অজয় বসুর জন্মদিনে একটি লেখা আমাকে লিখতে হচ্ছে, এতে যে একদম বিস্মিত হইনি— সেই কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে। বিস্ময়ের কারণ, এই প্রজন্ম তাহলে অজয় বসুকে মনে রেখেছে! বাংলা ধারাবিবরণী জগতের পিতামহ ব্রহ্মাকে তাহলে তারা ভোলেনি? বাংলা ধারাবিবরণীর ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর বলতে তো একটা সময়ে আমরা অজয় বসু, পুষ্পেন সরকার আর কমল ভট্টাচার্যকেই জানতাম। বাংলা ধারাবিবরণীর মাধ্যমে এই ত্রয়ী ক্রিকেট আর ফুটবল খেলাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন ঘরের অন্দরমহলে। বয়কটের ঘুমপাড়ানি ব্যাটিংয়ের কথা রেডিওয় শুনতে-শুনতে ওপাড়ার হিমানি মাসিমা কি মন্তব্য করতেন না, ‘আ মোলো যা! ব্যাটিংয়ের কী ছিরি!’ এই যে ক্রিকেট খেলাটিকে একদম ‘কলোকিয়াল’ করে দেওয়া, তাও তো বাংলা ধারাবিবরণীর কীর্তি! আর সেই কীর্তির প্রধান রূপকার অজয় বসুকে এই প্রজন্মও মনে রেখেছে! বিস্ময় একটু জাগবে না?
অজয় বসু আমার গুরু, সেই কথা স্বীকার করে নিয়েও আমার একটা ছোট্ট অভিমানের কথা আজ শোনাই। ধারাভাষাকার অজয় বসুর কথা বলতে গিয়ে আমরা ভুলে যাই ক্রীড়া-সাংবাদিক অজয় বসুর কথা। আমরা যে ক্রীড়া সাংবাদিকরা তাঁর কাছে নাড়া বেঁধেছিলাম, তারা তো জানে, ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে তিনি কতটা ‘পারফেকশনিস্ট’ ছিলেন। ফাঁকি দিয়ে তাঁর কাছ থেকে পালানোর জো ছিল না। সদাই তৎপর, সর্বদাই অনুসন্ধিৎসু।
সেই সময় বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতার দু’টি ঘরানা নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল— আনন্দবাজার পত্রিকার মতি নন্দীর অনুসারী একটি দল আর ‘যুগান্তর’-এর অজয় বসুর দেখানো পথ অনুসারী একদল যুবকের একটি দল। সেই সময় মতি নন্দী আর অজয় বসুর কল্পিত আঁকচাআঁকচির গল্পে বাঙালি উদ্বেলিত হত। ব্যাপারটা যে কষ্টকল্পনা, তা বুঝি ফোর্ট উইলিয়মের সাঁতারের পুলে জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতার ফাঁকে। একদিন আমি ও মতি নন্দী ফোর্ট উইলিয়ম থেকে ফিরছি। ফোর্ট উইলিয়ম থেকে বড় রাস্তায় ওঠার ফাঁকে মতি নন্দী আমাকে শুনিয়েছিলেন অজয় বসু সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন। সেই মূল্যায়নে ছিল এক বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
অজয় বসু তখন আলংকারিক ভাষা প্রয়োগে লিখছেন। বড় ম্যাচের পরদিন তাঁর রিপোর্ট পড়ার জন্য বাঙালি উন্মুখ হয়ে থাকত। খেলার প্রকৃত কাটাছেঁড়া থাকত সেই লেখায়। মতি নন্দী তখন লিখছেন সাহিত্যশ্রয়ী নির্মেদ গদ্য। তাঁর রিপোর্ট যেন এক ছোটগল্প। খেলোয়াড়ের হাসি-কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায় সেই লেখায়। এই দুই ঘরানার সংঘাতে যার সব থেকে উপকার হয়েছে, তা হল বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতা।
তাই এই পরিণত বয়সে পৌঁছে একটু অভিমান জন্মায়— ধারাবিবরণীকার অজয় বসুর সাফল্য কি খানিকটা আড়ালে রেখেছে ক্রীড়া সাংবাদিক অজয় বসুকে? না-হলে আকবরের ১৭ সেকেন্ডের গোলের পর তাঁর কড়া সেই শিরোনাম— মাঠের বাদশা আকবর— বাঙালি ভুলে গেল কীভাবে?
