সদ্যপ্রয়াত কেতকী কুশারী ডাইসন বাঙালিকে যেন আরও খানিক দরিদ্র করে দিয়ে গেল। উদার, উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চার মানুষের এখন বড় অভাব। বনভূমি ধ্বংসের মতো বাঙালি ক্রমশ নিজেদের শেষ করে ফেলছে! খরার এই তীব্র আবহে কেতকীর কাজের বিচিত্র বিস্তার আমাদের চমকিত করে। জীবনের সিংহভাগ বিলেতে কাটিয়েও শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এক বাঙালি মেয়ে। সাহসী, অনুসন্ধিৎসু, সৃষ্টিশীল আর কোমলহৃদয় সেই মেয়ে দু’দেশের মধ্যে আশ্চর্য সাঁকো হয়ে রইলেন। ভাস্কর্যের মতো পরতে-পরতে তাঁর ভাবনার বহুমাত্রিকতা, চিন্তার বিচিত্র সংশ্লেষ। একাধিক ভাষার গভীরে অবগাহন থেকে মাতৃভাষার প্রতি অভিবাসী লেখিকার এই অদম্য জেদ— আমাদের কাছে সান্ত্বনার মহাপ্রলেপ হয়ে রইল। অনুবাদের ভুবন থেকে, সৃষ্টিশীল সাহিত্য এবং বহুস্তরীয় গবেষণার অভিমুখে এমন দৃঢ় পায়ে কেউ হেঁটেছেন বলে সহসা মনে পড়ে না। আজ এই মধ্যমেধার ঊষর প্রান্তরে বৃক্ষের সংখ্যা যখন দ্রুত বিলীন আসছে, তখন তাঁর কাজের প্রেক্ষিত আমাদের উজ্জীবিত করে।
পিছনে তাকালে দেখি, একদা যাঁদের মুক্তচিন্তা আমাদের প্রাণিত করেছে, সেই পাহাড়প্রমাণ মানুষরা একে-একে চলে গেছেন। ব্যক্তিগত অনুষঙ্গে কেতকীর কথা মনে পড়লে সেই সঙ্গে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে— শিবনারায়ণ রায়, অম্লান দত্ত, শঙ্খ ঘোষ, সত্যেন্দ্রনাথ রায়, সনজীদা খাতুন, বীণা আলাসে, শ্যামলী খাস্তগীর প্রমুখ স্রোতের বিরুদ্ধে চলা দুর্লঙ্ঘ ব্যক্তিত্বের ছবি। কালের স্রোতে এঁরা হারিয়ে গেছেন। হারিয়ে গেছেন হয়তো বা আমাদের স্মৃতি থেকেও! এহেন অবস্থায় কেতকীর চলে যাওয়া আর-এক ইন্দ্রপতন।
অনায়াসে প্রশ্ন উঠতে পারে, এঁদের সঙ্গে কেতকীকে মিলিয়ে নেওয়া যায় কি না! বিগত ষাট বছরের বেশি সময় যাঁর দেশের বাইরে অবস্থান, তাঁকে এই সারিতে আসন দেওয়া কি যথাযথ? তবুও বলতে হয়, কেতকীর ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম কিছু কম ছিল না, হয়তো বা কিছু বেশিই। ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ নিয়ে ইংরেজের দেশে নিজস্ব ক্রিয়েটিভ আইডেন্টিটি তৈরি করার মতো স্পর্ধা প্রদর্শন করেছেন অনায়াসে। সেই সঙ্গে ক্ষতবিক্ষত হয়েও নিবিড় মমতায় বুকের গভীরে আগলে রেখেছেন মাতৃভাষাকে। সহস্র মাইল দূরে বসে অজস্র জরুরি কাজ করেছেন বাংলা ভাষায়। না করলেও কিছু ক্ষতি ছিল না, আখেরে বরং লাভই হত— কিন্তু সেই তথাকথিত লাভকে ছুড়ে ফেলতে দ্বিধা করেননি তিনি। অভিবাসী লেখকের অদম্য লড়াই চালিয়ে গেছেন আজীবন। প্রথম পর্বে ওপার বাংলার মেহেরপুরের স্মৃতি, তারপর কলকাতা, আবার কলকাতা ছেড়ে বিলেতের মাটিতে আসন পেতেছেন। ছিন্নমূল জীবনের পাশাপাশি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে আর-এক সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তাঁর, তার পরিসমাপ্তি ঘটল।
