সেলুলয়েডের স্বদেশ
সেলুলয়েডের স্বদেশ দেখতে ঠিক কেমন হয়? বিশেষ করে, ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন পেরিয়ে, একটা রক্তাক্ত দেশভাগ আর লক্ষ-লক্ষ বাস্তুহারা মানুষের বোঝা নিয়ে যে-দেশটা সবে তার স্বাধীন আত্মপরিচয় তৈরি করছে, তাদের সিনেমা কেমন হওয়ার কথা?
১৯৫৮ সালে ভারতের স্বাধীনতার বয়স যখন মাত্র ১১ আর দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা সবে দু’বছরে পা দিয়েছে, বলিউডের প্রযোজক-পরিচালক রমেশ সেহগাল বানালেন ‘ফির সুবাহ হোগি’। ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর ছায়ায় তৈরি ছবিটায় একটা গান ছিল, ‘চিন ও আরব হামারা/হিন্দুস্তান হামারা/রহেনে কো ঘর নহি হ্যায়/সারা জাঁহা হামারা।’ মহম্মদ ইকবালের ‘তারানা-এ-হিন্দ’-এর বিখ্যাত কবিতা পণ্ডিত রবিশঙ্করের সুরে যা স্বাধীন ভারতে অন্যতম রাষ্ট্রীয় গান হয়ে উঠেছিল, সেই ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’-কে মাথায় রেখেই তীব্র তির্যক স্যাটায়ারে তাকে খান-খান করেছিলেন গীতিকার সাহির লুধিয়ানভী। সুর দিয়েছিলেন খৈয়াম আর রাজ কাপুরের ঠোঁটে গানটা গেয়েছিলেন মুকেশ।
আরও পড়ুন: বাংলা গানে যেভাবে তৈরি হয়েছিল স্বদেশের ভাষ্য! লিখছেন শ্রুতি গোস্বামী…
গানের দৃশ্যায়নে আমরা দেখি মধ্যরাতের মুম্বই মহানগরী। রাস্তা দিয়ে চলেছেন রাজ কাপুর, তাঁর চিরচেনা চ্যাপলিন-প্রাণিত ‘ট্র্যাম্প’-বেশে। সেই কোট-প্যান্টুলুন-জুতো। আছে সারি-সারি মানুষ। পর পর মন্তাজে বার্তাটা স্পষ্ট। স্বাধীন ভারতে, দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাঝামাঝি সময়েও হাজার-হাজার নাগরিক গরিব মানুষের মাথার ওপর ছাদ নেই— ‘রহেনে কো ঘর নহি হ্যায়/সারা জাঁহা হামারা।’

সারাদিন ঘাম-ঝরানো ন্যায্য মজুরি নেই। পেট ভরানোর খাবার নেই। গানের সঞ্চারীতে এসে আমরা জেনে যাচ্ছি, কোট-প্যান্টুলুন পরা নায়কও আসলে এই গৃহহীনদেরই দলে। রাস্তার ধারে ‘সারে জাঁহা’-ই তাঁর ঘরবাড়ি-ঠিকানা। গানে লিপ দিতে-দিতেই নায়ক যখন কোটটা খুলে, জুতোজোড়াটাকে মাথার কাছে সামলে রেখেই ঘুমনোর আয়োজন করছেন, তখন ফুটপাতেরই বাসিন্দা, এক শিক্ষিত বেকার যুবক, গানের মাঝখানেই প্রশ্ন করে— ‘আরে ভাই, আমাদের হাল কি চিরকাল এমনই থাকবে? দিন বদলাবে না?’ আভোগে পৌঁছে, গণনাট্য সংঘ ও প্রগতি লেখক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য, পাক্কা কমিউনিস্ট সাহির সে-উত্তরটাও দিয়ে দেন। মুকেশের একটু ধরা, বসা, উদাসী, মাদকতাময় কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, ‘মিলজুলকে ইয়ে ওয়াতানকো/অ্যায়সে সাজায়েঙ্গে হাম…।’ এই লাইনগুলোয় লিপ দিতে-দিতে রাজ কাপুরের মুখেও যেন ঝলমলাচ্ছে সেকুলার-সমাজতান্ত্রিক ভারতীয় সংবিধানের শপথ— দিন বদলাবেই! মানুষ বদলাবে। ‘এক ভোট এক দাম’-এর রাজনৈতিক সমতায় ভর করেই নতুন ভারত কোনওদিন পৌঁছে যাবে সামাজিক-অর্থনৈতিক সাম্যেও।
