সংবাদ মূলত কাব‍্য: পর্ব ৪৬

জরুরি অবস্থা, ব্যক্তিগত

অমৃতবাজার-এর ছেলেমেয়ে তিন-চারজন তাদের ডাক-পত্রিকার জন‍্য বিহার-ওড়িশার খবর বাছাবাছি করতে-করতে গল্পগাছা করছিল। আমি বললাম, ‘ইউএনআইয়ের মেশিন দেখ, ফ্ল্যাশ পাঠাচ্ছে, ইন্দিরা গান্ধীকে নাকি গুলি করেছে!’ অমৃতবাজারের ঢ‍্যাঙা ছেলেটি উঠে গিয়ে মেশিনের ক্রিড দেখে বলল, ‘ধুস, রিউমার বলছে।’ আমাদের এসব বলাবলির ভেতর ঘট ঘট বেজে উঠল পিটিআইয়েরও টেলিপ্রিন্টার, এবার কনফার্মড ফ্ল‍্যাশ নিউজ, গুলিবিদ্ধ ইন্দিরা গান্ধীকে এআইআইএমএস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর দু-চার মুহূর্তকালের ভেতর পিটিআইয়ের মেশিনে এপি-রয়টার্সের খবর আসতে লাগল— ইন্দিরা ইজ নো মোর…

ঘট ঘট, খট খট… প্রতি মুহূর্তে খবর আসতে লাগল প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে গুলি করেছিল তাঁর দুই দেহরক্ষী সতবন্ত সিং আর বিয়ন্ত সিং। সকাল সাড়ে ১০টার ভেতর রয়টার্স-এপি-বিদেশি সংবাদ সংস্থাগুলি বিবিসি সূত্রে খবর দিয়ে দিল, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিহত হয়েছেন। সঙ্গে-সঙ্গেই আমি অমিতাভ চৌধুরীকে আর দেবব্রত মুখোপাধ‍্যায়কে ফোন করলাম। ওঁরা জানালেন, অফিস রওনা হচ্ছেন তাঁরা। আমাকে টেলিগ্রাম বের করার জন‍্য প্রস্তুতি নিতে বললেন।

আরও পড়ুন: খলিস্তানি জঙ্গিদের হাতে বন্দি হয়ে কী ঘটেছিল রোমানিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে?
‘সংবাদ মূলত কাব‍্য’ পর্ব ৪৫…

সংবাদপত্রের টেলিগ্রাম বের করার বিষয়টি আমার জানা ছিল। ‘যুগান্তর’-এ আমার যোগ দেওয়ার স্বল্পকাল আগে পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টোর ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, বিমান ধ্বংস হয়ে মারা গিয়েছিলেন সঞ্জয় গান্ধী। তখন টেলিগ্রাম বেরিয়েছিল কলকাতার তিন-চারটি বাংলা-ইংরেজি সংবাদপত্রের। টেলিগ্রাম হল, সংবাদপত্রকে ভাঁজ করলে যে আকার হয়, সেই সাইজ। চার পাতার। ট‍্যাবলয়েড সাইজ বলে একে।

অফিসের ফোন ঘন-ঘন বাজছিল তখন। প্রথম ফোনটি এসেছিল প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর। রাজীব গান্ধী তখন ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সফরে। ওই সকালে, ওই সময়ে রাজীব ছিলেন কাঁথিতে জনসভায়। প্রিয়রঞ্জন ছিলেন তাঁর সঙ্গে। প্রিয়রঞ্জন ফোনে জানতে চান, যা শুনছি, তা কি সত‍্যি? আমি বলি, ‘হ‍্যাঁ, প্রিয়দা।’ ‘যুগান্তর’-এর উপেনদা, উপেন চক্রবর্তী ছিলেন ওখানে, তিনি আমাকে ফোনে জানিয়ে দেন, রাজীব বিমানে দিল্লি রওনা হয়ে গিয়েছেন। এরপর অগুনতি ফোন আসতে থাকে। অপারেটার আমাকে বলেন, ‘বড়সাহেব আপনাকে ফোন করেছেন, আপনি ধরুন।’

