ক্যামেরা, লাবন, কচুইল্যা
আমার দাদুর কোনও ছবি তোলা নেই। ক্যামেরা না থাকার কারণেই মূলত কোনও ছবি ওঠেনি। তবে রাঙাদা কিছু ছবি তুলেছিল, তার কিছু কপি আমার কাছেও ছিল, সব বিবর্ণ ও নষ্ট। এখনকার এ আই হয়তো অনেকটাই উদ্ধার করে দিতে পারত, কিন্তু সেইসব ছবি কোথায় আছে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আমাদের বিরাটির বাড়িতে দাদুর ছবি দেওয়ালে ঝুলত, বাবা প্রণাম করতেন। সেটা রয়েছে আজও। রাঙাদারই তোলা। রাঙাদা মানে আমার পিসতুতো দাদা, যে আমেরিকা চলে যায় ১৯৬৬ সালে। প্রথমে এমএস, তারপর পিএইচডি। ওখান থেকেই পোলারয়েড ক্যামেরা নিয়ে আসে, ওই ক্যামেরায় রঙিন ছবি উঠত, এবং প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই প্রিন্ট পাওয়া যেত। একটা বিশেষ ধরনের মোটা কাগজ ক্যামেরাতে ঢুকিয়ে ওরকম রঙিন ছবি তোলা যেত। বেশ খরচসাপেক্ষ ব্যাপার।
তার আগেই অবশ্য রঙিন ফিল্ম বেরিয়ে গেছে। প্রথম বাংলা রঙিন চলচ্চিত্র সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ১৯৬২-তে। রঙিন ফিল্মের প্রচুর দাম ছিল, খালি ফিল্মেই শেষ নয়, ডেভেলপ করানো এবং প্রিন্ট নেওয়া ব্যাপক খরচসাধ্য ছিল। এখনকার ডিজিটাল প্রজন্ম ভাবতেই পারবে না সেই ব্যয়বাহুল্যের কথা। ১৯৯০ সালে ৩৬টা ছবি ওঠে এমন একটি কোডাক বা ফুজি কোম্পানির রিলের দাম ছিল ৬০ টাকা, ডেভেলপ এবং প্রিন্ট নিয়ে ছবিপিছু সাত-আট টাকার মতো খরচ পড়ে যেত। একটা রিলকে ছবিতে পরিণত করতে ৩০০ টাকার বেশি খরচ পড়ে যেত। আমার তখনকার এক সপ্তাহের মাইনের সমান। এখন কথায়-কথায় মোবাইল নিয়ে খচাৎ। হয়ে গেল ছবি। কল্পনা করা যেত না। রাত্তিরে ছবি তোলার খরচ অনেক বেশি। ফ্ল্যাশ বাল্ব কিনতে পাওয়া যেত, একটু দামি ক্যামেরার সঙ্গে ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালাবার ব্যবস্থা থাকত। ক্যামেরার শাটার টিপলেই ফ্ল্যাশ বালব জ্বলে উঠত। একটা বালব একবারই মাত্র ব্যবহার করা যেত। এক-একটা বালবের একজ্বলা জীবন। আট-দশ টাকা দাম ছিল। রাত্তিরে ছবি তোলা খুব বড়লোকদের ব্যাপার ছিল।
যাই হোক, দাদুর যে-ছবিটা আছে, সেটা গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়িতে তোলা। পিছনে মেরুনের ওপর গাঢ় হলুদ-হলুদ ফুল-ফুটে-থাকা কার্পেট। মেজ পিসেমশাই রেঙ্গুন থেকে এনেছিলেন। ওই কার্পেটটাই সরস্বতী পুজোর সময়ে প্রতিমার পেছনে রাখা হত। আবার কোনও-কোনও বিশেষ সময়ে মেঝেতেও পাতা হত।
আমার দাদুর কোনও ছবি তোলা নেই। ক্যামেরা না থাকার কারণেই মূলত কোনও ছবি ওঠেনি। তবে রাঙাদা কিছু ছবি তুলেছিল, তার কিছু কপি আমার কাছেও ছিল, সব বিবর্ণ ও নষ্ট। এখনকার এ আই হয়তো অনেকটাই উদ্ধার করে দিতে পারত, কিন্তু সেইসব ছবি কোথায় আছে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
