কলকাতা বেতার ১০০

১৯২৭-এর ২৬ অগাস্ট কলকাতায় নিয়মিত বেতার সম্প্রচার শুরু। সেই হিসেবে কলকাতা বেতারের শতবর্ষ শুরু হল। এই তারিখটা আমাদের কাছে বিশেষ গর্বের, কারণ অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর এখন ৯০ বছর, সেই হিসেবে কলকাতা বেতার তার থেকে ১০ বছরের বড়।

কলকাতা বেতার সম্প্রচারের সূচনা কিন্তু এই দিনে নয়। বরং এই দিনটি তার প্রথম সুনিশ্চিত পদক্ষেপ। ভারতে এবং ব্রিটেনে বেতারের সুদূর ও দৃঢ় বিস্তৃতির সময়কাল প্রায় একই, বিগত শতাব্দীর তৃতীয় দশক, মোটমাট বিশের দশকে। প্রাথমিক আবিষ্কারপর্ব তার আগের দশকেই, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বের প্রায় সব শক্তিধর রাষ্ট্রকেই জনমত নিয়ন্ত্রণ করার একটা অমিত সম্ভাবনা হিসেবে বেতারকে দেখতে প্রলুব্ধ করে। ব্রিটেনে ১৯২০ সালে কিছু-কিছু সংস্থাকে বেতার সম্প্রচারের ছাড়পত্র দেওয়া শুরু হয়। স্বাভাবিকভাবেই, মার্কনি সাহেবের সাহায্যধন্য কোম্পানিটি চটপট সাফল্য পায়। মার্কনি বিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি যথেষ্ট ব্যাবসাবুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন। ১৯২২-এ মার্কনি, জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি, মেট্রোপলিটন-ভিকার্স এবং আরও কোনও-কোনও সংস্থা মিলে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কোম্পানি তৈরি করে। তখন বেতার গ্রাহকযন্ত্র বাড়িতে রাখতে লাইসেন্স নিতে হত পোস্টমাস্টার জেনারেলের কাছে, নগদ কড়ি গুনে তা পুনর্নবীকরণও করতে হত (একটু বয়স্ক শ্রোতার হয়তো মনে করতে পারবেন, এই ব্যবস্থা বহুকাল পর্যন্ত ভারতেও চালু ছিল)।

বছর দুয়েকের মধ্যেই বিলেতে দশ লক্ষ মানুষ লাইসেন্স নেন। ১৯২৬ সালে ওই সংস্থা ভেঙে দিয়ে সরকারি, কিন্তু স্বায়ত্তশাসিত কর্পোরেশন গঠিত হয় রাজকীয় পরোয়ানায়। জন্ম নেয় ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন বা বিবিসি।

আকাশবাণীর আড্ডায় গান বাঁধতেন নজরুল, গান গাইতেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়!
লিখছেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী…

ভারতে, বিশেষত কলকাতায় তার বিকাশ অবশ্য প্রথমদিকে সরকারি আনুকূল্য পায়নি, কলোনি বলেই। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু সারস্বত-সাধনার চাঁদের হাট। প্রশাসনিক দায়িত্বে স্বয়ং ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, আর গবেষণা ও অধ্যাপনায় মেঘনাদ সাহা, সি ভি রমন, সত্যেন বসু। জগদীশচন্দ্র বসু ও মার্কনি— দুজনে কাছাকাছি সময়েই, সম্পূর্ণ ভিন্ন গবেষণায় তারের সংযোগ ছাড়াই শব্দ বা সিগনাল আদান-প্রদানের যন্ত্র আবিষ্কার করেন, বেতারের যা ভিত্তিভূমি। জগদীশচন্দ্র সামান্য আগেই, তবে ও-নিয়ে তিনি আর এগোননি, তাঁর আগ্রহ ও গবেষণা ভিন্ন পথের যাত্রী।

শিশিরকুমার মিত্র

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী গবেষক শিশিরকুমার মিত্র তখন প্যারিসে পাড়ি জমিয়েছেন গবেষণার ইচ্ছে নিয়ে। তাঁর হাতে পড়ল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-র সময়ে রেডিয়ো ভাল্‌ভের সাহায্যে খবর পাঠানোর চেষ্টার সাফল্যের কিছু রিপোর্ট। বিষয়টি তাঁকে নতুন গবেষণার ক্ষেত্রে হিসেবে অত্যন্ত আকৃষ্ট করল। ন্যান্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ ফিজিক্সের প্রফেসর গাটনের গবেষণাগারে যোগ দিলেন প্রশিক্ষণের জন্য। বেতারের ভাল্‌ভ ও তার সার্কিট নিয়ে সেখানে তখন নিরন্তর চর্চা। এর মধ্যে বিপুল সম্ভাবনা আঁচ করে শিশিরকুমার চিঠি লিখলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষকে। প্রস্তাব দিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের একটি বিষয় হিসেবে ওয়ারলেসকে যোগ করার।

