বিতর্কিত একাদশ: পর্ব ৫

Representative Image

অভিশপ্ত গোলরক্ষক

‘কেবলমাত্র তিনজন ব্যক্তি এক ঝটকায় মারাকানাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন— ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, পোপ দ্বিতীয় জন পল ও আমি’— আলসাইদেস এদগার্দো গিজ্জিয়া।

উরুগুয়ের ইতিহাসবিদ ও ফুটবল লেখক এডোয়ার্ডো গ্যালিয়ানো, তাঁর ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ বইতে লিখেছেন, ‘আপনি কখনও কোনও খালি ফুটবল স্টেডিয়ামের ভিতরে ঢুকেছেন? একবার চেষ্টা করে দেখুন। এবার মাঠের ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে শুনুন। শূন্য স্টেডিয়ামের থেকে আর বেশি শূন্যতা জগৎ-সংসারে কোথাও অনুভব করবেন না। দর্শকহীন গ্যালারির মতো নিস্তব্ধতাও আর কোথাও মিলবে না।’

গ্যালিয়ানোর এই বিবরণ অনুভূত হবে পৃথিবীর প্রতিটা স্টেডিয়ামে, যার ঘাসের ওপর রচিত হয়েছে ফুটবল ইতিহাস। মেক্সিকো সিটির ‘অ্যাজটেকা’ থেকে মন্টেভিডিওর ‘সেন্টিনারিও’, লন্ডনের ‘ওয়েম্বলি’ থেকে মিউনিখের ‘ওলিম্পিক’ স্টেডিয়াম— সর্বত্র। আর রিও ডি জেনেইরোর ‘মারাকানা’ স্টেডিয়ামের শূন্যতায়, সেন্টার সার্কেলে গিয়ে দাঁড়ালে, আজও প্রথম অনুভূত হবে ১৯৫০-এর এক ম্যা্চে, উরুগুয়ের আলসাইদেস গিজ্জিয়ার গোলের পর, অপ্রত্যাশিত শোকে মুহ্যমান গ্যালারির দু’লক্ষ দর্শকের সেই সর্বগ্রাসী কবরের নিস্তব্ধতা! সঙ্গে ভেসে উঠবে হতাশায় ভেঙে পড়া এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের বিষণ্ণ মুখের দৃশ্য।

আর্জেন্টিনার জেতার দরকার নেই! কোন অদৃশ্য হাতছানিতে ঠিক হয়েছিল ১৯৯০ বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ?
পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ৫…

১৯৫০-ই একমাত্র বিশ্বকাপ, যেখানে কোনও ফাইনাল-ম্যাচ ছিল না; ছিল না সেমিফাইনাল বা তৃতীয়-স্থান নির্ধারক ম্যাচ। ফরম্যাটে কোনও নকআউট পর্বই রাখা হয়নি। পুরো প্রতিযোগিতাটাই সাজানো হয়েছিল, দুটো রাউন্ড-রবিন লিগ পর্বে। প্রথমে গ্রুপ লিগ পর্ব। তারপর চারটি গ্রুপ সেরা দলকে নিয়ে চূড়ান্ত পর্বের লিগ-ভিত্তিক খেলা; এই ফাইনাল রাউন্ডের সেরা টিমের মাথায় উঠেছিল বিশ্বসেরার শিরোপা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে তখনও ইউরোপ ক্ষতবিক্ষত। ১৯৪২ ও ’৪৬— যুদ্বের জন্য, দু’বার বিশ্বকাপ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে সহজেই চতুর্থ ‘জুলেরিমে’ কাপের পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে গেল ব্রাজিল। লাতিন আমেরিকার সর্ববৃহৎ দেশ, তখন নিজেদের ‘জাতিরাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। সংগঠকরা, ফুটবল ও জাতীয় দলকে ঘিরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করার মঞ্চ করে তুলতে চাইল বিশ্বকাপকে। তবে এক্ষেত্রে একটু বাড়াবাড়িও করে ফেললেন, ব্রাজিলের রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। এমনকী জনগণও! সংবাদপত্রগুলের একাংশ অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে মগ্ন হয়, সাদা জার্সি পরিহিত ব্রাজিল ফুটবলারদের ছবি ছেপে ঘোষণা করে দিলেন, ‘নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা’ শিরোনামে! এই আত্মতুষ্টির একটি কারণ এই যে, চূড়ান্ত পর্বের শেষ দুটো ম্যাচে, সুইডেনকে ৭-১ ও স্পেনকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল আয়োজক ব্রাজিল! বিশেষজ্ঞ মত, ঘরের মাঠে দর্শকদের সামনে ব্রাজিলকে যতগুলো সম্ভব ম্যাচ খেলিয়ে, আর্থিক ফয়দা তোলাও পুরো প্রতিযোগিতাকে লিগ ফরম্যালটে নিয়ে আসার অন্যতম কারণ ছিল।

