মেঘে মেঘে বেলা: পর্ব ১১

বুড়ো বয়সে বাচ্চা? ম্যাগো!

আমাদেরই লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে, আর ওনাকে দ্যাখো, এই বয়সে পেট ফুলিয়ে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ছিছিছি, এতটুকু লজ্জা নেই রে তোর? এই বয়সে কেউ মা হতে চায়? না পারে?’ প্রশ্নটা এমনভাবে ছুটে আসে, ঠিক যেমন পুরনো ‘মহাভারত’ সিরিয়ালে একটা বাণ নিমেষে পঞ্চাশটা বাণ হয়ে টারগেটের দিকে ধেয়ে যেত, তেমন! মাঝবয়সে মা হওয়া যেন কোনও সিরিয়াস ক্রাইম, আর সেই অপরাধের বিচার বসেছে পাড়ার মোড়ে, আত্মীয়ের ডাইনিং টেবিলে, খবরের কাগজের পাতায়, এমনকী আমাদের নিজেদের মাথার ভিতরেও।

প্রশ্নটার ধার অবশ্য একদিকেই নয়, দু’দিকে। প্রথম ধারটা শরীর নিয়ে। এই বয়সে আবার বাচ্চা? শরীরে কি সইবে? বাচ্চা সুস্থ হবে তো? বয়স তো আর কম হল না! শরীরের কলকবজা তো ক্ষইতে শুরু করেছে। আর দ্বিতীয় ধারটা আরও ‘মানবিক’— বাচ্চাটাকে মানুষ করবে কে? তার সঙ্গে দৌড়বে কে? স্কুলে নিয়ে যাবে, খেলবে, রাত জাগবে, অসুখে মাথায় জলপট্টি দেবে— এইসব করার মতো শক্তি কি আর থাকবে? তারপর আসে সবচেয়ে মজার পাঞ্চ লাইন— বাচ্চা বড় হয়ে বাবা-মাকে বাবা-মা না বলে দাদু-ঠাকুমা ডাকবে! এ-রসবোধ থেকে ক্যাটরিনা কইফ-ও বাদ যাননি।

আরও পড়ুন: ছি ছি, এই বয়সে ভালবেসে ফেললাম! ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেছে, লোকে কী বলবে!
‘মেঘে মেঘে বেলা’ পর্ব ১০…

সমাজের রসবোধ সত্যিই অসাধারণ। একটা নারীর মাতৃত্বের সম্ভাবনাকে প্রশ্ন করতে গিয়ে তার বয়স, শরীর, যৌনতা, ভবিষ্যৎ— সব কিছুর হিসেব কষে ফেলে। শুধু একটা হিসেব কষে না— সে নিজে কী চায়। অথচ একটু পিছনে তাকালেই দেখা যায়, আমাদের আগের প্রজন্মের সংসারে বয়সের এই অঙ্কটা মোটেই এমন ছিল না। ষোলো-সতেরো থেকে সন্তান হওয়া শুরু হয়েছে, চল্লিশ পেরিয়েও হয়েছে। কারও বড় ছেলে আর ছোট মেয়ের বয়সের ব্যবধান কুড়ি-বাইশ-চব্বিশ বছর। একই বাড়িতে একদিকে নাতি, অন্যদিকে সদ্যোজাত শিশু। তখন কেউ ক্যালকুলেটর নিয়ে বসেনি— ‘বাচ্চাটা আঠারো হলে মায়ের বয়স কত হবে?’

তখন ব্যাপারটা স্বাভাবিক ছিল। এখন অস্বাভাবিক। কেন? কারণ তখন সন্তান ছিল জীবনের স্বাভাবিক গতির অংশ। এখন সন্তান পরিকল্পিত। আগে তিন-চার-পাঁচটি সন্তান হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। এখন একটি বা দু’টি। ফলে চল্লিশের পর একটি সন্তান এলেই সেটি আলাদা করে চোখে পড়ে। যেন সমাজের সাজানো ছবির ফ্রেমে কেউ হঠাৎ অন্য রং ঢেলে দিয়েছে। আর সেই নারী যদি চাকরি করেন, নিজের কেরিয়ারকে গুরুত্ব দেন, নিজের জীবনটাকে নিজের মতো করে সাজাতে চান— তাহলে তো কথাই নেই। চল্লিশের পর মা হয়েছেন? মহা পাপ!

