অভয়বাবুর ভয়

অভয়বাবুর মতো স্বাস্থ্যসচেতন বাঙালি খুব কম দেখা যায়। আয়কর বিভাগ থেকে অবসর নিয়েছেন পাঁচ বছরের বেশি হয়ে গেল, শরীরে একফোঁটা মেদ নেই। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি লোকটা যখন স্পোর্টস শু পরে হনহনিয়ে মর্নিংওয়াক করে, তখন সবুজগ্রাম স্টেশন রোডের গুমটি দোকানদার আর টোটোওলা-অটোওলা রিকশাওলারা তো বটেই, ফাঁড়ির পুলিশগুলো পর্যন্ত সশ্রদ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে। 

গিন্নি এটাকে তেমন পাত্তা না দিলেও, জানুয়ারিতে শালি-র ছেলের বৌভাতে অভয়বাবুর বড় জামাই জয়ন্ত একজনকে বেশ গর্ব করে বলল, ‘আমার শ্বশুর হচ্ছে ফিটেস্ট রিটায়ার্ড পার্সন অ্যারাউন্ড।’ আসলে এই বয়সেও চেহারাটা ধরে রাখা যে কত কঠিন সেটা ও হাড়ে-হাড়ে টের পায় তো। কর্পোরেটের চাকরি করতে-করতে চল্লিশ না হতেই কোলেস্টেরল আর স্পন্ডিলাইটিস ধরিয়ে ফেলেছে, প্রস্থে বেড়েই চলেছে। সারাক্ষণ আফসোস করে, ‘রোজ ভাবি অফিসের জিমটা জয়েন করব। কিন্তু এত কাজ যে চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারি না। এখনও যে বাপ-ঠাকুরদার সুগারটা ধরেনি, সেটা একটা মির‍্যাকল।’ যে ছেলেটা ভিডিও করছিল, সে এইসব শুনে-টুনে গদগদ হয়ে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিল, ‘স্যর কি আর্মিতে ছিলেন?’ অভয়বাবু জিভ-টিভ কেটে ‘না’ বললেও, বিলক্ষণ খুশি হয়েছিলেন। আজকাল মাঝে-মাঝেই তাঁর মনে হয়— মিলিটারিতে যাওয়াই উচিত ছিল, দেশের জন্য কিছুই তো করা হল না…

একবার সন্ধেবেলা টিভি দেখতে-দেখতে অভয় সরকার উত্তেজনার বশে কথাটা স্ত্রী-কে বলে ফেলেছিলেন। তাতে সীমা সরকার চায়ের কাপটা ঠোঁট থেকে সরিয়ে ঠান্ডা চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে উত্তর দিয়েছিলেন, আজ পর্যন্ত একটা আরশোলা একবারে মেরে উঠতে পাল্লে না, আবার মিলিটারি!’ তারপর টিভির রিমোটটা ছিনিয়ে নিয়ে বলেছিলেন, “অনেক হাবিজাবি শুনে গা গরম করেছ। এখন যাও চাল নিয়ে এসো, আমি শান্তিতে ‘কাদের কুলের বউ’ দেখি। তোমার ভোটের জ্বালায় কতগুলো এপিসোড যে মিস কল্লাম। এদিকে সুপুরি আর অরিন্দমের বিয়ে হয়ে গেল কিনা কে জানে!” 

পড়ুন এই লেখকের অন্য গল্প ‘মেহের আলির দুর্গ’…

অভয় সরকারের সবচেয়ে বড় গুণ হল, তাঁর সাহস কখনও সীমা ছাড়ায় না। তাই তিনি চুপচাপ চালের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিলেন। অবশ্য, ‘সন্ধান’ কথাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। অভয়বাবুর বাবা যে দোকান থেকে আজীবন চাল কিনতেন, উনিও সেখান থেকেই চাল কেনেন। স্টেশন বাজারে টালির চাল দেওয়া সেই দোকানের মালিক ছিল হারু ঘোষ, মানে অভয়ের হারুজেঠু। এখন পাকা ছাদওলা দোকান চালায় তার ছেলে সুকান্ত। চালের ব্যাগটা নিয়ে অভয়বাবু যখন বেরচ্ছেন, তখন গিন্নি অর্ডার করলেন ‘সবজিও আনতে হবে। দু-চারটে পটল আর একফালি কুমড়ো পড়ে আছে।’ সন্ধেবেলায় সবজির জোগান নেই শুনলেই অভয়বাবুর মেজাজ খিঁচড়ে যায়। কারণ তিনি মনে করেন, স্টেশন বাজারে একটিমাত্র সবজিওলা আছে যে টাটকা সবজি বেচে— অনন্ত, সহপাঠী হওয়ার সুবাদে যাকে অভয়বাবু নন্তু বলে ডাকেন। নন্তু ইদানীং রাতে চোখে ভাল দেখে না বলে সন্ধেবেলায় বসে না। অত কথা গিন্নিকে বলে লাভ নেই, কারণ সুপুরির হবু ননদ আর হবু জায়ের চক্রান্ত পেরিয়ে অভয়বাবুর কথা গিন্নির কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিবে না। অতএব তিনি দায়সারাভাবে বললেন, ‘এবেলা মাছ এনে দিচ্ছি, সবজি বাজার সকালে হবে।’ সুপুরির পারিবারিক সংকটের চেয়ে সরকারবাড়ির সবজির সংকট কখনওই বেশি জরুরি নয়, অতএব সীমা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। ফলে অভয়বাবু নির্বিবাদে বেরিয়ে পড়তে সক্ষম হলেন।