১৯৫০ সালে ব্রাজিলে আয়োজিত ‘জুলেরিমে’ কাপের অফিসিয়াল পোস্টার

সে-যুগে বিশ্বকাপের মূল পর্ব হত ষোলটি টিম নিয়ে। চতুর্থ বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত যোগ দিল ১৩টি দেশ। যুদ্বের জেরে ইউরোপের মাত্র ছ’টি দেশ, ব্রাজিল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিল। যাতায়াতের অতিরিক্ত ব্যয়ের অজুহাতে, শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ায় তুরস্ক। স্কটল্যান্ড বলেছিল, ব্রিটিশ নেশন্স কাপে চ্যাম্পিয়ন হলে, তবেই তারা ব্রাজিলে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে। কিন্তু ওই প্রতিযোগিতায় তারা দ্বিতীয় স্থানে শেষ করেছিল! ষোলতম দেশটি ছিল ভারত। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর, ৪৮-এর লন্ডন অলিম্পিকে ডঃ টি আও-এর নেতৃত্বে খেলেছিল ভারত। সেই পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে, এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে— তাদের মূল পর্বের কিছুদিন আগে, আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন অনুশীলনের অপর্যাপ্ত সময় ও যাতায়াতের ব্যয়-বাহুল্যের কারণ দেখিয়ে, তা প্রত্যাখ্যান করে। এর পেছনে আরও দু’টি কারণ ছিল। প্রথমটি, ‘ফিফা’ ’৪৮-এই খালি পায়ে খেলা নিষিদ্ধ করে দেয় নিজেদের টুর্নামেন্টে। আর সদ্য স্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার, বিশ্বকাপের থেকে ’৫২-র হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে টিম পাঠাতে বেশি উৎসাহী ছিল। তাই, শৈলেন মান্না-আহমেদ খান-সাহু মেওলালদের আর বিশ্বকাপে খেলা হল না।

তিনটি দল কম হলেও, সে-বারই বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথম আবির্ভাব হল ইংল্যান্ডের। দীর্ঘ সতেরো বছর ইংল্যান্ড নিজেদের ‘ফিফা’ থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছিল। ব্রিটিশ মিডিয়ার দাবি ছিল, সেরা পেশাদার ফুটবলারদের নিয়ে ব্রাজিলে কাপ জিততে প্রস্তুত হয়েই এসেছে ‘থ্রি-লায়নস’-রা। শেষ দু’বারের চ্যায়ম্পিয়ন ইতালি, ইংল্যায়ন্ড, সুইডেন, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, যুগস্লোভিয়া— ইউরোপের এই ছ’টি দেশ, লাতিন আমেরিকার পাঁচটি ও উত্তর আমেরিকার দু’টি দলকে নিয়ে দীর্ঘ বারো বছর পর শেষ পর্যন্ত শুরু হল বিশ্বকাপের মূলপর্ব। জার্মানিকে ‘ফিফা’ সে-বার খেলতে দেয়নি, যুদ্ধবিদ্ধস্ত ফ্রান্স, হাঙ্গেরি ইত্যাদি দেশ এই বিশ্বকাপে যোগ দেয়নি।

তেরোটা দলকে, মোট চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল। প্রাথমিক গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচে, সুইজারল্যান্ড শেষ মুহূর্তে গোল করে, ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র করে দিল। ব্রাজিল অবশ্য বাকি দু’টি ম্যাচই দাপটে জিতেছিল। তবে এ-পর্বের সবথেকে বড় অঘটনটি ঘটাল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চিলে-কে হেলায় হারিয়ে, বিশ্বকাপে শুভ সূচনা করেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু বেলো হরিজোন্তেতে ল্যারি গেটজেন্সসের গোলে, মার্কিনদের কাছে হেরে গেলেন তাঁরা। কৃষ্ণাঙ্গ সেন্টার-ফরোয়ার্ড গেটজেন্স ছিলেন— হাইতি থেকে আমেরিকায় আসা এক অভিবাসী শ্রমিক। দাম্ভিক ব্রিটিশ প্রেসের প্রতিনিধিরা মানতেই পারছিলেন না, একজন ইস্কুলের শারীরিক-শিক্ষক উইলিয়াম জেফরির কোচিংয়ে, এক অস্থায়ী ডিশ ধোয়ার কর্মী, এক ডাক-কর্মী, এক অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার পরিচালক, প্রমুখ মানুষদের নিয়ে গড়া একটি দল, তাঁদের মতো বিশ্ব-ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে বিশ্বকাপে হারিয়ে দিতে পারে! তাই ইংল্যান্ডে টেলিগ্রাফ-যোগে যখন খবর গেল, তখন লন্ডনের এক সাংবাদিক ১-০ টাকে নেহাতই ছাপার ভুল ভেবে, তাদের পক্ষে ১০-১ লিখে দিয়েছিলেন!