অদ্ভুত ব্যাপার, একজন পুরুষ চল্লিশ-পঞ্চাশে বাবা হলে আমরা বেশ খুশি হই। ‘বয়স হয়েছে, এখন একটু সেটল্‌ড।’ কেউ কেউ তো বলেন, ‘এই বয়সে বাবা হলে বাচ্চাকে ভালভাবে মানুষ করা যায়।’ কিন্তু একজন নারী একই বয়সে মা হলে— ‘এতদিন কী করছিলেন?’ কী আশ্চর্য! পুরুষের বয়স অভিজ্ঞতা, নারীর বয়স অপরাধ। কেরিয়ারমনস্ক নারী হলে অপরাধটা আরও গুরুতর। কারণ তিনি এতদিন নিজের জীবনটাও বাঁচলেন, কাজও করলেন, নিজের পরিচয়ও তৈরি করলেন, টাকাও রোজগার করলেন— তারপর আবার মা হওয়ার আনন্দটাও পেয়ে গেলেন। এ যেন একসঙ্গে দুটো পুরস্কার জিতে ফেলা। আর সমাজের ঠিক তখনই গা-জ্বালানি শুরু হয়। ‘কেমন ভাগ্য দ্যাখ, জীবনের সবটা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিল।’ এই ‘সবই পেয়ে যাওয়া’ ব্যাপারটাই বোধহয় সবচেয়ে অসহ্য।

অবশ্য কেরিয়ারমনস্ক মেয়েরা চল্লিশে পৌঁছে হঠাৎ অফিসে অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলে, পদোন্নতি আটকে গেলে, নতুন চাকরি না পেলে, তাঁদের বয়স নিয়ে ঠাট্টা হলে— সেই রাজনীতিটা আমরা একটু চুপ করে দেখি। কিন্তু সেই নারী যদি সেই বয়সেই মা হয়ে যান, তখন হঠাৎ সবাই তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ি। বাচ্চাটাকে মানুষ করবে কী করে— এই দুশ্চিন্তায় সমাজের ঘুম উড়ে যায়। মায়ের নিজের ঘুম উড়ছে কি না, সেটা অবশ্য কেউ জিজ্ঞেস করে না। কারণ আসল অস্বস্তিটা হয়তো আরও অন্য জায়গায়। একজন নারী চল্লিশের পরেও যে যৌন মানুষ— এই সত্যিটা সমাজ এখনও খুব একটা পছন্দ করে না।

বিয়ের পর সন্তান না হলে আমরা প্রশ্ন করি— ‘বাচ্চা কবে?’ কিন্তু সেই সন্তান আসার জন্য যে যৌন সম্পর্কের প্রয়োজন, সেই কথাটা উচ্চারণ করলেই যেন ঘরে হঠাৎ বাতাস বন্ধ হয়ে যায়। বউ যৌনতা করবে— ঠিক আছে, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত। তারপর? তারপর তার শরীর যেন সরকারি সম্পত্তি— ব্যবহার বন্ধ, ইচ্ছা বন্ধ, আকাঙ্ক্ষা বন্ধ। পঞ্চাশে পৌঁছে একজন নারী প্রেম করতে পারেন, শরীরের আনন্দ পেতে পারেন, সন্তান ধারণ করতে পারেন— এই স্বাভাবিক সত্যিটাই যেন সবচেয়ে অস্বাভাবিক।

‘বধাই হো’ সিনেমার কথা তাই মনে পড়ে। প্রায় পঞ্চাশের একজন নারী গর্ভবতী হয়েছেন— এই খবরেই পরিবারে যেন ভূমিকম্প। বিয়ের পর থেকে যে-শাশুড়ি বউকে ‘বাচ্চা কবে?’ বলে তাড়া দিয়েছেন, সেই তিনিই পরে ছিছিক্কার করছেন। কেন? কারণ বয়স হয়ে গেছে। অর্থাৎ সন্তান চাই, কিন্তু যৌনতা চাই না। মাতৃত্ব চাই, কিন্তু নারীর শরীরের ইচ্ছা চাই না। বউ চাই, মা চাই, দিদিমা চাই— শুধু নারীটাকে চাই না। এই জায়গাটাই সবচেয়ে নির্মম।