এমনিতে মাছটাও সন্ধেবেলায় কেনা অভয়বাবুর পছন্দ নয়। তিনি রুটিন-প্রিয় মানুষ। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে নিজেই এককাপ লাল চা বানিয়ে খেয়ে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে পড়া; অন্য মর্নিং ওয়াকারদের মৃদুমন্দ গতির ভ্রাম্যমাণ আড্ডাকে পাত্তা না দিয়ে হনহনিয়ে পনেরো বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া গাড়ির কারখানা পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া; ছোট মেয়ের দেওয়া আইওয়াচ ধরে ঠিক সাড়ে ছ’টার সময়ে ফিরতি পথে শম্ভুর চায়ের দোকানে এসে বসা; সাড়ে সাতটা পর্যন্ত ওখানে বেশ কয়েক কাপ দুধ চা ও বিভিন্ন স্বাদের বেকারির বিস্কুট সহযোগে পরিচিত ও অপরিচিতদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে আসা খবর এবং জোক আলোচনা; তারপর বাজারে ঢুকে নন্তুর দোকান থেকে সবজি; অসিতের দোকান থেকে আলু-পেঁয়াজ, আদা; অজস্র মাছের দোকান ঘুরে নিজে হাতে নেড়েঘেঁটে মাছ (রবিবারে ইমরান বা আনামুলের কাছ থেকে খাসির মাংস) কিনে কাঁটায়-কাঁটায় সাড়ে আটটায় বাড়ি ঢোকা এবং জলখাবার খাওয়া— এই হচ্ছে অভয়বাবুর সকালের রুটিন। দিনদশেক অন্তর অবশ্য এরপরেও একটু সমাজসেবা করতে হয়। পাড়ার রাস্তার ধারের গাছগুলো যে পাতা ঝরায়, সেগুলো প্রশাসনিক অবহেলায় রাস্তাতেই পড়ে আছে— এ দৃশ্য অভয়বাবুর মতো মিলিটারি পরিচ্ছন্নতার মানুষের কাছে বড়ই বেদনাদায়ক। পঞ্চায়েত সদস্য শিখাকে একাধিকবার বলে লাভ হয়নি। মেয়েমানুষ, কী-ই বা বোঝে। তাই রিটায়ারমেন্টের পর থেকে পৃথিবীর পথকে পাতাহীন করার দায়িত্বটা অভয়বাবু নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন। নিজের বাড়ির শলার ঝাঁটা দিয়ে পাতাগুলোকে ঝেঁটিয়ে এক জায়গায় এনে তিনি আগুন ধরিয়ে দেন। খানিকক্ষণের মধ্যেই পবিত্র ধোঁয়ায় এলাকা ভরে যায়, কয়েক মিনিটে আবর্জনা সাফ। সম্প্রতি পাড়ায় একঘর নতুন ভাড়াটে এসেছে উলটো দিকের বাড়ির দোতলায়। সে বাড়ির ছেলেটি আর তার বউ ইদানীং প্রায়ই ব্যাপারটা নিয়ে আপত্তি করছে। তাদের মেয়ের নাকি অ্যাজমা আছে, ধোঁয়া নাকে গেলেই কাশি শুরু হয়। তাই তাদের দাবি— পাতা পোড়ানো বন্ধ করতে হবে। আরে বাপু নিজেদের জানলাগুলো বন্ধ করে দিলেই হয়। তা না, এরা যুগলে ঝগড়া করে। পাতা পোড়ানো নাকি অপ্রয়োজনীয়, এতে নাকি পরিবেশ দূষণ হয়। আশ্চর্য!

এইসব শেষ হতে-হতে ছোট মেয়ে অলিভিয়ার অফিস যাওয়ার সময় হয়ে যায়। অভয়বাবু স্কুটারটা বের করে ঝাড়পোঁছ করেন, স্টার্ট হচ্ছে কিনা দেখে নেন। তারপর খাওয়াদাওয়া হলে মেয়েকে পিছনে বসিয়ে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আসেন। দুই মেয়ের মধ্যে ছোটটি সবদিক থেকেই এগিয়ে। বড় মেয়ে অলিম্পিয়া লেখাপড়ায় সাধারণ ছিল, ইতিহাসে এমএ করার পরে চাকরিবাকরি করার বিশেষ ইচ্ছে দেখায়নি। অভয়বাবু চটপট ছেলে দেখে ঝটপট বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। বড় মেয়ে দেখতে সাধারণ হলেও, পাত্র চাই বিজ্ঞাপনে যে ‘গৃহকর্মে নিপুণা’ লেখা হয়েছিল, সেটা বাড়িয়ে বলা নয়। তাই সে স্বামী, পুত্র নিয়ে সুখী গৃহিণী হয়েছে। জামাই জয়ন্ত স্বাস্থ্যসচেতন নয় বলে অভয়বাবুর একটু ইয়ে আছে বটে, তবে গিন্নির সঙ্গে এ-ব্যাপারে তিনি একমত যে, মানুষটা ভাল। সমস্যা হয়েছে অলিভিয়াকে নিয়ে। দিদি ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না, বোন গোড়া থেকেই দুরন্ত। কিন্ডারগার্টেনে পড়ার সময়ে ছেলেদের সঙ্গে রীতিমতো মারামারি করত। তার ওপর ক্লাসে প্রথম তিনে থেকেছে সবসময়, একবারে জয়েন্ট পাশ করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ঢুকেছে, ও-জিনিসটার মন্দার বাজারেও ক্যাম্পাস থেকে সাত তাড়াতাড়ি চাকরি পেয়েছে। ‘এই মেয়ের পাত্র পাওয়া শক্ত হবে’ বলে সীমা বরাবরই চিন্তা করতেন, কিন্তু অভয়বাবু পাত্তা দিতেন না। কারণ তাঁর ধারণা ছিল— ইঞ্জিনিয়ার মেয়ের জন্য ইঞ্জিনিয়ার ছেলে পাওয়া এমন কিছু শক্ত ব্যাপার নয়। তাছাড়া মেয়ে যে বিজ্ঞাপনের ভাষায় ‘প্রকৃত সুন্দরী’, তা নিয়ে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সকলেই একমত। অতএব চিন্তা কী? কিন্তু ওটাই যে চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে, কে জানত!