ওই ইংল্যান্ড দলে ছিলেন, আল্ফ রামসের মতো ফুলব্যাক। পরবর্তীতে যাঁর কোচিংয়ে, ’৬৬-তে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জেতে ইংল্যান্ড। মার্কিনদের কাছে এই হারের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারলেন না রামসেরা, শেষ ম্যাচে স্পেনের কাছেও টেলমো জারার দৃষ্টিনন্দন গোলে হেরে, গ্রুপ পর্বেই শেষ হয়ে গিয়েছিল ইংল্যেন্ডের বিশ্বকাপ অভিযান। ওই গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হল স্পেন। যদিও মার্কিনরা পরের ম্যাচে চিলে-র কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে, বিদায় নিল বিশ্বকাপ থেকে। এরপর বিশ্বকাপের মূলপর্বে যোগ্যতা অর্জন করতে, মার্কিনদের লেগে গিয়েছিল দীর্ঘ ৪০ বছর। ১৯৯০-ইতালি বিশ্বকাপে আবার দেখা যায় তাঁদের।

বাকি তিনটি গ্রুপে প্রথম হল, যথাক্রমে ব্রাজিল-সুইডেন ও উরুগুয়ে। নিজেদের গ্রুপে সেরা হওয়ার পথে, প্রাক্তন চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে দেয় সুইডেন।

চারটি দলকে নিয়ে শুরু হল ফাইনাল-রাউন্ডের খেলা। কিন্তু বলপ্লেয়ার জিজিনহো, সেন্টার ফরোয়ার্ড আলদেমিরদের দুরন্ত ছন্দের ওপর ভর করে, ব্রাজিল বাকি সব প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকটাই পেছনে ফেলে দিল। সুইডেনকে ৭-১ ও স্পেনকে ৬-১-এ বিধ্বস্ত করে, কোচ ফ্ল্যাাভিও কোস্টার টিম তখন— লিগ তালিকায় সবার ওপরে। অন্যদিকে উরুগুয়ে প্রথম ম্যাচে, স্পেনের সঙ্গে পিছিয়ে পড়েও, ২-২ ড্র করল। পরের ম্যাচে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর, ১-২ থেকে ফিরে এসে, পরপর দুটো গোল করে হারালো সুইডেনকে; জোড়া গোল করে ওস্কার মিগুয়েজ জিইয়ে রাখলেন, উরুগুয়ের বিশ্বকাপের আশা। শেষ ম্যাচের আগে তাই— ব্রাজিলের থেকে এক পয়েন্টে পিছিয়ে ছিল, ওবদুলিও ভারেলার নেতৃত্বাধীন দল।

১৯৫০-জুলেরিমে’ কাপের ব্রাজিল টিম

নীল লাইনিং দেওয়া স্ফটিকের মতো সফেদ জার্সি পরিহিত, ব্রাজিলীয় দলের ফুটবলে ছিল, সম্মোহনী জাদু। ফুটবল মাঠের এই আগাম সাফল্যের ইঙ্গিত, আম ব্রাজিলীয়দের সাময়িক এক সুরে বেঁধে ফেলেছিল। রঙিন টিভির তখন সদ্য জন্ম হয়েছে। যদিও তাতে হয়নি কোনও বিশ্বকাপের ম্যাচের সম্প্রচার। কম্পিউটার অনেক অপারেশন করে দিয়ে, তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। সে বছরই রুপোলি পর্দায় অভিষেক হয়েছিল মেরিলিন মনরোর। যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে, নোবেল পুরস্কার পেতে চলেছেন বার্ট্রান্ড রাসেল। সে-বছরই লুইস বুনুয়েলের নতূন ছবি ‘লোস ওলভিদাদোস’ কান-এর চলচ্চিত্র উৎসবে সোরগোল ফেলে দিয়েছে। পাবলো নেরুদা, তখনই ‘কন্টো জেনেরাল’ প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের পতাকা গায়ে জড়িয়ে, সে-বছরই মার্কিন সেনারা কোরীয় উপদ্বীপ আক্রমণ করেছিল। সেই আবহে, রিও বিমানবন্দরে বিশ্বকাপ খেলার জন্য নামলেন, নানা প্রান্তের ফুটবলাররা। সেই পরিস্থিতিতে, ইউনেস্কো ফুটবলকে কেন্দ্র করে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্রাজিলকে ঘোষণা করেছিল। যদিও মারাকানা ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর দেখা গেল, তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র!

