আলোর গল্প  

১৯৮২ সালের এপ্রিল মাসের এক দুপুরে, বাষট্টি বছরের নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সার্পেন্টাইন লেনের বাড়ির বারান্দায় বসে স্ত্রী মাধবীকে প্রশ্ন করলেন, ‘ফুলঝুরি পত্রিকা থেকে চিঠি এসেছে, আমার গল্পটা মনোনীত হয়নি। এই নিয়ে মোট পাঁচটা গল্প বিভিন্ন পত্রিকায় অমনোনীত হল। কেন বলো তো?’

সাতান্ন বছরের মাধবী গৃহবধূ। একইসঙ্গে তিনি গ্রন্থকীট। তাঁর সকাল শুরু হয় ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ও ‘যুগান্তর’ নামের দু’টি খবরের কাগজ পড়ে। বাড়িতে আসে গাদা-গাদা পত্রিকা। ‘শুকতারা’, ‘নবকল্লোল’, ‘সন্দেশ’, ‘আনন্দলোক’, ‘দেশ’, ‘আনন্দমেলা’। সাংসারিক কাজ সেরে সব পত্রিকা খুঁটিয়ে পড়েন। মাধবী বললেন, ‘ফুলঝুরি ছোটদের পত্রিকা! তুমি ছোটদের জন্যেই গল্প লেখো। তাও ছাপল না? তা হলে এক কাজ করো। তোমার দুটো বই যারা ছেপেছে, তাদের বলে দেখো। প্রকাশক অতুল্য তো তোমার বন্ধু।’

গাঁটের কড়ি খরচ করে বন্ধু অতুল্য সেনের ‘নানাবিধ প্রকাশনী’ থেকে দুটি গল্পের বই প্রকাশ করেছেন নারায়ণ। একটির বইয়ের নাম, ‘আলোর গল্প,’ অন্যটির নাম ‘আশার আলো।’ বাচ্চাদের জন্যে লেখা বইদু’টির বিশেষ বিক্রি নেই। নারায়ণই ঘুরে-ঘুরে কলকাতার বিভিন্ন গ্রন্থাগারে দিয়ে এসেছেন। সার্পেন্টাইন লেনের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় জয়ী প্রথম তিনজনকে একটি করে বই উপহার দেন। এইভাবেই চলছে।

পড়ুন প্রতীক-এর লেখা গল্প ‘অভয়বাবুর ভয়’…

‘অতুল্য আমার বই ঠিকই করবে। কিছু টাকা দিতে হবে, এই যা!’ আপনমনে বললেন নারায়ণ। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রথম বইও তাঁর বন্ধুই করেছিলেন। তবে কি জানো মাধু, পত্রিকায় গল্প মনোনীত হলে পরীক্ষায় পাশ করার মতো আনন্দ হয়। টাকা দিয়ে বই করলে সেই আনন্দ নেই। তা ছাড়া, পাঁচটা গল্প বিভিন্ন পত্রিকা থেকে রিজেক্টেড হয়েছে মানে আমার গল্প লেখায় সমস্যা আছে।’

‘অত ভেবো না তো!’ স্বামীকে বোঝান মাধবী। ‘তুমি লেখো ছোটদের রূপকথা। বাংলায় সেরকম গল্পের কোনও অভাব নেই। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’, ‘টুনটুনির বই’, ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘হিন্দুস্থানী উপকথা’, ‘ভোঁদড় বাহাদুর’— কত চাই? সেসব লেখা ফেলে আজকের বাচ্চারা তোমার লেখা পড়বে না। শুধু ভাল হিরো আর খারাপ ভিলেনের লড়াই দিয়ে রূপকথা হয় না। জীবনকে কাছ থেকে না দেখলে রূপকথা কেন, কোনও গপ্পোই লেখা যায় না!’

‘আমি জীবন দেখিনি?’ ম্লান হাসলেন নারায়ণ, ‘তুমি এই কথা বলছ? আসলে কী জানো, গোটা জীবনজুড়ে এত দুঃখকষ্ট দেখলাম যে, ওসব নিয়ে লিখতে মন চায় না। গত চল্লিশ বছর বাংলার বাইরে কাটিয়ে সবে ফিরেছি নিজের দেশে। সার্পেন্টাইন লেনের এই বাড়ি কিনেছি সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে। ডিসপ্লেসমেন্টের দুঃখ কাকে বলে আমি জানলেও তুমি জানো না। শ্যামবাজারে বড় হয়েছ, বাগবাজার মাল্টিপারপাসে পড়াশুনো করেছ, বিয়ের পরে দমদমে থিতু হয়েছিলে। এখন আছ শেয়ালদায়। সব পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে। ঠাঁইনাড়া হওয়া কাকে বলে, প্রকৃত দুঃখ কাকে বলে যদি জানতে, তা হলে বুঝতে যে আমি যা লিখি তা হল…।’

নারায়ণের লেখার গুরুত্ব বোঝার আগেই মাধবী চমকে উঠলেন। কারণ বাড়ির বাইরে একটি পুলিশের জিপ নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে। কলকাতা পুলিশের এক বরিষ্ঠ আধিকারিক কলিংবেল টিপে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন?’

