ডেটলাইন : পর্ব ৫৮

চৈতন্যর জন্মস্থান

সবে ঘুম ভাঙছে শহরের। ঢাকা থেকে রাতভর ভলভো বাসে সিলেটে নামলাম ভোরের আলো গায়ে মেখে। মনেই হল না, এই প্রথম এলাম। এমনভাবে রিকশাওয়ালাকে বললাম, ‘সাধনা ঔষধালয়ের বাড়ি যাব’, যেন মাঝেমধ্যেই যাই। আসলে আমাদের বর্ণিত পরিবারের, মানে যাকে বলে ‘এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি’, যাঁরা দেশভাগের আগে বা পরে ওপারে থেকে গেছেন, সিলেট শহরের তালতলায় তাঁদের বাড়ি অনেক পুরনো আর ‘সাধনা ঔষধালয়’ তাঁদের ষাট বছরের ভাড়াটে। ফলে মুখে-মুখে ওরকম নাম হয়েছে। ট্রাভেল শো-এর শুটিং-এ সিলেট যাব শুনে তাঁরা উচ্ছ্বসিত, তাই ‘নিজের বাড়িতেই’ থাকতে হবে, হোটেলে নয়। এখানে বলে রাখি, কখনও সিলেটিদের উচ্ছ্বাসের ভাষা শুনে বিভ্রান্ত হবেন না। যেমন আমি বাড়িতে পা রাখামাত্র অশীতিপর গৃহকর্ত্রী আবেগে ভেসে গেলেন, ‘কী সর্বনাশ, মন্টুর মাইয়া আইছে ইন্ডিয়া থিক্যা!’ এই ‘সর্বনাশ’ শব্দটা আমরা ব্যবহার করি বিপদ ঘটলে, কিন্তু সিলেটের মানুষের অতিরিক্ত খুশির প্রকাশ এটা। রামায়ণের সিলেটি ভার্সন শুনে আমার মনে হয়েছে, এর থেকে জার্মান ভাষায় ‘রামায়ণ’ শুনলে আমি বেশি বুঝতে পারতাম।

ঢাকার মানুষ বলেন, সিলেট তো বড়লোকের শহর। সত্যিই তাই! আসলে সিলেটের প্রায় প্রতিটি বাড়ির কেউ না-কেউ বিলেত-আমেরিকায় থাকে। বিশেষ করে, লন্ডনের পুবদিকের পাড়াগুলোতে ঘুরলে আপনার মনে হবে, একটুকরো সিলেট। বাঙালি খাবারের রেস্তরাঁগুলোতে খাঁটি বাংলাদেশি মেনু— সিলেটের বিখ্যাত শুঁটকি মাছ আর ছালন পাবেন। একসময় অতলান্ত সাগর পাড়ি দেওয়া সিলেটি নাবিকদের ভরসা ছিল একথালা ভাতে একটুখানি ছালন। প্রচুর শুকনো লঙ্কা দিয়ে শুঁটকি মাছ বাটা। আমি নাম দিয়েছি পটাশিয়াম সায়নাইড, আমার মতো নিরীহ জিভে ছোঁয়ালেই শেষ। সিলেটের শপিং মল বা কন্ডোমোনিয়ামগুলোতে গেলেই শোনা যায়, ডলার-পাউন্ডের পানঝনানি। বিশাল শুঁটকির বাজারে আলাপও হল বেশ কয়েকজন নন-রেসিডেন্ট বাঙালির সঙ্গে। আসলে আমাদের ক্যামেরা দেখে ওরাই এগিয়ে এসে আলাপ জমালেন। চিনিয়েও দিলেন, কোনটা লইট্যা, কোনটা ফাইস্যা, কোনটা হিদল। সঙ্গে উদার নেমন্তন্ন, ‘বাসায় আসেন, কত পদ খাহবেন শুঁটকির, শুধু কন!’

আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগারের সন্ধান দিয়েছিলেন এক বিহারি রিকশাওয়ালা!
পড়ুন ‘ডেটলাইন’ পর্ব ৫৭…

সে আর যাওয়া হয়নি অবশ্য, কিন্তু অনাহূত হয়ে গেছিলাম এক বিয়েবাড়িতে। আমাদের পাশের বাড়ির মেয়ের বিয়ে। ট্রাভেল শোয়ে সিলেটি বিয়ে সুপারহিট হয়েছিল। কলকাতায় সিলেটি হিন্দু পরিবারের বিয়েতে এত বিস্তারিত আচার না মানা হলেও, মূল ব্যাপারটা এক, দেখলাম। ফুল দিয়ে সাজানো কুঞ্জের মাঝখানে চেয়ারে বর বসে, কনে পায়ে হেঁটে তাকে সাতপাক ঘোরে। তারপর বর দাঁড়ায়, মালাবদল হয়। সিলেটি বিয়ের সবচেয়ে সুন্দর দুটো জিনিস, আবিরের আল্পনা আর ধামাইল গান। মনে আছে, ওই বিয়েবাড়িতে ধামাইল গাইতে এসেছিলেন টুকটুকে ফরসা এক বৃদ্ধা, যাঁর রীতিমতো নামডাক আছে সিলেটে। আমরা তাঁর গান পরে রেকর্ড করেছিলাম। ‘সোহাগ চাঁদ বদনী ধনী নাচো তো দেখি’ বা ‘ভাল কইরা বাসা গো দোতারা, সুন্দরী কমলা নাচে’-র মতো চেনা গানের বাইরেও আছে ধামাইলের বিশাল সম্ভার। ‘সখি ঢেউ দিও না জলে, আমার ভাঙিয়া যাইব গাঙের চুলি’ গানটা যে কী অসাধারণ গেয়েছিলেন মাসিমা।

এই সিলেটের রাস্তাতেই সেবার হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেছিল আর এক গানপাগল মানুষের সঙ্গে, মৌসুমী ভৌমিক। তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশনের বৃত্তিতে লোকগীতি নিয়ে গবেষণার কাজে গেছিলেন সিলেটে, হাওরের গান সংগ্রহ করতে। সিলেটের একটা বড় সৌন্দর্য এই হাওর, বিশাল জলাভূমি, বর্ষীয় সাগরের মতো দেখায়।

ঢাকায় যখন আপনার ফ্লাইট নামে, নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন বিমানবন্দরের নাম। হজরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিখ্যাত সুফি সাধক শাহ জালাল চোদ্দ শতকে সম্ভবত ইয়েমেন থেকে এসেছিলেন সিলেটে, সঙ্গে ছিল বিশাল আউলিয়ার দল। সেই দলে ছিলেন তাঁর ভাগ্নে ও প্রধান শিষ্য শাহ পরাণ। তাঁরা ইসলাম প্রচার করেছিলেন সিলেটে। তাঁদের মাজার আছে সিলেটে, দেশ-বিদেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ আসেন। আবার এই সিলেট শহরের প্রান্তে ঢাকা দক্ষিণ নামের জায়গাটা বিখ্যাত চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্য। তাঁর বাবা জগন্নাথ মিশ্রর বাড়ি ছিল এখানেই। বিদ্যা অর্জনের জন্য নবদ্বীপ গেলেও শচী দেবীকে বিয়ের পরই জগন্নাথ ফিরে যান ঢাকা দক্ষিণে। এখানকার মন্দিরের পূজারী আমাকে বললেন, এটা মহাপ্রভুর জন্মস্থান। আমি সঙ্গে-সঙ্গে প্রতিবাদ করলাম, সে তো আমাদের দেশে, নবদ্বীপে। তিনি জানালেন, শচীমাতার গর্ভসঞ্চার হয়েছিল ঢাকা দক্ষিণে। আসলে কাহিনিটা এরকম। জগন্নাথের মা শোভা দেবী স্বপ্ন দেখেন, তাঁর নাতি হয়ে আবির্ভাব ঘটবে স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণর। কিন্তু তার আগেই যেন জগন্নাথ ও শচী চলে যান নবদ্বীপে। তাঁরা চলে যাওয়ার আগে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন শোভা দেবী, ভবিষ্যতে নিমাই আসবে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। এসেছিলেন গৌরাঙ্গ। ঠাকুমা তাঁর বংশীবাদন মূর্তি দেখে আপ্লুত হয়েছিলেন। ছোট টিলার ওপর গাছগাছালি-ঘেরা নিরিবিলি প্রায়গায় সাদামাটা মন্দির। কৃষ্ণ, মহাপ্রভু, তাঁর পূর্বসূরিদের মূর্তি আছে। কেমন যেন মনে হল, ভক্তির থেকেও ভালবাসায় মাখামাখি এই জায়গাটা।