মেয়ে চাকরি করছে অনেকদিন হয়ে গেল, বয়সটা তিরিশের দিকে এগোচ্ছে, এদিকে মেয়ের কাউকেই পছন্দ হয় না। মাঝে শুনেছিলেন কার সঙ্গে নাকি প্রেম করছে, তাতে অভয়বাবুর আপত্তি ছিল না। কিন্তু কিছুদিন পরেই শুনলেন ‘ব্রেক-আপ’ হয়ে গেছে। কথাটা আজকাল খুব কানে আসে, অভয়বাবু বুঝেছেন যে, এর মানে হল ছাড়াছাড়ি। ছেলেটার ছবি-টবি অলিভিয়া দেখিয়েছিল। ওরই কোলিগ, ওরাও কায়স্থ। অভয়বাবুর বাবার আমলে একে বলা হত রাজযোটক। মেয়ের সমস্যাটা কী তাহলে? সেকথা জিজ্ঞেস করার মতো খোলামেলা সম্পর্ক ছোট মেয়ের সঙ্গে নেই। গিন্নির মুখে শুনেছেন ‘কমপ্যাটিবিলিটি ইস্যু’। সেটা কী ব্যাপার জিজ্ঞেস করায় সীমা বললেন, ‘অত আমি বুঝি না। ও যা বলল তাই তোমায় বললাম।’ সঙ্গে সাবধান করে দিলেন, ‘তুমি আবার কিছু জিজ্ঞেস করতে যেও না। ওই নিয়ে কথা বলতে গেলেই রেগে যাচ্ছে।’ গিন্নি কেন যে তাঁকে এত বোকা ভাবে, সেটা চল্লিশ বছরেও অভয়বাবু বুঝে উঠতে পারেননি। যিনি গিন্নিকেই দরকারের বাইরে একটা কথা জিজ্ঞেস করেন না, তিনি যাবেন মেয়েকে ঘাঁটাতে? বড় মেয়েকে দিয়ে মাঝেমধ্যে খবর নেওয়ার চেষ্টা করেন, ছোট আবার কোনও প্রেম-টেম করছে কিনা। তাতে যা শুনেছেন, সেটা সুবিধের লাগেনি। কীসব অ্যাপ-ট্যাপ নাকি আছে, তাতেই প্রেম চলে আজকাল। মেয়ে তাতে ছেলেদের ঘেঁটেঘুটে দেখছে। এই নিয়ে একদিন মা-মেয়ের তুমুল হয়ে গেছে, অভয়বাবু ধারেকাছে ঘেঁষেননি। বিয়ে করতে চাইলে করবে, না চাইলে না করবে। টাকাপয়সার ব্যবস্থা তো করাই আছে, আজ বললে কাল বিয়ে দিয়ে দিতে পারবেন। গোছানো লোকেরা যেমন হয়। অতএব খামকা মেয়ের বিয়ে নিয়ে ভেবে নিজের শরীর খারাপ করবেন না বলেই ঠিক করে নিয়েছেন।

অভয়বাবুর মতো শান্তিপ্রিয় এবং ঠান্ডা মাথার লোক হয় না। তিনি ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে রাগ করে শরীরের ক্ষতি করেন না। দেশে রাগ করার মতো ব্যাপার তো আর কম ঘটছে না। এই যদি রিজার্ভেশন না থাকত তাহলে অলিম্পিয়া না পেলেও, অলিভিয়া অবশ্যই সরকারি চাকরি পেত। তাহলে এই যে সাড়ে দশটা-এগারোটায় একা-একা ট্রেনে করে ফেরে আর অভয়বাবু চিন্তায় ঘর-বার করেন, মাঝে-মাঝে মাঝরাত পেরিয়ে অফিসের গাড়িতে ফেরে— এসব আপদ থাকত না।

সীমা অবশ্য মাঝে-মাঝেই খোঁচান, ‘তুমি বাবা, তোমার একটা দায়িত্ব নেই? মেয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে আর তুমি নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছ?’

অভয়বাবু আলোচনা দীর্ঘায়িত না করার উদ্দেশ্যে বলেন ‘ও তো বিয়ে করতে চাইছে না। চাইলেই আমি…’

‘ও বিয়ে করতে চাইছে না আবার কী কথা? আমি কি আমার বাবাকে গিয়ে বলেছিলাম হ্যাংলার মতো, বাবা আমার বিয়ে দাও? তুমি পাত্র ঠিক করো, ওর ঘাড় বিয়ে করবে।’

‘আরে বাবা যুগ পালটে গেছে। তোমার মেয়ে চাকরি করে, একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট উওম্যান…’

‘আসল কথা হচ্ছে তোমার দ্বারা হবে না। নিজের মেয়েকে শাসন করতে পারো না, কী করে অফিস চালাতে ভগবান জানে।’

অভয়বাবুর পক্ষে স্বস্তিদায়ক ব্যাপার হল, গিন্নির এই জাতীয় বাক্য যে কোনও আলোচনার শেষ বাক্য। এরপর তিনি আর কিছু বলেনও না, অন্য পক্ষ কিছু বললে শোনেনও না। ফলে অভয়বাবু নিশ্চিন্তে কাটমানি, ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ক’টা মদের বোতল আর কন্ডোম পাওয়া গেল, কোন নেতার বান্ধবী নেতার থেকে কত ছোট, পশ্চিমবঙ্গ পশ্চিম বাংলাদেশ হয়ে যাবে— টিভির এইসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মন দিতে পারেন। এসব না জানলে সকালের প্রাতঃভ্রমণোত্তর আড্ডায় বা পাড়ার মুদির দোকানে নিজেকে বড্ড আনস্মার্ট লাগে। ওটা সামলে দিতে পেরে অভয়বাবুর অবসর জীবন বেশ আরামেই কাটছিল। মাঝে-মাঝে গ্যাসের দাম নিয়ে গিন্নি খুঁতখুঁত করলে অভয়বাবু বলতেন, ‘আরে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে দাম বাড়ছে, তো এখানে বাড়বে না? এসব তুমি বুঝবে না।’ স্কুটারে পেট্রল ভরতে গিয়ে প্রতিবারই বলতেন, ‘আবার বাড়িয়ে দিলে, অ্যাঁ? স্কুটারটা এবার বেচেই দেব শালা।’ পেট্রলপাম্পের ছেলেগুলো বলত, ‘দাম আমরা বাড়াই? গভমেন্টকে বলুন গিয়ে।’ অভয়বাবু বলতেন, ‘সবই গভমেন্টের দোষ, না? দেশের লোকের কোনও দায়িত্ব নেই?’ তারা বলত, ‘তাহলে পাম্পের মালিককে বলুন।’ এছাড়া কোনও টেনশন ছিল না। চারদিকে সবাই বলত বটে, জিনিসপত্রের দাম খুব বেড়ে যাচ্ছে, চালের কিলো ষাট টাকা; বেশি ঘ্যানঘ্যান করলে অভয়বাবু শুনিয়ে দিতেন, ‘ষাট টাকাটা আজকের দিনে কোনও টাকা? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিনিসের দাম তো বাড়বেই।’

এককথায়, অভয়বাবুর মতো শান্তিপ্রিয় এবং ঠান্ডা মাথার লোক হয় না। তিনি ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে রাগ করে শরীরের ক্ষতি করেন না। দেশে রাগ করার মতো ব্যাপার তো আর কম ঘটছে না। এই যদি রিজার্ভেশন না থাকত তাহলে অলিম্পিয়া না পেলেও, অলিভিয়া অবশ্যই সরকারি চাকরি পেত। তাহলে এই যে সাড়ে দশটা-এগারোটায় একা-একা ট্রেনে করে ফেরে আর অভয়বাবু চিন্তায় ঘর-বার করেন, মাঝে-মাঝে মাঝরাত পেরিয়ে অফিসের গাড়িতে ফেরে— এসব আপদ থাকত না। তারপর এই যে দেশের ইতিহাসটাই ঠিক করে শিখতে দেওয়া হল না কাউকে, না অভয়বাবুকে, না তাঁর মেয়েদের— এটাও কি কম রাগের ব্যাপার?