নারায়ণ আর মাধবী বাইরে বেরোলেন। নারায়ণ বললেন, ‘আমিই সেই ব্যক্তি। কেন স্যর?’ 

আধিকারিক বললেন, ‘লালবাজার থেকে আসছি। আমার নাম মনোজ সান্যাল। আপনি কি ১৯৪২ সালে নওয়ানগর এস্টেটের শরণার্থী শিবিরের ইশকুলে আন্দ্রেজ় সিকোরস্কিকে পড়াতেন?’

মাধবী অবাক হয়ে নারায়ণের দিকে তাকালেন।


দমদমের বাসিন্দা, বাইশ বছরের নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দশ বছরের পোলিশ শিশু আন্দ্রেজ় সিকোরস্কি-র প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯৪২ সালে, নওয়ানগরের শরণার্থী শিবিরে।

চল্লিশ বছর পরে, নারায়ণের সার্পেন্টাইন লেনের বাড়িতে, পঞ্চাশ বছরের আন্দ্রেজ়ের নাম কেন উচ্চারিত হল? সেটা জানার জন্যে আমাদের যেতে হবে অতীতে।

নারায়ণের জন্ম ব্রিটিশ-ভারতের বরিশাল জেলায় হলেও তিনি অল্পবয়সে কলকাতা শহরে চলে আসেন। এখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা ও পড়াশুনো। জ্যাঠা-বাবা-কাকার যৌথ পরিবারের বসবাস দমদমের বাড়িতে। সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইংরিজি সাহিত্য নিয়ে বিএ পাশ করে চাকরি খুঁজছিলেন নারায়ণ। পাচ্ছিলেন না। কোথায় যেন একটা যুদ্ধু বেধেছে, তার প্রভাবে এসব হচ্ছে।

এই নিয়ে নারায়ণের মা আদৌ চিন্তিত নন। তাঁর বক্তব্য, ‘ঠিক কিছু-না-কিছু জুটে যাবে।’ বাড়িতে বসে থাকা ছেলেকে দেখে নারায়ণের বাবার ভুরু কিন্তু কুঁচকে যেত।

নারায়ণ বাবা-মায়ের এক সন্তান। তাঁর জেঠিমা, কাকিমা, কাকা এবং তাঁদের সন্তানরা এই বাড়িতে থাকলেও জেঠু কল্যাণকে দেখা যেত না। কারণ তিনি ছিলেন নওয়ানগরের রাজপুরোহিত।

নওয়ানগর জায়গাটা কোথায়, সেটা না-জানলেও, রাজপুরোহিত মানে বিশাল কিছু, এইরকম ধারণা ছিল নারায়ণের। কল্যাণ বছরে একবার, পনেরো দিনের জন্যে বাড়ি এলে তাঁকে দেখে কখনও সাংঘাতিক ধর্মপ্রাণ মানুষ বলে মনে হয়নি। বাবার মতোই প্যান্টশার্ট পরতেন, সিগারেট ফুঁকতেন, নানা বিষয়ে আড্ডা মারতেন। পনেরো দিন পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠতেন। যাওয়ার দিন জেঠিমা ঘোমটার আড়ালে মুখ লুকিয়ে কাঁদতেন।

নারায়ণ প্রত্যেক বছর বাবার সঙ্গে হাওড়া স্টেশনে যেতেন কল্যাণকে ছাড়তে। দমদমা থেকে হাওড়া যাওয়া মানে বিশ্বভ্রমণ বলা যায়!

নারায়ণের তখন বাইশ বছর বয়স। বাৎসরিক ছুটি কাটাতে বাড়ি ফিরে, বাবার সঙ্গে শলাপরামর্শের শেষে কল্যাণ একদিন মাকে বললেন, ‘নাড়ু আমার সঙ্গে চলুক। ওখানকার ইশকুলে টিচার লাগবে।’

মা মোটেই রাজি নন। ছেলে আজ পর্যন্ত একা হাওড়া স্টেশনও যায়নি! সে কী করে অতদূর যাবে? ওখানে হিন্দি-মিন্দিতে কথা বলতে হবে, মাছ-ভাত পাওয়া যাবে না, মেয়েগুলো কমবয়সি ছেলে দেখলেই মাথা মুড়িয়ে খাবে…

কল্যাণ বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তা হলে আঁচলের তলায় রেখে মাছ-ভাতই খাওয়াও। ওখানকার মেয়েরা সব সময়ে এক গলা ঘোমটা দিয়ে রাখে। আজ পর্যন্ত কোনও মেয়ের মুখটাও দেখতে পেলাম না।’