খাস জহুরি আশুতোষ স্বোৎসাহে অনুমতি দিলেন, সঙ্গে আগাম জানিয়ে দিলেন গুরুতর আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও বিভাগীয় বিরোধিতার সম্ভাবনার সতর্কতা। একটি কম খরচের পরিকল্পনা পাঠাতে অনুরোধ জানিয়ে, জানালেন তিনি প্রতীক্ষায় থাকবেন শিশিরকুমারের ফিরে আসার। তিনি ফিরলেন ১৯১৬ সালের নভেম্বর মাসে। ইতিমধ্যে, পাশাপাশি, ১৯১২ সালে ব্রিটিশ নেভিগেশন কোম্পানির জাহাজগুলিতে বেতারযন্ত্র লাগানোর প্রতিরক্ষা-স্বার্থমূলক। একটি প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়ে ১৯১২ সালে মার্কনির কোম্পানি কলকাতার হেস্টিংস স্ট্রিটে একটি অফিস খোলে। ১৯১৮ সালে সেই অফিস সরে আসে কলকাতা হাইকোর্টের অদূরে টেম্পল চেম্বার্সে। ব্রডকাস্টিং-এর সম্ভাবনা হাতে-কলমে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ও তার জন্য বেছে নেওয়া হয় কলকাতাকেই।

১৯২২ সালের মে মাসে ইন্ডিয়ান স্টেট্‌স অ্যান্ড ইস্টার্স এজেন্সি লিমিটেডের কর্ণধার এফ ই রেশর ভারত সরকারকে চিঠি দিয়ে প্রস্তাব দেন, কলকাতায় একটি বেতারকেন্দ্র স্থাপনের। অনুমতি এল, এবং এই টেম্পল চেম্বার্সেই, ১৯২৩ সালে প্রথম ফাইভ এ এফ নামের খুবই কম শক্তির একটি ট্রান্সমিটার বসল। জে ব্রিগস এবং জে আর স্টেপলটন কলকাতার এই টেম্পল চেম্বার্স থেকেই ১৯২৩-এ সম্প্রচার শুরু করলেন। অবশ্য তা হয়তো ঠিক নিয়মিত বেতারকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি, কিন্তু শুরুটা ওই ঠিকানাতেই, এবং জে আর স্টেপলটন সাহেবের নেতৃত্বেই।

টেম্পল চেম্বার্সের সেই বাড়ি

এই সময়ে একটি রেডিয়ো ক্লাব তাঁরা গড়ে তোলেন, এবং তাতে নিবিড়ভাবে যুক্ত হল ড. শিশিরকুমার মিত্র। রেডিয়ো ক্লাব প্রতি সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করল। একটি পত্রিকাও বের করা শুরু হল, নাম ‘রেডিয়ো’। তাতে এই নতুন প্রযুক্তির নানা আশ্চর্য সম্ভাবনার কথা পাঠকদের জানানো হতে থাকল। এই সময়েই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রচেষ্টায় ড. মিত্র তাঁর গবেষণাগারে একটি ট্রান্সমিটার বসালেন। তার সম্প্রচার শুরুহয়েছিল শিল্পী হীরেন বসুর সংগীত দিয়ে। স্বল্প শক্তির ট্রান্সমিটার, তা-ও সে-যুগে বেতারের যাত্রাপথে অন্য কোনও তরঙ্গের বাধা ছিল না বলে, নলিনীকান্ত সরকার লিখে গেছেন যে, শিশিরকুমারের সম্প্রচার সুদূর বর্মা, আগ্রা, বারাণসীতেও শোনা যেত।

১৯২৪ সালের জুন মাসে আরও দু’টি রেডিয়ো ক্লাব তৈরি হয় তৎকালীন বম্বে ও মাদ্রাসে। প্রতিদিন আড়াই ঘণ্টা সম্প্রচার চলত। এইসব প্রচেষ্টা, বিশেষ করে কলকাতায় ড. শিশিরকুমার মিত্র-র বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি দ্রুতই বিবিসি-র দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ভারতের মতো বিস্তৃত সাম্রাজ্যে রেডিয়োর বিকাশের বিপুল সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দিকটি খতিয়ে দেখতে কলকাতায় এলেন বিবিসি-র সি সি ওয়ালিক। সেটা ১৯২৬ সাল। টেম্পল চেম্বার্সের বাড়িরই সর্বোচ্চ তলে স্থাপিত হল নতুন ট্রান্সমিটার, কর্ণধার পূর্বোক্ত জে আর স্টেপলটন সাহেব।

