‘রাজু, তোকে বলেছিলাম নীল আলো আনতে। তুই একটা আকাশি রঙের আলো এনেছিস, এতে কাজ হয় না।’ রাজু ঘরের কোণে ব্যাজার মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট্ট ঘরটার একদিকে শৌখিন দেওয়াল। সেই দেওয়ালে কারুকার্য করা। দেওয়ালের ওপরে এলইডি আলো। দেখে বোঝাই যাচ্ছে, এই দেওয়ালটা ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করার জন্য এত শৌখিন। এই ঘরের বাকি দেওয়ালগুলো ফ্যাকাশে। ঘরের সিলিং বেশ পুরনো। কিছু জায়গায় থেকে ইটগুলো হাঁ করে সিসিটিভির মতো বেরিয়ে আছে। গলি থেকে ঢুকেই ডানদিকের একতলার এই ঘরটায় ব্যস্তটা এখন চরমে। কারণ এখানেই হচ্ছে শুটিং। অভিনেত্রী ছাড়া ঘরে তিনজন আছে। তিনজনই পুরুষ। সন্ধের দিকে প্রতিদিন পুলিশি অভিযান চলে। খদ্দেরদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার সকালে ছেড়ে দেওয়া হয়। রুটিনমাফিক। কারণ আইনে এখনও দেহব্যবসা অবৈধ। যদিও সেই আইনের ফাঁক গলেই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এই ব্যবসা। সেই ব্যবসাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আরও অনেক ছোট ব্যবসা। গড়ে উঠেছে আস্ত একটা অঞ্চল। সেই অঞ্চলের একটি ঘরে তৈরি হচ্ছে নীল ছবি। সমাজমাধ্যমের বিপুল জোয়ারে দেহব্যবসার জন্য পরিচিত যে গলিগুলি বাংলার বুকে জনপ্রিয় ছিল, সেখানে এখন নীল ছবির কুটিরশিল্প শুরু হয়েছে। সন্ধে হলেই শুরু যায় শিল্প এবং শিল্পীর প্রদর্শন। জ্বলে ওঠে শুটিং-সহায়ক আলো। ক্যামেরার ওপারে থাকে পরিচালক। তিনি আবার মাঝে-মাঝে ‘কাট কাট’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। একদম সিনেমার মতো, একদম শুটিংয়ের মতো।
সুহানা বিবি আজ একা অভিনয় করছেন। তিনি স্বমেহন করবেন। সেই দৃশ্যের জন্য প্রয়োজন ছিল একটা নীল আলোর, রাজু ভুলবশত আকাশি আলো এনে পরিচালক এবং অভিনেত্রীর দু-জনেরই মুখঝামটা শুনেছে। এই ফাঁকে একজন সুহানার মুখে বিভিন্ন প্রলেপ লেপে দিচ্ছে। সুহানাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এখন কি দেহব্যবসার অনেকটাই ডিজিটাল নির্ভর?’ সুহানার নির্লিপ্ত উত্তর, ‘হ্যাঁ তো। না হলে চলবে কী করে?’ এখন দেহব্যবসার অনেক ফাঁকফোকর গজিয়ে উঠেছে। কেউ কেন এই গলিতে আসবে? সুহানাদেরও তো কিছু করে খেতে হবে। ‘এখন প্রতিটা বেশ্যাপট্টিতেই নীল ছবি তৈরি হয় বাবু। আগেও হত। এখন বেশি হয়।’
কথাটা শেষ হতেই পরিচালক বলে উঠলেন, শুরু করা যাক। মুহূর্তের মধ্যে ঘরের পরিবেশটা বদলে গেল। মনে হল, এক জলজ্যান্ত জীবনের সেটের মধ্যে আর একটা সেট। এইভাবেই নিষিদ্ধপল্লির অন্দরে ডিজিটাইজেশন আছড়ে পড়েছে। সুহানা বিবির বক্তব্য অনুসারে একটা পনেরো মিনিটের ভিডিওর জন্য সে প্রায় ২২,০০০ টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছে। কলকাতা থেকে পরিচালক বাবু এসে একদিন রিহার্সাল করে পুরো ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, তাকে কথা দিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও কাজ দেবেন। নিষিদ্ধপল্লির মেয়েদের নীল ছবিতে অভিনয়, এটা নতুন কিছু নয়। বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই প্রথা চলে আসছে। কিন্তু ইঁদুর দৌড়ের যুগে, নীল ছবি তৈরি করা এবং সেই ছবি থেকে উপার্জন এখন প্রায় জলভাত। এককালে যে সিস্টেমটা ছিল বেজায় জটিল, সেটা এখন সবার নখদর্পণে চলে এসেছে।
একসময় কলকাতার আকাশ ছিল বেলুনের প্রমোদকানন?