এই কথা শুনে জেঠিমা ভুরু কুঁচকে গেলেও জেঠুর কথা কেউই অবিশ্বাস করলেন না। নারায়ণের যাওয়ার সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়ল। তিনি বাবা-মা’কে ছেড়ে, কলকাতা শহর ছেড়ে, বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে কল্যাণের সঙ্গে উঠে পড়লেন দূরপাল্লার ট্রেনে।

লম্বা ট্রেনযাত্রার সময়ে নারায়ণকে পাশে বসিয়ে কল্যাণ বললেন, ‘আমি যে রাজার পুরোহিত, তাঁর নাম দিগ্বিজয় সিং। উনি বিখ্যাত ক্রিকেটার রঞ্জিত সিংহের ভাইপো। নিঃসন্তান রঞ্জিত ভাইপোকে দত্তক নিয়েছেন।’

রণজিত সিংহ ওরফে রঞ্জির নাম ক্রিকেটপ্রেমী নারায়ণ জানেন।

কল্যাণ বললেন, ‘দিগ্বিজয়ের জন্ম সারোদরে। পড়াশুনো ম্যালভার্ন কলেজ আর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্রিটিশ আর্মিতে যোগ দিয়েছেন। ‘নাইট’ উপাধিও পেয়েছেন।’

‘রবি ঠাকুরও নাইট উপাধি পেয়েছেন।’ চোখ গোল-গোল করে নারায়ণ বললেন। রবিবাবুর গল্প-উপন্যাসের ভক্ত নারায়ণ একগাদা বই বাক্সে ভরেছেন।

‘গপ্পো-কবিতা ছাড়!’ ধমক দিলেন কল্যাণ। ‘ওতে টাকা নেই। টাকা আছে ব্যাবসাতে। আমাদের রাজার যেমন! হোটেল ব্যাবসা, কাপড়ের ব্যাবসা, সিমেন্টের ব্যাবসা, এরোপ্লেন চালানোর ব্যাবসা… কী নেই! আমি এই যে পুরুতগিরি করি— এতেও ভাল টাকা। তবে সেটা মন্দির বানালে, পুরুতের চাকরি করলে নয়। তোর মতো ম্যাস্টরের চাকরি করেও টাকা নেই। সেটা আছে ইশকুল খুললে। তবে আমাদের রাজাটা বোকা। কতগুলো বিদেশি বাচ্চার জন্যে আস্ত ইশকুল খুলেছে। তবে সেটা খুলেছে বলেই তুই ম্যাস্টরের চাকরি পেলি!’

অবাক নারায়ণ বললেন, ‘আমি বিদেশি বাচ্চাদের ইংরিজি পড়াব? ওরা তো ইংরিজি জানে!’ ‘ধুর বোকা!’ ভাইপোর মাথায় চাঁটি মেরে, হাসতে-হাসতে কল্যাণ বললেন, ‘বিদেশি মানেই বিলিতি নয়। এগুলো পোল্যান্ডের বাচ্চা!’


আন্দ্রেজ় এবং আরও দুশোটি পোলিশ শিশু কীভাবে নওয়ানগরে এসেছিল সেটা জানার জন্যে, ১৯৩৯ সালের গোড়ায় জার্মানি আর রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তির কথা জানতে হবে। যে-চুক্তিমাফিক রাশিয়া আর জার্মানি ঠিক করে, পোল্যান্ডকে নিজেদের মধ্যে বাটোয়ারা করবে। চুক্তি অনুযায়ী ১৯৩৯ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর, হিটলারের বাহিনী পশ্চিম দিক থেকে পোল্যান্ড আক্রমণ করে। আর তার ষোলোদিন পরে রাশিয়া আক্রমণ করে পুব দিক থেকে। জোড়া আক্রমণের ফলে লাখ-লাখ পোলিশ পুরুষ, নারী ও বাচ্চা বন্দি হয় দুই দেশের হাতে। রাশিয়ার যুদ্ধবন্দিদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় সাইবেরিয়ায়।

বরফাবৃত প্রান্তরে প্রচুর বন্দি মারা যান। যাঁরা বেঁচে রইলেন তাঁদের জন্যে আরও বড় বিভীষিকা অপেক্ষা করছিল। চুক্তি মেনে দেশদু’টি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত। তারপর চিল-শকুনে খেয়োখেয়ি শুরু হয়। ১৯৪২ সালে জার্মানির হামলায় রাশিয়া খানিক বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে বাধ্য হয় ‘অ্যামনেস্টি’ বা ‘সরকারি ক্ষমা’ ঘোষণা করতে।