এরকম আরও অনেক ব্যাপারেই তাঁর রাগ হয়, তবে অভয়বাবু রাজনীতি আর ব্যক্তিগত জীবনকে কখনও মেলান না। মিলে যাওয়ার উপক্রম হলে অস্বস্তি বোধ করেন। সেই কারণেই বছরদুয়েক হল একটা ব্যাপারে তিনি খুব বিরক্ত হচ্ছিলেন। সকালে হাঁটতে বেরিয়ে সবুজগ্রাম স্টেশন রোডের দু-ধারে সবজিওলা আর গুমটির সংখ্যা বেড়েই চলেছে দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে মনখারাপ হত। অভয়বাবুর বাপ-কাকারা দেশভাগের পর বরিশাল থেকে এসে এখানে বসত করলেও, ওঁরা তিন ভাইবোন এখানেই জন্মেছেন, বড় হয়েছেন। তখন কত ফাঁকা ছিল জায়গাটা! পুকুরে ডোবায় ভরা, কত গাছগাছালি! এমনকী, দশ বছর আগেও এত ঠাসাঠাসি ছিল না। এখন একেবারে লোকে লোকারণ্য। তাতে সুবিধা হয়েছে অনেক, রাস্তাঘাটও আগের চেয়ে ভাল হয়ে গেছে। কিন্তু স্টেশন বাজারটা বাড়তে-বাড়তে রাস্তায় এসে পড়েছে— এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। সবুজগ্রামে লোক যত বেড়েছে, তার চেয়ে বোধহয় গাড়িঘোড়া বেড়েছে বেশি। তাতেই স্টেশন রোডে গ্যাঞ্জাম লেগে থাকে সারাক্ষণ, তার ওপর এরা বসে পড়ে রাস্তাটাকে আরও সরু করে দিয়েছে। এভাবে কোনও সভ্য দেশের মানুষ বাঁচে?

মাসছয়েক আগে শম্ভুর দোকানে চা খেতে-খেতে একদিন এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, রিটায়ার্ড স্কুলমাস্টার স্বপন সেন বললেন, ‘চাকরিবাকরি নেই তো, লোকে করবে কী? বসে পড়ল রাস্তার ধারে বিশ কিলো আলু নিয়ে।’ একটি বছর তিরিশেকের ছেলে, অভয়বাবুর অপরিচিত, খুব যুক্তিপূর্ণ কথা বলল, ‘চাকরি নেই যোগ্যতা নেই বলে। তার জন্য আমাকে ভুগতে হবে কেন? আমি শান্তিতে হাঁটাচলা করতে পারব না? এটা তো আমার ফান্ডামেন্টাল রাইট।’ স্বপনদা বলছিলেন, ‘ওদেরও তো বেঁচে থাকার রাইট আছে’, ছেলেটি খুব জোরের সঙ্গে বলল, ‘না নেই। আমার থেকে বেশি রাইট নেই। কারণ আমি ট্যাক্সপেয়ার। আমার টাকায় এই রাস্তা তৈরি হয়েছে। সেই রাস্তায় আমি শান্তিতে বাইক চালাতে পারব না ওরা চাকরি পায়নি বলে? মামাবাড়ির আবদার। এসব শুধু এই দেশেই চলে। পলিটিকাল পার্টিগুলো ভোটের জন্য এদের মাথায় তুলে রেখেছে। কোনও ডেভেলপড কান্ট্রিতে এসব পাবেন না।’ 

হক কথা। দোকানে উপস্থিত সকলেই ওকে সমর্থন করছে দেখে স্বপনদা চেপে গেলেন। অভয়বাবুর দারুণ ভাল লেগেছিল ছেলেটিকে। আলাপ করে জানলেন, ছেলেটির নাম কৌস্তভ রায়। একটা বড় ওষুধ কোম্পানির এক্সিকিউটিভ। সবুজগ্রামে নতুন এসেছে। স্টেশন রোডে ‘ড্রিম হোমস’ বলে যে নতুন অ্যাপার্টমেন্টটা হয়েছে, তার চারতলায় ফ্ল্যাট। গিন্নি আবার হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট। একমাত্র মেয়ে কনভেন্টে পড়ে। এদের দেখেই বুকে বল আসে যে, দেশটার এই জবরজং অবস্থা বেশিদিন থাকবে না। কৌস্তভের সঙ্গে দেখা হয় কম, কিন্তু সেই থেকে হোয়াটস্যাপে যোগাযোগ আছে। ও বারবার বলত, ‘টু চেঞ্জ দ্য কান্ট্রি, উই হ্যাভ টু চেঞ্জ দ্য গভর্নমেন্ট। সেটা শিগগির হবে। তারপর আপনারা দেখতে পাবেন ডেভেলপমেন্ট কাকে বলে। দেশটাকে এরা ধর্মশালা বানিয়ে রেখেছে। যেখান থেকে ইচ্ছে এলাম, আধার কার্ড, রেশন কার্ড বানালাম আর রাস্তার ধারে দোকান বানিয়ে বসে গেলাম— এসব আর চলবে না।’ ছেলেটার কথার মধ্যে এমন একটা ব্যাপার আছে যে শুনলে খুব আশা জাগে। কিন্তু অভয়বাবু এত বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, আশা করলেই আশাহত হতে হয়। তাই তিনি দুরুদুরু বুকে জিজ্ঞেস করতেন, ‘বলছ চেঞ্জ হবে? আর তো পারা যাচ্ছে না।’ কৌস্তভ বলত, ‘আলবাত হবে।’