প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী

আমি জানতাম না বড়সাহেব কে। শুধিয়ে বসি, ‘কে বড়সাহেব?’ অপারেটার আমাকে ধমকের স্বরে বলেন, ‘তুষারবাবু!’ আমি ফোন ধরতেই তুষারকান্তি আমার পরিচয় জানতে চান, জানতে চান কী হয়েছে, এসব কী শুনছেন তিনি! আমি যে শিক্ষানবিশ নতুন সাব এডিটার, তা জানিয়ে বলি, দেহরক্ষীদের গুলিতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হয়েছেন। এই কয়েকটি কথা আমার মুখে শুনেই তুষারকান্তিবাবু আচমকা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি ইংরেজিটা বুঝতে পেরেছ তো?’ এ-প্রশ্নে আমি রেগে যাই। সঙ্গে-সঙ্গে হাতে-ধরা ফ্ল‍্যাশ নিউজের গোছাগুলি পড়তে শুরু করি। শুনতে-শুনতে তুষারবাবু ‘বুঝেছি’ বলে ফোন রেখে দেন। ওই একটি শব্দেই আমি বুঝতে পারি, তৎকালে ৮৬ বছর বয়সি মানুষটি ব‍্যথিত হয়েছেন।

ওইদিন অফিসে ঢোকার সময়েই দেখেছিলাম, গলির মুখে বাগবাজার স্ট্রিটে কংগ্রেসের একটি পথসভায়   ‘যুগান্তর’-এর সাব এডিটার শ‍্যামল দে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। শ‍্যামলদা ওই পাড়াতেই থাকতেন। শ‍্যামলদা বয়সে তরুণ, আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড় ছিলেন, কংগ্রেস রাজনীতি করতেন। আমি আমাদের সহযোগী, চতুর্থ শ্রেণির কর্মী নন্দকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে বলি, ‘যাও, এক্ষুনি শ‍্যামলদাকে ডেকে আনো।’ নন্দ ছুটে সিঁড়ি দিয়ে গলিতে নেমে যায়। অল্প সময়ের মধ‍্যে গলিতে প্রবল গোলযোগ শুরু হলে ব‍্যালকনিতে ছুটে গিয়ে দেখি, শ‍্যামলদা দৌড়তে-দৌড়তে আসছেন। তার পিছু-পিছু আসছে কংগ্রেসি বাগবাজার স্ট্রিটটি।

তুষারকান্তি ঘোষ

পথসভার লাউডস্পিকারে নন্দ-র দৌলতে সে-খবর ঘোষণা হয়ে গেছিল যে, ইন্দিরা গান্ধী দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। শরীর-মনের কোন আলোড়নজাত তৎপরতায় আরেক সহযোগী নরহরিকে আমি বলেছিলাম, ‘শ‍্যামলদাকে ঢুকিয়ে গ্রিল আটকে দাও।’ নরহরি আশ্চর্য দ্রুততায় তা হাসিল করে। দোতলায় নিউজ ডিপার্টমেন্টের লোহার গ্রিল পেরিয়ে ক্রন্দনরত শ‍্যামলদা মেঝেয় আছড়ে ড়া মাত্র নরহরি পেতলের ভারী-ভারী দুটি তালা গ্রিলে চাবি দিয়ে আটকে দেয়। গ্রিল ঝাঁকিয়ে বাগবাজার জনতা ভেতরে ঢুকতে দেওয়ার দাবি জানাতে থাকে। দারোয়ানরা ও নীচের তলার প্রেসের বলবান সহকর্মীরা তাদের ঠেলে, ধাক্কা দিয়ে, অলিগলিতে ফিরৎ পাঠায়। প্রেসের কালোসোনা নামের সহকর্মীটির দাপট সহর্ষে, এই এখন, মনে পড়ছে।