অ্যামনেস্টি কাকে বলে? মোদ্দা কথা হল রাষ্ট্র ঠেলায় পড়লে মানুষের উপকার করার অভিনয় করে। আসল উদ্দেশ্য, জোর করে ধরে আনা বিদেশিদের তাড়ানো। তবে মোড়কটা ক্ষমার।

পাঁচশো পোলিশ নারী ও দুশো পোলিশ শিশুকে জাহাজে তুলে দেন পোলিশ সেনাবাহিনীর প্রধান। জাহাজের ক্যাপ্টেনকে তিনি বলেন, ‘যে-দেশ এদের আশ্রয় দেবে, সেখানেই নামিয়ে দেবে।’ তারপর আন্দ্রেজ়ের মাথায় হাত বুলিয়ে সহনাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে।’

আন্দ্রেজ় আর তার মায়ের মতো সাতশো ঠাঁইহারা মানুষ রাষ্ট্রের হাতের পুতুল হয়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে অতীতে একবার দেশ ছাড়তে এবং বরফের মধ্যে বন্দিজীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। আবার তাঁরা ঠাঁইনাড়া হলেন। জাহাজে চেপে অকূল দরিয়ায় ভাসতে-ভাসতে চললেন এক দেশ থেকে অন্য দেশে। শরণার্থীদের নিয়ে জাহাজটি ইউরোপ ও এশিয়ার অজস্র বন্দরে যায়। কেউ আশ্রয় দেয়নি। অবশেষে জাহাজটি ভারতের পশ্চিম উপকূলে, বম্বে বন্দরে পৌঁছয়।

সেখানকার ব্রিটিশ গভর্নরও নোঙর করার অনুমতি দেননি। ঠিক এই সময়ে শরণার্থী ও গভর্নরের মাঝখানে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন নওয়ানগরের মহারাজা। তিনি গভর্নরকে জানালেন, ‘ওরা আমার রাজত্বে থাকবে। আপনি নাক গলাতে আসবেন না।’ তারপর নওয়ানগরের অন্তর্গত রোজ়ি বন্দর পোলিশ জাহাজটির জন্যে খুলে দিলেন।

অচেনা দেশের বিদেশি নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে বিপদ কি নেই? আছে! তবে ব্রিটেনের মন্ত্রীসভার প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন দিগ্বিজয়। তিনি জানতেন, এরা কারা। এরা কোথা থেকে আসছে।

রোজ়ি বন্দরে পা রাখামাত্র শরণার্থীরা আহার, পোশাক ও বাসস্থান পেলেন। সমুদ্রের ধারের ছোট্ট গ্রাম বালাচাড়িতে ওদের জন্যে তৈরি হল শিবির। এখানকার প্রবল গরম পোলিশ নাগরিকদের ভাল লাগার কথা নয়। কিন্তু সাইবেরিয়া থেকে আসা, সমুদ্দুরে-ভেসে-বেড়ানো আন্দ্রেজ় আর তার মায়েরা পায়ের নীচে মাটি পেলেন। তাঁরা এই শিবিরকে স্বর্গ বলে মনে করলেন।

বাচ্চাদের জন্যে আলাদা শিবির। সেখানে লম্বা ডর্মিটরিতে পর পর পোক্ত খাটে বিছানা পাতা। প্রতিটি খাটের পাশে রয়েছে টেবিল আর চেয়ার। থাকা-খাওয়ার আর পড়াশুনো করার ব্যবস্থা তো আছেই। সঙ্গে আছে খেলার মাঠ, স্কুল, হাসপাতাল এবং লাইব্রেরি। আন্দ্রেজ় অবাক হয়ে দেখেছে, লাইব্রেরিতে পোলিশ ভাষায় অনেক বই আছে। সেগুলো মহারাজা আনিয়েছেন। যাতে তারা মাতৃভাষা ভুলে না-যায়।

সব কিছুর ব্যবস্থা হলেও পাওয়া যাচ্ছিল না ভাল শিক্ষক। দিগ্বিজয় অনেক ভেবে বাঙালি রাজপুরোহিত কল্যাণকে অনুরোধ করেন শিক্ষক নিয়ে আসার জন্যে। কলকাতা শহরটি ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হওয়ার কারণে ওখানকার আম বাসিন্দারা ইংরিজি ভাষায় শিক্ষিত। কল্যাণ তার মূর্তিমান উদাহরণ। তিনি ইংরিজি, হিন্দি ও বাংলা ছাড়াও স্থানীয় ভাষা গুজরাটি জানেন।

এইখানে বলা প্রয়োজন যে, অতীতে এই জায়গাটির নাম গুর্জরদেশ বা গুর্জররাষ্ট্র ছিল। রাজ্যের বর্তমান নাম বম্বে স্টেট। ভবিষ্যতে সেটি নাম বদলে হয়ে যাবে ‘গুজরাট’।

