন ‘পণ্যায়িত নারীবাদ’। গত কয়েক দশকে বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলি ‘লাভ ইয়োর বডি’ থেকে ‘ফেমভার্টাইজিং’—কত কীই-না খুলে বসল! নারীবাদ আর বিজ্ঞাপনের বিয়ে দিয়ে দেনমোহর হিসেবে তুলে নিল চৌগুণ মুনাফা। নারীর সম্মিলিত ক্ষোভ থেকে রাজনীতিটুকু ছেঁটে ফেলে, তার সঙ্গে মেশানো হল নির্বাচিত আত্মবিশ্বাসের সুগন্ধি। বিজ্ঞাপনগুলোতে একই কথা বলা হল গেদে-গেদে, নারীদের উচিত নিজেদের শরীরকে ভালবাসা, আত্মবিশ্বাসী হওয়া এবং সমাজের চাপিয়ে-দেওয়া নিয়মের তোয়াক্কা না করা। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলেই এই ক্যাম্পেইনগুলোর অন্তর্নিহিত ভণ্ডামিগুলো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এই ‘লাভ ইয়োর বডি’বয়ানটি আসলে এক প্রকার নিওলিবারেল ফাঁদ। আমার বাবাকে আমি যদি ভালবাসি, তবে তার খুলে-আসা দাঁত দেখে কি আমার গা গুলিয়ে উঠবে, নাকি মায়ের ঝুলে-যাওয়া চামড়া দেখে আমার রি রি ধরবে! আমি আমার শরীরকে ভালবাসলে তাকে নির্দ্বিধায় বুড়োতে দেব।
নারীকে শুধু সুন্দর হলেই চলবে না; সুন্দর হওয়ার শ্রমটিও লুকিয়ে রাখতে হবে। মাঝের এই প্রস্তুতিপর্বের গোপন কথাটি রহিবে গোপনে। ভনভনিয়ে ঘুরতে থাকা তাগ করা ক্যামেরা লেন্সকে এড়িয়ে চলাটা তখন আবশ্যিক। ডাক্তারের চেম্বার থেকে মুখে ব্যান্ডেজ বেঁধে গাড়ি দুশোতে ছুটিয়ে মারুন না পোলে, আমার তাতে কী! নিখুঁত ত্বক, ধারালো নাক, আর রসালো ঠোঁটের মনোমুগ্ধকর পূর্ণাঙ্গ চমকটি এক্ষেত্রে আর্ট গ্যালারিতে টাঙিয়ে রাখা তৈলচিত্রের মতো, আমি শেষবেলায় হাঁ হয়ে চেয়ে থাকব। তৈলচিত্রকে একটু-একটু করে হতে দেখলে পুরো বিস্ময়টাই মাঠে মারা যাবে না! আবার, যৌবন ধরে রাখছেন যিনি, যদি তিনি বারোয়ারি পোস্টে ভাইরাল হন যে চিকিৎসা বা প্রসাধনের সাহায্য নিয়েছেন, সঙ্গে-সঙ্গে তাঁকে প্রতারক বলে তুলোধোনা করব আমরা। কাজেই তিনি সন্তানজন্মের পর দ্রুত আগের চেহারায় ফিরবেন, তবে ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক, পরিচারিকা, পুষ্টিবিদ ইত্যাদির সুবিধার কথা ঘুণাক্ষরেও জানাবেন না।
জীবনের যা-কিছু স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, সেগুলোকে স্টেপজাম্প করবেন বলেই না ধনতন্ত্র সোশ্যাল মিডিয়া নামক একটি খুড়োর কলের আমদানি করেছে। যেমন ধরুন ‘স্ন্যাপব্যাক’ কালচার বা প্রসব-পরবর্তী অধ্যায়ে ছিমছাম শারীরিক গঠনে ফিরে যাওয়ার এক অমানবিক এবং অবাস্তব মানসিক চাপ নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। সেলিব্রিটিরা সন্তান জন্মদানের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কীভাবে নির্মেদ পেটে ফোটোশুট করছেন, সেই অলৌকিক চিত্র প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরা হবে। আমরা জানব এটাই স্বাভাবিক, আমাদের চিন্তায় এবং চেতনে, শুধু আমাদের কেন, সাধারণ বা অসাধারণ সব নারীর মনেই এই ধারণা পুঁতে দেওয়া হবে যে, প্রসবের পর পেটে স্ট্রেচ-মার্ক থাকা বা শরীরের আকার পরিবর্তিত হওয়াটা এক ধরনের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা।