আর যে-নারী এই বয়সে মা হলেন, তাঁর কষ্ট কি নেই? অবশ্যই আছে। হয়তো সত্যিই তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। হয়তো ছোট্ট শিশুটির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠবেন। হয়তো কোনও-কোনও রাতে মনে হবে— ইশ, আর একটু আগে যদি এই সন্তানটা আসত! হয়তো শিশুটির সঙ্গে বয়সের ফারাক দেখে তাঁর নিজেরই মন খারাপ হবে। এই ভয়, এই অপরাধবোধ, এই অনিশ্চয়তা— সব কিছু নিয়েই তো তিনি মা হয়েছেন!

তার ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি হাতে কাঁটা নিয়ে। ‘এই বয়সে?’ ‘বাচ্চাটার ভবিষ্যৎ কী?’ ‘এতদিন অপেক্ষা করলেন কেন?’ ‘নিজের কথা ভাবলেন, এখন বাচ্চার কথা ভাবছেন?’ কী অদ্ভুত! একজন মা নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে যতটা ভয় পান, সমাজ তাকে তার চেয়েও বেশি ভয় দেখায়। আর সবচেয়ে বড় কথা— একজন নারী কখন মা হবেন, সেটা নিয়ে আমাদের এত মাথাব্যথা কেন?

শিশুটির সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। মায়ের শরীর নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তব কথাও আছে। বয়স বাড়লে গর্ভধারণে কিছু ঝুঁকি বাড়ে— সেটা অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু চিকিৎসার প্রশ্ন আর সামাজিক নৈতিকতার প্রশ্ন এক জিনিস নয়। ডাক্তার যদি বলেন ঝুঁকি আছে, সেটা তথ্য। পাড়া যদি বলে, ‘এই বয়সে আবার!’— সেটা বিচার। দুটোকে গুলিয়ে ফেললেই বিপদ। কারণ তখন আমরা মায়ের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলছি না। আমরা আসলে তাঁর চরিত্র, তাঁর বয়স, তাঁর যৌনতা এবং তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর পাহারা বসাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত শিশুটাকে মানুষ করবেন তাঁর বাবা-মা। হয়তো তাঁরা পারবেন, হয়তো পারবেন না। হয়তো বয়স তাঁদের জন্য কঠিন হবে। হয়তো আরও সাহায্য লাগবে। হয়তো দাদা-দিদা, বন্ধু, আত্মীয়, সমাজ— সবাই মিলে পাশে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু সাহায্য আর অপমান এক জিনিস নয়।

একজন মাঝবয়সি মা-কে যদি সত্যিই সাহায্য করতে চাই, তবে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলি— ‘কীভাবে পাশে থাকতে পারি?’ ‘এই বয়সে বাচ্চা কেন?’— এটা না। কারণ বয়সটা তাঁর। শরীরটা তাঁর। সিদ্ধান্তটাও তাঁর। আর সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর মাতৃত্বকে বৈধতা দেওয়ার জন্য আমাদের অনুমতিপত্রের কোনও প্রয়োজন নেই। আমাদের শুধু একটা জিনিস মনে রাখা দরকার— মাতৃত্বের একটা বয়স থাকতে পারে, কিন্তু একজন নারীর মানুষ হয়ে থাকার বয়সসীমা নেই। তাঁর ইচ্ছে বুড়ো হয় না এত সহজে। তাঁর শরীরের গল্পও ক্যালেন্ডারের পাতায় শেষ হয়ে যায় না। আর সমাজ যতই মুখ কুঁচকে বলুক, ‘এই বয়সে?’ জীবন খুব শান্ত গলায় উত্তর দেয়— ‘হ্যাঁ, এই বয়সেও।’