এই যে অভয়বাবু বলেছিলেন ‘পারা যাচ্ছে না’, তার কারণ তিনি ভয় পাচ্ছিলেন। কৌস্তভকে বিচক্ষণ প্রমাণ করে চেঞ্জ তো হয়েছে, কিন্তু অভয়বাবুর ভয় কাটেনি। ভয়টা ছোট মেয়ের জন্য। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় থেকেই অলিভিয়ার পিছনে ছেলেরা ছোঁকছোঁক করত। অভয়বাবু গিন্নির থেকে যত দূর শুনেছেন, প্রথম একজন প্রোপোজ করে ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময়ে। মেয়ের নাকি ছেলেটিকে বেশ পছন্দও ছিল, একবার সিনেমা দেখতেও গেছিল একসঙ্গে। তবে গিন্নির কানে আসায় তিনি একদিন ডেকে পাঠিয়ে অ্যাইসা ধমক দিয়েছিলেন, যে ছেলেটি আর এমুখো হয়নি। অলিভিয়া দিনদুয়েক কান্নাকাটি করেছিল, তারপর সামলে যায়। কলেজে কে বা কারা প্রোপোজ করেছে, মেয়ে তাদের কাকে কতটা পাত্তা দিয়েছে সে খবর আর কানে আসেনি, তবে শীতের শেষদিকে প্রতিবারই একদিন দেখতেন মেয়ে খুব সেজেগুজে সকাল-সকাল বেরিয়ে যাচ্ছে, আর ফিরছে কীসব গিফট-টিফট নিয়ে। পরপর দু-তিনবার এরকম দেখার পরে বড় মেয়েকে জিজ্ঞেস করে অভয়বাবু জানতে পারেন— ওই দিনটা প্রেমের জন্য বরাদ্দ। অভয়বাবুর প্রশ্ন ছিল, ‘কেন? কোনও পুজো-টুজো?’ অলিম্পিয়া বলে, ‘বাবা, তুমি এত ব্যাকডেটেড কী করে! টিভিতে, কাগজে, সোশাল মিডিয়ায় সব জায়গায় কত অ্যাড বেরোয় দেখো না? আজ তো ভ্যালেন্টাইনস ডে।’ তারপর গুগল করে ব্যাপারটা জেনে নিয়েছিলেন।

এসব অলিম্পিয়া-অলিভিয়ার পিসি করলে অভয়বাবুর বাবা বাড়ি থেকে বেরনোই বন্ধ করে দিতেন, কিন্তু অভয়বাবু তেমন বাবা হননি। মেয়েদের তিনি প্রাণে ধরে কোনওদিন কানটাও মুলে দিতে পারেননি, তার জন্য গিন্নির কাছে ‘বাবা হওয়ার অযোগ্য’ তকমাও পেয়েছেন। কিন্তু মুশকিল হল এমএলএ-র ছেলে অলিভিয়ার প্রেমে পড়ে যাওয়ায়। না কি তাতেও মুশকিল হত না, অলিভিয়া তার প্রেমে পড়ল না বলেই যত গণ্ডগোল?

এমনিতে এমএলএ ন্যাড়া দাস বা তার ছেলের প্রেমে পড়ার কোনও কারণ আছে বলে অভয়বাবুও মনে করেন না। ন্যাড়াকে তো চোখের সামনে বড় হতে দেখেছেন। ভাল নাম সৌপ্তিক। ওর বাবা স্টেট বাসের কন্ডাক্টর ছিল, নিপাট ভালমানুষ। ন্যাড়া তার বাবার ঠিক উলটো। ছোট থেকেই মারামারি করে বেড়ানো অভ্যাস, টুকে মাধ্যমিক পাশ। তারপর দাদাদের ধরে প্রোমোটারি শুরু করেছিল। ঘটে বুদ্ধি থাকায় প্রোমোটার থেকে ডেভেলপার, ডেভেলপার থেকে নেতা হয়েছে। কোটিপতি নেতা। তার একমাত্র ছেলে শৌর্য, ওরফে কাল্টু, এলাকার ত্রাস। সে অলিভিয়ার ক্লাসমেট ছিল স্কুলে। বরাবরই নাকি অলিভিয়াকে ইম্প্রেস করার চেষ্টা করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে। হওয়ারই কথা। কাল্টু দেখতে বেশ লাল্টু হলেও লেখাপড়ায় একেবারে ঢ্যাঁড়শ, তার ওপর স্কুলজীবন থেকেই প্রকাশ্যে নেশাভাঙ করে। কাল্টু আর তার বন্ধুমহল ক্লাবের সভ্যদের সভ্যতার ঠ্যালায় রেললাইনের এপারের সবুজগ্রাম আর ওপারের কুড়াইলের প্রায় কোনও অল্পবয়সি মেয়েই নিশ্চিন্তে থাকতে পারে না। তবে যেহেতু ন্যাড়া অভয়বাবুর পাড়ার ছেলে, এখনও বাজার থেকে ভারি ব্যাগ হাতে ফিরতে দেখলে গাড়িতে লিফট দেয় আর দেশ-দুনিয়ার খবর জিজ্ঞেস করে, সেহেতু ভেবেছিলেন তাঁর মেয়ের দিকে কাল্টু নজর দেবে না। প্রথমদিকে যখন বিরক্ত করত, তখন একবার অভয়বাবু গটগটিয়ে ন্যাড়ার বাড়ি গিয়ে বেশ রেলায় বলে এসেছিলেন ‘কী রে ন্যাড়া, তোর ছেলেটাকে একটু দেখেশুনে চলতে বল? নিজের পাড়ার মেয়েকে বিরক্ত করছে!’ ন্যাড়াও অস্বাভাবিক ভদ্রতা করে বলেছিল, ‘আর বোলো না দাদা। ওর মা আর আমার মায়ের আদর পেয়ে পেয়েই এরকম বাঁদর তৈরি হয়েছে। ওর ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব আমি দাঁড়াও। এক ক্লাসে ভাইবোনের মতো বড় হল, এখন সেই মেয়ের পেছনে ধাওয়া করছে!’