কাজেই, ট্রোলবাজদের পক্ষ থেকে নারীমুক্তির ধ্বজাধারীদের বলছি, দোহাই আপনাদের, একটু বুঝুন। প্রকৃত নারীমুক্তির জন্য কেবল আইনি বা অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই যথেষ্ট নয়; এই মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়াটাও সমান জরুরি। সৌন্দর্যের এই প্রাতিষ্ঠানিক মিথ বা রূপকথার মায়াজালকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে ভেঙে ফেলা না গেলে, আধুনিক নারীর স্বাধীনতা কেবল বাইরের খোলসেই আটকে থাকবে, তার অন্তর্নিহিত ও আত্মিক মুক্তি কোনও জন্মেই ঘটবে না।
সবটাই তো বুঝছেন! আপনাদের এবং আমাদের সম্মিলিত কারবারে, সৌন্দর্য এখন আর কেবল একটি নান্দনিক বিষয় নেই, নৈতিক যোগ্যতা মাপার তোলনযন্ত্র। কোনও নারী নিজেকে প্রচলিত অর্থে ‘সুন্দর’ রাখার জন্য যথেষ্ট শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় না করলে আমরা তাকে শুধু ‘অসুন্দর’ বলেই থামব না; অলস, অযত্নশীল, এমনকী আত্মমর্যাদাহীন আখ্যা দিয়ে তার চেহারাগত বিরুদ্ধাচরণকে নৈতিক ব্যর্থতা বলে প্রতিপন্ন করব। টের পাচ্ছেন নিশ্চয়, ক্যাটরিনার ট্রোলিংয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক এই জিনিসই ঘটেছে। নেটিজেন নামক এক নির্দয় সংস্থা প্রশ্ন তুলেছে, তিনি কেন প্রসবের পর নিজের ‘সেল্ফ-কেয়ার’ (self-care) অবহেলা করছেন। অর্থাৎ, নিজের শরীরকে সেল্ফ-কেয়ারের ধুয়ো তুলে একটি কৃত্রিম, মেদহীন ছাঁচে ফেলে রাখাটা এখন বাধ্যতামূলক। তাহলেই ভাবুন, কী প্রকাণ্ড স্বাধীনতার মধ্যে আমাদের বসবাস!
আগে নারীদের বলা হত তাদের শরীর নিখুঁত করতে হবে; ইদানীং বলা হচ্ছে তাদের শরীর তো বটেই, এমনকী তাদের মনস্তত্ত্ব বা আত্মবিশ্বাসকেও ধোপদুরস্ত বানাতে হবে। উদ্দেশ্যটা সহজ, নারীবাদের মূল রাজনৈতিক দাবিগুলোকে মুছে ফেলে তাকে দিয়ে ভোগবাদী তেজারতি চালিয়ে যাওয়া। এক ঢিলে কত পাখি যে অক্কা পেল, বলা দুষ্কর।
মিশেল ফুকো ‘প্যানঅপটিকন’ বলে একটা কথার চল করেছিলেন। মূল নকশাটি জেরেমি বেন্থামের। একটি বৃত্তাকার কারাগার, যার মাঝে রয়েছে একটা পর্যবেক্ষণ-মিনার। সেখান থেকে প্রহরীরা পাহারা দেয়; নজর রাখে প্রত্যেক বন্দির উপর। কিন্তু একজন বন্দিও কিছুতেই ঠাওর করতে পারে না ঠিক কখন তার উপর নজরদারি চলানো হচ্ছে। কী বিচিত্র ব্যবস্থা দেখুন, অবিরাম নজরদারির প্রয়োজন পড়ছে না কিন্তু; কারণ নজরদারির সম্ভাবনাই বন্দিকে নিজেই নিজের প্রহরীতে পরিণত করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই কেন্দ্রীয় মিনার। আর অ্যালগরিদম তার অলক্ষ্য নেত্র। এখান থেকে পালাবেন কোন ইউটোপিয়ায়!