এই যে আমি এতটা লিখলাম, এসব কিন্তু মিনিট কয়েকের। সকাল ১০-২০ থেকে বড়জোর ১১টা তক। দ্রুত খবর লিখতে শুরু করি। চোখেমুখে জল দিয়ে শ‍্যামলদাও লিখতে থাকেন। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি সহজপাঠ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘সেই সব দিনরাত্রি যুগান্তর এবং আরও কিছু’ বইটিতে অধুনালুপ্ত সংবাদপত্রটির কথা সবিস্তারে লিখেছেন দেবব্রত মুখোপাধ‍্যায়, আমাদের দেবুদা, তৎকালীন বার্তা-সম্পাদক (পরে সংযুক্ত সম্পাদক)। সে বই থেকে উদ্ধৃতি দিতে আমার সংকোচ হচ্ছে।

ওইদিন সকালে ১০টার পর নিজের ১ নং সফদরজং রোডের বাসভবনে বাগানের ভেতরের পথ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কয়েকজন রক্ষী-সহ হেঁটে যাচ্ছিলেন ব্রিটিশ অভিনেতা ও চিত্রপরিচালক পিটার উস্তিনভের তথ‍্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দিতে। তখনই দুই দেহরক্ষী সতবন্ত সিং ও বিয়ন্ত সিং তাঁকে গুলি করে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ‍্যে তিনি মারা যান। ঘটনাস্থলেই অন‍্যান‍্য রক্ষীরা বিয়ন্ত সিংকে গুলি করে মারে। সতবন্ত সিং গ্রেপ্তার হয়। এই ষড়যন্ত্রে জড়িত কেহর সিং ধরা পড়ে যায়। অমৃতসরে সেনা অভিযান অপারেশন ব্লু স্টারের বদলাতেই ইন্দিরা-হত‍্যা।

দ্রুত লিখে ফেলি আমরা দুজনে। আমি খুব চটপট লিখতে পারতাম। মৃত‍্যুর সপ্তাহখানেক আগে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ওড়িশায় জনসভা করেছিলেন। সেই শেষ জনসভার বক্তৃতাও খুঁজে বের করে কম্পোজে পাঠিয়ে দিই। প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, নেতা, বিশিষ্টজনদের জীবনী— সব খবরের কাগজে লিখিত এবং ফাইলে রাখা থাকত। ইন্দিরা-জীবনীটিও কম্পোজে পাঠানো হয়। ইন্দিরা গান্ধীর অনেক ছবিও প্রেসে, ক‍্যামেরাঘরে পাঠানো হয়। নেহরুর সঙ্গে ইন্দিরার ছবি, দুই পুত্রের সঙ্গে ইন্দিরা, রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী—  এইসব ছবি। সাড়ে ১১টা নাগাদ অমিতদা (চৌধুরী), দেবুদা (দেবব্রত মুখোপাধ‍্যায়) পৌঁছন। আরও অনেকে পৌঁছে যান।  তখন টেলিগ্রাম ভরিয়ে ফেলার মতো কপি-ছবি প্রেস ও স্টুডিয়োয় পাঠানো হয়ে গেছে। পাইকপাড়া থেকে শ‍্যামদুলাল কুণ্ডু এসে চটজলদি ওই টেলিগ্রামের ডামি কপি সাজিয়ে দেন। এরপর সাড়ে ১২টার ভেতর ‘যুগান্তর’-এর টেলিগ্রাম ছাপা হয়ে যায়। তখনই ‘যুগান্তর’-এর টেলিগ্রাম শ‍্যামবাজার, অফিসপাড়া ধর্মতলা, এরপর হাওড়া, শিয়ালদা চলে যায়।