কিন্তু সে তো ভবিষ্যতের কথা। বর্তমানের কথা হল, দিগ্বিজিয়ের হুকুম তামিল করতে কল্যাণ কলকাতা থেকে নওয়ানগরে নিয়ে এলেন নারায়ণকে। দীর্ঘ ট্রেনযাত্রার ধকল সামলে, নওয়ানগরে পৌঁছনোর দ্বিতীয় দিন নারায়ণ দেখা করলেন মহারাজার সঙ্গে। স্বল্প সময়ের বৈঠক সেরে, মহারাজের ড্রাইভার পেয়ারেমোহনের সঙ্গে গাড়ি চেপে রওনা দিলেন বালাচাড়ির শরণার্থী শিবিরের উদ্দেশে। এখানকার ইশকুলেই নারায়ণ ও আন্দ্রেজ়ের প্রথম সাক্ষাৎ হয়।


ইশকুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা রোগা শিশুটির গায়ের রং অতীতে আপেলের মতো লালাভ ছিল। পশ্চিম ভারতের রোদে পুড়ে সেটি এখন তামাটে। চুলের রং খয়েরি। চোখের মণির রং সমুদ্রের মতো নীল। দেখে দেবশিশু বলে ভ্রম হয়। ছেলেটির দৃষ্টিতে বেদনা ও ভীতি ফুটে উঠেছে। বাচ্চাটি নতুন মানুষ দেখে ভয় পেয়েছে।

নারায়ণ জানেন না কী ভাষায় শাপগ্রস্ত দেবশিশুটির সঙ্গে কথা বলবেন। করিডোরে বাবু হয়ে বসে ইংরিজিতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি ইংরিজি জানো? তোমার নাম কী?’

ছেলেটি বলল, ‘একটু-একটু জানি। আমার নাম আন্দ্রেজ় সিকোরস্কি।’

এইটুকু ইংরিজিই যথেষ্ট। নারায়ণ বললেন, ‘আমার নাম নারায়ণ। ইউ ক্যান কল মি নাড়ু।’

নামটি আন্দ্রেজ়ের পছন্দ হয়েছে। সে একগাল হেসে বলল, ‘নারু! নারু!’

এর পরে আন্দ্রেজ়ের সঙ্গে নারায়ণের সখ্য গড়ে উঠতে সময় লাগেনি। দুজনেই কলকল করে বলে গেছে নিজের কথা, বাবা-মায়ের কথা, বাড়ির কথা, দেশছাড়ার কথা। কখনও বাংলায়, কখনও পোলিশ ভাষায়, কখনও ইংরিজিতে, কখনও হাত-পা নেড়ে।

বন্ধুত্ব করার দরকার ছিল না নারায়ণের। শিক্ষক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব আন্দ্রেজ় এবং অন্য বাচ্চাদের ইংরেজি আর অঙ্ক শেখানো, ওদের শাসনে রাখা। কিন্তু প্রথম দিন আন্দ্রেজ়ের চোখ দেখেই বুঝেছিলেন, ওই দৃষ্টিতে ঠাঁইনাড়া হওয়ার যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে। তিনি নিজেও ঠাঁইনাড়া। টাকা রোজগারের জন্যে নিজের দেশ, নিজের লোক, নিজের ভাষা ছেড়ে এতদূর এসেছেন। তাঁর আর আন্দ্রেজ়ের ভাষা আলাদা হতে পারে কিন্তু দুঃখ একরকম।

দুঃখ নাকি ভাগ করলে কমে। নারায়ণ তাই পড়াতেন কম, গল্প শোনাতেন বেশি। ওদের মুখে গল্প শুনতেন আরও বেশি। ওরা বলত পোলিশ রূপকথা। ব্যাং রাজকুমারী, ভাল মাঝি ও জলপরিদের গল্প। তিনি শোনাতেন লালকমল-নীলকমল, বুদ্ধু-ভূতুমের গল্প। আন্দ্রেজ় বলত ভিস্তুলা নদীর কথা, ওয়ারশ শহরের কথা, বাড়ির কথা, সাইবেরিয়ার শীতে মরে যাওয়া বাবা আর পাশের ক্যাম্পে থাকা মায়ের কথা। নারায়ণ বলতেন গঙ্গা নদীর কথা, কলকাতা শহরের কথা, দমদমের বাড়িতে যৌথ পরিবারের কথা। আন্দ্রেজ় বলত ‘পিয়েরোগি’ বা ডাম্পলিং, ‘কটলেট শ্যাবোভি’ বা শুয়োরের মাংসের কাটলেটের কথা। নারায়ণ বলতেন ভাত-মাছের কথা, লুচি আর পাঁঠার মাংসের কথা। শুনতে-শুনতে আন্দ্রেজ়, ভিয়েস্লাভ, মিরানিয়া এবং অন্য সব শিশুর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত।

