সংবাদ মূলত কাব্য: পর্ব ৪৫

দ্রোহকাল

আগের পর্বে আমি ভারতের প্রথম স্বাধীন তাম্রলিপ্ত সরকারের সামরিক বিদ্যুৎবাহিনীর সর্বাধিনায়ক সুশীল ধাড়ার কথা লিখেছিলাম। মহিষাদলে শতবর্ষ ছুঁই-ছুঁই বয়সে তাঁকে দেখেছিলাম, কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম তাঁর শরীর-কাঠামোর বর্ণনা দিতে। বলব কী, হকচকিয়ে গিয়েছিলাম ওই বয়সে শায়িত মানুষটিক দেখে। দীর্ঘকায়, শতবর্ষ প্রাক্কালের অতিবৃদ্ধ মানুষটির সুদীর্ঘ হস্তদ্বয়, পা দু’খানি দেখে মনে হয়েছিল, তিনি তাঁর ১৯/২০ বয়সে ছিলেন চমক লাগিয়ে দেওয়ার মতো মহাযোদ্ধা। এমনি-এমনি তো বিদ্যুৎবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হননি তিনি। এবার শুধু প্রণাম নয়, এ-লেখায় প্রয়াত সুশীল ধাড়াকে সেল‍্যুট জানালাম আমি।

এই সেদিন একটি টেলিফোন পেলাম। নাম বললেন, ঋত্বিক মিত্র। পরিচয় দিতে স্নেহ জাগল, কাজলদার ছেলে। আবার ১৯৮২/’৮৩ সালে ফিরি। ওই সময়ে ‘যুগান্তর’-এ যোগ দিয়ে যে-অগ্রজদের স্নেহ পেলাম, কাজলদা, কাজল মিত্র তাঁদের অন‍্যতম। ‘যুগান্তর’-এ সিনিয়র সাব এডিটর ছিলেন। খুব অল্প কয়েক মাস কাজ করেছিলাম তাঁর সঙ্গে, কিন্তু স্মৃতিতে জ্বলজ্বল। পাইকপাড়ায় থাকতেন, বাগবাজারে ‘যুগান্তর’ অফিসের কাছেই। খুব রসিক, হাস‍্যোজ্জ্বল, ছটফটে, প্রাণবন্ত মানুষ ছিলেন। চটপট খবর লিখে চমকপ্রদ হেডিং করতেন। একবার বর্ধমান জেলা কী জানি কী কৃতিত্ব অর্জন করল, তা বর্ধমান জেলা হতে পারে, বর্ধমান বিশ্ববিদ‍্যালয় হতে পারে, বর্ধমানের কোনও কিছুর কৃতিত্ব। সে-খবরে কাজলদা হেডিং করলেন, ‘মান বাড়াল/বর্ধমান’।

আমাদের নাইট ডিউটিতে যে-চার/পাঁচজনের টিম ছিল, তাতে কাজলদাও ছিলেন। একদিন রাতের ডিউটির পর টেবিলে-টেবিলে আমরা ঘুমিয়ে ভোরে উঠে দেখলাম ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। চা-টা খাওয়ার পর কাজলদা বললেন, ‘আমার ছাতা আছে। চলো, বাগবাজার বাটা-র ওখান থেকে তোমাকে ৩ নম্বর বাসে তুলে দিই, শ্রীরামপুর পৌঁছে যাবে।’ গল্প করতে-করতে আমরা চললাম। বাটার কাছে এসে বললাম, ‘আমি পাইকপাড়া অবধি আপনার সঙ্গে যাই, ওখান থেকে ৩ নম্বর ধরে নেব।’ আমরা একটা ছাতায় আধভেজা হয়ে গল্প করতে-করতে চললাম। টালা ব্রিজে একটা ৩ নম্বর আসতেই কাজলদা সেই বাসে আমাকে তুলে দিলেন।

পরদিন নাইট ডিউটিতে কাজলদা এলেন না। পরদিনও এলেন না। সন্ধেবেলা অফিস গিয়ে জানলাম, কাজলদা মারা গিয়েছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫১। অকালমৃত‍্যু। মাত্র কয়েক মাস চাকরি করেছিলাম তাঁর সঙ্গে। তা কত বছর আগের কথা! কাজলদার ছেলে ঋত্বিক ফোন করেছিল এই সেদিন। কাজলদার ছোটদের জন‍্য লেখা বই  ‘ভাল্লুকের কোট’ বের হল লালমাটি প্রকাশন থেকে। অভিযান বুক কাফেতে ওই বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানে ঋত্বিক আমন্ত্রণ জানাল। আমি গিয়েছিলাম। শংকরলাল ভট্টাচার্য এসেছিলেন।