বলেছিলাম না, বাংলাদেশের সব শহরের একটা করে নিজস্ব নদী আছে। সিলেটে সেই নদীর নাম সুরমা। সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশ, গায়ক নির্মলেন্দু চৌধুরীর দেশ, ছড়াকার অমিতাভ চৌধুরীর দেশ। ওঁদের জীবনযাপনে এমনভাবে জড়িয়ে ছিল শিকড়ের টান যে লেখায়, কথায়, স্মৃতিতে ফিরে ফিরে আসত সুরমা নদী, শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান, ধামাইলের সুর। ‘যুগান্তর’ খবরের কাগজের সম্পাদক অমিতাভ চৌধুরীর কাছে আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। কলেজে পড়তেই নিয়মিত লেখার সুযোগ দিয়েছিলেন। দক্ষিণ কলকাতার রানিকুঠিতে ওঁদের বাড়িতে প্রতি রবিবার দারুণ আখড়া বসত। কত পেশার কত বিখ্যাত মানুষ আসতেন সেই দুপুর গড়িয়ে যাওয়া আড্ডায়। আমি সবচেয়ে ছোট বয়সে, কিন্তু বেশ পাত্তা পেতাম। সেই লোভেই মনে হয়, রবিবারের আডডা একদম মিস করতাম না। আর একটা আকর্ষণ ছিল অমিতদার (শান্তিনিকেতনের স্টাইলে জ্যাঠামশাইয়ের বন্ধুকে ‘দাদা’ বলতাম) মায়ের মানে আমি যাঁকে ঠাকুমা বলতাম, তাঁর হাতের রান্না। গর্ভমোচা থেকে চিতোই পিঠে, এত স্বাদ ওঁর রান্নার হাতে। এখন আর পুরনো সিলেটিরা নেই, তবে প্রতি বছর এই কলকাতাতেই বেশ জাঁকজমক করে হয় শ্রীহাটু সম্মিলনী, সিলেটিদের মিলনমেলা।

সিলেটের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন অনেকে। বাংলাদেশের প্রাচীনতম ভূমি বলে দাবিও করা হয় সিলেটিকে। একসময় নাকি কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মণ হিউয়েন সাঙকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে পরিব্রাজকের জাহাজ ভিড়েছিল শিলিতাচোল বলে একটা জায়গায়, যার নাকি পরে সিলেট নাম হয়। গবেষণায় নাকি এও জানা গেছে যে, আরবরা বাণিজ্য করতে চীন যাওয়ার পথে সিলেট বন্দরে বিশ্রাম নিত। পাঠান, মুঘল হয়ে বিটিশ শাসনে সিলেট ছিল অসমের অংশ। দেশভাগের সময় গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পাকিস্তানে চলে যায়। এই প্রাচীনত্ব নিয়ে রীতিমতো গর্ব আছে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সিলেটিদের। মনে আছে, অনেক বছর আগে লন্ডনে জানুয়ারির এক জবুথবু সন্ধেয়, যে-কোনও মুহূর্তে বরফ পড়ার ভয় উপেক্ষা করে এক অল্প-চেনা প্রবীণ এসেছিলেন বহু পথ পেরিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে, শুধু একটাই কারণে, আমার পূর্বপুরুষ সিলেটের মানুষ। আমি খাঁটি ভারতীয়, সিলেটের প্রতি আমার বিরাট কোনও আবেগ নেই, সেটা মুখ ফুটে বলতে পারিনি সেদিন, এতই আপ্লুত দেখাচ্ছিল তাঁকে।

