আমার দাদু
আমার দাদুর নাম কৃষ্ণকমল চক্রবর্তী। দাদু মানে, আমার পিতামহ। আমার ‘চতুষ্পাঠী’ উপন্যাসে বিলু নামে যে চরিত্রটি আছে, সে কিন্তু আমি নই ঠিক, বরং বলা যায় বিলু হল না-হওয়া আমি। বিলুর চিন্তাভাবনার সঙ্গে আমার মিল আছে অনেকটাই। আর বিলুর দাদু অনঙ্গমোহন কিন্তু কৃষ্ণকমল নয়। অনঙ্গমোহনের সঙ্গে কৃষ্ণকমলের সামান্যই মিল আছে। অনঙ্গমোহন সম্পূর্ণ কল্পিত চরিত্র। ‘জলের ওপর পানি’-তে আবার অনঙ্গমোহন অনেকটা জুড়ে আছে। আমি কোথাও অনঙ্গমোহনের চেহারার বর্ণনা দিইনি, তবে লেখার সময়ে ওর যে-ছবিটা দেখতাম, তাতে উনি লম্বা, সোজা, টানটান শিরদাঁড়া, গৌরবর্ণ, উসকোখুসকো চুল।
আমার দাদু খুবই সুপুরুষ ছিলেন। খুব ফর্সা রং, খুব লম্বা নয়, কোনওদিন তো মাপার দরকার হয়নি, তবে আমার বাবার মতোই লম্বা ছিলেন। বাবা ছিলেন পাঁচ ফুট আট। আমি বাবার তুলনায় দেড় ইঞ্চি বেঁটে। আমার বাবাও দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। আমার দাদুর খুব বেশি ছবি নেই। পিসেমশাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া কোডাক বক্স ক্যামেরায় দু’চারটে ছবি উঠিয়েছিলাম, দাদুর বৃদ্ধ বয়সে। সেই সব ছবির চিহ্নমাত্র নেই। দাদুর ছবি আমার স্মৃতিতেই আছে। আমার স্মৃতিলুপ্তির পর, বা আমার নিজের লুপ্তির পর, দাদুর কোনও ছবি থাকবে না।
দাদু ধুতিই পরতেন। এবং ধুতির কাছা থাকত। কখনও ভাঁজ করে লুঙ্গির মতো গিঁট দিয়ে পরতে দেখেছি। দাদু সাধারণত খালি গায়েই থাকতেন। শীতকালে গেঞ্জি পরতেন। গোল গলা এবং হাতাসমেত। সঙ্গে চাদরও পরতেন। বাইরে বের হলে পাঞ্জাবি। কখনও-বা হাফ হাতা। পোশাক-আশাক বেশি ছিল না। পেনশন আনার দিন দাদু বেশ সেজেগুজেই যেতেন। সেদিন শার্ট পরতেন কলারওয়ালা। দাদুর দুটোমাত্র শার্টই দেখেছি। সাদা আর ঘিয়ে রঙের। ধুতির ওপরে শার্ট পরার পর চাদর ছাড়াও শীতকালে একটা কোটও পরতে দেখেছি কখনও-কখনও। পায়ে পাম্প শু।
মনের কথা চিঠিতে লিখবা, বলেছিলেন দাদু!
পড়ুন ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ২৯…
গ্যালিফ স্ট্রিট ট্রামডিপো থেকে ট্রামে উঠে ডালহৌসি যেতেন। সকাল-সকাল ভাত খেয়ে চলে যেতেন, ফিরতে-ফিরতে বিকেল। পেনশন ছিল ৩৩ টাকা ১২ আনা। দাদুর হিসেবের খাতায় দেখতাম লেখা থাকত, ‘পেনশন বাবদ ৩৩ টাকা ১২ আনার মধ্যে নিজ খাইখরচ বাবদ জমা ১৮ টাকা।’ আর বাকি থাকত ১৫ টাকা ১২ আনা। এই টাকার মধ্যে নিজের নস্যি, তালমিছরি, আমাদের জন্য মাসে একবার (পেনশনের দিন বিকেলে) চমচম বা দানাদার নিয়ে আসা, চিৎপুর যাওয়ার ট্রামভাড়া, নিজের গামছা, নিজের ‘ফেরি’ হওয়ার সাবান এবং ব্লেড— এইসব হাতখরচা। এটা পাঁচ/ছয় দশকের কথা। তখন তো ডিএ ইত্যাদি ছিল না। পেনশন বাড়ত না। দাদুর ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মৃত্যু হয়। শুনেছি, ৯১ বছর বয়স হয়েছিল। ১৯৫১ সালের অগাস্ট মাসে জন্ম আমার, ১৯৫৭ থেকে স্মৃতি আছে ধরে নিচ্ছি। তাহলে ১৬ বছরের দাদুর সংসর্গের স্মৃতি জমা আছে। কিশোর বয়সে এই কথাটা খুব লিখতাম, ‘মনের মণিকোঠায়’। এখন লিখতে একটু ইয়ে হয়।
