
উল্টো দূরবিন: পর্ব ৩৭
আমার নিজের দাদুর স্মৃতিশক্তি ছিল দুর্দান্ত। কবীরের দোহা, চার্বাকের শ্লোক, খনার বচন গড়গড় করে বলে যেতেন। পরে বুঝেছি, এইসব চরিত্ররা দাদুর ‘চরিতাভিধান’ বইতে ছিল, যেটার সঙ্গে দাদু জড়িত ছিলেন।

আমার নিজের দাদুর স্মৃতিশক্তি ছিল দুর্দান্ত। কবীরের দোহা, চার্বাকের শ্লোক, খনার বচন গড়গড় করে বলে যেতেন। পরে বুঝেছি, এইসব চরিত্ররা দাদুর ‘চরিতাভিধান’ বইতে ছিল, যেটার সঙ্গে দাদু জড়িত ছিলেন।

‘দাদুকে শতরঞ্চিতেও তালি লাগাতে দেখেছি। শতরঞ্চি ফুটো হয়ে গেলে টুকরো কাপড়ের তালি লাগাতেন নিজেই। এতটাই ‘তালি-বান’ ছিলেন আমার দাদু। শুধু দাদু নয়, গোটা পরিবারেরই এই অভ্যেস ছিল। কোনও জিনিসকে বহুদিন এবং বহু ভাবে ব্যবহার করার নানাবিধ ফন্দিফিকির উদ্ভাবন করা হত।’

‘আমার দাদুর কোনও ছবি তোলা নেই। ক্যামেরা না থাকার কারণেই মূলত কোনও ছবি ওঠেনি। তবে রাঙাদা কিছু ছবি তুলেছিল, তার কিছু কপি আমার কাছেও ছিল, সব বিবর্ণ ও নষ্ট। এখনকার এ আই হয়তো অনেকটাই উদ্ধার করে দিতে পারত, কিন্তু সেইসব ছবি কোথায় আছে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।’

টুকরো কোলাজ দাদুর পায়ে খড়ম থাকত। খড়ম এখন কোনও বাড়িতেই দেখতে পাওয়া যায় না। খড়ম হচ্ছে হাওয়াই চটির পূর্বপুরুষ। পায়ের পাতার মাপে বানানো একফালি কাঠ।

“নবীন সেনের ‘পলাশীর যুদ্ধ’ থেকে, মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ থেকে আওড়াতেন। রবীন্দ্রনাথকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। বলতেন, ‘রবিবাবুর কবিতায় অশ্লীলতা দোষ আছে।’”

‘‘ক্লাস এইট হবে, দাদু বলছেন, ‘একই শব্দ কিন্তু অবস্থাভেদে নানা অর্থ হয়। যেমন ধরো সৈন্ধব। এর অর্থ লবণও হয়, আবার ঘোড়াও হয়। জনৈক পণ্ডিত ভোজনে বইস্যা যদি কয়, ‘সৈন্ধব আনয়’, তখন কি তুমি একখান ঘোড়া হাজির করবা? আবার যুদ্ধে প্রস্তুত কোনও রাজা যদি একই হুকুম করে, তখন কি লবণের আচ্চি লইয়া আসবা?’’

‘দাদুর কাছে পাটিগণিত করার মজাই ছিল আলাদা। কঠিন-কঠিন অঙ্কগুলো যখন উত্তরে মিলত না, দাদু টেনে নস্যি নিতেন আর-একবার। ‘র, র! উত্তর মিলতেই হইব! অঙ্ক না হইয়া যাইব কই?’ আবার নতুন করে ভাবতে বসতেন, আবার নতুন করে করতেন।’

আমার দাদুর খুব বেশি ছবি নেই। পিসেমশাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া কোডাক বক্স ক্যামেরায় দু’চারটে ছবি উঠিয়েছিলাম, দাদুর বৃদ্ধ বয়সে। সেই সব ছবির চিহ্নমাত্র নেই। দাদুর ছবি আমার স্মৃতিতেই আছে। আমার স্মৃতিলুপ্তির পর, বা আমার নিজের লুপ্তির পর, দাদুর কোনও ছবি থাকবে না।

‘মোহিনী ঠাকুর একটু-আধটু কংগ্রেস করতেন। গান্ধীটুপি ছিল। মোহিনী ঠাকুরের ছোট ছেলে জিজ্ঞাসা করল, গান্ধীটুপি মাথায় দিলে কি হবে? পুরোহিত মহা ফাঁপরে। কে একজন বললেন, মুকুট হইল গিয়া লোকাচার। মুকুট পরিধান তো শাস্ত্রে নাই!’

‘সামনের জমিতে জোছনা পড়ত, কখনও কুয়াশা জড়ানো। জোছনা ডাকত আয়-আয়, বেরিয়ে পড়তে চাইতাম। শৈলা যেতে চাইত না। কখনও ভূতগ্রস্তের মতো ঘুরেছি একা, ভয়-ভয় করত। কী একটা পাখি ডাকত, রাতে নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা জিরাফের ভাষা লুকিয়ে থাকে।’

‘ওই বিল থেকে একটা মায়াবি জলজগন্ধ পাওয়া যেত, কিছু কচুরিপানা, যা পুরোটা শুকায়নি, এর উপর দিয়ে হাঁটলে হালকা ফটাস শব্দ হত। শব্দ-চিত্র-গন্ধময় সুখস্মৃতি।’

‘নীলগঞ্জের অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসছে, অধিকাংশই গন্ধ নির্ভর। সার-সার গরুদের সমবেত গন্ধ, দুধ দোয়াবার বালতি বালতি দুধের গন্ধ, ডাঁই করা গোবরের গন্ধ, সবই আলাদা রকম।’
This Website comprises copyrighted materials. You may not copy, distribute, reuse, publish or use the content, images, audio and video or any part of them in any way whatsoever.
©2026 Copyright: Vision3 Global Pvt. Ltd.