লিখছেন রাজর্ষি সরকার…
এই গলিতে জীবনের প্রায় বাইশ বছর কাটানো শেফালি নিজের ফোনের ক্যামেরা দিয়ে বিশেষ মুহূর্তের ভিডিও বানায়। সেই ভিডিও তাঁর বাঁধাধরা ‘খদ্দের’-কে পাঠিয়ে সে মোটা টাকা উপার্জন করে। এই ভিডিও বানানোর প্রয়োজনীয় সামগ্রী তার ঘরেই মজুত থাকে। শুধু স্ট্যান্ডে ফোন গুঁজে আলো জ্বালিয়ে দিলেই হল। অনেক সময় খদ্দেরদের বিশেষ কোনও অনুরোধও পূর্ণ করা হয়। ‘আমার অনেক খদ্দের, কেউ হিন্দি গানের সঙ্গে নাচ দেখতে চায়। একজন বড় বাবু আছে, সে প্রতিদিন ভিডিও কল করে রাতে। আমাকে না দেখলে নাকি তার ঘুম আসে না।’ শেফালি আরও বলল, ‘এক-একটা ভিডিও পিছু পাঁচশো, হাজার নিই। আবার অনেক খদ্দেরের সঙ্গে মাসকাবারি হিসেব আছে।’

এই একই বিষয়ে আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল যে, এখন নিষিদ্ধপল্লিতে লোকে কম আসে। বড় বড় হোটেল উঠেছে হাই রোডের পাশে। ওয়ো হয়েছে। আইনের ফাঁক দিয়ে গলে যাওয়ার উপায় হয়েছে। ফলে নিষিদ্ধপল্লিতে এখন ভাটা চলছে। কোভিডের পরবর্তী সময়ে নিষিদ্ধপল্লির অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ভরসা হয়ে ওঠে বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন। যে অ্যাপ্লিকেশনে অতি সহজে খোলামেলা ছবি আপলোড করে উপার্জন করা যায়। জয়েন মাই অ্যাপ, প্যাটরিয়ন, স্কাই, ম্যাসাজ রিপাবলিক, আংশিকভাবে লোকান্টো— ইত্যাদি অ্যাপ ও সাইটগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠল বাংলার নিষিদ্ধ সমাজ। যে অ্যাপগুলো তৈরি হয়েছিল মূলত নিজের শিল্পকর্মের প্রদর্শনীর জন্য, সেই অ্যাপ্লিকেশন হয়ে উঠল নীল জগতের ধ্রুবতারা। সমাজের একটা শিক্ষিত সমাজ এই অ্যাপে ডুব দিল। খোলামেলা কনটেন্ট তৈরি করল। মূলত সমাজের এলিট শ্রেণির হাতে থাকা এই অ্যাপ্লিকেশনগুলোর ঝক্কি কম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অ্যাপ্লিকেশনগুলো সার্বজনীন হয়ে উঠল। বদলে গেল নিষিদ্ধপল্লির অ-আ-ক-খ।
উনিশ শতকের শেষভাগে স্থির আলোকচিত্রের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপ ও আমেরিকায় নগ্ন বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি গোপনে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। চলচ্চিত্রের আবিষ্কারের পর উনিশ শতকের নয়ের দশকেই ফ্রান্সে কয়েক মিনিট দৈর্ঘ্যের কিছু গোপন যৌনচিত্র নির্মিত হয়, যেগুলিকে ইতিহাসবিদরা ‘স্ট্যাগ ফিল্ম’ নামে চিহ্নিত করেছেন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আট মিমি ও ১৬ মিমি ফিল্মের সহজলভ্যতা এই শিল্পকে আরও বিস্তৃত করে। বিশ শতকের সাতের দশকে আমেরিকায় তথাকথিত ‘পর্নো চিক’ যুগে প্রাপ্তবয়স্ক চলচ্চিত্র মূলধারার আলোচনায় চলে আসে। এই সময়ে নির্মিত ‘Deep Throat’ বা ‘Behind the Green Door’-এর মতো ছবি ব্যাপক আলোচিত হয়। পরে ভিএইচএস ক্যাসেট, সিডি-ডিভিডি এবং একবিংশ শতাব্দীতে ইন্টারনেটের বিস্তার নীল ছবির উৎপাদন ও বিতরণের ধরন আমূল বদলে দিয়েছিল। একসময় যেখানে বড় স্টুডিও ও পরিবেশকদের ওপর নির্ভর করতে হত, সেখানে আজ একটি স্মার্টফোন, ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই ব্যক্তি পর্যায়ে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট তৈরি ও বিক্রি করা সম্ভব। ভারতে নীল ছবির বাজারের রূপান্তরের পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে স্মার্টফোন ও সস্তা ইন্টারনেট। ২০১৪ সালে যেখানে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫ কোটি, সেখানে ২০২৫ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা ১০০ কোটিরও