অনেক ছবি, অনেক কথা মনে গাঁথা আছে। এমনকী দাদুর কথা মনে এলে, দাদুর নস্যি-নস্যি গায়ের গন্ধটাও পাই। আমাদের গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়ির চুনকাম-খসে-যাওয়া দেওয়ালে একটা কাচ-বাঁধানো মানপত্র ঝোলানো ছিল। লেখা ছিল, ফরিদপুর জি টি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মান্যবর কৃষ্ণকমল চক্রবর্তীকে বিদায় সংবর্ধনা। দুই কলমব্যাপী অমিত্রাক্ষর ছন্দে বিরচিত কবিতাটার একটি লাইনও আজ আর মনে নেই। বাঁধানো অবস্থাতেই ওই কাগজটা পোকায় খেয়ে ঝুরঝুরে করে দিয়েছিল। তবে যেহেতু দাদুর সঙ্গে অনেক কথা হত, তাই জেনেছিলাম, জি টি স্কুল মানে, গুরু ট্রেনিং স্কুল। পাঠাশালার পড়ুয়াদের যাঁরা পড়াতেন, তাঁদের ‘গুরুসয়’ বলা হত। গুরুমশায়ের ডাকনাম।
ছোটবেলায় বাগবাজারের কাশিমবাজার স্কুলের মানিকবাবু স্যার, যিনি ব্রতচারী শেখাতেন, সেই তিনি বলেছিলেন, ‘এই ব্রতচারীর গানগুলো কার লেখা জানিস? গুরুসয় দত্ত।’ আরও বড় বয়সে জেনেছিলাম, উনি গুরুসদয় দত্ত। বড় মাপের সিভিল সার্ভেন্ট ছিলেন, ব্রতচারী আন্দোলন তাঁরই মাথা থেকে এসেছিল, ছোটবেলা থেকেই খেলার ছলে ব্যায়াম ইত্যাদির মাধ্যমে দেশাত্মবোধ জাগানোর ভাবনা ছিল তাঁর মনে। লোকসংস্কৃতির সংগ্রাহক ও গবেষক ছিলেন। আমার কাছে ওঁর ‘চল কোদাল চালাই’ গানের সবেচেয় ভাললাগার জায়গাটা ছিল ‘পেটের খিদের জ্বালায়/খাব ক্ষীর আর মালাই।’

মানিকবাবু স্যারের স্মৃতিতে সেই ‘গুরুসয়’ শব্দটাই হয়তো লেগেছিল। যাই হোক, আমার পিতামহ ছিলেন ওই ‘গুরুসয়’-দের ট্রেনিং স্কুলের শিক্ষক, পরে প্রধান শিক্ষক হয়েছিলেন। ওই গুরু ট্রেনিং স্কুলটা ফরিদপুরে ছিল, উনি তাই ফরিদপুরেই থাকতেন। নিজের বাড়ি করেননি সম্ভবত, যদিও পাকা বাড়িতেই থাকতেন। নোয়াখালি জেলার দত্তপাড়া গ্রামে দাদুর জন্ম; আমার বাবা, দুই পিসিরও। ছোট পিসি এবং কাকাদের জন্ম আবার ফরিদপুরে। কারণ কাকাদের কাছে নোয়াখালির কথা শুনিনি। ফরিদপুরের কথাই শুনেছি। অবশ্য মেজ কাকাকে তো খুব শৈশবেই হারিয়েছিলাম।
আমাদের বাড়িতে ছোট পিসির এক বান্ধবী আসতেন প্রায়শই, তার নাম শান্তিসুধা। ছোট পিসির বালিকাকালের বান্ধবী। আর একজন ফরিদপুরের প্রতিবেশী ছিলেন, অর্শের চিকিৎসক। একবার দাদুর সঙ্গে নবদ্বীপে গিয়েছিলাম। এক রাত ছিলাম। ওঁর সঙ্গে সেখানে দাদুর দেখা হয়েছিল। ওখানে দু’জনের কথায় বার বার গোপাল ঘোষের দই, বাগাটের রাজকুমার— এইসব কথা চলে এসেছিল। রাজকুমার মানে, আসলে এক ধরনের মিষ্টি। সেটা বুঝেছিলাম যখন, ওঁরা বলছিলেন, ‘রাজকুমাররে দুধের সরে মাখাইলে বড় বেশি ভাল। সেইরকম মিষ্টি এই ধারে তো দ্যাখলাম না।’ আজও অবশ্য জানি না, রাজকুমার কী ধরনের মিষ্টি। দাদুর অর্শরোগের সমস্যা ওই ফরিদপুরি আড্ডাতেই উপশম হয়ে গেল কি না জানি না, কারণ পরে দাদুর ওই রোগের কথা বিশেষ শুনিনি।