খুব দ্রুত নারায়ণের সঙ্গে প্রতিটি শিশুর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ওদের সঙ্গে কথা বলে নারায়ণ অল্পবিস্তর পোলিশ ভাষা শিখলেন। ওরাও অল্পবিস্তর বাংলা শিখল। বেশি করে শিখল ইংরিজি। তিন ভাষার মিশ্রণে কথাবার্তা চলতে লাগল। ক্লাস চলাকালীন পাঠ্যপুস্তক সরিয়ে নারায়ণ গাইতেন, ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী/উড়ে চলে দিগ্‌দিগন্তেরও পানে।’ শোনাতেন, ‘নীলকমল জাগে, লালকমল জাগে, আর জাগে তরোয়াল… দপ্‌দপ্ করে ঘিয়ের দীপ জাগে, কারা এসেছে কাল?’ আন্দ্রেজ়, ভিয়েস্লাভ, মিরানিয়া এবং অন্য পোলিশ শিশুরা শোনাত পোল্যান্ডের জাতীয় সংগীত। ‘যতদিন আমরা বেঁচে আছি, পোল্যান্ড এখনও ধ্বংস হয়নি।’ প্রবল কষ্ট, দুঃখ আর আশাহীনতার মধ্যে এইসব টুকরো-টাকরা জিনিস সব্বার মুখে হাসি ফোটাত।

হঠাৎ জানা গেল, মহারাজা এক মাস পরে শিবিরে আসবেন। নারায়ণ তৎক্ষণাৎ ঠিক করলেন যে বাচ্চাদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান করবেন। মিটিং-এ ঠিক হল, বাচ্চারা অভিনয় করবে ‘ব্যাং রাজকুমারী’ নামের পোলিশ নাটক। তারপর ওরা গাইবে গুজরাটি লোকসঙ্গীত, ‘মোর বানি ঠাঙ্গাত করে’ বা ‘ময়ুর সেজে নাচছে।’ দিগ্বিজয়ের সঙ্গে প্রথম আলাপের দিন এই গানটির ইতিহাস জেনেছিলেন নারায়ণ।

পরের এক মাস শিবিরের সবাই অক্লান্ত পরিশ্রম করল। পোলিশ বাবা-মায়েরা মঞ্চ ও পোশাক তৈরির কাজে ব্যস্ত রইলেন। নারায়ণ ব্যস্ত রইলেন নাটকের মহড়ায় আর নিজের রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে। তা ছাড়া বাচ্চাগুলো ‘মোর বানি ঠাঙ্গাত করে’ গানের সঙ্গে গরবা নৃত্য পরিবেশন করবে। তার মহড়াও আছে। নির্দিষ্ট দিনে মহারাজা এলেন। নাচ-গান সহযোগে তাঁকে বন্দনা করল বাচ্চারা। তারপর শুরু হল অনুষ্ঠান। প্রথমে পোলিশ মায়েরা পোল্যান্ডের জাতীয় সংগীত গাইলেন। শিবিরের দেশি কর্মচারীরা গুজরাটি ভাষায় সংগীত পরিবেশন করলেন। তারপর অভিনীত হল ব্যাং রাজকুমার। আন্দ্রেজ়, ভিয়েস্লাভ আর মারিয়ানার অভিনয়ে জমজমাট নাটক দেখে মহারাজা খুব হাততালি দিলেন। সব শেষে আসবে নারায়ণের গান…


মঞ্চে দাঁড়িয়ে নারায়ণ ভাঙা গুজরাটিতে বক্তব্য পেশ করলেন। তারপর বললেন বাংলায়। বক্তব্যটি আন্দ্রেজ় পোলিশ ভাষায় শুনিয়ে দিল।

নারায়ণ বলছেন, ‘বর্ষার আগমনে আনন্দিত হয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০০ সালে রচনা করেছিলেন একটি কবিতা। নাম, ‘নববর্ষা’।’ তারপর গাইলেন… ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে/…আকুল পরান আকাশে চাহিয়া উল্লাসে কারে যাচে রে।।’

একটু থেমে বললেন, ‘গুজরাটি সাহিত্যিক ঝাভেরচন্দ্র মেঘানি ১৯২০ সালে কলকাতায় যান এবং কবিগুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সময়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের মুখে গানটি শোনেন। গানটি শুনে তিনি রচনা করেন একটি গুজরাটি সংগীত, ‘মোর বানি ঠাঙ্গাত করে’। আপনারা সবাই জানেন, এই গানটি নওয়ানগর-সহ গোটা বম্বে স্টেটের প্রিয় লোকগান। এটি এমন এক সংগীত, যা পূর্ব আর পশ্চিমকে এক সুরে বেঁধেছে। ব্রিটিশ ভারতবর্ষের পূর্ব আর পশ্চিমদিকের রাজ্য তো বটেই, পৃথিবীর পূর্ব আর পশ্চিম গোলার্ধও এই গানে মিশে যাবে। কারণ গানের সঙ্গে নাচবে এই বাচ্চারা। মহারাজাকে স্বাগত জানানোর জন্যে এটাই আদর্শ গান হওয়া উচিত।’