১৯৩০ পর্যন্ত ব্রাজিলীয় জাতিসত্তা বলে কোনও ধারণার অস্তিত্বই ছিল না, ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের। স্থানীয় খবরের কাগজগুলোর প্রথম পাতায় যখন আগাম প্রকাশিত হয়ে গেল, ‘ব্রাজিল, নয়া বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’, ফুটবল টিমের তারকাদের ছবি, তখন দেশের জনগণ এক প্রবল জাতীয়তাবাদের গরিমায় আক্রান্ত হলেন, এই জাতীয় দলকে ঘিরে। ‘ব্রাসিল ওস ভেনসেরেন্দোস’ (‘ব্রাজিল, নয়া বিশ্বজয়ী’)— একটি গানও ততক্ষণে রচনা হয়ে গিয়ে মুখে-মুখে ঘুরছে। দু’লক্ষ মানুষ এসে যাতে ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের কার্নিভালে মাততে পারেন, সে-কথা মাথায় রেখেই, সংগঠকরা নতুন দৈত্যাকার মারাকানা স্টেডিয়ামের নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পৃথিবীর সর্ববৃহৎ স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ সময় মতো শেষ করা গেল না। বল যখন গড়াতে শুরু করল, তখনও বহু জায়গার সিমেন্ট শুকোয়নি।

মারাকানা স্টেডিয়াম

মাঠেও রঙ-বেরঙের ফুল ফোটাচ্ছিলেন ফুটবলাররা। এর একটা নিদর্শন গ্রুপ পর্বে, যুগোস্লোভিয়া ম্যালচে দেখা যায়। এই ব্রাজিল দলের মূল বলপ্লেয়ার ছিলেন, জিজিনহো। যুগস্লোভিয়ার জালে তিনি একবার বল জড়ালেন, কিন্তু রেফারি গোলটা বাতিল করলেন। ক্ষুব্ধ জিজিনহো একটি অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটালেন। তিনি বলটা নিয়ে গিয়ে, একই দিক থেকে বক্সে ঢুকে, ওই সংশ্লিষ্ট ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে, একই কোণ দিয়ে বলটি আবার জালে পাঠালেন। যাকে বলে ধাপে-ধাপে অ্যকশন রিপ্লে করে দেখানো। রেফারি গোলটি দিতে বাধ্য হলেন এরপর! জিজিনহো, স্কিলের স্ফূরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গোল পাচ্ছিলেন সেন্টার ফরোয়ার্ড আলদেমির। আর দুর্ভেদ্য গোলকিপিং করে, দলকে নির্ভরতা দিচ্ছিলেন মোয়াসির বারবোসা। ওই বিশ্বকাপের সেরা প্লেয়ার নির্বাচিত হন জিজিনহো-ই, সর্বোচ্চ গোলদাতা আলদেমির। আর সেরা গোলকিপার? নির্বাচনটি আর হয়নি!

১৬ জুলাই, দু’লক্ষ নরনারী মারাকানার গ্যািলারি ভরিয়ে দিয়েছিলেন, মনেপ্রাণে এই বিশ্বাস করে যে— ব্রাজিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েই গিয়েছে! ফুটবলার থেকে সমর্থক, এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের একটা কারণ, এটা প্রথাগত ফাইনাল ছিল না, টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচ যেখানে ড্র করলেই, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যেত ব্রাজিল। সেখানে উরুগুয়ের, এই প্রতিকূল পরিবেশে জেতা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। আর দ্বিতীয় কারণ, তার আগের বছর, দু’দেশের মধ্যে ‘লা ব্রোঙ্কা’ সিরিজে জয়ী হয়েছিল ব্রাজিলই। তিন ম্যাচের সিরিজ যখন ১-১, তখন নির্ণায়ক তৃতীয় ম্যাচে, ১-০ গোলে উরুগুয়েকে হারিয়েছিল সেলেশাও।

মোয়াসির বারবোসা

ব্রাজিল দলের একটি বড় ছবি দিয়ে, ‘ও মুন্ডো’ নামে রিও-র এক সংবাদপত্রর শিরোনাম ছিল, ‘এস্তেস সাও ওস ক্যাম্পিও মুন্ডিয়াল’, পোর্তুগিজে যার অর্থ, ‘এরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’। বিপক্ষকে গোলের মালায় ‘সম্ভাষিত’ করার জন্য্, আলদেমির-সহ দলের সব সদস্য উপহার পেয়েছেন, সোনার ঘড়ি, যার একদিকে খোদাই করে লেখা, ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য!’
পেনারলের নির্ভরযোগ্য প্লেয়ার, উরুগুয়ের অধিনায়ককে ফুটবল মহল চিনত, ‘এল নেগ্রো জেফে’ (কালো প্রধান) নামে। ব্রাজিলীয় সংবাদপত্রের ওই শিরোনাম ভারেলার অহংয়ে প্রবল ধাক্কা দেয়। তিনি কাগজগুলো মাটিতে ফেলে, তার ফুটবলারদের ডেকে বলেন, ‘দু’লক্ষ সমর্থক ম্যাচটা খেলবে না। খেলা হবে আমাদের এগারো বনাম ওদের এগারো। গ্যালারির দর্শকরা তো কাঠের পুতুল। সুতরাং, মাঠে নেমে আমাদের ম্যাচটা জিতেই ফিরতে হবে।’