আমার দাদুর কিছু প্রিয় খাবার ছিল— একটা হল ‘লাবন’। এই খাদ্যটা হয়তো পৃথিবী থেকেই লুপ্ত হয়ে গেছে। খই গুঁড়ো করে গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে সঙ্গে ঘি, সামান্য নুন এবং গোলমরিচ মিশিয়ে সেই মণ্ডটা একটা ছোট পিতলের বাটিতে (যে-বাটিতে পুজোর সময়ে চন্দন বেটে রাখা হয়) রেখে পাথরের নোড়া দিয়ে বাড়ি মেরে যেন বেশ একটা গোলাকৃতি চাকতি তৈরি করা হয়। চৈত্র সংক্রান্তিতে এটা করার নিয়ম ছিল। ওই ‘লাবন’-কে একটা কৌটোর মধ্যে খইয়ের গুঁড়োর সঙ্গে রেখে দেওয়া হত। আমার ঠাকুমা এটা করত, কিন্তু মা ভাল পারত না। দাদুকে বলতে শুনেছি, ‘লাবন উপভোগের দিন গেছে গিয়া। অহনকার বউ-ঝিরা লাবন বানাইতে পারে না।’ আসলে পূর্ব বাংলায় ডাল ছিল না, গম ছিল না, ফলে সুজি-ময়দা-বেসন এইসব ছিল না। গরু ছিল ঠিকই, কিন্তু পর্যাপ্ত দুধ ছিল না। কারণ বছরে চার-পাঁচ মাস মাঠগুলো জলে ভরা থাকত, গরু চরবে কোথায়? ফলে অন্য ধরনের খাবার তৈরির নানা ফন্দি-ফিকির আবিষ্কার করতে হয়েছিল।
আমার কোনও আত্মীয়স্বজন এই ‘লাবন’-এর নাম জানে না। গুগলে সার্চ দিয়ে যদিও এই খাদ্যটার ছবি পাওয়া যাবে, কিন্তু ‘কচুইল্যা’ পাওয়া যাবে না। শুকনো মানকচু, খই, গুড়, মরিচ ওই একইরকমভাবে মণ্ড করে ছাঁচে ফেলে করা। এতে সামান্য গলা কুটকুট করে। ওটাও নাকি আনন্দদায়ক অনুভূতির মধ্যে পড়ে ব্যক্তি ও সমাজবিশেষে। যেমন তেতো খাবার ছোটবেলায় ভাল লাগত না, বয়সকালে লাগে। শুঁটকি মাছের গন্ধ অনেকেরই ভাল লাগে না, অনেকেরই লাগে। জৈন ধর্মের মানুষ মাছের গন্ধই সহ্য করতে পারে না, অনেকের এই গন্ধেই আবার পরমানন্দ। আমাদের জিহ্বা, স্বাদকোরকগুলি নোনতা, টক, মিষ্টি, তেতো ইত্যাদি স্বাদে উদ্বেল হয়। ঝাল তাকে উত্তেজিত করে, আবার জিভ-তালু-গাল এরা নমনীয়তা বোঝে, তাই কেকের ক্রিম ও পাঁউরুটির মাখন ইত্যাদি তাকে স্বস্তি দেয়। ঠান্ডা-গরমও বিশেষ একটা অনুভূতি। ‘উমামি’ নামে একটা অনুভূতিকে জাপানি স্বাদ-বিশারদরা ব্যাখ্যা করেছেন, এটা একটা স্বাদরহস্য। একটা অন্য অনুভূতি, যেটা মাশরুম-পনির-চিজ ইত্যাদিতে আছে। স্বাদের সঙ্গে যোগ হয় গন্ধ। এছাড়া চট্টগ্রাম-নোয়াখালি অঞ্চলের কিছু মানুষ বোধহয় ওই গলা-চুলকুনি পছন্দ করতেন বা করেন। দাদু ওই ‘কচুইল্যা’-ও পছন্দ করতেন। ঠাকুমা ও তাঁর ভইনডি-রা এলে বানানো হত। আমার একদম ভাল লাগত না, বাবা-কাকাদেরও নয়। কাঁঠাল খেতে খুবই ভালবাসতেন দাদু। হাতের তালুর চারটে আঙুলের ওপর রসালো কাঁঠালের কোয়া রেখে বুড়ো আঙুলের চাপে কী এক আশ্চর্য কায়দায় কাঁঠালের রস বের করতেন। সেই রস দুধের বাটিতে পড়ত। দুধ, কাঁঠালের রস, সঙ্গে খই। আর একটা খাবার খুব প্রিয় ছিল, গোল খোপযুক্ত মাটির সরার উনুনে বসিয়ে তাতে চালের গুঁড়ি গোলা দিলে গোল-গোল সামান্য ফাঁপা একটা খাদ্য তৈরি হয়। ওটাকে ‘চিতল পিঠা’-ও বলা হত, আবার ‘সরা পিঠা’-ও। নারকোল-কোরা এবং খেজুর গুড় দিয়ে তৈরি এই খাবারটা বিশেষভাবে পছন্দ ছিল আমার দাদুর।