বিশ শতকের পাঁচের দশকে বলিউড নেহরু-জমানাকে তখনও তুখোড় সমালোচনায় বিঁধছে, আবার ভরসাও রাখছে। ওই গোটা দশক শাসন করছেন বলিউডের যে নায়ক-ত্রয়ী, সেই রাজ কাপুর, দেব আনন্দ ও ইউসুফ ‘দিলীপ কুমার’ খান— এই তিনজনেরই কেরিয়ার শুরু হচ্ছে স্বাধীনতার বছরের প্রায় গা ঘেঁষেই। আর ঘটনাচক্রে তিনজনেরই আদি বাড়ি দেশভাগের পর থেকে যাচ্ছে সীমান্তের ওপারে, মানে সাবেক পশ্চিম পাকিস্তানে। এর মধ্যে পেশোয়রি দিলীপ আর রাজকে তো প্রায় পাড়াতুতো বন্ধুই বলা যায়। দুজনে খুব ছোটবেলায় একসঙ্গে গলি-ক্রিকেট খেলেছেন। খান আর কাপুর পরিবারের সখ্যও ছিল অনেকদিনের। ফলের ব্যবসায়ী খান পরিবার দেশভাগের পর বোম্বাই প্রদেশ তথা ভারতবর্ষেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। স্কুলবেলা থেকে দিলীপ কুমারের লেখাপড়া মহারাষ্ট্রেই। রাজ কাপুরও বাবা পৃথ্বীরাজের ভ্রাম্যমাণ থিয়েটারদলের সঙ্গে দেশের নানা জায়গায় ঘুরেছেন। কিশোরকালে কলকাতাতেও কাটিয়ে গেছেন বছর ছয়েক। কাপুরদের তাই সেই অর্থে উদ্বাস্তু পরিবার বলা যায় না। একইভাবে দেব আনন্দের জন্মস্থান শাজারগড় তহসিল, দেশভাগের পরে পাক-পাঞ্জাবে চলে গেলেও বা লাহোর কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট হলেও, তাঁকেও সর্বস্ব খুইয়ে বাস্তুহারা হয়ে এপারে আসতে হয়নি। এঁরা তিনজনেই কোনওদিন পর্দায় বা পর্দার বাইরে পাকিস্তান-বিরোধী রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক মুখ হিসেবে ব্যবহৃত হননি। ১৯৯৮-এ দিলীপ কুমার পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান নিশান-এ-ইমতিয়াজ পাওয়ার পরে ঠাকরের শিবসেনা কিছু উৎপাত করলেও দিলীপ কুমার বিশেষ পাত্তা দেননি। বরং প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারীর সঙ্গে রীতিমতো আলোচনা করে তাঁর অনুমোদন নিয়েই তিনি প্রতিবেশী দেশের খেতাব গ্রহণ করেছিলেন। এই বাজপেয়ীজিই বছর দু’তিন পরে ‘শত্রু’-ভূমিতে মৈত্রীযাত্রায় সফর সঙ্গী করেছিলেন পাক-পাঞ্জাবের আদি বাসিন্দা দেব আনন্দকে।



জাতিরাষ্ট্রের ধরন-গড়ন, চলন-ফেরনের সঙ্গে রুপোলি পর্দার চিরকালীন আইকনদের সম্পর্ক-সমীকরণ যদি বিশ শতকের শেষ বা একুশ শতকের গোড়াতেও এত স্পর্শকাতর থাকতে পারে, তাহলে পাঁচ বা ছয়ের দশকের নায়ক-ত্রয়ী যখন জনপ্রিয়তার চূড়ায়, তখন নতুন একটা নেশন নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাঁদের ‘অফ’ বা ‘অন দ্য স্ক্রিন’ সম্পর্কে