‘যুগান্তর’-এ আমি যোগ দেওয়ার পর সতীনাথদা, সতীনাথ চট্টোপাধ‍্যায়, গৌতম রায়, জয়ন্ত সিংহ, তন্ময় ভট্টাচার্য— এই সমবয়সিরা তো এসেছিলই, এরপর এসেছিল বিশ্বরূপ মুখোপাধ‍্যায়, অরূপ দে, অভিজিৎ সিরাজ-রা। সব মিলিয়ে আমাদের তৎকালের তরুণদের বড়সড় একটা দলই। এ-নিয়ে অগ্রজরা এই সংবাদপত্রটির ভবিষ‍্যৎ নিয়ে হয়ে উঠেছিলেন আশাবাদী। ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-তেও যোগ দিয়েছিল আমাদের সমবয়সি তরুণ-তরুণীরা। এখন লেখাই যায়, সেই ভবিষ‍্যৎকাল ছিল বড়ই সংক্ষিপ্ত। এমনকী আজ যখন এসব লিখছি, তখন মুদ্রিত সংবাদপত্রের, বলা যায়, অস্তমিত হওয়ার কাল।

আট দশকের গোড়া থেকেই পাঞ্জাবে পৃথক খালিস্তান রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টায় বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিরা তৎপরতা শুরু করে। আমি তখন ‘যুগান্তর’-এ। কাঠমান্ডু থেকে দিল্লিগামী বিমান ছিনতাই করে লাহোরে নিয়ে গিয়েছিল খালিস্তানি জঙ্গিরা, সে-কথা আগে বলেছি। তখন রোজই চণ্ডীগড়-অমৃতসর থেকে আসত সেনা-পুলিশের সঙ্গে খালিস্তানিদের সংঘর্ষ-বিস্ফোরণ-নাশকতার নানা খবর। বাংলা সংবাদপত্রগুলিতে পাঞ্জাবে ১০ জন/১৫ জন নিহত হওয়ার খবর প্রথমদিকে প্রধান খবর অর্থাৎ লিড নিউজ হলেও, পরে এক কলমের খবর, মানে টপ নিউজ হয়ে যায়। তবে কিনা, মাঝে মাঝে এমনই নাশকতার খবর আসত, দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলে দিত খালিস্তানি জঙ্গিরা। ভীতিও। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও শোরগোল ফেলে দিয়েছিল তাঁরা। বিস্তারিত বলার দরকার নেই। হইচই ফেলা দু’একটি ঘটনার কথা বলি, গণভীতি জাগানোর কোন তুঙ্গে উঠেছিল খালিস্তানি জঙ্গিরা, বিশেষত বব্বর খালসা জঙ্গিগোষ্ঠীটি, তাতে বোঝা যাবে।

দিল্লি, রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশের কয়েকটি শহরে-পার্কে, সিনেমাহলের সামনে, বাজারে, বাসস্টপে পথচারীরা পড়ে থাকা ট্রানজিস্টার রেডিয়ো হাতে নিয়ে নব ঘোরাতেই বিকট বিস্ফোরণ। খালিস্তানিদের পেতে-রাখা এই রেডিয়ো-বোমায় ১৯৮৫ সালের ১০-১১ মে দু’দিনে মারা গিয়েছিলেন ৮৬ জন। নিহতদের অধিকাংশই দরিদ্র বালক কিশোর, বস্তিবাসী।

১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর দিল্লিতে খালিস্তানি জঙ্গিরা দিল্লিতে নিযুক্ত রোমানিয়ার রাষ্ট্রদূত লিভিউ রাদুকে অপহরণ করে। অপহরণ করেই ছবি তুলে সে-ছবি সংবাদসংস্থাকে পাঠিয়ে দেয়। ছবিতে দেখা যায়, একটি গাড়িতে রাষ্টদূত রাদু পিছনের সিটে-বসা দুই খালিস্তানি জঙ্গির মাঝখানটিতে বসে আছেন। পরিচয় গোপনে রাখতে দুই জঙ্গিই চোখে কালো চশমায়, গোঁফ-দাড়ি-পাগড়িতে ঢাকাঢুকা। দুজনেই সশস্ত্র। সারা ভারতেই সংবাদপত্রগুলিতে ওই ছবি-সহ খবর বের হয়েছিল লিড নিউজ হিসেবে। রোমানিয়ার রাষ্টদূত অপহরণে আন্তর্জাতিক মহলে হইহই পড়ে গিয়েছিল। খালিস্তানি জঙ্গিরা সেটাই চেয়েছিল। আন্তর্জাতিক মহলের চাপেই ২৬ দিনের মাথায় জঙ্গিরা দিল্লির অদূরে, রাস্তায় রাষ্ট্রদূত রাদুকে অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে যায়, সেখান থেকে ট‍্যাক্সিতে রোমানিয়ার দূতাবাসে ফেরেন রাষ্ট্রদূত। এছাড়া চমকপ্রদ আরও খবর, খালিস্তানের পাসপোর্ট বের করেছিল তারা। ডাকটিকিট, মুদ্রা বের করেনি বোধহয়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছিল খালিস্তানকে। লন্ডনে দপ্তর খুলে বসেছিলেন খালিস্তানের প্রবক্তা নেতারা। কানাডাতেও ছিলেন। সর্বোপরি পাকিস্তানের মদত তো ছিলই। তবে, ট্রানজিস্টার-বোমা ও রোমানিয়ার রাষ্টদূত অপহরণের ঘটনা খালিস্তান জঙ্গিদের নিভন্ত সময়ের দপ দপ করে ওঠা।  অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরে সেনাবাহিনীর অপারেশন ব্লু স্টার ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হত‍্যাকাণ্ডের পরের ঘটনা।

