লুপ্তগন্ধের স্মৃতি
গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়িতে পিসেমশাইয়ের তাসের আড্ডা ছিল না। দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে একতলায় একটা ঘরে ছিল। পিসিমা বলতেন ‘বৈঠকখানা’। পিসেমশাই বলতেন ‘ড্রইংরুম’। বৈঠকখানা শব্দটা শুনেছি। আমাদের পাঠ্যবইয়ের কোথাও-কোথাও দেখেছি। ড্রইংরুম শব্দটা নতুন। সোফাসেট দেখলাম। নরম গদি। ট্রামের ফার্স্টক্লাসে গদি ছিল। ওটা মোটা ছিল না মোটেই; দোতলা বাসের গদি ছিল ট্রামের চেয়ে পুরু। এই সোফাসেট ছিল আরও নরম। তলায় স্প্রিং, তার উপরে স্পঞ্জ। বাচ্চারা লাফালে আমি শাসন করতাম; কী হচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাবে তো! আমিই তো বড়। এই ড্রইংরুমে রবিবার-রবিবার তাস খেলা হত। পিসেমশাইয়ের কয়েকজন বন্ধুস্থানীয় ভদ্রলোক তাস খেলতে আসতেন। একজন ছিলেন ডাক্তারবাবু। চেম্বারে চারটাকা ফি। আমাদের জ্বরজারি, পেটখারাপ, খোশপাঁচড়া হলে, ওষুধ লিখে দিতেন, ফি দিতে হত না। তাস খেলতে আসতেন একজন উকিলবাবু, আরও ওই পাড়ার কেউ-কেউ। একজন ছিলেন পিসেমশাইয়ের থেকে অনেক ছোট। ওই পাড়ার বলাকা সংঘের সেক্রেটারি হাঁদুদা। তাসের আড্ডায় চা-জলখাবার দেওয়া হত। বাগবাজার স্ট্রিটের পটলার দোকানের লড়াইয়ের চপ, খাস্তা কচুরি অথবা শিঙাড়ার সঙ্গে সন্দেশ বা দরবেশ থাকত। আমিও অনেক সময়ে খাবার আনতে গিয়েছি। খাবার কিনতে যাওয়াটা খুব আনন্দদায়ক ব্যাপার ছিল।
খুব ছোটবেলায় দেখতাম, শালপাতার শঙ্কু আকৃতির ঠোঙায় কিম্বা বাঁশের পাতলা কঞ্চির কাঠামোর উপর, শালপাতার আস্তরণের মধ্যে এইসব খাবার সাজিয়ে দেওয়া হত। শিঙাড়া-কচুরির সঙ্গে শালপাতার গন্ধ মিশে গেলে একটা আশ্চর্য রকমের গন্ধ নির্মিত হত, সেই লুপ্তগন্ধের স্মৃতির হাহাকার এই লাইন দুটোয় মিশে রইল। অক্ষরের প্রকাশ হয় না।
সাতের দশকেও শালপাতার চুবড়ি ছিল। এরপর কাগজের ঠোঙা। বাক্স, আটের দশক থেকে প্লাসটিক-পলিথিন ঢুকতে লাগল, থার্মকল ইত্যাদি। চপ-কাটলেট যদিও শালপাতার ঠোঙায় দেওয়া হত না। ব্রাউন কাগজের ঠোঙায় দেওয়া হত।
পিসেমশাইয়ের শার্টের পকেট থেকে আধুলি পেয়েও রেখে দিয়েছিলাম অপরাধবোধে! পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ১২…