আরও পড়ুন: শ্রীকান্ত, শরৎচন্দ্র ও বাঙালি বনাম মুসলমান! লিখছেন আশিস পাঠক…


প্রায় বছরদশেক ধরেই তিনি বড় অসুস্থ, ফলে লেখার টেবিলের সঙ্গে অযাচিত দূরত্ব তৈরি হয়েছে অনেকদিন। তাঁর শেষতম প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে ২০১৫ সালে, বিপুলাকার সে-গ্রন্থের শিরোনাম ‘কাছে-দূরের কক্ষপথে’। তার পৃষ্ঠাসংখ্যা ৮১৬, কনটেন্টের কথা বাদ দিয়ে কেবলমাত্র পাতার অঙ্কের হিসেবে সে এক মহাগ্রন্থ। বিষয়ের বৈচিত্র্য, চিন্তার প্রাখর্য, বিশ্লেষণের তীক্ষ্ণদীপ্তি সরিয়ে— কেবল গ্রন্থের পৃষ্ঠাসংখ্যাই যে-কোনও লেখকের পক্ষে চূড়ান্ত শ্লাঘার কারণ হয়ে উঠবে। কেতকী এমনই, কোনও বিষয়কে গ্রহণ করলে ভাবনার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে চান। সারাজীবন তিনি জ্ঞানের পক্ষে, বৈদগ্ধের পক্ষে লড়াই করে গেছেন। ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, কিন্তু হার মানেননি। হিসেব করলে দেখি, তাঁর প্রবন্ধধর্মী বাংলা রচনা সংকলনের সংখ্যা পাঁচ, উপন্যাস ও নাটকের সংখ্যা যথাক্রমে চার এবং তিন, সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদ, রবীন্দ্রনাথ-ওকাম্পো চিঠিপত্র সম্পাদনা, বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্তর কবিতার অনুবাদ, সাহিত্য ও চিত্রে রঙের ব্যবহার প্রসঙ্গে ব্যতিক্রমী রবীন্দ্র-গবেষণা ইত্যাদি কী নেই সেখানে?



যদিও এত কিছু কাজের মধ্যে নিজের কবিসত্তাকে সবচেয়ে ভালবাসতেন। কবিতার প্রসঙ্গে তাঁর মুখমণ্ডলে ফুটে উঠত বিশেষ আলোকবিভা। একবার তাঁকে বই উপহার দেওয়ার সময় নবনীতা দেবসেন সে বইতে লিখে দিয়েছিলেন ‘কবি কেতকীকে’— সেই ছোট্ট সম্বোধন তাঁকে আপ্লুত করেছিল। এই গল্প কেতকী অনেকবার শুনিয়েছেন আমাদের। হিসেব অনুসারে বাংলা আর ইংরেজি মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত কবিতা বইয়ের সংখ্যা দশ, তার মধ্যে বাংলা বইয়ের সংখ্যা ছয়। ‘বল্কল’ (১৯৭৭), ‘সজীব পৃথিবী’ (১৯৮০), ‘জলের করিডর ধরে’ (১৯৮১)। তারপর বেশ কিছুটা বিরতি নিয়ে ১৯৯২ সালে আবার প্রকাশ পেয়েছে ‘কথা বলতে দাও’। এর কিছু কবিতা অবশ্য শিবনারায়ণ রায়ের ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। পাশাপাশি পুরোদমে চলেছে তখন ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ নিয়ে গবেষণার কাজ। সেই কাজ প্রকাশ পাওয়ার দু-বছরের মধ্যে ১৯৯৯ সালের বইমেলায় বেরিয়েছে ‘জাদুকর প্রেম জাদুকর মৃত্যু’। ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর মতো ‘জাদুকর প্রেম জাদুকর মৃত্যু’ বইয়ের সঙ্গেও আমি জড়িয়ে গেলাম। কেতকীদির ইচ্ছে এই বইতে তাঁর কবিতার পাশাপাশি আমার আঁকা কিছু ছবি থাক। ফলে একগুচ্ছ সাদা-কালো ছবিতে সেজে উঠেছে তাঁর সেই বই। এরপরে ২০০০ সালের বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে ‘দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে’ শীর্ষক কবিতার বই। সেইটিই বোধহয় কবিতার শেষ বই।
জানতে ইচ্ছে করে, কবিতার বিষয়ে এই অভিবাসী লেখিকা ঠিক কি ভাবতেন। অবশ্য নিজেই জানিয়েছেন সে-কথা। বলেছেন— ‘প্রত্যেক কবিরই একটা Songs of Innocence-এর পর্যায় এবং Songs of Expereince-এর পর্যায় আছে কি না জানি না, তবে আমার জীবনে নিঃসন্দেহে একটা সত্যিকারের Songs of Innocence-এর পর্যায় গেছে, কারণ একেবারে ছোটবেলা থেকেই কবিতা লিখছি আমি। সত্যি বলতে কি, জীবনের এমন কোনো সময় আমার মনে পড়ে না যখন আমি কবিতা লিখতাম না।’ আবার কোথাও বলেন ‘কবিতাপাঠ প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তাকে দৃঢ়তর করে তোলে।’






খেয়াল করে দেখলে, প্রকৃতির সঙ্গে আজীবন তাঁর নিবিড় আত্মীয়তা, অরণ্যের স্বাদ ছাড়া নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে তাঁর—এমনটা ওঁর মুখে অনেকবার শুনেছি। এমনকী, দিনের বেলা জানলা খুলে না-রাখলে কবিতা লিখতে পারতেন না। ছবি আঁকতে দেখেছি, ‘জাদুকর প্রেম জাদুকর মৃত্যু’ বইতে গাছের কথা, অরণ্যের এসেছে বারে-বারে। কখনও জানলা দিয়ে দেখা গাছেরাই তাঁর কবিতার নায়িকা। ‘নিবাত দিনে সুদূর দুই গাছ / পরস্পরের সঙ্গে তর্করত / উদ্বেজিত অসহায় দুই জটিবুড়ি, / অসংবৃত অথচ নিষ্কম্প, চিত্রার্পিত। … দুই গাছ দুই সখী, / অভিনেত্রী, প্রান্তবর্তিনী, / যবনিকাপতনের প্রতীক্ষায়।/ চোখে জ্বালা, শ্বাস রুদ্ধ, ভূমিকা আবছা হয়ে আসে।’
এই উদ্বেজিত তার্কিকের একজন যে কেতকী নিজেই, সে কি আমাদের বলে দিতে হবে?


আবার ‘অনিয়ম’ কবিতার শেষটুকু— ‘কে তুমি, ঢিলে রোদের বাকল-পরা গাঢ় ছায়া, / শিকড় গেড়েছো আমার ভাঙা কেয়ারিতে? / এই নাও নিয়ম-ভাঙা পাতা। / কিছু চিঠির, কিছু কবিতার, কিছু গাছের, / আমার দ্বিধাগ্রস্ত বিকেল থেকে তোমার দীপ্ত দ্বিপ্রহরের দিকে।’ এ কবিতার অন্দরেও কি নীরবে পড়েনি লেখিকার জীবনের পড়ন্ত রোদ্দুর? কখনও কবিতায় লিখে রাখা বাড়ির ঠিকানা, যেখানে ঝুঁকে পড়ে একরাশ ডালপালা— ‘…দুর্বোধ্য এ ঠিকানা? / শোনো বলছি, যেখানে ফটক রোধ ক’রে / পাতার ভারে অবনত লাইলাকের শাখা / আর রোজহিপের কাঁটাওয়ালা বাঁকা-ধনুক ডালে / ধরেছে সিঁদুরে বেরি, সেটাই আমার বাড়ি জেনো। / চিনতে ভুল হবে না।’