তারপর যা হল, সেটা ভাষায় বোঝানো অসম্ভব! একদল পোলিশ শিশুকন্যা চানিয়া, চোলি, দুপাট্টা পরে এবং একদল পোলিশ বাচ্চা ছেলের ধুতি, কুর্তা আর পাগড়ি পরে গরবা নাচছে। আর নারায়ণ উদাত্ত কণ্ঠে কখনও বাংলায় গাইছেন ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে,’ কখনও গুজরাটিতে গাইছেন, ‘মোর বানি ঠাঙ্গাত করে’। কখনও গাইছেন, ‘ওগো,  নির্জনে বকুলশাখায় দোলায় কে আজি দুলিছে, দোদুল দুলিছে।’ কখনও গাইছেন, ‘ঘনঘোর ঝরে চাহু ওরে মারু মান, মোর বানি থাঙ্গাত করে।’ আকাশে উড়ছে আবির ও গুলাল। আলো, রং, শব্দ, সুর, কথার এই অপরূপ মেলবন্ধন আগে কেউ কখনও দেখেনি।

অনুষ্ঠান শেষ হতে মহারাজ চোখের জল ফেলতে-ফেলতে উঠে দাঁড়ালেন। করতালি দিয়ে বাচ্চাদের কোলে তুলে নাচছেন। বলছেন, ‘কে বলে তোমরা অনাথ? আমি গোটা নওয়ানগরের বাপু। আজ থেকে আমি তোমাদেরও বাপু।’

নারায়ণকে জড়িয়ে ধরে আন্দ্রেজ় কেঁদে ফেলল। নারায়ণ তার কানে ফিসফিস করে বললেন, ‘কোনও মানুষের জীবনে এত অন্ধকার থাকতে পারে না। কিছুতেই না। একদিন এসব শেষ হবে। তোরা দেশে ফিরে যাবি। যাবিই। ততদিন এই নাচ আর গান, গল্প আর কবিতারা আলোকশিখা হয়ে তোদের আঁধার পেরতে সাহায্য করবে।’

নারায়ণের কথা সত্যি হয়েছিল। তবে সেটা ছ’বছর পরে, ১৯৪৮ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে আন্দ্রেজ়, ভিয়েস্লাভ আর মিরানিয়ার মতো শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে পোল্যান্ড ফিরে যায়। যাওয়ার আগে দিগ্বিজয় আর নারায়ণকে জড়িয়ে ধরে ওদের সে কী কান্না! আন্দ্রেজ় চুপিচুপি নিজের ব্যবহৃত পেনসিলটি উপহার দিয়েছিল নারায়ণকে। বলেছিল, ‘স্যর, আমি আপনাকে কোনওদিনও ভুলব না। আপনি আমাদের জন্যে আরও গল্প লিখুন।’  

এর পরে আর আন্দ্রেজ়দের সঙ্গে দেখা হয়নি নারায়ণের।

ওরা চলে যাওয়ার পরে শরণার্থী শিবির বন্ধ হয়ে গেলেও স্কুল চালু রইল। নারায়ণ সেই স্কুলের শিক্ষক হলেন। এর পিছনে দিগ্বিজয়ের হাত ছিল। কয়েক বছর পরে নারায়ণ বিবাহ করলেন মাধবীকে। বছরে দু’বার পনেরো দিনের জন্যে কলকাতায় গিয়ে ফিরে আসার সময়ে বুঝতে পারলেন, জেঠিমা কেন জেঠুর চলে যাওয়ার দিন নীরবে চোখের জল ফেলতেন।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হল। ১৯৫৯ সালে নওয়ানগর নাম বদলে জামনগর হয়ে গেল। ১৯৬০ সালে গুজরাট আলাদা রাজ্য হিসেবে মর্যাদা পেল। ১৯৬৬ সালে, সত্তর বছর বয়সে দিগ্বিজয় মারা গেলেন।

ষাট বছর বয়সে প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নেওয়ার পরে নারায়ণ পাকাপাকিভাবে কলকাতায় ফিরেছেন।


চল্লিশ বছর আগের কাহিনিকে বর্তমানে এনে ফেলার সময় হয়ে গেছে। আমরা চলে এসেছি ১৯৮২ সালে। সার্পেন্টাইন লেনের বাড়িতে। মনোজের দিকে তাকিয়ে নারায়ণ বললেন, ‘হ্যাঁ, ওকে আমি পড়াতাম। কেন?’