আসলে বাংলা ধারাবিবরণী আর অজয় বসু এমনই সমার্থক হয়ে গিয়েছিলেন যে, সাংবাদিক অজয় বসুকে আর বাঙালি মনে রাখেনি। অথচ চুনী গোস্বামী আর প্রদীপ ব্যানার্জীর কাছে শুনেছি যে, তাঁরা যে-কোনও ম্যাচের পরদিন অজয় বসুর রিপোর্ট পড়ে নিজেদের ভুল-ত্রুটির সংশোধন করার চেষ্টা করতেন। অজয় বসু কাজ করতেন ‘অমৃতবাজার পত্রিকা-যুগান্তর’-এর বিজ্ঞাপন বিভাগে। অধুনালুপ্ত সেই কাগজের অন্যতম মালিক প্রফুল্লকান্তি ঘোষ, পরে যিনি ক্রীড়ামন্ত্রী হন, তাঁকে নিয়ে আসেন ‘স্পোর্টস’ বিভাগে। বিজ্ঞাপনকর্মী রাতারাতি হয়ে যান ক্রীড়া সাংবাদিক। তাঁর সুললিত কণ্ঠস্বর, মার্জিত উচ্চারণ আর ব্লিশেষণ অচিরেই তাঁকে নিয়ে আসে ধারাবিবরণীকারের আসনে। বাংলা ধারাবিবরণী-র উত্তমকুমার হয়ে উঠতে তাঁর সময় লাগেনি। তিনি ফুটবল, ক্রিকেট ছাড়াও কাবাডি, লন টেনিস, টেবল টেনিস, এথেলেটিক্স, সাঁতার, ভলিবল, বাস্কেট বলের কমেন্ট্রি করেছেন। আরও কত খেলার যে কমেন্ট্রি করেছেন, তার জুড়ি মেলা ভার। সত্যজিৎ রায়ের প্রয়াণের পর কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের কলকাতায় জনসভার মুহূর্তে তাঁর ধারাবিবরণী আজও কানে বাজে। নেলসন ম্যান্ডেলার ইডেনে গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অজয় বসুর সঙ্গে ধারাবিবরণী দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তখন দেখেছিলাম ‘হোম ওয়ার্ক’ কাকে বলে!
গরমের দিনে পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবির বাইরে তাঁকে কোনওদিন দেখিনি। শীতকালে টেস্ট ম্যাচ থাকলে পরতেন স্যুট। টাইটা হত স্যুটের সঙ্গে মামানসই। পরিমিতিবোধ ছিল তাঁর ধারাবিবরণীতে, জীবনেও। নিজে হাতে বাজার করতেন। ট্যাংরা মাছে ছিল তাঁর আসক্তি। আসক্ত ছিলেন তাস খেলার। প্রতি শনিবার নিয়ম করে চন্দননগরে বন্ধুর বাড়ি যেতেন তাস খেলার টানে। এর বাইরে পার্থিব কোনওকিছুতেই আসক্তি দেখিনি।
অজয়দার সঙ্গে বহু খেলার ধারাবিবরণী দেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে কলকাতা বেতার কেন্দ্র ও দূরদর্শন কর্তৃপক্ষের সৌজন্যে। বিবরণী দিয়েছি কলকাতার বহু ফুটবল ম্যাচে, শিলিগুড়িতেও। কোনওদিন ভুলতে পারব কি, প্রতিবার কমেন্ট্রি শুরুর আগে অজয়দার সেই অসাধারণ সৌজন্যের কথা— নাও, তুমি শুরু করো!
নিজেকে বিজ্ঞাপিত করার জন্য এই লেখা নয়। সহ-ভাষ্যকারের প্রতি তাঁর সম্মান প্রদর্শন আজ মিথ হয়ে গেছে। মনে পড়ে, আমার প্রথম দিনের ধারাবিবরণী দেওয়ার দিনটার কথা। আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে হরিপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল-কুমারটুলি ম্যাচে রিলে (তখন ধারাবিবরণীকে ওই নামেই ডাকা হত) করে ‘যুগান্তর’ অফিসে ঢুকেছি দুরুদুরু বুকে, কী জানি অজয়দা কী বলবেন! আমাদের ক্রীড়া দফতরের সহায়ক সতীশদা ভরসা দিলেন, ভাল বলেছেন! অজয়বাবু বলছিলেন! কিন্তু অজয়দা কেন কিছু আমাকে বলছেন না! ভাল-মন্দ কিছুই!