কী আশ্চর্য! এ যে কেতকীর সত্যিকার ৬৩ নম্বর ব্যানবেরি রোডের প্রবেশপথের নিশানা।
নিজেই জানিয়েছেন, সেই ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ আর বৈষ্ণব কবিতার প্রভাবে গড়ে উঠেছে তাঁর প্রেমের কবিতার বাচনভঙ্গি। তাছাড়া ছবির সঙ্গে, গানের সঙ্গে তাঁর বহুকালের ভালবাসা, শক্ত করে বাঁধা গাঁটছড়া। সে একেবারে নাড়ির টান। গায়িকা, গীতিকার এবং অভিনেত্রী এক সময়ের রক আইকন কালো মেয়ে টিনা টার্নার ছিল কেতকীর অন্যতম প্রিয় শিল্পী, এ-ছাড়া ফরাসি গাইয়ে, গীতিকার, ক্যাবারে-নাচিয়ে ও অভিনেত্রী এদিত পিয়াফের গান অত্যন্ত প্রিয় ছিল তাঁর। রেকর্ডে গাওয়া পিয়াফের ঝরা পাতার গান কী আবেগের সঙ্গে চোখ বুজে শুনতেন। চকিতে মনে পড়ে, আটের দশকের শেষদিকে শান্তিনিকেতনে ‘রতন কুঠি’-র অর্ধবৃত্তাকার লাল বারান্দার একদিকে ফুলে ছাওয়া বোগেনভেলিয়ার পাশে সন্ধ্যার মৃদু অন্ধকারে সনজীদা খাতুনের গান। কী আশ্চর্য মগ্নতায় সে রবীন্দ্রগান শুনছিলেন কেতকী! সে সন্ধ্যার আরেক নিবিড় শ্রোতা ছিলেন শিবনারায়ণ রায়। ‘আমি তখন ছিলেম মগন গহন ঘুমের ঘোরে’— রবীন্দ্রনাথের গানটি আমি সেদিনই প্রথম মন দিয়ে শুনেছিলেম। সনজীদাদির আরও অনেক গানের মধ্যে সেদিন এই গান আমাকে স্পর্শ করেছিল সবচেয়ে বেশি।
শুধুই কি প্রকৃতি আর গানের মগ্নতা! বলার অপেক্ষা রাখে না, কেতকীর কবিতায় নারীবাদী স্বর কীভাবে উপচে উঠেছে। তবে সে তীব্র ঝাঁঝালো কণ্ঠে নয়, অনুচ্চকিত স্থিতধী সুরে। এ-কথায় হঠাৎ মনে পড়ল, ‘কথা বলতে দাও’-এর ‘ধুনুরী’ কবিতার কয়েকটা লাইন। ‘তুলো ধুনতে বেরিয়েছি— / আমার কাজ, আমার খেয়াল, আমার শখ। …দ্যাখেন নি মেয়ে-ধুনুরী? / ফুসফুসে তুলোর ধুলো, চোখে জলছবি? / সরু পায়ে মল নেই। ধনুকে টঙ্কার। / সঙ্গে যায় কানাই বলাই। / শীত আসছে, গৃহস্থেরা, বাতাসে টের পাই, / ঠিক হবে না বেকার বসে থাকা। / আমারও রোজগার চাই / চাই আচার দিয়ে রুটি। / তাই তুলো ধুনতে বেরিয়েছি— / আমার দীক্ষা, আমার পেশা, আমার ঋতু-উৎসব। / ন্যায্য রেট দেবেন, বাবুরা।’ এই কবিতার প্রতিটি ভাঁজে কেতকীকে চেনা যায়। বারবার মনে হয়েছে, তাঁর সৃষ্টিসত্তা বুঝি কবিতার মধ্যেই মুক্তির যথার্থ স্বাদ পেতে চায়।
‘বাড়ির লোক তো আপন হবেই। পরকে আপন ক’রে তোলা যে আমার কাজ। যে-তাগিদে দেশছাড়া হয়েছি। পরকে আপন করেছি একভাবে। এখন কি আপন পর হয়ে গেছে? সেই ছেড়ে আসা মাটির মানুষগুলো কি এখন আমার পর?’
‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ ঘিরে গবেষণার সূত্রে তাঁর সঙ্গে অজস্র চিঠিপত্রের আদান-প্রদান, আলাপ-আলোচনার সময় দেখেছি, কবিতাই তাঁকে সবচেয়ে আনন্দ দেয়, আবার যন্ত্রণাও। তাঁর চিঠিপত্রের দু’-একটা অংশ এখানে রাখি—
‘লেখা সম্পূর্ণ হয় না। লেখাকে সম্পূর্ণ না-করা পর্যন্ত রেহাই পাওয়া যায় না, প্রকাশের তাগিদ থাকে। মানুষকে যখন সারভাইভ করতে হয় তখন কতরকমের স্ত্র্যাটিজিই যে অবলম্বন করতে হয়। এও একরকমের রণকৌশল। কেউ কেউ সব কিছু বেশ বোতলে পুরে রাখতে পারে। কেউ কেউ পারে না— কোনোভাবে মুক্তি দিতে হয়। কবিতা আমার সেই মুক্তি, সংকটের সময়ে বেঁচে থাকার একমাত্র হাতিয়ার।’
অন্য এক চিঠির টুকরো—
‘বাপ-মায়ের আদরের হলে আত্মবিশাসের বনিয়াদ যেমন দৃঢ় হয়, ফলে চরিত্রেও একটা দৃঢ়তা আসে, লড়বার একটা ক্ষমতা পাওয়া যায়। তেমনি সেই প্রাপ্তির উল্টোপিঠে একটা অসুবিধাও বোধহয় এসে দাঁড়ায়। বাপ-মায়ের কাছ থেকে জীবনের প্রারম্ভে যে উচ্ছলিত স্নেহ, গুণের স্বীকৃতি, এবং সহযোগিতা পাওয়া গেছে, সারা জীবনই সেই স্নেহ, সেই এ্যাপ্রিসিয়েসন আর কো-অপারেশনের জন্যে একটা তৃষ্ণা, একটা কাঙালপনা থেকে যায়। ভালোবাসা দেবার ক্ষমতা যেমন বাড়ে, ভালোবাসা পাবার জন্যে আকুলতাও তেমনি স্বভাবের মধ্যে মিশে যায়। … বোধহয় আমার প্রবাসী জীবন সেই আকুলতাকে তীব্রতর করে।’
আবার কোথাও—
“বাড়ির লোক তো আপন হবেই। পরকে আপন ক’রে তোলা যে আমার কাজ। যে-তাগিদে দেশছাড়া হয়েছি। পরকে আপন করেছি একভাবে। এখন কি আপন পর হয়ে গেছে? সেই ছেড়ে আসা মাটির মানুষগুলো কি এখন আমার পর? একদিন যেখানে প্রীতিস্নিগ্ধ পরিবেশে জীবনের আত্মসচেতনা পেয়েছি, এখনো যেন সেখান থেকে প্রীতির স্বীকৃতি পাই—এই ব্যাকুলতাকে কাটিয়ে উঠতে পারি না।”
নিভৃত স্বগতোক্তির মতো মেলে দেওয়া এই শব্দের সারি কেতকীর ভেতরের আনন্দ আর বেদনাকে তুলে ধরে। স্বদেশ, স্বজন আর মাতৃভাষাকে আঁকড়ে ‘কাঙালপনা’ সারাজীবন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। তবে এও সত্যি, ‘কম্যুনিকেট’ করার তাগিদে হালকা হাততালির জন্যে কলম ধরতে রাজি নন। বেশ জোরের সঙ্গে জানিয়ে দেন—
‘আমার যেমন কম্যুনিকেট করার একটা তাগিদ আছে, তেমনই শুধু করতালির প্রত্যাশায় আমি এক লাইনও লিখি না,— না পদ্য, না গদ্য,— যে-সত্য আমাকে উন্মথিত করেছে তাকে প্রকাশ করার তাগিদেই, তাকে ভালো করে বুঝে নেওয়ার তাগিদেও লেখার চেষ্টা।’
এই ছত্রগুলি আটের দশকের মাঝামাঝি তাঁর কলম থেকে নিঃসৃত হলেও আজীবন এটিই কেতকীর জীবনের মন্ত্র হয়ে উঠেছে।