শঙ্কু আকৃতির শালপাতার ঠোঙায় আবার অদ্ভুত নৈপুণ্যে পকেট করা হত। কচুরির তরকারিটা একটা পকেটে থাকত, জিলিপিটা অন্য পকেটে। নারকোল পাতার শির থেকে ছোট-ছোট কাঠি তৈরি হয়, সেই কাঠি দিয়ে শালপাতাগুলি গাঁথা হত। চুবড়ির উপরে শালপাতারই আচ্ছাদন কাঠি দিয়ে সেলাই করে দেওয়া হত। বাড়ি আনবার সময়ে আকাশ থেকে মাঝে আচমকা নেমে আসত চিল। ছোঁ মারত। চুবড়িটা দু’পায়ের আঙুলে চাপা থাকত। উপর আকাশ থেকে নীচে পড়ত দু-চারটে শিঙাড়া-জিলিপি। এ-জন্য নেমে আসত কাক। কলকাতার আকাশে আর চিল নেই। হায় চিল! আর শালপাতার চুবড়িও নেই।
বারো নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিটের ওই কারখানা-বাড়ির পাশেই একটুকরো জমি ছিল মেজপিসেমশাইয়ের। উনি টিনের চালা এবং পাঁচইঞ্চি ইঁটের দেওয়াল করে ভাড়া বসিয়েছিলেন। ছোট-ছোট ছ’টি ঘর ছিল। একপাশে তিন, অন্যপাশে তিন। ওই বাড়ির একটা ঘরে থাকতেন আমার বড়পিসেমশাই। উনি ছাগল পুষতেন। একটিমাত্র ঘরের ভেতরে বড়পিসেমশাই, বড়পিসিমা ছাগল, ছাগলছানা সবাই থাকত। ওই ঘরেই রান্নাবান্না হত। বাইরে রাস্তা। রাস্তায় উনুন ধরিয়ে ঘরে এনে রান্নাবান্না হতে দেখেছি।
বড়পিসেমশাইয়ের একটা ছবি ছিল ও-বাড়ির দেওয়ালে। উনি মিলিটারিতে চাকরি করতেন, কিছু টাকা পেনশন পেতেন। আবার পুজোআচ্চাও করতেন অন্যের বাড়িতে। প্রধানত বস্তিতে। এ-জন্য ওঁকে ঠাকুরমশাই ডাকত। গলায় একটা রুদ্রাক্ষের মালা ছিল। ওদের কোনও সন্তান ছিল না। ছাগলছানাকে খুব আদর করতেন দু’জনেই। ছাগলের গায়ে হাত বুলাতেন, খাওয়াতেন। ওই ছাগল-গন্ধমাখা ঘরে আমার নিমন্ত্রণও থাকত। বোয়াল মাছের ঝাল, মুলোর অম্বল— এইসব খুব ভাল রান্না করতেন বড়পিসিমা। বড়পিসিমা ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। যাকে বলে ডাকসাইটে সুন্দরী। টকটকে ফরসা রং। অপূর্ব চোখ-মুখ। আমার মেজপিসিমা কিন্তু সুন্দরী ছিলেন না একদম। মোটাসোটা গড়ন, গায়ের রং চাপা, সামনের দাঁত একটু উঁচু। মেজপিসেমশাই আমার বড়পিসিমাকে একটু বেশি পাত্তা দিতেন। বড়পিসিমার সঙ্গে কথা বলতে ভালবাসতেন। এ-জন্য বড়পিসেমশাইয়ের একটু রাগ ছিল।
বড়পিসেমশাই ছিলেন এক বিচিত্র ধরনের মানুষ। বড়পিসেমশাইয়ের বিপদের সময়ে মেজপিসেমশাইয়ের বদান্যতায় এই আশ্রয়। উনি আশ্রয়হীনই হয়ে পড়েছিলেন একসময়ে। পরে সুযোগ পেলে বড়পিসেমশাইয়ের কথা বলা যাবে। অনেকে পোষা কুকুরকে বাইরে হিসি করাতে নিয়ে যায়। বড়পিসেমশাই ঘরের ছাগলদের নিয়ে যেতেন হিসি করাতে। বাচ্চাদের হিসি করানোর সময়ে মায়েরা যেমন জিভে শিস্ধ্বনির মতো এক ধরনের আওয়াজ করে, যে-আওয়াজটা অক্ষর সাজিয়ে বলা যাবে না, তেমন আওয়াজই করতেন এবং আশ্চর্য— ছাগলেরা হিসিও করত। তাই বলে ঘরের ভিতরে কি করত