তারাপুরে শহিদ ফলক

কয়েকদিনের সিলেট-বাসে একবার আমি সত্যিই আবেগে ভেসেছিলাম, তারাপুর চা-বাগানে দাঁড়িয়ে। একশো বছরের বেশি সময় ধরে এই চা-বাগান আমাদের পরিবারের একটি শাখার মালিকানায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের এক বিকেলে কয়েকজন পাক সেনাকে নিয়ে রাজাকাররা আসে এখানকার বাংলোয়, বলে, চা খেতে এসেছি। এরপর পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে যেতে বলা হয়। তাঁদের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে, যাতে যুদ্ধের বাজারে সমস্যা না হয়। আমাদের পরিবারের সাতজন আর চা-বাগানের ৩২ জন কর্মীকে তাঁদের কোয়ার্টার থেকে ডেকে পাঠিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আর্মি ক্যাম্পে। একটু পরেই সবাইকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। কী এক অজ্ঞাত কারণে, আমাদের পরিবারের সাতজনের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে ছোট শঙ্করকে ছেড়ে দেয় পাক মেজর। শঙ্কর ফিরে গেলে সেই রাতেই মুক্তিবাহিনীর সাহায্যে শিশুদের নিয়ে বাড়ি ছাড়েন মহিলারা। শোক করার সময়টুকুও ছিল না, টানা কয়েকদিন হেঁটে পৌঁছন ভারতে। শঙ্কর ভারতেই ডাক্তারি পাশ করে ব্রিটেনে গিয়ে খুব নাম করেন। স্বাধীনতার পর সরকার তারাপুর টি-এস্টেট অধিগ্রহণ করলেও পরে শেখ হাসিনা ফেরত দেন ডা. শঙ্কর গুপ্তকে। ২০২০ সালে আমরা যখন সিলেট গেলাম, ৭০ ছুঁই-ছুঁই শঙ্কর গুপ্ত সতেজ, রীতিমতো পরিশ্রম করে চা-বাগানের দেখভাল করেন। নিজেই নিয়ে গেলেন শহিদ বেদির সামনে, যেখানে লেখা আছে দীর্ঘ তালিকা, সেই অভিশপ্ত দিনের দুঃসহ স্মৃতি।

সিলেটের সেরা জায়গা জাফলং। শহর থেকে ঘণ্টাদেড়েকের পথ। এপারে তামাবিল, ওপারে ডাউকি। ভারতের মেঘালয় সীমান্তে খাসিয়া-জয়ন্তিয়া পাহাড়ের নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে পিয়াইন নদী। কাচের মতো স্বচ্ছ নীল জল। তাতে বড়-বড় পাথর। অজস্র নৌকো থেকে সেই পাথর সংগ্রহ চলছে। অদ্ভুত দৃশ্য। প্রবল বর্ষায় শিলং পাহাড় থেকে ডাউকি নদীর খরস্রোতে ভেসে আসে শিলা। দূরে ঝুলন্ত সেতু, বাংলাদেশের সম্পত্তি নয়, ভারতের। মেঘালয়ের ডাউকির সেই হ্যাঙ্গিং ব্রিজ হালকা কুয়াশায় মোড়া, যেন স্বপ্নের ভেতর উঁকি দিয়ে যাওয়া। আমার মনে হল, আহা, এই নদীটুকু পেরলেই আমার দেশ, চলে যাই নৌকো বেয়ে। ট্যুরিস্টদের মহা উৎসাহে দুই পাহাড় জোড়া দেওয়া সেই সেতু দেখান মাঝি। সঙ্গে গান ফ্রি, তাল রাখে জলে ভেজা নুড়ির ঠকঠকি। ‘মন বাগানে ফুইটাছে ফুল বন্ধু রে তুই জানলি না/ ভুল মানুষের হহলি আপন/ আমার আপন হইলি না।’ পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে সেই মেঠো সুর যেন হাহাকারের মতো শোনায়। কে না জানে, অ-শিক্ষিত গলায় বিরহের গান প্রাণ পায় বেশি।