পাটিগণিতের মজা
দাদুর কাছে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক শিখতাম। অঙ্কে ছিল দারুণ মাথা। পাটিগণিত, বিশেষ করে যাদব চক্রবর্তী ও কেশব নাগের বই ছিল আমাদের সম্বল। একটা বাড়ি তৈরি করার জন্য ১০০ শ্রমিককে নিযুক্ত করা হল। কিছুদিন পর বেশ ক’জন কাজটা ছেড়ে দিল, এবার নতুন নিয়োগ হল, ওদের শতকরা ২০ টাকা বেশি মজুরি দিতে হল। বাড়ি তৈরিতে মোট এত টাকা খরচ হয়েছিল। কতজন শ্রমিক তাহলে মাঝপথে কাজ ছেড়ে দিয়েছিল? ওরেব্বাপ! কীসব বিদঘুটে চিন্তা করতেন ওঁরা। একটা রেলগাড়ি পাটনা থেকে এতটার সময়ে হাওড়ার উদ্দেশে ছাড়ল ঘণ্টায় গড়ে এত মাইল বেগে। অন্য একটি গাড়ি হাওড়া থেকে একই সময়ে ছাড়ল ঘণ্টায় এত মাইল বেগে। কোনও ট্রেন কোথাও থামবে না। হাওড়া থেকে পাটনার দূরত্ব এত মাইল। কোথাও কি ট্রেনদু’টি পরস্পরকে অতিক্রম করবে? চৌবাচ্চায় ফুটো করে দিচ্ছে, বাঁশ বেয়ে বাঁদর উপরে উঠছে, আবার ফুস করে স্লিপ করে নীচে পড়ে যাচ্ছে, একটা বর্গক্ষেত্রের ভেতরে একটা পুকুর তৈরি হচ্ছে, বাকি জমিতে ঘাস লাগানো হচ্ছে, প্রতি বর্গফুট ঘাস লাগানোর খরচ এত হলে কত খরচ পড়বে, গোয়ালারা দুধে জল মেশাচ্ছে ইত্যাদি-ইত্যাদি।
দুধে জল মেশানোর প্রসঙ্গে মনে হল, এলোমেলো ক’টি কথা। অঙ্কের বইয়ে দুধে জল মেশানোর কথা থাকত অনায়াসে। শিক্ষক-ছাত্র-অভিভাবক সহজভাবেই গ্রহণ করতেন। কারণ এটা তো নিয়মই! আবার মজুরিঘটিত অঙ্কে নারীর মজুরি পুরুষের অর্ধেক, বালকের মজুরি আরও কম— এইসব অঙ্কের প্রশ্নের মধ্যেও একটা সমাজচিত্র পাওয়া যেত। শিশুশ্রম যে প্রচলিত ছিল, চালে যে কাঁকড় মেশানো হত, দুধে জল যে মেশানো হত— এবং এগুলো সামাজিকভাবে গৃহীতই ছিল, তা মোটামুটি বোঝা যেত এই প্রশ্নগুলো থেকে। আরও অনেক আগেকার কোনও শিক্ষাক্ষেত্রে দাসব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আসত নির্ঘাত।
এই লেখা যখন লেখা হচ্ছে, দেখেছি, চারপাশে চাকরি কেনাবেচা চলছে। ভুয়া শিক্ষক, ভুয়া চিকিৎসক এমনকী, ভুয়া প্রশাসনিক কর্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে। মন্ত্রীরা নানাভাবে টাকা রোজগার করতে পারেন। এমন অঙ্কও হয়তো ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে, যেখানে থাকবে, একজন এত টাকার বিনিময়ে একটি চাকরি জোগাড় করল, সেই টাকা জোগাড় করার জন্য এত টাকা ধার করল। মাসে-মাসে সুদ এবং আসল মিলে এত টাকা দিতে হয়। তাঁর মাসিক বেতন এত হলে প্রকৃত আয় কত?
দাদুর কাছে পাটিগণিত করার মজাই ছিল আলাদা। কঠিন-কঠিন অঙ্কগুলো যখন উত্তরে মিলত না, দাদু টেনে নস্যি নিতেন আর-একবার। ‘র, র! উত্তর মিলতেই হইব! অঙ্ক না হইয়া যাইব কই?’ আবার নতুন করে ভাবতে বসতেন, আবার নতুন করে করতেন। কাগজ নষ্ট হচ্ছে, এমন একটা অপরাধবোধও ছিল। গত বছরের ক্যালেন্ডারের পিছনের সাদাটাও ব্যবহার করতেন।
দাদুর কাছে পাটিগণিত করার মজাই ছিল আলাদা। কঠিন-কঠিন অঙ্কগুলো যখন উত্তরে মিলত না, দাদু টেনে নস্যি নিতেন আর-একবার। ‘র, র! উত্তর মিলতেই হইব! অঙ্ক না হইয়া যাইব কই?’ আবার নতুন করে ভাবতে বসতেন, আবার নতুন করে করতেন। কাগজ নষ্ট হচ্ছে, এমন একটা অপরাধবোধও ছিল। গত বছরের ক্যালেন্ডারের পিছনের সাদাটাও ব্যবহার করতেন। হনুমানের বুক-মাথা, হাত-পা টুকরো-টুকরো করে কাটা হত কাঁচি দিয়ে। ‘হনুমান’ বললে কেউ রাগ করতে পারেন, আসলে হালখাতায় তো আসত, তাতে চৈতন্য-কালী-গণেশ বা বুক চিরে রাম-সীতার ছবি দেখানো হনুমানরাই থাকতেন। আর পিসেমশাইয়ের কালির বড়ি কোম্পানি খুব বুদ্ধদেবের ছবিওয়ালা ক্যালেন্ডার করত, কারণ কালির বড়ি বর্মাদেশে খুব চলত, আর ওই দেশের প্রায় সবাই বৌদ্ধ। এই ক্যালেন্ডার কিছু পড়ে থাকত, এগুলো দিয়ে বইয়ের মলাট হত। বারো মাসে বারোটা পাতার উলটোদিকগুলো এইসব কাজেই ব্যবহার হত। সে ধোপার হিসেব হোক বা মুদি দোকানের ফর্দ এবং পাটিগণিতের অঙ্ক-প্রচেষ্টা।
জটিল কোনও অঙ্কের সমাধানসূত্র পেয়ে গেলে দাদু দু’আঙুলে একটা তুড়ি বাজাতেন, তারপর বলতেন, ‘দে দেখি খাতাখান।’ এইবারে অঙ্কখাতাটা নিয়ে করে দিতেন স্টেপ বাই স্টেপ। অঙ্ক কষার সময়ে দাদু ঠোঁটের ওপর অন্য ঠোঁট টিপে রাখতেন, রন্ধনবিলাসীরা মাংস কষানোর সময়ে যেমন ওষ্ঠমুদ্রা করে রাখেন। কোনও অঙ্ক শেষপর্যন্ত না মিলিয়ে ছাড়তেন না। এমনও হয়েছে, সকালে অঙ্কটা দিয়েছি। পিতার বয়স ও দুই সন্তানের বয়সের গড় এত। পাঁচ বৎসর পূর্বে গড় ছিল পিতা ও দুই সন্তানের বয়সের অনুপাত, ৪:২:১। দশ বৎসর পরে তিনজনের গড় বয়স কত? এই ধরনের অঙ্ক। সকালে হল না, দুপুরের আহারে মন নেই, বিকেলে তুড়ি বাজবে। এই তুড়ির মানে ইউরেকা, অঙ্ক হয়ে গেছে।