কত রকমের পরত থাকতে পারে, আন্দাজ করে নিন। এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া ভাল, সিনেমার বাইরে এই নায়ক-ত্রয়ীর সঙ্গে দেশের নায়ক জহরলাল নেহরুর সম্পর্ক ছিল যথেষ্ট মধুর, স্নেহ-শ্রদ্ধা-বন্ধুত্বে মাখামাখি। কিন্তু পর্দায় এঁরা তিনজনই ‘নেহরুর হিরো’ নন! সেই অভিধাটা শুধু দিলীপ কুমারের জন্যই বরাদ্দ। হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী অর্থনীতিবিদ-লেখক লর্ড মেঘনাদ দেশাই-এর বিখ্যাত বই ‘নেহরু’স হিরো: দিলীপ কুমার ইন দ্য লাইফ অফ ইন্ডিয়া’ বইটির সুবাদেই এই কয়েনেজটি আলোচনায় এসেছে বা জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু দিলীপ কুমারের পর্দা-ব্যক্তিত্বের বিবর্তন শুনেই লর্ড দেশাই স্বাধীন ভারতের নির্মাণপ্রক্রিয়া ও সেখানে নেহরুর ভূমিকার সঙ্গে সেলুলয়েডে নির্মিত স্বদেশের বয়ান বা ন্যারেটিভকে অন্বিত করেছেন।
পাঁচের দশকের মাঝামাঝি অবধি দিলীপ কুমার ছিলেন বলিউডি প্রণয়-শোকগাথার বিষাদ সম্রাট, ‘ট্র্যাজেডি কিং’। দাঙ্গা-দেশভাগের রক্তনদী, দুস্তর ট্রমা পেরিয়ে এদেশের যৌবনও তখন ‘দাদার’ বা ‘দেবদাস’-এর নায়কের মতোই হতাশা-অবসাদ-বিভ্রান্তি-অনিশ্চয়তার আঁধারগলিতে পথ হারাচ্ছে। এই সময়েই, ১৯৫৩-এ দিলীপ কুমার একটি ছবি করছেন, ‘ফুটপাথ’। এ-ছবির নায়ক ছোট কাগজের কম মাইনের সাংবাদিক, নুন আনতে রোজই পান্তা ফুরোয়। রোজগারের হাল ফেরাতে নায়ক নোশু খাদ্যশস্য আর জীবনদায়ী ওষুধের কালোবাজারি-মজুতদারি পাপের পাতালে তলিয়ে যায়। তারপর এক ভয়ানক মহামারীর সময়ে, চারপাশে তার চেনা ঝুপড়ি-ফুটপাথের অসহায়-গরিব মানুষদের কুকুর-বেড়ালের মতো মারা যেতে দেখে তার হুঁশ ফেরে। বিবেকের কামড়ে সে আইনের জালে ধরা দেয়। প্রসঙ্গত বলা যায় ২০২০-র কোভিড-অতিমারীর সময়ে ১৯৫৩-র এই ছবিতে দিলীপ কুমারের সংলাপ সমাজমাধ্যমে নতুন করে ভেসে ওঠে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, সদ্য-স্বাধীন দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আসল দাম, বাজার থেকে আচমকা চল-আটা-কেরোসিন উধাও হয়ে যাওয়ার বিষচক্রের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে নেহরু কালোবাজারি মুনাফাখোর মজুতদারদের ল্যাম্পপোস্টে লটকানোর নিদান দিয়েছিলেন আর নেহরুর নায়ক ‘ফুটপাথ’-এ সেই সমস্যাটাই আমজনতার সামনে নিয়ে এলেন।

