দেশাত্মবোধক : ১

স্বদেশের গান

‘চারমূর্তি’ ছায়াছবিতে একটা উদ্ভট দৃশ্য ছিল। বইয়ের সঙ্গে, বা বাকি গল্পের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। কৈশোরের গোড়াতেই যে টেনিদা-প্যালা-ক্যাবলা-হাবুলদের চিনেছি, তারা যে হারমোনিয়াম বাজিয়ে মান্না দে-র কিন্নরকণ্ঠে গান গাইতে পারে, এমন অবিশ্বাস্য ব্যাপার দেখে ভুরভুরিয়ে হাসি পেয়েছিল। কিন্তু গানটা ভুলতে পারিনি। ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো’। শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা, অজয় দাসের সুর। বড় মধুর, বড় উদ্দীপক। বড় করুণ, বড় তেজি। এ গান প্রথম আমায় অনুভব করিয়েছিল, দেশের মাটিতে কত মায়া…

সূত্রপাত
রামনিধি গুপ্ত লিখেছিলেন, ‘নানান্ দেশের নানান্ ভাষা, বিনা স্বদেশীয় ভাষা পূরে কি আশা’। ভাষাসত্তার সঙ্গে জাতিগত অনুভূতির যে যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি, তার প্রভাব ছিল দূরগামী। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে নতুন নাগরিক বাংলা গান যে-ক’টি প্রধান খাতে তৈরি হচ্ছিল, তার মধ্যে একটি হল জাতি ও দেশভাবনার গান। ১৮৬৭ সাল, হিন্দুমেলার প্রতিষ্ঠা ও সংলগ্ন কার্যকলাপের মধ্যে ছিল নতুন দেশের গান নির্মাণ। সে সময় এই গানগুলির দু’টি ধারা। প্রথমটিতে শেকল পরার গ্লানি, দ্বিতীয়টিতে শেকল ভাঙার উত্তাপ। একদিকে করুণ রস, অন্যদিকে বীররস। একদিকে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মলিন মুখচন্দ্রমা ভারত তোমারি, রাত্রিদিবা ঝরিছে লোচনবারি’। অন্যদিকে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাজ রে শিঙা বাজ এই রবে, সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে’। দেশের যন্ত্রণাকে ঘিরে আক্ষেপ, আর্তি, হাহাকার যেমন স্বাভাবিক, তেমনই চোখের জল মুছে মুক্তির ঝোড়ো হাওয়াও প্রত্যাশিত। হেমচন্দ্রর ‘ভারত সঙ্গীত’ গানে সেই ঝড়ের শিঙা বেজেছিল।

একবার শুধু জাতিভেদ ভুলে,
ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণ বৈশ্য শূদ্র মিলে
করি দৃঢ়পণ এ মহীমণ্ডলে
উড়াও আপনার মহিমা-ধ্বজা!

আরও পড়ুন : সুকান্ত ভট্টাচাৰ্যর কবিতা কি আজও প্রাসঙ্গিক? লিখছেন সংযুক্তা বসু…

ভুবনমনোমোহিনী
এই দুই মনোভঙ্গির সমান্তরালে, বা সংশ্লিষ্ট হয়েই আরও একটি দেশগানের ধারা গড়ে ওঠে। যে-দেশ অসহায়, পীড়িত, রুগ্ন— পরিস্থিতি যে সমূহকে নিঃসম্বল করে রেখেছে— তার অন্তর্গত বৈভবকে আবিষ্কার করা। সেই ঐশ্বর্যের মহিমাতেই জেগে ওঠা যাবে আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেদের সচেতনভাবে স্থাপিত করার সাহস জোটানো যাবে। তাই সেই সম্পদের কথা মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করা, আক্ষরিক অর্থে মহিমাকীর্তন। এই সূত্রেই দেখি রবীন্দ্রনাথের ‘সার্থক জনম আমার’, ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘আমার সোনার বাংলা’, বা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্যপুষ্পভরা’, ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’, কিংবা অতুলপ্রসাদের ‘উঠ গো ভারতলক্ষ্মী’, ‘বলো বলো বলো সবে’। উনিশ শতকের নয়ের দশক থেকে স্বদেশি আমল, বিশ শতকের একেবারে প্রথম ১০-১৫ বছরের মধ্যে লেখা হয়েছে এই গানগুলি। পরপর পড়লেই বোঝা যায়, মোটামুটি কিছু সাধারণ উপকরণ ব্যবহার করে চলেছিলেন কবি-গীতিকাররা। তার মধ্যে একটা দিক হল রূপমুগ্ধতার দিক। ১৮৭৫-এ বঙ্কিমচন্দ্র শুভ্রজ্যোৎস্নাবিধৌত পুলকিত ভারতরাত্রির উজ্জ্বলমধুর সৌন্দর্যে আবিষ্ট হচ্ছেন, ১৯০৫-এ রবীন্দ্রনাথ বলছেন ‘কোন্‌ বনেতে জানি নে ফুল গন্ধে এমন করে আকুল’, দ্বিজেন্দ্রলাল বলছেন, ‘এত স্নিগ্ধ নদী কাহার, কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়’, ১৯৩৪-এ নজরুল বলছেন, ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী,/ ফুলে ও ফসলে কাদামাটিজলে ঝলমল করে লাবণী।’ যে ‘শ্যামলবরণ কোমল মূর্তি’-তে ভারতজননী আবির্ভূত হচ্ছেন রবীন্দ্রকল্পনায়, সেই একই জননীকে দ্বিজেন্দ্রলাল দেখছেন ‘সকল দেশের সেরা’ হিসেবে। 

সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে
গানগুলির আরেক দিক হল বহুত্ববাদের। রূপমুগ্ধতা যদি প্রশস্তির উপাদান হয়, এই দিকটি তবে প্রশংসার লক্ষ্য। ভারত কেবল তার অনন্য প্রকৃতি আর সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্যেই ‘জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন’ পাবে না, তার বহুত্ববাদী চেতনাটি অদ্বিতীয়, ওটিই নিখিলবিশ্বে আদৃত। চারণকবির গানে ভারতমাতার গোষ্ঠীনিরপেক্ষ মূর্তিটি যেভাবে চিহ্নিত হয়, সেই মূর্তি বিশ শতকের ভারতের নতুন রাজনৈতিক আবহে অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।

নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান,
বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।

অতুলপ্রসাদের এই কথা প্রায় স্লোগানের মতো সর্বগ্রাহ্য হয়ে ওঠে সেকালে। যে যুগে এই সম্প্রদায়-সম্মিলন একাধারে অধরা ও অনিবার্য, সেই যুগে নজরুল লিখেছিলেন—

হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী, বলো ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র

যে ‘এক’ হওয়ার বার্তা ১৯০৫ সালে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ১৯১০-এ সেই ঐক্যের ঘোষণা করেন ভারত-তীর্থ কবিতায়, তথা গানে। শুধু হিন্দু-মুসলমান নয়, আর্য-অনার্য, শক-হুন-দল-পাঠান-মোগল, ভারতভূমি যে সকলকেই একীভূত করেছে, এই কল্পনা তাঁর ছিল। যে রাষ্ট্র আজ বিচিত্র সব কাগজ, নিয়ম আর হিসেবের খেলায় মানুষকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে সীমারেখার ওপারে, সেই রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত বলে গৃহীত গানের প্রথম স্তবক ঘোষণা করেছিল সেই সমন্বয়ের কথা—

হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী…

পুরাতন এ পুরবে
আন্তর্জাতিক মহলে যখন তিব্বত, চিন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পিছিয়ে পড়ছে, রমরমিয়ে উঠছে ইউরোপিয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের পতাকা, তখন কমলাকান্তের আড়ালে বঙ্কিম বলেছিলেন “…আমাদের দেশ ইংরেজি মুলুক হইয়া এ বিষয়ে বড় গণ্ডগোল বাধিয়া উঠিয়েছে। ইংরেজি শাসন, ইংরেজি সভ্যতা ও ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ‘মেটিরিয়াল প্রস্পেরিটির’ উপর অনুরাগ আসিয়া দেশ উৎসন্ন দিতে আরম্ভ করিয়াছে। ইংরেজ জাতি বাহ্য সম্পদ বড় ভালবাসেন—ইংরেজি সভ্যতার এইটি প্রধান চিহ্ন—তাঁহারা আসিয়া এদেশের বাহ্য সম্পদ সাধনেই নিযুক্ত—আমরা তাহাই ভালবাসিয়া আর সকল বিস্মৃত হইয়াছি।…”