ভারেলা জানতেন, এই অন্তিম ম্যাচটি স্নায়ুর লড়াইতে পর্যবসিত হবে। কিন্তু, শুধু ভোকাল টনিকেই থেমে থাকেননি তিনি। ব্রাজিলকে এই বিশ্বকাপ জয়ের লড়াইয়ে সম্ভাব্য মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে, সেলেশাওকে খুব খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে গিয়েছিলেন ভারেলা ও তাদের কোচ যুয়ান লোপেজ। উরুগুয়ে যতটা খুঁটিয়ে ব্রাজিলকে পড়েছিল, বড় ব্যবধানে দুটো ম্যাচ জিতে আত্মতুষ্ট ব্রাজিল, উরুগুয়েকে সেভাবে লক্ষ করার প্রয়োজনই মনে করেনি। চূড়ান্ত পর্বে, উরুগুয়ে দুটো ম্যাচ পেছন থেকে ফিরে এসে প্রত্যাঘাত করেছিল। গিজ্জিয়া দুটো ম্যাচেই গোল পেয়েছিলেন। ব্রাজিল সে-সব মাথায় রাখেনি, সতর্কও হয়নি। ভারেলারা রেখেছিলেন। গ্রুপ পর্বে সুইজারল্যান্ড শেষ সময়ে গোল শোধ করে, রুখে দিয়েছিল ব্রাজিলের জয়। উরুগুয়ে-কোচ জুয়ান লোপেজের মস্তিষ্কে তা রয়ে গিয়েছিল। এই বিশ্লেষণই ভারেলাদের এই চূড়ান্ত ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও, ফিরে আসার কৌশলের সন্ধান দিয়েছিল।

১৯৫০-এর উরুগুয়ে টিম

জিজিনহোরা যখন আক্রমণের ঝড় তুলছিলেন, তখন ঠান্ডা মাথায় খেলার গতি কমিয়ে দেন ভারেলা। তিনি ব্রাজিল-ডিফেন্ডার বিগোদেকে ঘুঁষিও মেরে দেন, পাল্টা মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করার জন্য। ফ্ল্যামেঙ্গোর কোচ হিসেবে, ফ্ল্যাভিও কোস্টা যে ডায়গোনাল (কোণাকুণি) আক্রমনের ছক তৈরি করেছিলেন, ব্রাজিল দলকেও তিনি সে-কৌশলেই রপ্ত করিয়েছিলেন। এতে আক্রমণে যুক্ত হয়ে যেত আটজন। রক্ষণে তৈরি হত ফাঁক। ভারেলারা ওই ফাঁকগুলো লক্ষ করে রেখেছিলেন। তাই, জিজিনহোদের ফাঁদে ফেলতে, কাউন্টার অ্যাটাকের কৌশল নেন যুয়ান লোপেজ। কোস্টা, কোনও প্ল্যাজন বি ভেবে রাখেননি।

প্রথমার্ধে কোনও গোল হল না। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে শুরুর মিনিট তিনেকের মধ্যে প্রবল গর্জন অনুরণিত হল মারাকানার গ্যালারিতে। ফরোয়ার্ড ফ্রিয়াকার শট, উরুগুয়ের জাল কাঁপানোর পর। ভারেলা বলটি নিয়ে আসতে-আসতে সেন্টার সার্কেলের দিকে গেলেন। রেফারির সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে তর্ক করলেন গোল নিয়ে, তারপর আবার ঢিমে তালে খেলা শুরু করলেন। এ-সবই, বুদ্ধিমান উরুগুয়ে অধিনায়কের কৌশল। যা তাঁর প্লেয়ারদের একটু গুছিয়ে নেওয়ার সময় করে দিল। গ্যালারি তখন উৎসবের জোয়ারে ভাসছে। কিন্তু মাঠের মধ্যেয় ভারেলা-স্কিয়াফিনোরা তখন ওঁৎ পেতে রয়েছেন মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায়।

ম্যাচ এক ঘণ্টা পেরনোর পর এল সেই সময়। খোলস ছেড়ে বেরিয়ে, আক্রমণ করতে শুরু করল উরুগুয়ে। ডানদিক দিয়ে কাট করে ঢুকে, বক্সে সেন্টার করলেন গিজ্জিয়া। সেন্টার ফরোয়ার্ড জুয়ান আলবার্তো স্কিয়াফিনোর উদ্দেশ্যে। পেনারলে ভারেলার সতীর্থ স্কিয়াফিনো, জোরালো শটে জাল কাঁপিয়ে দিলেন। ভারেলার সঙ্গে গিজ্জিয়া, স্কিয়াফিনো ও গোলকিপার রক ম্যাাসপলিও খেলতেন পেনারলে। তাদের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল, সদ্য আবিষ্কৃত কম্পিউটারের মতো। গ্যালারি হঠাৎ করে ছেয়ে গেল উদ্বেগ আর আশঙ্কার মেঘে!