আবার ১৯৫৭-এ দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস যখন কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে, কেরলে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় চলে এসেছে, তখনই মুক্তি পাচ্ছে দিলীপ কুমারের ‘নয়া দৌড়’। আসলে ১৯৫১-’৫৬, নেহরু-শাসনের এই পর্বটাকে মোটামুটি ‘ইউফোরিয়া’ বা উচ্ছ্বাস-উল্লাসকাল বলা যায়। নতুন সংবিধান, সোভিয়েত মডেলে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা— নেহরুর চোখে তখন অনেক স্বপ্ন, ‘ভিশন’! জনগণের মনে অনেক আশাভরসা। ভারী শিল্প, বড় বাঁধ, প্রত্যেক হাতে কাজ, শুখা মরশুমেও প্রতি খেতে সেচের জল। সুজলাং-সুফলাং… মাতরম! কিন্তু জনসাধারণের সঙ্গে নেহরু তথা শাসক কংগ্রেসের সেই মধুচন্দ্রিমা-পর্ব দ্রুত ফুরোতে থাকে। মধুর স্বাদ, জ্যোৎস্নার আলো ফিকে হতে থাকে। বলিউডের সিনেমায় এই মোহভঙ্গের কিছু-কিছু ঝলক দেখা যাচ্ছিল, সেটা আমরা আগেও বলেছি। রাজ কাপুরের ‘রাজু দ্য ট্র্যাম্প’ খানিকটা সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে (সৌজন্যে চিত্রনাট্যকার, ইপটা-র সদস্য, খাজা আহমেদ আব্বাস) ‘আওয়ারা’-‘শ্রী ৪২০’-এ গরিব-বড়লোকের অসাম্য, অভাব, অনটন, অশিক্ষা, আদালতে-এজলাসে বিচারের বাণীর নীরবে নিভৃতে কেঁদে মরা যাওয়া নিয়ে খোঁচা দিয়ে চলছিল। এমনকী স্টাইল-আইকন দেব আননন্দের ‘বাজি’, ‘জাল’, ‘সিআইডি’-র মতো ‘বম্বে নয়্যার’ ঘরানার ছবিগুলোতেও শহুরে শিক্ষিত বেকারের হতাশা, অপরাধের পথে পা বাড়ানো, প্রশাসন তথা সমাজের উঁচুতলার দুর্নীতির নানা চেহারা উঠে এসেছে।
কিন্তু ‘নয়া দৌড়’-এ দিলীপ কুমার, নেহরুর নেশন নির্মাণ প্রক্রিয়াকে একটা অন্তর্দর্শন বা আত্মশুদ্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। দ্রুত শিল্পায়নের তাড়াহুড়োয় গ্রামভারত যেন পিছিয়ে না পড়ে, তাকে যেন ভুলে যা যাওয়া হয়, তার কণ্ঠস্বর যেন শোনা হয়। ‘নয়া দৌড়’-এর প্রতিটা ফ্রেম, প্রতিটা সংলাপ যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দাবির পক্ষে একটা ইস্তেহার। নেহরুর বিজ্ঞানভিত্তিক, শিল্পনির্ভর আধুনিক ভারতের ধারণার সঙ্গে গান্ধিজির গ্রাম-স্বরাজের ভাবনা জুড়ে একটা অন্যধারার মিশ্র অর্থিনীতির প্রকল্পের কথাই যেন বলতে চাইল ‘নয়া দৌড়’। একইসঙ্গে ছবিতে গ্রামের মানুষের যৌথ শ্রম আর উদ্যোগে একটা আস্ত রাস্তা তৈরি করে ফেলাটাও যেন সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে গ্রামের গরিবের চাষিকে যুক্ত করার একটা রাষ্ট্রীয় ইচ্ছাপূরণ। নেহরুর হয়ে নেহরুর নায়কই যেন তার সেলুলয়েড ভাষ্যটা তৈরি করে ফেললেন। এই সমবায় শ্রম, নতুন ভারত গড়ার নেহরুবাদী স্বপ্নের সঙ্গে গ্রামের মানুষকে সংযুক্ত করার একইরকম প্রণোদনা বা প্রেরণা আমরা দেখতে পাচ্ছি নার্গিস-সুনীল দত্তর ছবি ‘মাদার ইন্ডিয়া’-য়। আর কে ব্যানার-কে আলবিদা জানিয়ে নার্গিস তখন প্রযোজক-পরিচালক মেহবুব খানের শিবিরে। সেই মেহবুব স্টুডিয়ো, যার প্রবেশপথের লোগোয় ছিল হাতুড়ি আর কাস্তের সাজেশন!