অভয়বাবু পারলে দরজা খুলে ঝাঁপ দিতেন। ততক্ষণে অবশ্য গাড়ি বাড়ির দোরগোড়ায়। নামিয়ে দেওয়ার আগে ন্যাড়া বলল ‘যা-ই হোক, পাড়ার মেয়ে। গুডউইলটা তো খারাপ করতে পারি না, নইলে ওসব মেয়েকে কী করে টাইট দিতে হয় আমার জানা আছে। ওকে শুধু বলে দিও একটু কম উড়তে। বড্ড উড়ছে। যেসব ড্রেস পরে অফিস যায়… সবুজগ্রাম ভদ্দরলোকদের জায়গা। এগুলো বরদাস্ত করব না কিন্তু।’

তারপর কিছুদিন শান্তি বজায় ছিল, কিন্তু বছরতিনেক আগে একদিন স্টেশন চত্বরে গোলাপ ফুল হাতে প্রোপোজ করে বসতেই অলিভিয়া কষিয়ে থাপ্পড় মারে। তারপর থেকে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেছে। কাল্টু তখনই অলিভিয়ার গলা টিপে ধরেছিল, স্টেশন চত্বরের দোকানদাররা দৌড়ে এসে মেয়েটাকে বাঁচিয়ে দেয়।

বাড়িতে ব্যাপারটা নিয়ে কথা হওয়ার সময়ে সীমা মেয়েকে বলেছিলেন, ‘ফুলটা না নিলেই তো মিটে যেত। আবার চড় মারার কী দরকার ছিল? দিনদুপুরে বাজারের মধ্যে… প্রেস্টিজে লাগে না?’

অলিভিয়া ফোঁস করে উঠেছিল, ‘হ্যাঁ, এখন মাওয়ালিদের প্রেস্টিজ বাঁচিয়ে ভদ্রবাড়ির মেয়েদের চলতে হবে, না? কত বছর ধরে ডিস্টার্ব করে যাচ্ছে আমাকে! অনেকদিন আগেই ভদ্রভাবে বলে দিয়েছি, দ্যাখ, তোর সঙ্গে আমার কিছু হওয়া সম্ভব না। তারপরেও স্টক করে। কতদিন টলারেট করব? সবকিছুর একটা লিমিট আছে তো।’

অভয়বাবু মিনমিন করে বলেছিলেন, ‘মাথা গরম করলে চলবে না রে। ও হচ্ছে পাওয়ারফুল লোকের ছেলে। ওর সঙ্গে লড়ে কি আমরা পারব?’

‘লড়তে হবে কেন? তুমি ন্যাড়াকাকুকে বলো নিজের ছেলেকে শাসন করতে। স্কুলে পড়তেই ফালতু ছেলে ছিল, এখন তো পুরো অ্যান্টি-সোশাল হয়ে গেছে। ক্লাবের সামনে বসে থাকে দলবল নিয়ে, আর যত মেয়ে ওখান দিয়ে যাতায়াত করে সবাইকে টোন কাটে। আর কোনও কাজ নেই।’

কথাটা যে সত্যি, তা কেবল অভয়বাবু আর সীমা কেন, গোটা সবুজগ্রাম জানে। সঙ্গে এ-ও জানে যে, এমএলএ-র কাছে নালিশ জানিয়ে কোনও লাভ নেই। আগে তবু চক্ষুলজ্জার খাতিরে বলত, ‘আচ্ছা দেখছি’, ইদানীং বলে, ‘তা আমি কী করব? অত বড় ছেলের পোঁদে পোঁদে ঘুরে বেড়াব কাজকম্ম ফেলে? নিজের মেয়েকে সামলে রাখতে পারেন না?’

আরও হাত-পা ঠান্ডা করে দেওয়া কাণ্ড ঘটেছিল দিনদুয়েক পরে। সন্ধেবেলা স্টেশন বাজারের বীরুর দোকান থেকে মাসকাবারি জিনিসপত্র নিয়ে দু-হাতে দুটো ভারি ব্যাগসমেত হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন অভয়বাবু। পাশে এসে দাঁড়াল ন্যাড়ার ইনোভা, স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে দরজাটা খুলে ধরে বলল, ‘আরে একটা রিকশা নাওনি? তুমি ফিট লোক জানি, কিন্তু বয়সটা তো হচ্ছে। উঠে এসো।’ অভয়বাবু জীবনে না বলতে শেখেননি, তাই অস্বস্তি হলেও উঠেই পড়লেন। ন্যাড়া কোনও ভূমিকা না করেই বলল, ‘তোমার মেয়ে কিন্তু কাজটা ভাল করেনি, অভয়দা।’

‘হ্যাঁ, আমিও বলেছি। আসলে… বাচ্চা মেয়ে তো, মাথা গরম করে ফেলেছিল আর কী!’

‘বাচ্চা মেয়ে! দিব্যি তো ডবকা হয়েছে দেখি। বাচ্চা মেয়ে আবার কী? কথা নেই বার্তা নেই, একটা ছেলেকে চড় মেরে দেবে! কী অপরাধ করেছিল আমার ছেলে? সভ্যভাবেই তো প্রোপোজ করেছে। গায়ে হাতও দেয়নি, নোংরা কথাও বলেনি। ঠিক কিনা?’

‘সে তো ঠিকই…’

‘কিন্তু ও সবার সামনে আমার ছেলেকে অপমান করে দিল তো? এটা জাস্টিস হল? তুমিই বলো?’

অভয়বাবুর তখন গলা শুকিয়ে কাঠ।

‘শুনে থেকে আমার এত খারাপ লাগছে, কী বলব অভয়দা। তোমার মেয়েদের আমি নিজের মেয়ের মতো ভালবাসতাম। অলিকে তো সেই ছোট থেকে চিনি। আর তো সেই নজরে দেখতে পারব না, না?’

অভয়বাবু পারলে দরজা খুলে ঝাঁপ দিতেন। ততক্ষণে অবশ্য গাড়ি বাড়ির দোরগোড়ায়। নামিয়ে দেওয়ার আগে ন্যাড়া বলল ‘যা-ই হোক, পাড়ার মেয়ে। গুডউইলটা তো খারাপ করতে পারি না, নইলে ওসব মেয়েকে কী করে টাইট দিতে হয় আমার জানা আছে। ওকে শুধু বলে দিও একটু কম উড়তে। বড্ড উড়ছে। যেসব ড্রেস পরে অফিস যায়… সবুজগ্রাম ভদ্দরলোকদের জায়গা। এগুলো বরদাস্ত করব না কিন্তু।’

অভয়বাবু পিছন ফিরে বাড়ির গেটটা খুলে ফেলেছেন, ড্রাইভার স্টার্ট দিয়েছে। স্টার্ট বন্ধ করিয়ে ন্যাড়া চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল ‘অভয়দা, অলির কত বয়স হল?’ কোনওমতে কাঁপা গলায় বলতে পারলেন, ‘এই তো… আঠাশ।’