বেশি হয়েছে। একই সময়ে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৭৫ কোটিতে। গড়ে একজন ভারতীয় প্রতি মাসে ২৪ গিগাবাইটেরও বেশি মোবাইল ডেটা ব্যবহার করছেন, যা একদশক আগের তুলনায় কয়েকশো গুণ বেশি। এই বিপুল ডিজিটাল বিস্তার প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্টের বাজারকেও বদলে দিয়েছে। একসময় নীল ছবি নির্মাণ ও বিপণন ছিল স্টুডিও, সিডি-ডিভিডি এবং বিশেষ ওয়েবসাইট-নির্ভর। এখন একটি স্মার্টফোন, রিং লাইট, ট্রাইপড এবং কয়েকটি ভিডিও এডিটিং অ্যাপ দিয়েই কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্টের বড় অংশ এখন মোবাইল ফোনেই দেখা হয়। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, শহুরে যুবসমাজের মধ্যে পর্নোগ্রাফি দেখার হার উল্লেখযোগ্য এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা স্মার্টফোনের মাধ্যমে। পাশাপাশি রিলস, শর্ট ভিডিও এবং লাইভ স্ট্রিমিং সংস্কৃতি দর্শকদের অভ্যাসও বদলে দিয়েছে। ফলে দীর্ঘ দৈর্ঘ্যের নীল ছবির পাশাপাশি কয়েক মিনিটের ব্যক্তিগত ভিডিও, কাস্টমাইজড কনটেন্ট, ভিডিও কল, সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং ব্যক্তিগত ফ্যান-গ্রুপ নতুন বাজার তৈরি করেছে।

আজ যৌনপল্লির বহু নারী কিংবা স্বাধীন কনটেন্ট নির্মাতা সরাসরি গ্রাহকের কাছে পৌঁছতে পারছেন, মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমেছে। সাহেব এই গলিতে আগে দালালির কাজ করত। এখন রুটি-ঘুগনির দোকান চালায়। তার কথায়, ‘আগে আমি খদ্দের ধরে আনতাম দাদা। কমিশন পেতাম। তারপর পুলিশ ঢুকলে সতর্ক করে দিতাম। বেশ ভালই কাটছিল। তারপর ফোনের যুগে, অনেকে আমাকে ফোন করে আসত। কোন ঘরে কে আছে, কখন আছে সব বলে দিতাম। তারপরে কোভিডের সময় থেকে সব বদলে গেল। আগেও এই গলিতে ওইসব শুটিং হত। শুটিং হলে আমার লাভ হত, কিন্তু এখন সবাই ভিডিও কলে, নিজের মতো ভিডিও বানিয়ে চালিয়ে দিচ্ছে। মাঝখান থেকে আমি বেকার হয়ে গিয়েছি।’
নিষিদ্ধপল্লির ইতিহাসে ‘দালাল’ ছিল এক অপরিহার্য চরিত্র। খদ্দের জোগাড় করা থেকে শুরু করে দরদাম, পুলিশি অভিযানের খবর দেওয়া কিংবা নতুন মেয়েদের কাজের ব্যবস্থা করা, সবকিছুর মধ্যেই তার উপস্থিতি ছিল। কিন্তু স্মার্টফোনের যুগে সেই চেনা চরিত্রটি ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তার জায়গা দখল করছে অ্যালগরিদম। ফেসবুকের সাজেশন, ইনস্টাগ্রামের রিলস, টেলিগ্রামের সার্চ ব্যবস্থা কিংবা বিভিন্ন মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের রেকমেন্ডেশন সিস্টেম এখন সম্ভাব্য গ্রাহকদের নির্দিষ্ট কনটেন্টের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। আজ একজন যৌনকর্মীর আয় অনেকাংশে নির্ভর করে কোন ভিডিও বেশি মানুষের সামনে পৌঁছবে, কোন পোস্ট বেশি দেখা হবে কিংবা কোন অ্যাকাউন্টকে প্ল্যাটফর্ম বেশি প্রচার করবে তার ওপর। অর্থাৎ একসময় যে কাজ করত পাড়ার দালাল, তার অনেকটাই এখন করছে অদৃশ্য সফটওয়্যার ও অ্যালগরিদম। খদ্দের আর গলির মুখে আসে না, তাকে নিয়ে আসে একটি নোটিফিকেশন।