এই ছোট্ট জায়গাটি একটি নিয়মিত বেতারকেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিতান্তই অপ্রতুল। স্টেপলটনের পছন্দ হল, ডালহৌসি স্কোয়ারের কাছে, চার্চের শান্ত পরিবেশের ধারে ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসের ঐতিহাসিক বাড়ি। এখানে পুরোদস্তুর স্টুডিয়ো গড়ার কাজ শুরু হল।

১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসের পুরনো বাড়ি

ওদিকে বিবিসি ভারতে, শাসনযন্ত্রকে মজবুত করা, সরকারের পক্ষে জনমত তৈরি করা, সরকারি পছন্দসই সংবাদ পরিবেশনের সুযোগ, সম্ভাব্য ভবিষ্যতের যুদ্ধবিগ্রহ বা অন্তর্বিদ্রোহের জরুরি পরিস্থিতির সময়ে তার প্রয়োজনীয়তার বিপরীতে বাস্তবে তার বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার সম্ভাব্যতা বিষয়ে নিরন্তর চিন্তাভাবনা, মতবিনিময়, সরকারি স্তরে নানা রিপোর্ট তৈরি করার কাজ করছিল। এখানে নানা মতানৈক্যও ছিল। অন্যদিকে ক্রমশ মস্কো রেডিয়োর সম্প্রচার শক্তিশালী হয়ে উঠছিল, সেটাও ছিল ভাবনার বিষয়।

প্রাথমিকভাবে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড রিডিং-এর খুব একটা উৎসাহ না থাকায় বাস্তব অগ্রগতি তেমন হয়নি। তবে, পরীক্ষার সহজ পথ হিসেবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেতার বিস্তারের স্বপ্নে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছিল। এই সময়ে ১৯২৩ সালে, দুই পার্সি ব্যবসায়ী, আর এন চিনয় ও সুলতান চিনয় ইন্ডিয়ান রেডিয়ো টেলিগ্রাফ কোম্পানি নামক একটি সংস্থা খোলেন। মার্কনি-র কোম্পানির প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও জোগাড় করেন। ১৯২৪ সালের ২৫ জুলাই সংস্থাটি রেজিস্টার্ড হয় ও ১৯২৫-এ পুনাতে একটি ট্রান্সমিটার তৈরির কাজে হাত দেওয়া হয়।

এই কোম্পানিতে মার্কনি-র সংস্থার লগ্নীকৃত পুঁজিই বেশি, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। নতুন নাম, ‘ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি’ নামে সংস্থাটি রেজিস্টার্ড হয় ১৯২৬ সালের ১ জুলাই। তার পুঁজি তখন প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা।সে-যুগের হিসেবে বিশাল।১৯২৭ সালের ছ-লক্ষ টাকার শেয়ার ছাড়া হয়, বেশিটাই কেনেন রাজাসাহেব ধনরাজ গিরজি নরসিং গিরজি। মার্কনি-প্রযুক্তির পেটেন্ট হাতে থাকায় চিনয়-ভাইরা এখানে যুক্তই ছিলেন, ছিলেন বম্বের আরও কিছু ব্যবসায়ী।

এত কথা বলার উদ্দেশ্য এটাই যে, বম্বের সঙ্গে তখন কলকাতার বেতার বিষয়ে যে-লড়াই চলছিল, তাতে পুঁজির পাল্লা বহুগুণে ভারী ছিল বম্বের দিকে। উলটোদিকে, কলকাতায় কিছু বিলিতি, কিছু ভারতীয় স্বপ্নসন্ধানী, শুধু সৃষ্টি ও গবেষণার উৎসাহে ভর করে লড়ে যাচ্ছিল।

ফলে ফোটো ফিনিশে প্রথম হয়ে ১৯২৭ সালের ২৩ জুলাই, বম্বে শহরে বেতারকেন্দ্র তৈরি হল। মাত্র এক মাস তিনদিন পরে ১৯২৭ সালের ২৬ অগাস্ট ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসে খুলল বেতারকেন্দ্র। দিল্লি তখনও বেতার মানচিত্রের বহু বাইরে।

উদ্বোধনের দিনের অনুষ্ঠান ছিল ভারতীয়। সংগীতে ছিলেন আঙুরবালা, জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী ও দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাঁশি বাজিয়ে শোনান নৃপেনবাবু (মজুমদার)ও হাসির গান পরিবেশন করেন সীতাংশুজ্যোতি মুখোপাধ্যায়, তৎকালে ‘বকুবাবু’ বলে বিখ্যাত। বক্তৃতাও ছিল, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের। সংবাদ পরিবেশন করেন রাজেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। এঁর আরেকটি পরিচয় আছে। ইনি ১৯১১ সালে আইএফএ শিল্ড জয়ী মোহনবাগান দলের অন্যতম সদস্য।