ইউরোপ তথা পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসী পুঁজিবাদী আত্মকেন্দ্রিক আস্ফালনের বিপরীতে এশীয় দেশগুলির দীর্ঘলালিত সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অধ্যাত্মমুখী চেহারাটিই যে শ্রেয়, তা বারবার প্রকাশ করছেন ভারতীয় দার্শনিক ও প্রাচ্যবাদী ইউরোপীয় দার্শনিকেরা। ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’-ই শুধু নয়, বহু শতক ধরে দয়া, করুণা, মানবিকতার মন্ত্রে উদ্বোধন শিখিয়েছে ভারতবর্ষ নামের এই দেশটা। ১৮৬৮-তে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘মিলে সবে ভারতসন্তান’ গানে এই প্রাচীন ভারতের ‘যশোগান’ গাওয়ার কথাই বলেছিলেন। সে-কথাই পরবর্তী কয়েক দশক ধরে পরের প্রজন্মের গানে ঘুরে-ঘুরে আসে। ‘প্রথম প্রভাত’ এই দেশের আকাশে উদিত হয়, এই দেশের তপোবনেই ‘প্রথম সামরব’ ধ্বনিত হয়, এই দেশের জ্ঞান, ধর্ম, পুণ্যগাথা পৃথিবীতে প্রচারিত। ‘উদিল যেখানে বুদ্ধ আত্মা’, যে দেশে অশোকের কীর্তি স্থাপিত, যে দেশ প্রতাপাদিত্যের জয়গানে মন্দ্রিত, সে দেশের আসন কেমন করে লুণ্ঠিত হয়! যে পূর্বভূখণ্ড মৈত্রেয়ী, খনা, লীলাবতী, সাবিত্রী, অরুন্ধতীদের অম্লান মাহাত্ম্যে বন্দিত, সে হয়ত ‘দুদিনের তরে হীনতা সহিছে’, জাগরুক হবার লড়াই তার জারি আছে। অতুলপ্রসাদের ‘বলো বলো বলো সবে’ গানে যে বাক্যটি ধ্রুবপদ হিসেবে বারবার উচ্চারিত হয়, তা হল— ‘নব দিনমণি উদিবে আবার পুরাতন এ পুরবে’। বিশ শতকের আন্তর্জাতিক ও আন্তর্দেশীয় রাজনীতিচর্চায় এই ‘পুরাতন পুরব’, তথা ঐতিহ্যময় প্রাচ্যের ধারণা বেশ জোরালো।

ত্বং হি দুর্গা…
২০২৬ সালে যে স্তোত্র প্রায় বাধ্যতামূলকভাবে বঙ্গবোধে স্থাপন করা হয়েছে, সে গানের প্রধান অবলম্বন মাতৃকল্পনা। ১৮৭৫-এ লেখা, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’। এই গান যে মায়ের বন্দনা করে, কখনও তিনি দশপ্রহরণধারিণী, কখনও ‘বাণী বিদ্যাদায়িনী’। এই দেবীরূপের কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথও—

ডান হাতে তোর খড়্‌গ জ্বলে, বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ,
দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাটনেত্র আগুনবরণ।
ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।।

এমন মা-কে দেখলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। ‘জননী ভারতবর্ষ’-র পূর্ণ প্রতিকৃতি তাঁর গানে; তিনি ‘জগত্তারিণী’, ‘জগদ্ধাত্রী’, ‘জগন্মোহিনী’, ‘জগজ্জননী’, এই ভারত-ভূগোল তাঁর ভূষণ, তাঁর চরণেই ভারতবাসীর মুক্তি। দেবীর এক রণমূর্তি দেখা যায় সরলা দেবীর ‘রণরঙ্গিনী নাচে’ গানে। এই পরিমণ্ডলের বাইরেও, জনতার আসরে, মুকুন্দ দাস ‘দানবদলনী’ ‘মাতঙ্গী’-র উন্মাদ রণনৃত্য কল্পনা করলেন। কিন্তু অবশ্যই, ‘সাজ রে সন্তান হিন্দু মুসলমান’— সম্প্রদায়বিমুক্ততার এই সতর্কতাটুকু সহ। আরও কয়েক দশক পরে নজরুলের গানে এই মাতৃকল্পনার এক আশ্চর্য বিস্তার ঘটে। ‘ভারত শ্মশান হল মা’- মূলতান রাগে বাঁধা অভাবনীয় বিষাদগম্ভীর সুরে এই গানে এক নতুন ‘শ্মশানবাসিনী’ ‘ছিন্নমস্তা’ রণচণ্ডীর রূপ গড়েন তিনি।