এই ১৯৫৭ সালেই ‘নয়া দৌড়’ আর ‘মাদার ইন্ডিয়া’র সঙ্গে কয়েক মাসের এদিক-ওদিকে মুক্তি পেয়েছিল গুরু দত্ত-র ‘পিয়াসা’। অন্য দুটি ছবিতে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচনার পাশাপাশি সংঘশক্তিতে বলীয়ান হয়ে দেশ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান ছিল, সেখানে ‘পিয়াসা’র কবি-নায়কও সমাজব্যবস্থার প্রতি হতাশ, বিরক্ত, বিক্ষুদ্ধ। কিন্তু সমষ্টির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সমাজ পালটানোর বদলে তিনি নিজেই ক্রুশকাঠ বয়ে নিয়ে চলেছেন। ‘নয়া দৌড়’-এর জন্য যে-সাহির ‘সাথি হাত বাড়ানা’র মতন গান লিখেছিলেন, ‘পিয়াসা’র জন্য তিনিই লিখলেন ‘জিনা না হ্যায় হিন্দ পর’। প্রথম গানে যেখানে নেহরুর গণতান্ত্রিক সমাজবাদের আদর্শ জনতার মুখরিত সখ্যে উজ্জ্বল, সেখানে ‘পিয়াসা’র গানে সেই উন্নয়নের ঘুড়ি যেন কলকাতার নিষিদ্ধপল্লির ক্লেদ আর অপমানের মাটিতে আছড়ে পড়ে। ছবির শেষ গানেও যখন সাহির ‘জ্বালা তো ইসে/ ফুঁক ডালো ইয়ে দুনিয়া’র মতো আগুনে লাইন লেখেন, সেটাও শেষাবধি এক নিঃসঙ্গ, রোম্যান্টিক কবির একক-বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত বিদ্রোহই থেকে যায়। কোনও বিপ্লবের জন্ম দেয় না।
সদ্য-স্বাধীন দেশে, বিনোদনশিল্পের হৃৎকেন্দ্র বলিউড সেটার প্রয়োজনও দেখেনি। রাষ্ট্রব্যবস্থাকে তাঁরা যেমন সম্পূর্ণ ক্লিনচিট দেননি, তেমনই নেশন নির্মাণের প্রক্রিয়া থেকে মুখ ফিরিয়েও থাকেননি। সাদায়-কালোয়, ভাল-মন্দে তৈরি হয়েছে সেলুলয়েডের স্বদেশ। অবশ্যই তার একটা ছক, নকশা, মতাদর্শ ছিল। অবশ্যই তা প্রতিষ্ঠানবিরোধী ছিল না, কিন্তু নেহাতই রাষ্ট্রের মর্জিমাফিক অর্ডার সাপ্লাইও ছিল না। সেখানে পর্দায় আধা বা উত্তর সত্যনির্ভর একের পর এক ‘ফাইলস’ বানানো বা কোনও সর্বশক্তিমান ‘ধুরন্ধর’ নিরাপত্তা উপদেষ্টার এজেন্ট-জীবনের ‘মনোরম কাহানিয়া’ নির্মাণের দায় ছিল না। তাই দেশভাগের বেদনা বুকে নিয়ে মুম্বইতে আসা জনৈক উদ্বাস্তু যুবক যশরাজ চোপড়ার প্রথম ছবি ‘ধুল কা ফুল’-এর জন্য সাহির যখন গানে লেখেন, ‘তু হিন্দু বনেগা না মুসলমান বনেগা/ইনসান কি আওলাদ হ্যায়/ইনসান বনেগা’, তা কোনও ছদ্ম ধর্ম-নিরপেক্ষতা থাকে না। বরং, বলা যায়, ১৯৫৯ সালে লেখা ওই গানের লাইন ‘তু বদলে হুয়ে ওয়াক্ত কা পহেচান বনেগা’, এই আশা আর প্রতিশ্রুতি থেকেই আমাদের স্বদেশ অনেক দূরে চলে এসেছে।