‘ফিফা’ সভাপতি তখন মারাকানার একটি লিফটে করে নামছেন। পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জয়ী অধিনায়কের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দেবেন বলে। তার পকেটে একটা চিরকুটে লেখা, সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা— চ‍্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দল, আয়োজক ও তাদের সমর্থকদের অভিনন্দন জানিয়ে। ট্রফি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা তখন জুলেরিমে ট্রফির গায়ে খোদাই করছেন ‘ব্রাজিল’ শব্দটি। লিফট থেকেই নেমেই থমকে গেলেন ‘ফিফা’ সভাপতি। একটা অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা যেন গ্রাস করেছে চতুর্দিক।

‘জুলেরিমে’-র এই কয়েক সেকেন্ডের যাত্রার মধ্যে, মাঠে রচিত হয়েছে এক কল্পনাতীত দৃশ্য। ম্যাচ তখন ৭৯ মিনিটে। রাইট উইং গিজ্জিয়া, ডানপ্রান্ত দিয়ে তরতর করে এগিয়ে ব্রাজিল বক্সের কাছে পৌঁছে যান। বক্সে কাট করে যখন ঢুকলেন, তখন বারবোসা সামান্য এগিয়ে দাঁড়ালেন। ম্যাচের পূর্ব অভিজ্ঞতায় ব্রাজিল গোলকিপার নিশ্চিত ছিলেন যে, পেনারল উইঙ্গার, বলটি সেন্টার করবেন। কিন্তু ২৩ বছর বয়সি মন্টেভিডিওর তরুণ, কোণাকুণি নীচু জোরালো শট নিলেন প্রথম পোস্টের ফাঁক লক্ষ্য করে। বল বারবোসার হাত স্পর্শ করে, জালে আছড়ে পড়ল। কৃষ্ণকায় ব্রাজিল গোলকিপার প্রথমে নিশ্চিত ছিলেন যে, বলটি তিনি ফিস্ট করে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু গ্যােলারির স্তব্ধতা তাঁকে অন্যে বার্তা দিল।

প্রবল স্নায়ুর চাপের মধ্যেু খেলা শুরু করল ব্রাজিল। উরুগুয়ে বাকি মিনিট দশেক ডিফেন্স করে কাটিয়ে দিল। রেফারির লম্বা বাঁশি বাজার সঙ্গে-সঙ্গে, ব্রাজিলের প্লেয়াররা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। রেডিওতে যারা ধারাবিবরণী শুনছিলেন, তাঁদের কেউ-কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। পরাজয়ের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে, আত্মহননও করলেন কয়েকজন। ব্রাজিলীয় ধারাভাষ্যকাররা বললেন, ‘এটা আমাদের ইতিহাসের সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি।’

বারবোসা, ম্যাচের পরে…

একটি বছর নয়েকের কৃষ্ণকায় কিশোর দেখল, তার বাবা হাঁউহাঁউ করে কাঁদছে, রেডিওতে ব্রাজিলের হারের বিবরণী শুনে। কিশোরটি তার বাবাকে সান্তনা দিয়েছিল, ‘কেঁদ না, আমি তোমাকে একটা বিশ্বকাপ এনে দেব!’ ব্রাজিলীরা এই হারকে জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে নিয়েছিল। আর এই জাতীয় বিপর্যয়ের জন্যে ‘দায়ী’ করে দেওয়া হল— কৃষ্ণাঙ্গ গোলকিপার বারবোসাকে। সমগ্র জাতির চোখে তিনি রাতারাতি এক ‘ভিলেন’ হয়ে গেলেন। ‘অপয়া’, ‘আনলাকি’ তকমাও তাঁর গায়ে সেঁটে দেওয়া হল। অথচ এই ফাইনালের আগে, বিশ্বকাপের সেরা গোলকিপার হিসেবে তাঁর পক্ষেই ছিল অধিকাংশ সাংবাদিকদের ভোট!

‘ট্রফি নিয়ে আমি মাঠের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে একা ঘুরছিলাম। বুঝেছিলাম, আর কোনও অনুষ্ঠান হবে না! উদ্যোক্তাদের কাউকে চোখে পড়ছিল না। অবশেষে, উরুগুয়ের ক্যাপ্টেন ভারেলাকে ডেকে, হ্যান্ডশেক করে ট্রফি দিয়ে দিই।’ শেষ বাঁশি বাজার পরের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে পরে বলেছিলেন, ‘ফিফা’ সভাপতি জুলেরিমে।

