রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমানী

‘বাবা, আমার ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সে ভাগ্যবানই আমার ধর্ম। যে ধর্ম চিরদিন আমাকে জীবনের সব ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে, অবজ্ঞার আস্তাকুরের পাশে আমাকে ফেলে রেখে দিয়েছে সে ধর্মের মধ্যে আমি তো দেবতার প্রসন্নতা কোনদিন দেখতে পেলুম না। আমি প্রথম ভালোবাসা পেলুম বাপজান, তোমার ঘরে….. সেই ভালোবাসার সম্মানের মধ্যে তাকেই আমি পুজো করি। তিনি আমার দেবতা, তিনি হিন্দু নন, মুসলমানও নন। তোমার মেজো ছেলে করিম, তাকে আমি মনের মধ্যে গ্রহণ করেছি। আমার ধর্ম কর্ম ওরই সঙ্গে বাঁধা পড়েছে…আমার না হয় দুই ধর্মই থাকল।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘মুসলমানীর গল্প’ (১৯৪১)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবন-সায়াহ্নে এসে লিখছেন ‘মুসলমানীর গল্প’। এই আখ্যানের কাঠামো, কাহিনি বা সারবত্তা হয়তো আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বড় ব্যতিক্রমী মনে হয়। বিশেষত, লাভ জিহাদ বা ‘কেরালা স্টোরি’-র বয়ানে বিশ্বাস রাখা মানুষজন এই গল্পকে হয়তো blasphemous বা ধর্মবিদ্বেষী বলেও দাগিয়ে দিতে পারেন। যদিও এর পাঠ-প্রতিক্রিয়া লেখা বা সাহিত্য সমালোচনা করা এই প্রবন্ধের মূখ্য উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সব ছোটগল্পের মধ্যে, এই কিঞ্চিৎ কম-আলোচিত আখ্যানটি আজ কেন ফিরে পড়া যেতে পারে? তাই নিয়েই কিছু কথা বলা যাক। 

যাঁরা ‘গল্পগুচ্ছ’ পড়েছেন, তাঁদের একবার মনে করিয়ে দেওয়া যায় সদ্য-বিবাহিতা কমলার কথা। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন যে, রাতের অন্ধকারে মধুমোল্লার ডাকাতের পাল্লায় পড়ে শেষ পর্যন্ত কমলা রক্ষা পায় হবির খাঁর উদ্যোগে। বিবাহের পর জঙ্গলে পালকি নিয়ে যাওয়ার সময় লুটেরার দল আক্রমণ করলে হবির তৎক্ষণাৎ দস্যুদের মোকাবিলা করে এবং মেয়েকে সস্নেহে নিয়ে যান তার রাজপুতানি মহলে। এই আটমহলা বাড়ির বর্ণনা দিতে গিয়ে রবি ঠাকুর এক সহাবস্থানের দৃশ্য তুলে ধরেছেন। যে-মহলে একদিকে হয় শিবপুজো আর অন্যদিকে নামাজ পাঠ। বড় অদ্ভুত প্রান্তিকতা সেখানে; সমাজচ্যুত মানুষরা এক টুকরো আশ্রয় খোঁজে ধর্ম, জাত বা শ্রেণির রেষারেষি বাদ দিয়ে। ব্রাহ্মণের মেয়ে কমলা, যে আঁটোসাঁটো পরিবেশে অবহেলায় বড় হয়েছে কাকার কাছে, সে হবির খাঁর তত্ত্বাবধানে এসে অবশেষে বলার সুযোগ পায়: ‘বাবা আমার ধর্ম নেই, আমার দেবতা হিন্দুও নন, মুসলমানও নন।’ রবীন্দ্রনাথ যখন কমলার এই উক্তিকে খুব যত্ন করে নিজের গল্পে স্থান দিচ্ছেন, সময়টা কিন্তু ১৯৪১-এর আশপাশে। তিনি মারা যাওয়ার পর এই গল্প প্রকাশিত হলেও ধরে নেওয়া যায় এটি ১৯৪০-’৪১-এর মধ্যেই লেখা। এই রচনার অনুপ্রেরণা যে তৎকালীন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে, তাও সহজে অনুমান করা যায়।  

এ-ব্যাপারে সম্পাদকীয় বয়ান কিছুটা তুলে দেওয়া যায়:

“এই লেখাটি পূর্ণাঙ্গ ছোটগল্প নয়। গল্পের খসড়া মাত্র। এটি প্রথম রচিত হয়। ২৪/৬/৪১ তারিখে পরে ২৫।৬/৭১ তারিখে পরিবর্তিত হয়। এই খসড়াটি রোগশয্যায় রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে বলে গিয়েছেন, অন্যেরা লিখে নিয়েছেন। এর পূর্ণরূপ তিনি দিয়ে যেতে পারেননি। এইটিই তাঁর শেষ গল্প রচনার চেষ্টা। তাঁর কাহিনী রচনার প্রথমদিকে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় এবং অত্যন্ত ঘটনামূলক প্লট রচনার ঝোঁকও দেখা যায়। এই অসম্পূর্ণ গল্পের প্লটটিতে এ দুয়ের ছাপ রয়েছে। এই খসড়া গল্পের ঠিক পূর্ববর্তী রচনা, ‘প্রগতি সংহার’ এবং ‘শেষ কথা’ ও ‘তিনসঙ্গী’-র গল্পগুলির সঙ্গে এর মিল কম। এই প্রসঙ্গে শ্রীপ্রমথনাথ বিশীর ‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প’ গ্রন্থের পরিশিষ্টে শ্রীপুলিনবিহারী সেন সঙ্কলিত রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের ইতিহাস দ্রষ্টব্য।”

আরও পড়ুন : থিয়েটারকে ভালবেসে চূড়ান্ত অপমানিতও হয়েছেন রামকিঙ্কর! লিখছেন সায়ন ভট্টাচাৰ্য…

তিন ও চারের দশক ভারতের ইতিহাসকে সাম্প্রদায়িকতার চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। ১৯২৬, ’৩০ বা ’৪১ সালে ধারাবাহিকভাবে আমরা ঢাকা শহরে দাঙ্গা দেখতে পাই। এমন অস্থিরতার সাক্ষী থাকে কলকাতাও। এই শহরের এক মাড়োয়ারি বাড়ি থেকে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯২৬-এ আর্যসমাজ কর্তৃক মসজিদের দোরগোড়ায় গান পরিবেশন, এছাড়া আরও নানা ধর্মীয় উস্কানিতে কলকাতার গার্ডেনরিচ, মেটিয়াবুরুজ বা হাওড়া ছিল সরগরম। এমন রাজনৈতিক আবহে, রবীন্দ্রনাথের হাতেগড়া চরিত্র কমলা আর হবির খাঁ যে আসলে বাস্তব অবস্থার বিপরীতে গিয়ে এক স্বাধীন, মুক্ত জীবনের স্বপ্ন দেখার চেষ্টা, এটা বোঝা খুব দুরূহ নয়। তবে শুধু স্বপ্ন নয়, রবিঠাকুর মনে করেছিলেন যে তাঁর ছেলেবেলায় যেভাবে হিন্দু-মুসলিম সৌহার্দ্য ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক, সেই সহজ সম্পর্কে অচিরেই ঘুণ ধরেছে। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথাতেও আমরা বারবার যে প্রান্তিক চরিত্রগুলি দেখতে পাই, কাঁচি বেদেনি থেকে আব্দুল মাঝি, তারা হঠাৎ করে কীভাবে এক-একটা ধর্ম, জাত বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে থেকে যেতে পারে, এই প্রশ্ন নিশ্চয়ই তাকে ভাবিয়েছিলে। ১৮৯৫ সালে এক প্রবন্ধে তিনি লিখছেন যে, শৈশবে এমন দৃশ্য প্রায়শই দেখা যেত, যেখানে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়েরা, তাদের প্রতিবেশী ব্রাহ্মণ ঠাকুরাণীদের কোলেপিঠে মানুষ হয়েছে। শ্রেণির তারতম্য নিশ্চই ছিল, কিন্তু ধর্ম নিয়ে এত মাতামাতি ছিল না। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন: 

‘তাহারা নবপার্জিত আর্য অভিমানকে শজারুর শলাকার মতো আপনাদের চারিদিকে কন্টকিত করিয়া রাখিয়াছেন, কারো কাছে ঘেষিবার জো নাই… হঠাৎ হিদুঁয়ানি, অত্যন্ত অস্বাভাবিক উগ্রভাবে প্রকাশ হইয়া পড়িয়াছে।’ (‘হিন্দু ও মুসলমান’, ১৮৯৫)  