মনোজ বললেন, ‘আজ সন্ধে সাতটার সময়ে উনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন। তাই এখন থেকেই এখানে পুলিশ মোতায়েন থাকবে।’   

ঠিক সন্ধে সাতটার সময়ে বাড়ির বাইরে গাদাগাদা পুলিশের গাড়ি দেখে নারায়ণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। প্রতিবেশীরা যদি বিরক্ত হন!

লাল বাতি লাগানো সাদা অ্যাম্বাস্যাডার থেকে ভীষণ লম্বা কিন্তু বেশ রোগা যে-ব্যক্তিটি নামলেন, তাঁকে দেখে নারায়ণ প্রথমে চিনতে না-পারলেও মুখের হাসিটি দেখে চল্লিশ বছর আগের স্মৃতি বাঁধভাঙা জলের দু’কূলপ্লাবী হয়ে ফিরে এল। সমস্ত প্রোটোকল ভেঙে, পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে লোকটিকে জড়িয়ে ধরে নারায়ণ বললেন, ‘আন্দ্রেজ়!’

‘হ্যালো স্যর! হাউ আর ইউ?’ পরিশীলিত ইংরিজিতে জানতে চাইলেন আন্দ্রেজ়।

পাশ থেকে মনোজ বললেন, ‘উনি এখন পোল্যান্ডের শিক্ষামন্ত্রী। সরকারি কাজে দিল্লিতে এসেই দাবি করেছেন যে, কলকাতায় এসে আপনার সঙ্গে দেখা করবেন। আপনার নাম-ঠিকানাও দিয়েছেন। স্যর কলকাতায় এসেছেন শুধুমাত্র আপনার সঙ্গে দেখা করতে।’

নারায়ণ অবাক হয়ে বললেন, ‘আমার নাম-ঠিকানা পেলেন কী করে?’ 

মাধবী ফিসফিস করে বললেন, ‘ওই দেখো।’ 

নারায়ণ দেখলেন, আন্দ্রেজ়ের হাতে দু’টি বাংলা বই। ‘আলোর গল্প’ এবং ‘আশার আলো’।

‘মন মোর মেঘের সঙ্গী…’ গুনগুন করে গাইছেন আন্দ্রেজ়। তাঁর চোখ দিয়ে জল বেরচ্ছে। তিনি গাইছেন, ‘মোর বানি ঠাঙ্গাত করে…’ তিনি বলছেন, ‘নীলকমল জাগে, লালকমল জাগে, আর জাগে তরোয়াল… দপ্‌দপ্ করে ঘিয়ের দীপ জাগে, কারা এসেছে কাল?’

কাঁদছেন নারায়ণও। তাঁর হাতে বইদু’টি তুলে দিয়ে আন্দ্রেজ় বললেন, ‘আমাদের দেশ ছিল না, আশা ছিল না, ছোটবেলা ছিল না। আপনি আমাদের সেগুলো দিয়েছিলেন। এই দেশ আমার দ্বিতীয় মাতৃভূমি। আপনি আর মহারাজা আমার দ্বিতীয় মাতৃভূমির দুই স্তম্ভ! আপনার ঋণ কোনওদিনও শোধ করতে পারব না।’

‘আমিও না!’ বিড়বিড় করছেন নারায়ণ।

‘আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে। আপনার সব খবর আমি পোল্যান্ড থেকে রাখি। বইদু’টি জোগাড়ও করেছি। এই বইদু’টি আমি পোলিশ ভাষায় অনুবাদ করতে চাই। আপনি প্লিজ় অনুমতি দিন। মানুষ জানুক, গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময়ে কীভাবে আলোকশিখা জ্বেলে রাখতে হয়। প্রকৃত সাহিত্যিক ছাড়া সেই কাজ আর কেউ করতে পারেন না।’

মাধবীর দিকে আড়চোখে তাকালেন নারায়ণ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘প্রকৃত সাহিত্যিক যখন হয়েই গিয়েছি, তা হলে তোমাকে একটা অটোগ্রাফ দিই?’

‘অফকোর্স স্যর! অফকোর্স!’ উত্তেজনায়, আনন্দে জ্বলজ্বল করছে আন্দ্রেজ়ের চোখ।

নারায়ণ লেখার টেবিলের কাছে গেলেন। কলমদান থেকে তুলে নিলেন একটি পেনসিল। সময় ও আবহাওয়ার প্রহার সহ্য করে এখনও সেটি লিখতে সক্ষম। পোল্যান্ড ফিরে যাওয়ার আগে আন্দ্রেজ়ের দেওয়া উপহার সেই পেনসিল দিয়ে, নিজের বইতে জীবনের প্রথম অটোগ্রাফ দিচ্ছেন নারায়ণ। বাংলা হরফে লিখছেন, ‘আমার ছাত্র আন্দ্রেজ়কে শুভেচ্ছা, ভালবাসা ও স্মৃতিবেদনা সহ,/ নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়।’      

মাধবী তাকিয়ে রয়েছেন। তাঁর চোখে জল।