এর বহু বছর পর, ২০০৬-এ মারাকানাতে গিজ্জিয়াকে আপ্লুত মনে হয়েছিল, যখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের আরও তিন কিংবদন্তি পেলে, ইউসেবিও ও ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের সঙ্গে তাঁরও পায়ের ছাপ সংগ্রহ করে রাখে ব্রাজিলের ফেডারেশন। ওই ঐতিহাসিক উরুগুয়ে দলের শেষ জীবিত সদস্য ছিলেন, গিজ্জিয়া। ২০১৫-এ ৮৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন তিনি।

ব্রাজিলের জনসংখ্যা তখন উরুগুয়ের ২৩ গুণ। তবু এই জয়, গোলিয়াথের বিরুদ্ধে ডেভিডের জয় হিসেবে দেখালে, সম্পূর্ণ অপব্যাখ্যা হবে।

‘মারাকানা ওই মহাকাব্যের ছায়া উরুগুয়ে ফুটবলের অনেকগুলো দিক ঢেকে দিয়েছে। সবাই ‘অঘটনের’ কথা বলে, কিন্তু উরুগুয়ের যে একটা অসাধারণ টিম ছিল সে-সময়ে, সেটা খানিক চাপা পড়ে যায়। তার আগের তিন দশকের সাফল্যে; দুটো অলিম্পিক আর বিশ্বকাপ জয়েই বলছে ছোট্ট দেশটি তখন বিশ্ব ফুটবলের এক বিরাট শক্তি ছিল।’ ব্যাখ্যাা, ‘মারাকানা, আ সিক্রেট হিস্ট্রি’ বইটির লেখক সাংবাদিক আতিলিও গ্যারির্দোর।

ফুটবলে টাকার গুরুত্ব যত বেড়েছে, ততই এই সীমিত সম্পদের লাতিন আমেরিকার দেশটির শক্তিক্ষয় হয়েছে। বর্তমানে তারা ইউরোপের সেরা লিগগুলোতে ফুটবলার রপ্তানি করা একটি দেশে পরিণত হয়েছে। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনারও প্রায় একই দশা। তবুও লাতিন আমেরিকার এই দুই সুপার পাওয়ারের থেকে, পরবর্তীতে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে, এনজো ফ্রান্সিসকোলি-দিয়েগো ফোরলানদের দেশ। এরপর আরও তিনবার বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলেছিল উরুগুয়ে; ’৫৪, ’৭০ আর ২০১০-এ। তিনবারই তারা চতুর্থ হয়।

ব্রাজিলীরা এই হারকে জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে নিয়েছিল। আর এই জাতীয় বিপর্যয়ের জন্যে ‘দায়ী’ করে দেওয়া হল— কৃষ্ণাঙ্গ গোলকিপার বারবোসাকে। সমগ্র জাতির চোখে তিনি রাতারাতি এক ‘ভিলেন’ হয়ে গেলেন। ‘অপয়া’, ‘আনলাকি’ তকমাও তাঁর গায়ে সেঁটে দেওয়া হল। অথচ এই ফাইনালের আগে, বিশ্বকাপের সেরা গোলকিপার হিসেবে তাঁর পক্ষেই ছিল অধিকাংশ সাংবাদিকদের ভোট!

ভারেলাকে ওই রাতে সাংবাদিকরা ছেঁকে ধরেন। কিন্তু মৃদুভাষী উরুগুয়ে অধিনায়ক, ‘এটা সেরা জয়ের একটা’ ছাড়া আর কিছুই বলেননি। গিজ্জিয়াকে জড়িয়ে ধরে, স্কিয়াফিনোকে কাঁদতে দেখা গিয়েছিল ম্যাচের পর। না হলে, অন্তিম ম্যাচে, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবথেকে বড় অঘটনটি ঘটানোর পর, উরুগুয়ে শিবির ছিল অদ্ভুতরকম শান্ত। ভারেলা পরিচয় গোপন করে, রিও-র এক বার থেকে, আরেক বারে গিয়ে— পরাজিত দলের সমর্থকদের সঙ্গে বিয়ার খেয়ে কাটিয়েছিলেন সেই রাতটি। পরের দিন দুপুরে, মন্টেভিডিওর প্লেন ধরেন। দেশে ফিরে বিমানবন্দরে বিরাট ব্যানার নিয়ে অপেক্ষারত সমর্থকদের এড়িয়ে, পালিয়ে যান নিজের বাড়িতে। একটি করে সোনার মেডেল ও পুরষ্কার বাবদ কিছু অর্থ পেয়েছিলেন চ্যাম্পিয়ন টিমের প্লেয়াররা। উরুগুয়ে অধিনায়ক, নিজের প্রাইজের টাকায় একটি ১৯৩১ মডেলের ফোর্ড গাড়ি কিনেছিলেন, কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা চুরি হয়ে যায়!