আমার হাতেখড়ি দাদুই দিয়েছিলেন। সে-কথা আগে লিখেছি। হাতেখড়ির ভাল নাম ‘বিদ্যারম্ভ’। দাদু বলতেন, ‘তিনুরে আমি বিদ্যারম্ভ করাইসি, তোরেও করাইসি। তিনুর মতো হওয়া চাই।’ তিনি মানে আমার অকালপ্রয়াত কাকামণি। দাদুর কাছে হাতেখড়ি নেওয়ার আগেই আমি অক্ষর চিনেছিলাম। ‘আদর্শ লিপি’ নামে বইটার কথা মনে পড়ে। বাবা এনে দিয়েছিল, কিন্তু লেখা শেখানো হয়নি। ‘বিদ্যারম্ভের পূর্বে লিখা নিষেধ’। দাদুর বিধি। আমি তো ইস্কুলেই ভর্তি হয়েছি ক্লাস থ্রি-তে। এবিসিডি ছিল ক্লাস ফাইভ থেকে। বামফ্রন্ট সরকারকে সমালোচনা করে বলা হয়, বামফ্রন্ট প্রাথমিক থেকে ইংরেজি উঠিয়ে দিয়েছে। আমার স্কুলে ভর্তি কংগ্রেস আমলে। তখন তো ক্লাস থ্রি-তে ইংরেজি ছিল না। ব্রিটিশ আমলে অবশ্য প্রাথমিকে ইংরেজি ছিল। পাঠশালায় ছড়া-টড়ার মাধ্যমে ইংরেজি শেখানো হত। যেমন, ‘পমকিন লাউকুমড়া কোকোম্বার শসা/ব্রিঞ্জল বার্তাকু প্লোমেন চাষা।’ দাদুও আমাকে এই ধরনের ছড়া মুখস্ত করিয়েছিলেন। মনে পড়ছে, ‘লঙ্কা চিলি, সুগার চিনি, সল্ট হয় লবণ, দুধ মিল্ক, কার্ড হয় দই হয় যখন। এইবার ঘোল কী কইর্যা হয়? দই চিনি লবণ, ইংরিজিতে কার্ড সুগার অ্যান্ড সল্ট। বুঝলা?’ এইভাবে ইংরেজি শব্দ শেখাতেন ঠিকই, অনেক বাংলা শব্দের ইংরেজি ছোটবেলায় জেনেছি, কিন্তু মাখনকে বাটার বলতে শিখিনি, চিনিকেও সুগার নয়। কেউ বলত না। যেসব বড়লোকরা পাঁউরুটিতে মাখন লাগিয়ে খেত, তারা ‘টোস্ট’ বলত বটে, তবে বাটার টোস্ট না বলে মাখন টোস্টই বলত।
‘আদর্শ লিপি’ আর ‘ধারাপাত’ এগুলো ছিল আমাদের প্রথম বই, বাড়িতে শিক্ষার জন্য। ‘কিশলয়’ বইটি স্কুলে ভর্তি হয়ে পেয়েছিলাম, আর ‘প্রাথমিক গণিত’। ‘হাসিখুশি’ পড়ে পেয়েছি মনে হয়। ‘ধারাপাত’-এ এক কড়া পোয়া গণ্ডা, দুই কড়ায় আধা গণ্ডা লেখা থাকত, যদিও গণ্ডা-র মানে জানতাম। চার কড়ায় এক গণ্ডা হত, আবার কুড়ি গণ্ডায় হত এক পণ। কলার কাঁদি পণ হিসেবে পাইকারি কেনাবেচা হত। এক পণ মানে আশিটা। চাকরি করতে গিয়ে আদিবাসী অঞ্চলের হাটে দেখেছি, গ্রাম্য মেয়েরা কুড়ির বেশি গুনতে পারে না। চারটে করে ভাগায় পেঁপে বা পেয়ারা বিক্রি করে। পাঁচ ভাগায় এক কুড়ি। আবার পয়সার হিসেবেও কড়া আছে। কড়া মানে কড়ি। তিন ক্রান্তিতে এক কড়ি বা কড়া। ষোল আনা বা পণে এক টাকা। তার মানে এক টাকা অতীব দামি ছিল ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে। পাই এবং পয়সা এসেছে আরও পরে। গণ্ডা-র অবলুপ্তির পর পাই, তিন পাইতে এক পয়সা।
‘তোমার কোনও ঋণ আমি রাখব না, কড়ায়-গণ্ডায় মিটিয়ে দেব’— এইসব কথা সেই পুরনো দিনের অবচৈতনিক রোমন্থন। আবার ‘কড়া-ক্রান্তিতে প্রতিশোধ নেব’-র আধুনিক সংস্করণ হচ্ছে ‘ইঞ্চিতে-ইঞ্চিতে শোধ তুলব।’ আমাদের সেই লাল মলাটের ‘ধারাপাত’-এ ‘শুভঙ্করী আর্য্যা’ও ছিল। মনে আছে আজও। তবে ‘আদর্শ লিপি’ বইয়ের শেষে ইংরেজি শেখানোর ছড়া পেয়েছিলাম। এখনও বইটা পাওয়া যায় কিন্তু এইসব সংস্করণে ইংরেজি-শেখানো ছড়ারা অনুপস্থিত।