১৯৮২-’৮৩ সালেই পাঞ্জাবে খালিস্তানি জঙ্গিদের তৎপরতা তুঙ্গে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গে সাতের দশকের ‘সাফল‍্যের সুবাদে’ পাঞ্জাবের রাজ‍্যপাল পদে সিদ্ধার্থশংকর রায়কে বসান প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সিদ্ধার্থশংকর রাজ‍্যের পুলিশপ্রধান হিসেবে পেয়েছিলেন গিল ও রিবেইরোর মতো অফিসারদের। তাঁদের পুরো নাম এখন আর মনে নেই। জার্নেইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে ও তাঁর সঙ্গী খালিস্তানি সশস্ত্র জঙ্গীরা অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরে ঘাঁটি গেড়ে অবস্থান করে থাকলে, সেখান থেকে তাদের বের করার বিস্তর চেষ্টা চলে। এরপর ১৯৮৪-র ১ জুন থেকে এক সপ্তাহের বেশি সেখানে অপারেশন ব্লু স্টার অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। ভিন্দ্রানওয়ালে ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা, সেইসঙ্গে বহু মানুষ নিহত হন। স্বর্ণমন্দিরে অপারেশন ব্লু স্টারের পর দেশের কয়েকটি সেনাছাউনিতে শিখ জওয়ানদের ভেতরে ইতিউতি চাঞ্চল‍্য দেখা যায়। রাঁচির রামগড়, আগ্রা, এসব ক‍্যান্টনমেন্ট থেকে কিছু-কিছু শিখ জওয়ান বিভিন্ন সাঁজোয়া গাড়িতে দিল্লি বা অমৃতসর রওনা হন। মাঝরাস্তাতেই তাঁদের সামলানো গিয়েছিল। স্বর্ণমন্দিরে ব্লু স্টার অভিযান এবং ওই সিপাহি বিদ্রোহ, এসব খবর ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ মানেকা গান্ধী তাঁর ‘সূর্য ইন্ডিয়া’ পত্রিকাটিতে সবিস্তারে ছেপেছিলেন। ইন্দিরা সরকার সঙ্গে-সঙ্গে পত্রিকাটির ওই সংখ‍্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এই নিষিদ্ধ ঘোষণার ঠিক আগে শ‍্যামবাজারের বুকস্টলে আমি ‘সূর্য ইন্ডিয়া’র ওই সংখ‍্যাটি কিনে ছিলাম। আমি ইতিহাসের ভিতরে ছিলাম, আমি ইতিহাসের ভিতরে আছি।

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। ওইদিন আমার সকালের ডিউটি ছিল। সকাল ন-টা থেকে তিনটে, বিহার-ওড়িশার ডাকের কাগজ বের করতে হবে। সকাল ন-টা দশ নাগাদ বাগবাজারের ‘যুগান্তর’ অফিসে পৌঁছে গেলাম। চিফ সাব এডিটর নন্দগোপালদা (রায়) সাড়ে দশটার পর আসবেন। নরহরি পিটিআই-ইউএনআইয়ের খবরের ক্রিড (শ্লিপ) কেটে গুছিয়ে রেখেছিল। তা থেকে বিহার-ওড়িশার খবর বাছছিলাম। অফিসে আমাদের ‘যুগান্তর’-এর  আর কেউ ছিলেন না। ওদিকে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’র দিকটায় অমৃতবাজারের দু-তিনজন ছেলেমেয়ে খবর বাছতে-বাছতে গল্পগুজব করছিল। আমার মতোই তারা ট্রেনি সাব এডিটার। হঠাৎ ইউএনআইয়ের টেলিপ্রিন্টার ঘট ঘট শব্দ করতে-করতে ফ্ল‍্যাশ নিউজ পাঠাতে লাগল। ফ্ল‍্যাশ নিউজ মানে ফাঁক-ফাঁক লাইন, ক‍্যাপিটাল হরফে, গুরুত্বপূর্ণ খবর। ঘড়িতে তখন সকাল দশটা কুড়ি। টেবিল ছেড়ে ইউএনআই মেশিনে দেখলাম একই লাইন পর পর তিনবার: দেয়ার ইজ আ রিউমার ইন দেলহি মিসেস গান্ধী শুট অ্যাট…