টেলিগ্রাম বেরনোর পর আমি আর শ‍্যামলদা সারা অফিস ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। মাঝে মাঝেই দূরের হইহই কানে আসছিল। তখন, ওই তখন, বড়রা, সাংবাদিকরা সকলে বলাবলি করছিলেন, ইন্দিরা মন্ত্রীসভার দু’নম্বর মন্ত্রী অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ‍্যায়কে নিয়ে। প্রণববাবুই প্রধানমন্ত্রী হবেন নাকি? কয়েক ঘণ্টার আশা যেন জেগেছিল বাংলায়। তবে ওই ৩১ অক্টোবরের রাতে কংগ্রেস পারিষদীয় দলের বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে রাজীব গান্ধী নেতা নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন।

সেদিন অফিসে সকালে ডাকের ডিউটির পর, এক্ষেত্রে ওই টেলিগ্রাম বের হয়ে যাওয়ার পর, বিকেল সাড়ে তিনটেয় আমার ছুটি হয়ে যাওয়ার কথা। তখন ‘যুগান্তর’-এর পরের দিনের কাগজের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। সে-সময়ে ‘যুগান্তর’-এ সবাই এসে গিয়েছেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসতেই আমি উসখুস করতে লাগলাম। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিল না। প্রতি মাসেই এই সকালের ডিউটির পর মাধবীর সঙ্গে আমার দেখা হত। ওদের বাড়ি দক্ষিণেশ্বরের ভেতরে আড়িয়াদহে। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় মাধবী ডানলপের মোড়ে এসে আমার জন্য অপেক্ষা করত। এরকম একটা দিন, অমিতদা-দেবুদা যদি আমাকে ছুটি না দেন, আটকে রাখেন পরের দিনের কাগজের জন‍্য? দুর্ভাবনা জাগল আমার। ডানলপে যাওয়া আমার খুব দরকার যে!

কাকুতি-মিনতি করে ছুটি পেতেই ডানলপ ছুটলাম। বাগবাজারে বাটার মোড়ে এসে দেখলাম শ‍্যামবাজারের মোড়ে থোকা-থোকা পুলিশ ও সেনা ঘুরছে। কোনও যানবাহন নেই। রাস্তা প্রায় নির্জন। বি টি রোডে কাচের টুকরো ছড়ানো, লরি-ট্রাক-গাড়ির কাচ। আমি শুনশান বি টি রোড ধরে ডানলপের দিকে হাঁটলাম। দেখলাম, মাঝে মাঝে সেনাদের গাড়ি যাচ্ছে শ‍্যামবাজারের দিকে। কাশীপুরের কাছে দেখলাম রাস্তায় টায়ার জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ‍্যালয়ের সামনে একটি দগ্ধ লরি। অলিগলিতে শোকগর্জনরত কংগ্রেসি মিছিলও দেখলাম এদিক-সেদিক। সিঁথি পৌঁছতে আমি সেনা পুলিশ-ঝাঁকটি স্থানীয় মানুষের কায়দায় ভেদ করে বরানগর বাজারের রাস্তা ধরে ভাস্করদার, ভাস্কর চক্রবর্তীর বাড়ি পৌঁছলাম। আমি ডানলপে মাধবীকে খুঁজতে যাচ্ছি শুনে ভাস্করদাও দ্রুত তৈরি হয়ে আমার সঙ্গী হলেন। যানবাহনহীন, জনশূন‍্য গোপাললাল ঠাকুর রোড ধরে ডানলপ মোড়ে পৌঁছলাম আমি ও ভাস্করদা। তখন সন্ধ‍্যা নেমে গেছে। পথের বাতিস্তম্ভগুলির অধিকাংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সারা রাস্তায় লরিট্রাকবাস-ভাঙা ছোট-বড়-মাঝারি কাচের টুকরো। এদিকে-সেদিকে গুচ্ছ-গুচ্ছ সেনা পুলিশ। ডানলপে গুরদোয়ারার দিক থেকে ধোঁয়া উঠছিল পাক খেয়ে। দমকলের ঘণ্টা শুনলাম। থমথমে ওই আলো-অন্ধকারে আমি ও ভাস্করদা মাধবীকে খুঁজতে লাগলাম।