‘বাবা! অনেক তো! ওই বয়েসে আমার বউয়ের কাল্টু, সোনাই, মুনাই— তিনজনেই হয়ে গেছিল। বিয়ে দিয়ে দাও, বেকার দেরি করছ কেন? আমার ছেলের আবার সন্মানে লাগলে মাথার ঠিক থাকে না। কখন কী করে বসবে, তারপর তুমি আর বউদি আমারই পায়ে ধরবে গিয়ে। হে হে।’

সেদিন সারাদিন বৃষ্টি হয়ে একটু ঠান্ডা ঠান্ডাই ছিল, তবু কেন বাড়ি ঢুকে দরদর করে ঘামছিলেন সেকথা সীমাকে বা ক’দিনের জন্য বাপের বাড়ি আসা অলিম্পিয়াকে বলা যায় না।সীমা রান্নাঘরে থাকায় খেয়ালও করেননি, অলিম্পিয়া ফ্যানটা ফুল স্পিড করে দিয়ে বলেছিল, ‘বাবা, তুমি এই ভারি-ভারি ব্যাগ নিয়ে এতটা হেঁটে আসা এবার বন্ধ করো। রিকশা আছে, টোটো আছে, পয়সারও অভাব নেই। কোনদিন অসুস্থ হয়ে পড়বে।’

কিন্তু কথাগুলো কাউকে তো বলা দরকার। পরদিন সকালে শম্ভুর চায়ের দোকানে বসে নিচু গলায় বলছিলেন। ওখানে তখন বাজারের বিক্রেতাদেরই ভিড়। ইমরান বলল, ‘কোনও চিন্তা করবেন না, দাদা। অলি তো এখান দিয়েই ফেরে। আমরা থাকতে ওর গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না।’

নন্তুর পাশের দোকানের টুকাইও অভয় দিল, ‘সাহসই পাবে না। এমএলএ-র ছেলেই হোক আর এমপি-র ছেলেই হোক, মেয়েছেলের গায়ে হাত দিলে আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখব নাকি? এমনিতেই ওই শুয়োরের বাচ্চার গুন্ডামিতে সবাই খচে আছে। ওরা পাওয়ারে বলে কেউ কিছু বলি না।’

শম্ভু ইমরানকে বলল, ‘তর পোলারে ফিট কইর‍্যা দে না। রোজ অলি ট্রেন থিকা নামলেই তুইল্যা নিয়া একদম বাড়িতে ঢুকায় দিয়া আসব।’

মুখ থেকে কথা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইমরান ফোন করে ইকবালকে ডাকল। ও স্টেশনের বাইরের টোটো স্ট্যান্ডে দাঁড়ায়। মাসকাবারি ব্যবস্থা হয়ে গেল, মেয়েকে তখনই ফোন করে জানিয়েও দিলেন অভয়বাবু। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ‘এটার আবার কী দরকার ছিল? আমি তো একাই ফিরি এতদিন।’

‘না না, আজকাল তো প্রায়ই তোর বেশি রাত হচ্ছে। হেঁটে ফিরতে হচ্ছে। ইকবাল তোর জন্য ওয়েট করবে। আমি তোর নম্বর দিয়ে দিচ্ছি ওকে।’

‘ওর কাছে আছে আমার নম্বর। আমার কাছেও ওর নম্বর আছে। টুরে যাওয়ার সময়ে লাগেজ থাকে বলে আমি ডেকে নিই তো ওকে। কিন্তু এই অ্যারেঞ্জমেন্টটা আননেসেসারি হল।’

জীবনে ওই একবারই ছোট মেয়েকে ধমকেছিলেন অভয়বাবু, ‘সব ব্যাপারে তোমার মতামত চাওয়া হয়নি। বড় হয়ে গেছ বলে ডানা গজিয়েছে নাকি? বাবা যদ্দিন আছে, বাবার কথা মেনেই চলতে হবে। আমি চিতায় উঠলে পরে যা ইচ্ছে কোরো।’ ব্যাপারটা অপ্রত্যাশিত বলে অলিভিয়া জবাব দিয়ে উঠতে পারেনি।

তা ওই ব্যবস্থাই অ্যাদ্দিন চলছিল। প্রথম হপ্তাদুয়েক যতক্ষণ না বাড়ির গেটে ইকবালের হর্ন শোনা যেত, অভয়বাবু নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পেতেন। তারপর পুরোপুরি নিশ্চিন্ত না হলেও, এই বুঝি একটা বিপদ হল— এমন আর মনে হয় না। কিন্তু কাল্টু হল কুকুরের লেজ, সোজা হওয়ার নয়। মাঝেমাঝেই ইচ্ছে করে অভয়বাবুদের গেটের সামনে বাইক দাঁড় করিয়ে ফোনে কার সঙ্গে যেন লম্বা কথাবার্তা বলে আর ঘুরে-ঘুরে তাকায়। কখনও মোবাইলে খুব জোরে নোংরা ভোজপুরি গান চালিয়ে দেয়। ইচ্ছে করে পিটিয়ে পিঠের চামড়া তুলে দিতে, অভয়বাবুর গায়ে যা জোর আছে তাতে কাল্টু আটকাতেও পারবে না। কিন্তু কাল্টুর বাপের সঙ্গে কি আর পেরে ওঠা যাবে? এই উদ্বেগ কিছুতেই কাটে না। কাল্টুর ব্যবহারটা সীমারও চোখে পড়েছে, ফলে তিনিও ভয়ে থাকেন। মাঝেমধ্যেই জিজ্ঞেস করেন, ‘হ্যাঁ গো, এর কি কোনও প্রতিকার নেই?’

অভয়বাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। তাই বলেছিলেন, ‘আর পারা যাচ্ছে না।’

চেঞ্জ হওয়ার পর চারপাশের সবকিছু দ্রুত বদলে যাচ্ছে দেখে অভয়বাবুর দারুণ লাগছিল। ন্যাড়া হেরে যাওয়ায় তিনি রবিবার না হলেও খাসি কিনেছিলেন ইমরানের থেকে। ন্যাড়া চেঞ্জের দিন দুপুর থেকেই সপরিবার বেপাত্তা। কাল্টুর কারদানি এবার বন্ধ হবে, ওর বন্ধু মহলে বুলডোজার চলবে— একথা সেদিন রাতে গিন্নির অপূর্ব রান্নায় খাসির চর্বির স্বাদে আধবোজা চোখে বলেছিলেন অভয়বাবু। ক’দিন পরেই শুনলেন— স্টেশন বাজার তুলে দেওয়া হবে, স্টেশন রোডের দু-ধারে যারা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে, তাদেরও উঠে যেতে হবে। নোটিশ এসেছে। মনশ্চক্ষে দেখতে পেলেন ঝাঁ-চকচকে, ফাঁকা-ফাঁকা সবুজগ্রাম স্টেশন চত্বরের ছবি। আঃ! কী আরাম! মর্নিং ওয়াকটাও কত পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে ভেবে অদ্ভুত আনন্দ হল।