বঙ্কিমের মাতৃভাবনার বীজ তিন-চার দশক ধরে যে পাতা-ফুল-ফল তৈরি করেছিল, তার রং অবশ্য একটু পালটে যায়। দেবীরূপ থেকে মানবীরূপ, অবয়ব-অবলম্বন থেকে অংশত বিমূর্ততা, একটু একটু করে ধরা পড়ে ১৯০৫-পরবর্তী গানে। ১৯০৫-এ অবনীন্দ্রনাথ-অঙ্কিত ‘ভারতমাতা’-র তাপসীরূপ দেবীত্বের রাজসিক গরিমাকে দেখায়নি। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের আবহে সেই মাতৃদেহ আক্রান্ত হবার কল্পনাই জনচেতনাকে সবথেকে বেশি অভিভূত ও প্রাণিত করেছিল। মা তখন একান্তই ঘরের মা। যে দীনতাকে গ্লানিময় ভেবে তার বিপরীতে সমৃদ্ধির ছবি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল এক সময়, সেই দীনতাকে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যে মানসিকতার এক পরিণতি দেখতে পাই। সেখান থেকে এক সহজ, বাস্তব ও কার্যকরী সংযোগ তৈরি করা যায়। রজনীকান্ত সেনের বহুশ্রুত গান ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’-তে যেমন বলা হয়—

আয় রে, আমরা মায়ের নামে এই প্রতিজ্ঞা করব ভাই,
পরের জিনিস কিনবা না, যদি মায়ের ঘরের জিনিস পাই।

সেই একই তানে বেজে ওঠে রবীন্দ্রগানের উচ্চারণ— ‘আমি পরের ঘরে কিনব না আর, মা, তোর ভূষণ বলে গলার ফাঁসি’।

কিন্তু এও মনে রাখি, দ্বিজেন্দ্রলাল যখন লেখেন ‘স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা’— তখন কোনও নারীমূর্তিকে আর দেখতে পাওয়া যায় না। প্রায় এক শতাব্দী পরে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন Imagined Community বলতে এই জাতীয়তার নির্মাণকে চিহ্নিত করেছিলেন। দেশ কেবল এক ভূখণ্ড নয়, মানচিত্র নয়, এমনকী, কেবল দেশবাসীও নয়, তাদের সম্মিলিত ইতিহাস, স্মৃতির সমবায়, ভবিষ্যকল্পনা ও আগামী রূপচিন্তা, দেশ আসলে এই মানস-অবয়ব। 

পাল তুলে দে
কিন্তু কেবল মনোভূমিতেই তো তার অধিষ্ঠান নয়। স্বদেশের যে স্বাধীন ভবিষ্যৎ দেখতে চাওয়া হয়েছে, তার প্রয়োজন স্বশক্তি। সেখানে আছে সংকল্প, প্রত্যয়, শ্রমচিন্তা। স্বদেশি গানেরও ঘটেছে ভক্তিমার্গ থেকে কর্মমার্গে সরণ। এই গানগুলো যাত্রাপথের আনন্দগান। সেখানে আছে স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘লক্ষ ভায়ের দাঁড়ের টানে’, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চল রে চল সবে ভারতসন্তান’, অতুলপ্রসাদের ‘আপন কাজে অচল হলে চলবে না’, রবীন্দ্রনাথের ‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে’। তা আরও বিস্তৃত হয়েছে নজরুল ইসলামের ‘চল্‌ চল্‌ চল্‌’, ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ বা ‘কারার ওই লৌহকপাট’-এর মতো গানে। জল-স্থল-অন্তরীক্ষ জুড়ে সেই পথের সুর, সেই গতির উন্মাদনা, সেই ‘মাভৈঃ’ রবের গভীর হুংকার।