না? করত। পিসিমা জল দিয়ে ধুয়ে দিত। ছাগলেরা হাগুও করত। শৈশবেই লক্ষ করেছি, ছাগলের হাগু কী আশ্চর্য ব্যাপার! কালির কারখানার অটোমেটিক মেশিন থেকে যেমন ফুরফুর করে ট্যাবলেট পড়ে, সব সমান মাপের, সব সমান রঙের, ঠিক তেমনটাই ফুরফুর করে পটি পড়ত। কালো-কালো, গোল-গোল, চক্চকে। ছাগলের এই জিনিসটা নাকি ভাল সার। ওই চালাঘরের একপাশে কিছুটা মাটি ছিল। বড়পিসেমশাই ওখানে লাউয়ের দানা পুঁততেন, লাউগাছ ঘরের চালায় ছড়িয়ে যেত। ওই কালো-কালো ছাগলনাদির সারের খেলা। অনেক লাউ হত। ও-বাড়ির অন্য ঘরে ওই লাউ বিলি হত। আমাদের ঘরে তো আসতই।
অনেকে পোষা কুকুরকে বাইরে হিসি করাতে নিয়ে যায়। বড়পিসেমশাই ঘরের ছাগলদের নিয়ে যেতেন হিসি করাতে। বাচ্চাদের হিসি করানোর সময়ে মায়েরা যেমন জিভে শিস্ধ্বনির মতো এক ধরনের আওয়াজ করে, যে-আওয়াজটা অক্ষর সাজিয়ে বলা যাবে না, তেমন আওয়াজই করতেন এবং আশ্চর্য— ছাগলেরা হিসিও করত। তাই বলে ঘরের ভিতরে কি করত না? করত। পিসিমা জল দিয়ে ধুয়ে দিত।
এতসব কথা এল, কারণ এই চালাঘরের বাড়িটা ভাঙা হল ১৯৬৪ সাল নাগাদ। বাড়ির টিন, ছোট জানলা, কাঠের পাল্লা, কিছুই বিক্রি করলেন না মেজপিসেমশাই। আমার বাবাকে দিয়ে দিলেন। আমাদের একটা জমি কেনা হয়েছিল বিরাটিতে। খুব কম দামে, নীচু জমি। পুকুর কাটিয়ে জমি উঁচু করা হয়েছিল। জমি কেনার টাকাটা ধার দিয়েছিলেন— এই মেজপিসেমশাই জাহ্ণবীজীবন। এবার টিনের চালা, পাল্লা— এ-সবও দিলেন। তারপর ওইসব টিনের চালা ইত্যাদি দু’ভাগ করা হল। কারণ ওই জমি কেনা হয়েছিল আমার বাবার মেজমামার সঙ্গে। মেজমামার নাম উপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। বাবার চেয়েও অনেকটাই বড়, তবে বাবার সঙ্গে খুব ভাব। বাবার মামা যেহেতু, আমার দাদু। থাকতেন চিৎপুরে। ওরিয়েন্টাল সেমিনারির স্কুল-লাগোয়া একটা বাড়িতে। অবশ্যই ভাড়াবাড়ি। এই দাদুকে ডাকতাম চিৎপুরের দাদু।এই চিৎপুরের দাদুর সঙ্গে আমার বাবার মিলিত প্রয়াসে তৈরি হচ্ছিল, ফেলে আসা দেশের বাড়ির একটা ছেলেমানুষি রেপ্লিকা। পুকুর, সুপুরি গাছ, নারকোল গাছ, চালতা গাছ, আম-কাঁঠাল গাছ…সবই অল্প-অল্প করে। কম-কম করে। গাছগুলো যখন বড় হয়ে সেজে উঠতে শুরু করছে, তখন বন্যার পরে সব নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে অবশ্য এই সব পুকুরটুকুর জমিজমা সবই হাতছাড়া হয়ে যায়। এক চিটিংবাজের পাল্লায় পড়েছিলেন বাবা। ‘বাস্তুকথা’ নামে একটা উপন্যাস এ-নিয়েই লিখেছিলাম।