এখানে ‘নব উপার্জিত আর্য অভিমান’ কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ওরিয়েন্টালিস্টদের জবানবন্দিতে সভ্য-অসভ্যের মাপকাঠি, আর্যতত্ত্বের সঙ্গে ভারতীয় হিন্দুদের যোগসাধন এবং ভাষাতাত্ত্বিক উৎস খুঁজে-খুঁজে বাঙালি হিন্দুদের আর্যরূপে উন্নীত করার চেষ্টা যে আসলে সমাজে নানা মেরুকরণ তৈরি করতে পারে, তারই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। উইলিয়াম জোন্স, ম্যাক্সমুলার বা হাবার্ট রিসলির বিবিধ তত্ত্ব বাংলা পত্রপত্রিকায় আলোচিত হতে থাকে উনিশ শতকের শেষদিক থেকে। এই বয়ানকে কাজে লাগিয়ে মুসলিম, আদিবাসী, চণ্ডাল বা আরও নানা গোষ্ঠীদের যে সমাজে পৃথক করে রাখা যায়, নিজেকে সর্বোত্তম প্রতিপন্ন করে, এই কথা রবীন্দ্রনাথ বারবার বলেছেন। তিনি লক্ষ করেছেন, যে মানুষগুলো, আব্দুল মাঝির মতো সহজে, স্বচ্ছন্দে ইলিশ মাছ আর কচ্ছপের ডিম এনে দিত, তাদের ক্রমশ সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় সখ্য ভুলিয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষের চারা গজাচ্ছে। তিনি বলছেন, আমার দেশ থেকে অনেক দূরে তুরস্ক সাম্রাজ্যে অটোমান সুলতান কী করল, তিনি কী খান, কে তার পাচক— সেই প্রসঙ্গ টেনে এনে যখন পাশের বাড়ির মুসলমান প্রতিবেশীকে ঘৃণা করা হয়, তখন এই প্রবৃত্তি অত্যন্ত আশঙ্কা জাগায়। তাঁর ‘হিন্দু ও মুসলমান’ প্রবন্ধে এই নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা চোখে পড়ে। আজও কি আমরা দেখি না, আমাদের পড়শি, নিকট বন্ধু বা পাশের বাড়ির অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষকে প্রতিবেশী দেশের কর্মকাণ্ড দিয়ে বিচার করার প্রবল তাগিদ?  

১৯০৪ সালে, ঠিক বঙ্গভঙ্গের আগেই রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ‘স্বদেশী সমাজ’। এই রচনায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি কীভাবে বজায় থাকল শত-শত বছর ধরে, তার সন্ধান করছেন লেখক। তিনি লিখছেন যে, উগ্র হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সর্বদা সংযোগস্থল তৈরি করে এসেছে নানকপন্থী, কবিরপন্থী ও নিম্নশ্রেণির বৈষ্ণব সমাজ। অর্থাৎ গ্রামীণ বাতাবরণে, নানা অন্ত্যজ শ্রেণির আচার-ব্যবহারে মিলেমিশে গেছে ধর্মের কঠিন বাধা। মেলা, গান, কবিতা, মেঠো বা কৃষিজ সংস্কৃতিতে সূক্ষ্মভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না, কোথায় একটি ধর্ম শেষ হয়ে আরেকটি ধর্ম শুরু হয়ে যায়। এই সমন্বয়বাদ বাংলায় এককালে ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এমন লোকাশ্রয়ী পথ ধীরে-ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ১৯৩৬ সালে অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন: 

‘পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের ব্যবহারে একটা অদ্ভুত জেদ বেড়ে উঠছে… মসজিদের সামনে দিয়ে হিন্দু শোভাযাত্রায় বাজনা বাজিয়ে চলা…. কিছুক্ষণের জন্য মসজিদের উপাসকদের প্রতি শ্রদ্ধা করে বাজনা না হয় বন্ধ রাখাই হতো, এরকম রফানিষ্পত্তি অত্যন্তই সহজ… (কিন্তু) শোভাযাত্রীদের হাতে মসজিদের সামনে এলেই ঢাকে কাঠির দ্বিগুণ প্রবল হয়ে ওঠে… দেবভক্তি ছাড়িয়ে গিয়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ নিজের দেবতারই অবমাননা করে… আমি তো ছিয়াত্তরে পা দিয়েছি… শেষ কয়েক বৎসরই সাম্প্রদায়িক দুর্বুদ্ধির উত্তেজনা প্রবল হয়েছে দেখতে পাই।’ (২৮/৭/১৯৩৬)

যুবা বয়সে যে রবীন্দ্রনাথকে স্বদেশি আবহে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির বাণী প্রচারে দেখা যেত, যে আশাবাদ তাকে কিছুটা হলেও প্রাণবন্ত করে রেখেছিল, সেই মানুষটিরই নানা আশঙ্কাবাণী ১৯৩৬ থেকে ’৪১-এর মধ্যবর্তী লেখায় আমরা খুঁজে পাই। অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা চিঠিতে যে ধর্মীয় উস্কানির উল্লেখ করছেন কবি, পরধর্মের উপাসনালয়ের সামনে বিকৃত আস্ফালনের বিবৃতি দিচ্ছেন, তা একেবারে বাস্তব ঘটনা থেকে গৃহীত। এই চিঠি লেখার ঠিক ১০ বছর আগেই, কলকাতায় আর্যসমাজের একটি মিছিল, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে, মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে নামগান করায় এপ্রিল থেকে জুলাই মাস অবধি দাঙ্গা চলে এই শহরে। যদিও এই লড়াই বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে ছিল না। ঐতিহাসিক সুরঞ্জন দাস দেখাচ্ছেন যে, বাংলায় মুসলিমরা আক্রমণ করেছিল শ্বেতাঙ্গ অফিসার, মাড়োয়ারি ও ভাটিয়া বণিকদের ওপর। একজন মুসলিম নেতাকে এই সময় বাঙালি হিন্দুদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়:

‘তোমাদের সাথে আমাদের কোন সমস্যা নেই, আমরা এখানকার মাড়োয়ারীদেরকে শুধু সমূলে উৎখাত করে বিকানের ও যোধপুরে পাঠিয়ে দিতে চাই।’ (অমৃতবাজার পত্রিকা: মে, ১৯২৬)। 

কমলা তার কাকার বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে ঠাঁই পেয়েছিল হবিরের মহলে, সেখানে প্রৌঢ় ব্রাহ্মণকে নিয়ে পূজাঅর্চনা করতে কোনও বাধা ছিল না। এই বাড়ি তার ওপর কখনও কিছু চাপিয়ে দেয়নি, বরং অনেক বছর পর কমলা তার খুড়তুতো বোনকেও হবির খাঁ-র মতো ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। এই বাড়ি আর সেখানকার মুক্তমনা মানুষগুলোকে নিজের মানসপটে এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

দয়ানন্দ সরস্বতীর উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল বোম্বাইয়ের আর্যসমাজ। সেই মিছিলের আস্ফালনে বাঙালি হিন্দুদের না জড়িয়ে, সরাসরি লড়াই চলেছিল অবাঙালি গুজরাটি-মারোয়ারি বাণিয়াদের বিরুদ্ধে। এই সংঘর্ষ ছিল শ্রেণি, ভাষাকে কেন্দ্র করেও, শুধু ধর্মভিত্তিক নয়। যদিও এই লড়াইয়ের চরিত্রগত দিক পাল্টে গেল ১৯৪০-এর পর থেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পরিবর্তন সম্যকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। হিন্দু পুনরুত্থানবাদী আন্দোলন যে ভারতীয় মুসলমান, শিখ বা ব্রাহ্মদের আরও একঘরে করে দেবে সে কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। বুদ্ধদেব বসুকে ১৯৩৭ সালে লেখা একটি চিঠিতে তিনি বলছেন: 

“বন্দেমাতরম ব্যাপারটা নিয়ে বাঙালি হিন্দু সমাজে যে উন্মত্ত বিক্ষোভের আলোড়ন হয়েছে,এ আমি কখনো কল্পনাও করিনি…  বিস্মিত হবার বোধশক্তি এখনো ভোতা হয়ে যায়নি…তুমি কি বলতে চাও ‘ত্বং হি দুর্গা, কমলা কমল দল-বিহারিনী, বাণী বিদ্যাদায়িনী’ স্তব সর্বজাতিক গান (হিসেবে) গলাধঃকরণ করাতেই হবে!” (২৮/১২/১৯৩৭)

নেশন বা জাতীয় জীবন বলতে আমরা যা বুঝি, সেখানে কোনও একটি ধর্মকে যে বড় করে দেখা হচ্ছে; ব্রাত্য থেকে যাচ্ছে নিচুতলার বিশ্বাস, অন্ত্যজ শ্রেণির প্রথা, প্রান্তিক মানুষের আচার সেই কথা বারবার চিঠি, পত্রিকা বা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাই তাঁর একেবারে শেষ জীবনে রচিত ‘মুসলমানীর গল্প’ আদতে একটা স্বপ্ন বা মুক্তির স্বাদের ন্যায় প্রতিপন্ন হয়। গল্পে বর্ণিত আটমহলা রাজপুতানি বাড়ি, যেখানে হবির খাঁ থেকে কমলার শিবলিঙ্গ সবকিছুই নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে থাকতে পারে পাশাপাশি, সেই বাড়ি যেন একটা আদর্শ ভারতের খোঁজ দেয়। কমলা তার কাকার বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে ঠাঁই পেয়েছিল হবিরের মহলে, সেখানে প্রৌঢ় ব্রাহ্মণকে নিয়ে পূজাঅর্চনা করতে কোনও বাধা ছিল না। এই বাড়ি তার ওপর কখনও কিছু চাপিয়ে দেয়নি, বরং অনেক বছর পর কমলা তার খুড়তুতো বোনকেও হবির খাঁ-র মতো ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। এই বাড়ি আর সেখানকার মুক্তমনা মানুষগুলোকে নিজের মানসপটে এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন যে, এমন ভালবাসার দেশ হাতড়ালে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু গল্পে তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলে ক্ষতি কী?