১৯২৭ সালের ২৬ অগাস্ট এই কেন্দ্রের দ্বার উন্মোচন করেন বাংলার তৎকালীন গভর্নর, ছোটলাট স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসন। এই অনুষ্ঠানে বক্তব্যও রাখেন তিনি, এছাড়াও সামান্য কয়েকদিনের ব্যবধানে অগ্রজ বম্বে বেতারকেন্দ্রের ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিস্টার চিনয়। তখন প্রথম কেন্দ্র অধিকর্তা তখন প্রথম কেন্দ্র অধিকর্তা হয়েছিলেন, বিবিসি থেকে আসা সি সি ওয়ালিক‌।

এই বেতারকেন্দ্রের চলার পথ মসৃণ, নিষ্কণ্টক ছিল না। ব্যবসায়িকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া বেতারকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আবার একদল স্বপ্নময় তরুণ তুর্কি এগিয়ে এসে নিঃস্বার্থভাবেই একে বাঁচিয়ে রাখার, চালু রাখার ও জনপ্রিয় করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে।

শেষমেশ, প্রায় ডুবতে বসা সংস্থাটিকে অধিগ্রহণ করে বিবিসি, ১৯৩৫ সালের অগাস্টে। এর আগে ১৯৩০ সালের ১ এপ্রিল তারিখে বম্বের ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি অধিগৃহীত হয়, কারণ ১৯৩২ সালের পর থেকেই রেডিয়ো মস্কো ভারতের জনগণ শুনতে পাচ্ছেন। প্রথমে সরকারি বিচারে নাম রাখা হল ‘ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং সার্ভিস’, আইএসবিএস। বেতার ঘোষণায় তা খটমট, সৌন্দর্য বা আকর্ষণী ক্ষমতা নেই। শেষমেশ তৎকালীন কর্ণধার লায়োনেল ফিলডেনের দাবিমতো নাম রাখা হল— আর ইন্ডিয়া রেডিয়ো। সংক্ষেপে এআইআর‌।আজও সারা বিশ্বে লাইভ স্টুডিয়োর সম্প্রচার বোঝাতে এই নামটি ব্যবহার হয়। এরকম একটি মোক্ষম কয়েনেজের সুবিধে একমাত্র ভারতই পেয়েছে। সরকারি কর্তাদের বিপুল বাধা পেরিয়ে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগোকে লায়োনেল একটি ব্যাঙ্কোয়েটে সুকৌশলে রাজি করান ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’ নামটিতে অনুমোদন দিতে। একটি সিলমোহরও ডিজাইন করা হয়, যাতে AIR হরফগুলিভারতের ম্যাপের মধ্যে বসানো হয়। লিনলিথগো অবশ্য বরাবর ভেবেছেন, নামটি তাঁরই ভাবা, কৌশল ছিল এমনই চতুর।

আকাশবাণী ভবন

লায়োনেল ফিলডেন কিন্তু ১৯৩৫-১৯৪০ পর্যন্ত ভারতে থেকে মোট ১৪টি ট্রান্সমিটার স্থাপন করেন। কিন্তু এই সময়কালে মাত্র ৮৫০০০ শ্রোতা লাইসেন্স নেওয়ায়, এ-দেশ ছাড়ার সময়ে তিনি এটিকে নিজের সর্বকালের বৃহত্তম ব্যর্থতা বলে গেছেন।

কলকাতা বেতারকেন্দ্র কিন্তু কখনওই ব্যাবসায়িক ব্যর্থতাকে শেষ কথা প্রমাণ হতে দেয়নি। রাইচাঁদ বড়াল, দুনিচাঁদ বড়াল, দাদাঠাকুর, নলিনী সরকার, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, বাণীকুমার, পঙ্কজকুমার মল্লিককে দ্রুত আকর্ষণ করে এনেছে এই বেতারকেন্দ্রে। এঁদের প্রতিভা, প্রতিজ্ঞা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বেতারকে কলকাতার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পরিণত করেছে, যা অবিচ্ছেদ্য।

১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসের ঐতিহাসিক বাড়িটি আজ আর নেই। কালের নির্মোহ চলায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত সেনেট হলের মতোই, তা শুধু ছবি। ১৯৫৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো ‘আকাশবাণী’ হয়ে উঠে এসেছে বর্তমান ঠিকানায়, ইডেন গার্ডেন্সের পাশে। শতবর্ষে পা দিল কলকাতা বেতার। ‘আকাশবাণী’ নামের প্রচলন যদিও এক অন্য গল্প, যা আরেকদিন হবে।