স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মিথ্যার দ্বারাই হউক, ভ্রমের দ্বারাই হউক, নিজেদের কাছে নিজেকে বড়ো করিয়া প্রমাণ করিতেই হইবে এবং সেই উপলক্ষে অন্য নেশনকে ক্ষুদ্র করিতে হইবে, ইহা নেশনের ধর্ম, ইহা প্যাট্রিয়টিজমের প্রধান অবলম্বন।’ নেশন বিষয়ে তাঁর এই নেতিবাচক মনোভাব বহুদিনের অভিজ্ঞতার ফলাফল। জাতীয়তাবোধ যে শুধু ‘বীরগাথার ভূত’ চাপালেই জাগে না, ‘এক করিবার শক্তি’ না থাকলে কোনওভাবেই শুধু অপর-জাতিবিদ্বেষের উন্মাদনা দিয়ে এই বোধ প্রাণিত করে না, তা প্রায় তিরিশ বছর ধরে ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে তাঁর কাছে। সেই সময়েই ‘মেবার পতন’ নামের এক নাটক লিখলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। আর তার জন্যে লিখলেন একটি গান—

কিসের শোক করিস ভাই, আবার তোরা মানুষ হ’,
গিয়েছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ।…
শত্রু হয় হোক-না যদি সেথায় পাস মহৎ প্রাণ,
তাহারে ভালোবাসিতে শেখ, তাহারে কর হৃদয় দান।
মিত্র হোক ভণ্ড যে, তাহারে দূর করিয়া দে,
সবার বড়ো শত্রু সে, আবার তোরা মানুষ হ’।…

ভাববার কথা, এমন একটা সময়ে দেশ যাওয়ার দুঃখকে মুছে ফেলতে বলছেন, উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে মানবতাবাদে দাঁড়াতে বলছেন, ‘স্বজন দেশ ডুবিয়া যাক্‌’ বলে মিথ্যে আত্মমোহকে বিসর্জন দিতে বলছেন দ্বিজেন্দ্রলাল, তা একেবারে উত্তুঙ্গ স্বদেশি আমল। অসহিষ্ণু এই দিনকালে একথা হয়ত আমরা ভাবতেও পারি না। জাতিপ্রেম পেরিয়ে আন্তর্জাতিকতায় কীভাবে যেতে হয়, জানি না, নিজের দেশের ভিতরে ‘বিশ্বময়ীর’, ‘বিশ্বমায়ের’ স্পর্শ কীভাবে পেতে হয়, তাও জানি না। তাই ভাবতে পারি না, ১৮৯৬, বা ১৯০৫, বা ১৯৩০ সালে তৈরি হওয়া গান ১০০-২০০ বছর পেরিয়ে কেমন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকে।

বিশ শতকের চারের দশকের ক্ষুব্ধ সময়ে যে গানে বুক কেঁপে ওঠে, সেই একই গানে কেমন করে দুলে ওঠে সমকাল। একটি দৃশ্যের কথা বলে শুরু করেছিলাম। দু’টি দৃশ্যের কথা বলে শেষ করব। ২০২৪-এর জুলাই। যুববিপ্লবে উত্তাল বাংলাদেশ, গণহত্যা-পরবর্তী হাহাকার, ক্ষোভ, বেদনাকে মুঠোয় ভরে ঝাঁকে ঝাঁকে তরুণকণ্ঠ গাইছে একটি গান। ‘যারা স্বর্গগত, তারা এখনও জানে, স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি,/ এসো স্বদেশব্রতের মহাদীক্ষা লভি’, সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের চরণ চুমি…’, মোহিনী চৌধুরীর কথা, কৃষ্ণচন্দ্র দে-র সুর, ১৯৪৫-এ লেখা। গান কেমন করে সময়ের সমুদ্র পাড়ি দেয়, তা শাসক কোনওদিন জানতে পারে না। 

যে দেশভাগের ইতিহাস যন্ত্রণার, সেই ইতিহাস যখন আজ সাড়ম্বরে সোল্লাসে উদ্‌যাপিত হয়, তখন আবার ১৯৭৪ সালের এক দৃশ্য মনে পড়ে। বঙ্গমাতার ভাঙাচোরা সজল মুখের দিকে তাকিয়ে তোবড়ানো গালের এক প্রৌঢ় গাইছেন— ‘কেন চেয়ে আছ গো মা মুখপানে’। পালটে-পালটে যাওয়া দেওয়ালের রঙের বাহারে বিমুগ্ধ বঙ্গবাসীকে দেখিয়ে দেখিয়ে যেন কেউ বলছে, ‘এরা চাহে না তোমারে, চাহে না যে/ আপন মায়েরে নাহি জানে…’