বাজারে সবার অবশ্য মুখ অন্ধকার। চালের দোকানের সুকান্ত বলল, ‘কোথায় যাব এত বছরের ব্যবসা নিয়ে! বাইরে দোকানঘরের খোঁজ করেছি। এত ভাড়া চাইছে… অত ভাড়া দিয়ে ব্যবসা চালাতে পারব না রে ভাই।’ অভয়বাবু একটু দোটানায় পড়লেন বটে, তবে সত্যি কথাটা না বলে পারলেন না, ‘কী আর করবি! যার জমি সে ফেরত চাইলে দিতে তো হবেই। আইন তো সবার ওপরে।’

শম্ভুর দোকানে অনেকদিন পরে কৌস্তভের সঙ্গে দেখা।

‘কী, বলেছিলাম কিনা? কীরকম ফাস্ট সব চেঞ্জ হচ্ছে দেখছেন তো? জাস্ট একটা বছর যেতে দিন। সবুজগ্রাম গ্রিন সিটি হয়ে যাবে। চিনতেই পারবেন না।’

অভয়বাবু চওড়া হেসে বলতে যাচ্ছিলেন, সে কি আর হতে দেবে ভোটের কাঙাল পার্টিগুলো? তখন সব ঝান্ডাই এক হয়ে যাবে, বলবে কারও দোকান তুলতে দেব না। তার আগেই শম্ভু বলে উঠল, ‘হ, সবুজগ্রামেরেও চেনা যাইব না, মানুষগুলারেও চেনা যাইব না। আমরা তো আর থাকতে পারুম না এইহানে। পকেটে টি ব্যাগে চা আর ফ্লাস্কে গরম জল নিয়া আইস্যা খাইয়েন রাস্তার উপর বইস্যা।’

অভয়বাবুর হাসি মিলিয়ে গেল। খেয়াল হয়নি যে শম্ভুর দোকানটাও ভাঙা পড়বে। তবে কৌস্তভ আশ্চর্য ছেলে! একটুও না ঘাবড়ে উত্তর দিল, ‘দেখুন, ডেভেলপমেন্টের জন্য একটু স্যাক্রিফাইস তো করতেই হবে। আপনাদের তো এতদিন তোলা দিয়ে দোকান চালাতে হচ্ছিল। এখন তো সেই প্রবলেমটা থাকল না, না? অন্য কোথাও দোকান খুলুন। এত লোক আছে, কাস্টমার পাবেন না হতেই পারে না।’

শম্ভু আর কিছু বলল না, ওর কাঁচুমাচু মুখ দেখে অভয়বাবু তাড়াতাড়ি চা শেষ করে বেরিয়ে পড়লেন। প্রিয় সন্দেশ বিস্কুটটা ঠোঙাতেই পড়ে রইল। শম্ভুর মুখের ওপর তিনি বলতে না পারলেও, কৌস্তভ ঠিক কথাটা বলে দিয়েছে বলে অভয়বাবু খুশি। কতদিন আর গরিব লোকের রুটিরুজির দোহাই দিয়ে স্টেশনগুলোর হতকুচ্ছিত চেহারা করে রাখবে সরকার? বিদেশের রেল স্টেশনগুলোর ছবি দেখলে তো চোখ জুড়িয়ে যায়। তাছাড়া গরিব লোক হয়ে থাকতেই বা চাও কেন সারাজীবন? পরিশ্রম করো, তোমারও বাড়ি-গাড়ি হবে। স্টেশন চত্বরে বসে বসে চা বেচব আর অ্যান্টিলার মালিককে হিংসে করব— এ তো চলতে পারে না।

বাড়ি ঢুকতেই সীমার প্রশ্ন, ‘হ্যাঁ গো, স্টেশনের টোটো স্ট্যান্ডটাও তুলে দিচ্ছে নাকি?’

‘দেবেই তো। রেলের জমিতে দাঁড়ায় ওরা। কী জ্যাম হয়ে থাকে বলো তো কালভার্টের মুখটা? টোটো স্ট্যান্ডটা শুনছি তেঁতুলতলার ওদিকে পাঠিয়ে দেবে।’

‘সর্বনাশ!’

‘কেন? কী হল?’

‘আরে! তুমি বাবা না আর কিছু! মেয়েটা অফিসের কাজে মাস তিনেক বাইরে বলে ভুলে মেরে দিয়েছ? ওকে আবার এখান থেকে অফিস করতে হবে না? ইকবাল স্টেশনে না থাকলে ওকে বাড়ি পৌঁছে দেবে কে? তার ওপর দোকানপাট, বাজার সব তুলে দিচ্ছে; অত রাতে ওই নির্জন স্টেশনে এসে নামতে হবে! আমার তো ভাবলেই বুক ধড়াস ধড়াস করছে।’

তাই তো! অভয়বাবু চমকে উঠলেন। অবশ্য পরমুহূর্তেই খেয়াল হল, ন্যাড়া আর এমএলএ নেই। একগাল হেসে বললেন, ‘কাল্টু-ফাল্টু বেশি বাড়াবাড়ি করলে এবার কোমরে দড়ি পরিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাবে পুলিশ। দেখছ না চারদিকে কী চলছে? ওর বাবা তো ভয়ে হাওয়া।’

সীমা বললেন, ‘কিস্যু খবর রাখো না। চালু মাল, তাই গা ঢাকা দিয়েছিল। দল বদলে ফেলেছে। নতুন এমএলএ ন্যাড়ার কাঁধে হাত রেখে কীসব বলেছে দ্যাখো।’

বলে নিজের ফোনে একটা ইউটিউব ভিডিও চালিয়ে এগিয়ে দিলেন।

অভয়বাবু দেখলেন এবং ভীষণ ভয় পেলেন। ফেরার দিন অলিভিয়ার ফ্লাইট দমদমে নামবে রাত সাড়ে নটায়। মেট্রো বদলে, তারপর ট্রেন ধরে সবুজগ্রাম স্টেশনে নামতে এগারোটা তো বাজবেই।

ঠিক সেদিনই আবার সব তুলে দেওয়া হবে বলে নোটিশ পড়েছে।