যেভাবে উবার বা ওলা পরিবহণ ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছে, ঠিক তেমনভাবেই যৌনতার বাজারও ক্রমশ স্থাননির্ভরতা হারাচ্ছে। একসময় যৌনপল্লির ব্যবসা নির্ভর করত নির্দিষ্ট গলি, ঘর, দালাল এবং স্থানীয় খদ্দেরের ওপর। আজ স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেই কাঠামো ভেঙে দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সাম্প্রতিক ডিজিটাল পরিবর্তনকে ‘উবারাইজেশন’ বলে ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ, যে-প্রক্রিয়ায় কোনও পরিষেবা নির্দিষ্ট স্থান, প্রতিষ্ঠান বা মধ্যস্বত্বভোগীর হাত থেকে বেরিয়ে সরাসরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছতে শুরু করে। যেভাবে উবার বা ওলা পরিবহণ ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছে, ঠিক তেমনভাবেই যৌনতার বাজারও ক্রমশ স্থাননির্ভরতা হারাচ্ছে। একসময় যৌনপল্লির ব্যবসা নির্ভর করত নির্দিষ্ট গলি, ঘর, দালাল এবং স্থানীয় খদ্দেরের ওপর। আজ স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেই কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। একই সময়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্ফোরণ ঘটেছে। ইউপিআই-এর মাধ্যমে প্রতি মাসে শতকোটি লেনদেন হচ্ছে। ফলে কোনও গ্রাহককে আর নির্দিষ্ট এলাকায় যেতে হচ্ছে না। ভিডিও কল, ব্যক্তিগত চ্যাট, সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক কনটেন্ট এবং অনলাইন বুকিংয়ের মাধ্যমে পরিষেবা ও অর্থ, দু’টিই ডিজিটালভাবে আদানপ্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে যৌনপল্লির ঐতিহ্যগত ভৌগোলিক গুরুত্ব কমে এসেছে। আগে যেখানে একজন যৌনকর্মীর সম্ভাব্য গ্রাহক সীমাবদ্ধ থাকত কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে, এখন তিনি কয়েকশো কিংবা কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের গ্রাহকের কাছেও পৌঁছে যেতে পারছেন। সমাজতত্ত্ববিদদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু যৌনতার বাজার নয়, বরং সমগ্র অসাংগঠনিক পরিষেবা খাতের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। শরীর এখনও পণ্য, কিন্তু সেই পণ্য ক্রমশ একটি ডিজিটাল পরিষেবায় রূপান্তরিত হচ্ছে, যেখানে গলির পরিবর্তে প্ল্যাটফর্ম এবং দালালের পরিবর্তে অ্যালগরিদম ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ তৈরি করছে।
একসময় যাঁদের পরিচয় ছিল মূলত যৌনকর্মী হিসেবে, তাঁদের একাংশ এখন নিজেদের কনটেন্ট ক্রিয়েটর, পারফর্মার, কিংবা ডিজিটাল এন্টারটেইনার হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। কারণ আয় এখন আর শারীরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করছে না। একটি স্মার্টফোন, রিং লাইট, ভিডিও এডিটিং অ্যাপ এবং সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থাকলেই অনেক ক্ষেত্রে দর্শক তৈরি করা সম্ভব। বিশ্বের ক্রিয়েটর ইকোনমির বাজারমূল্য ইতিমধ্যেই ২৫০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে বলে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার অনুমান, এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই বাজার আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এই বিশাল অর্থনীতির একটি অংশ জুড়ে রয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট নির্মাতারাও। ফলে যৌনতার বাজারে শ্রমের প্রকৃতিও বদলাচ্ছে। আগে যেখানে মূল পুঁজি ছিল শরীরের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি, এখন সেখানে অভিনয়, ক্যামেরার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করা, দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, ভিডিও সম্পাদনা, অনলাইন প্রচার এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হয়ে উঠেছে। নিষিদ্ধপল্লির অন্ধকার ঘর থেকে শুরু হওয়া এই পরিবর্তন দেখিয়ে দেয় যে ডিজিটাল যুগে যৌনতার বাজার শুধু শরীরের নয়, ক্রমশ কনটেন্ট, দৃশ্যমানতা এবং মনোযোগের বাজারেও পরিণত হচ্ছে।