তখন আমি ব্যান্ডেলে থাকতাম। ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, হঠাৎ অজয়দার সেই জলদগম্ভীর হাঁক— জয়ন্ত, এদিকে এসো! গরুচোরের মতো দাঁড়ালাম অজয়দার টেবিলের সামনে। উনি বললেন, “ভালই বলেছ। কিন্তু, একটা সময়ে তুমি উলগার (উলগা নাথন) গতি বোঝাতে গিয়ে ‘তুরিয়ান’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলে। মনে রাখবে তোমার শ্রোতাদের মধ্যে বাংলার পিএইচডি যেমন আছেন, তেমনই আছেন বাংলার মাঠ-ময়দানে চাষ করা কৃষক। তুমি তুরিয়ান শব্দটি না ব্যবহার করে উলগা জোরে ছুটছেন বলতে পারতে না কী!”
অজয়দার এই শিক্ষা আর জীবনে ভুলিনি। কঠিন শব্দবন্ধ ব্যবহার করার চেষ্টা দ্বিতীয়বার আর করিনি। অজয়দা ছিলেন নির্ভেজাল বাঙালি। গরমের দিনে পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবির বাইরে তাঁকে কোনওদিন দেখিনি। শীতকালে টেস্ট ম্যাচ থাকলে পরতেন স্যুট। টাইটা হত স্যুটের সঙ্গে মামানসই। পরিমিতিবোধ ছিল তাঁর ধারাবিবরণীতে, জীবনেও। নিজে হাতে বাজার করতেন। ট্যাংরা মাছে ছিল তাঁর আসক্তি। আসক্ত ছিলেন তাস খেলার। প্রতি শনিবার নিয়ম করে চন্দননগরে বন্ধুর বাড়ি যেতেন তাস খেলার টানে। এর বাইরে পার্থিব কোনওকিছুতেই আসক্তি দেখিনি। হ্যাঁ, একটি বিষয়ে তাঁর আসক্তি ছিল, বাংলা ধারাবিবরণী দেওয়ার ক্ষেত্রে। অনেকেই জানেন না যে, অজয় বসুর সক্রিয় চেষ্টায় কলকাতা ফুটবল লিগের সব ম্যাচের ধারাবিবরণী চালু হয় একটি সময়ে। আসলে অজয় বসু বাংলা ধারাবিবরণীর একটি ইনস্টিটিউশন। তাঁর স্কুলে পড়েই আজ আমাদের এত রমরমা! কিন্তু, শেষ জীবনটা বড় কষ্টের ছিল অজয়দার। অমন কণ্ঠস্বর হারিয়ে গিয়েছিল। দেহপট সনে নট শুধু সকলি হারায় না— ধারাভাষ্যকাররাও হারায়। অজয় বসু তার জ্বলন্ত প্রমাণ!
ধারাভাষ্যের নায়ক
অজয় বসুর জন্মদিনে একটি লেখা আমাকে লিখতে হচ্ছে, এতে যে একদম বিস্মিত হইনি— সেই কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে। বিস্ময়ের কারণ, এই প্রজন্ম তাহলে অজয় বসুকে মনে রেখেছে! বাংলা ধারাবিবরণী জগতের পিতামহ ব্রহ্মাকে তাহলে তারা ভোলেনি? বাংলা ধারাবিবরণীর ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর বলতে তো একটা সময়ে আমরা অজয় বসু, পুষ্পেন সরকার আর কমল ভট্টাচার্যকেই জানতাম। বাংলা ধারাবিবরণীর মাধ্যমে এই ত্রয়ী ক্রিকেট আর ফুটবল খেলাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন ঘরের অন্দরমহলে। বয়কটের ঘুমপাড়ানি ব্যাটিংয়ের কথা রেডিওয় শুনতে-শুনতে ওপাড়ার হিমানি মাসিমা কি মন্তব্য করতেন না, ‘আ মোলো যা! ব্যাটিংয়ের কী ছিরি!’ এই যে ক্রিকেট খেলাটিকে একদম ‘কলোকিয়াল’ করে দেওয়া, তাও তো বাংলা ধারাবিবরণীর কীর্তি! আর সেই কীর্তির প্রধান রূপকার অজয় বসুকে এই প্রজন্মও মনে রেখেছে! বিস্ময় একটু জাগবে না?