বারবোসা আর ওই সাদা জার্সি ‘অশুভ’ হিসেবে চিরতরে বাতিল হয়ে যায় ব্রাজিলের জাতীয় দল থেকে। বারবোসা প্রায় চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত খেলা চালিয়ে গেলেও, জাতীয় দলের কোনও শিবিরের ধারেকাছে যেতে দেওয়া হত না তাঁকে। বারবোসা কালো ছিলেন, তাই কুসংস্কারবশত ২০০৬ বিশ্বকাপের আগে অবধি, কোনও কৃষ্ণাঙ্গ গোলকিপারকে টিমে রাখেনি ব্রাজিল। ২০০৬-এর বিশ্বকাপের ‘দিদা’-ই হলেন বারবোসার পর ব্রাজিল-বারের নীচে দাঁড়ানো প্রথম কালো গোলরক্ষক। ততদিনে ব্রাজিলীয়দের চিন্তা আরও পরিণত হয়েছে। জাতীয় দলের হারকে তারা মাঠের হার হিসেবে দেখতে শিখেছে, সমগ্র জাতির হার হিসেবে নয়। ওই পরিত্যক্ত সাদা জার্সি, বহু যুগ পরে আর-একবার মাত্র পরেছিলেন, রিভাল্ডো-রোনাল্ডোরা, ২০০৪-এ ‘ফিফা’-র শতবর্ষ উপলক্ষে, ফ্রান্সের বিরুদ্ধে একটি প্রদর্শনী ম্যাচে।

’৫৪-তেই দেখা গিয়েছিল, সোনালি-সবুজ জার্সির ব্রাজিলকে। মারাকানাজোর পর, যে-বছর নয়েকের ছেলেটি বাবাকে কথা দিয়েছিল, কেঁদো না, একদিন তোমাকে বিশ্বকাপ এনে দেব। ’৫৮-তেই ব্রাজিল দলে নির্বাচিত হয় সে। এবং পেলে-গ্যা রিঞ্চাদের যুগের সূচনা পর্ব থেকেই, এই জার্সির আভা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে। বাবাকে দেওয়া কথা রেখেছিল কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেটি। সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে, সুইডেনের মাটিতে বিশ্বকাপ জিতে।

তবে, মারাকানাজোর জ্বালা থেকে ব্রাজিল মুক্ত হয়ছিল, ১৯৭০-এ, যখন তিনবার বিশ্বকাপ জেতার পর, জুলেরিমে ট্রফির গায়ে চিরতরে খোদাই করা হয়েছিল ব্রাজিলের নাম। তাই, ২০১৪-তে মারাকানায় জার্মানদের কাছে ১-৭ হারকে নিয়ে তাঁরা দলকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করলেও, টিমের কাউকে ‘বলি’ করার দর কার পড়েনি। বা ঘটেনি কোনও আত্মহত্যার ঘটনাও। অথচ, মারাকানায় উরুগুয়ের দুটো গোলের জন্যই— বারবোসাকে দায়ী করা যাবে না। চাপের মুখে কোচ এবং সামগ্রিক দলের— কোনও সতর্কতামূলক কৌশল না থাকাই ডুবিয়েছিল জিজিনহোদের। উরুগুয়ের ওই বিশ্বজয় ছিল স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, ব্রাজিলের ২১ টা ফাউলের বিরুদ্ধে ভারেলাদের ফাউল সংখ্যা ছিল মাত্র ১১!

কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ সেই গোলকিপারের নির্বাসন-মুক্তি হয়নি। একদিন একটি দোকানে কিছু পণ্য কিনতে গিয়ে, বারবোসা শুনতে পেলেন, এক যুবতী তাঁকে দেখিয়ে তার কিশোর পুত্রকে বলছেন, ‘এই লোকটাই আমাদের সবাইকে কাঁদিয়েছিল।’ ’৯৩ তে রোমারিও-বেবেতোদের অনুশীলনে উৎসাহিত করার জন্যই, শিবিরে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কর্তারা তাঁকে অনুমতি দেননি। ’৯৪ বিশ্বকাপে একটি টিভি চ্যানেল, বারবোসাকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ করেছিল। কিন্তু ব্রাজিল ফেডারেশনের তরফ থেকে, চ্যানেল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়, তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য, কারণ তাতে দেশব্যাপি সমর্থকদের বিরূপ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এক বৌদির ওপর নির্ভরশীল হয়ে, শেষের দিকে দিন কাটাতে হত ব্রাজিলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ গোলকিপারকে। হাতে পেতেন, নামমাত্র একটা পেনশনের টাকা। ২০০০-এ মৃত্যুর কিছুদিন আগে, বিমর্ষ বারবোসা বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলে সর্বোচ্চ শাস্তি তিরিশ বছর। আমাকে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে এমন একটি অপরাধের জন্য, যা আমি করিনি।’

শূন্য মারাকানার সেন্টার সার্কেলে দাঁড়ালে, এখনও ওই অস্বস্তিকর স্তব্ধতার মধ্যে ধ্বনিত হবে বারাবোসার কাতর কণ্ঠস্বর…