অজয় বসু আমার গুরু, সেই কথা স্বীকার করে নিয়েও আমার একটা ছোট্ট অভিমানের কথা আজ শোনাই। ধারাভাষাকার অজয় বসুর কথা বলতে গিয়ে আমরা ভুলে যাই ক্রীড়া-সাংবাদিক অজয় বসুর কথা। আমরা যে ক্রীড়া সাংবাদিকরা তাঁর কাছে নাড়া বেঁধেছিলাম, তারা তো জানে, ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে তিনি কতটা ‘পারফেকশনিস্ট’ ছিলেন। ফাঁকি দিয়ে তাঁর কাছ থেকে পালানোর জো ছিল না। সদাই তৎপর, সর্বদাই অনুসন্ধিৎসু।
আরও পড়ুন: আটের দশক থেকে মোহনবাগান সমর্থকদের ‘মাচা’ আর ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের
‘লোটা’ বলে ডাকা শুরু হয়ে গেল! লিখছেন জয়ন্ত চক্রবর্তী…
সেই সময় বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতার দু’টি ঘরানা নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল— আনন্দবাজার পত্রিকার মতি নন্দীর অনুসারী একটি দল আর ‘যুগান্তর’-এর অজয় বসুর দেখানো পথ অনুসারী একদল যুবকের একটি দল। সেই সময় মতি নন্দী আর অজয় বসুর কল্পিত আঁকচাআঁকচির গল্পে বাঙালি উদ্বেলিত হত। ব্যাপারটা যে কষ্টকল্পনা, তা বুঝি ফোর্ট উইলিয়মের সাঁতারের পুলে জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতার ফাঁকে। একদিন আমি ও মতি নন্দী ফোর্ট উইলিয়ম থেকে ফিরছি। ফোর্ট উইলিয়ম থেকে বড় রাস্তায় ওঠার ফাঁকে মতি নন্দী আমাকে শুনিয়েছিলেন অজয় বসু সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন। সেই মূল্যায়নে ছিল এক বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
অজয় বসু তখন আলংকারিক ভাষা প্রয়োগে লিখছেন। বড় ম্যাচের পরদিন তাঁর রিপোর্ট পড়ার জন্য বাঙালি উন্মুখ হয়ে থাকত। খেলার প্রকৃত কাটাছেঁড়া থাকত সেই লেখায়। মতি নন্দী তখন লিখছেন সাহিত্যশ্রয়ী নির্মেদ গদ্য। তাঁর রিপোর্ট যেন এক ছোটগল্প। খেলোয়াড়ের হাসি-কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায় সেই লেখায়। এই দুই ঘরানার সংঘাতে যার সব থেকে উপকার হয়েছে, তা হল বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতা।
তাই এই পরিণত বয়সে পৌঁছে একটু অভিমান জন্মায়— ধারাবিবরণীকার অজয় বসুর সাফল্য কি খানিকটা আড়ালে রেখেছে ক্রীড়া সাংবাদিক অজয় বসুকে? না-হলে আকবরের ১৭ সেকেন্ডের গোলের পর তাঁর কড়া সেই শিরোনাম— মাঠের বাদশা আকবর— বাঙালি ভুলে গেল কীভাবে?
আসলে বাংলা ধারাবিবরণী আর অজয় বসু এমনই সমার্থক হয়ে গিয়েছিলেন যে, সাংবাদিক অজয় বসুকে আর বাঙালি মনে রাখেনি। অথচ চুনী গোস্বামী আর প্রদীপ ব্যানার্জীর কাছে শুনেছি যে, তাঁরা যে-কোনও ম্যাচের পরদিন অজয় বসুর রিপোর্ট পড়ে নিজেদের ভুল-ত্রুটির সংশোধন করার চেষ্টা করতেন। অজয় বসু কাজ করতেন ‘অমৃতবাজার পত্রিকা-যুগান্তর’-এর বিজ্ঞাপন বিভাগে। অধুনালুপ্ত সেই কাগজের অন্যতম মালিক প্রফুল্লকান্তি ঘোষ, পরে যিনি ক্রীড়ামন্ত্রী হন, তাঁকে নিয়ে আসেন ‘স্পোর্টস’ বিভাগে। বিজ্ঞাপনকর্মী রাতারাতি হয়ে যান ক্রীড়া সাংবাদিক। তাঁর সুললিত কণ্ঠস্বর, মার্জিত উচ্চারণ আর ব্লিশেষণ অচিরেই তাঁকে নিয়ে আসে ধারাবিবরণীকারের আসনে। বাংলা ধারাবিবরণী-র উত্তমকুমার হয়ে উঠতে তাঁর সময় লাগেনি। তিনি ফুটবল, ক্রিকেট ছাড়াও কাবাডি, লন টেনিস, টেবল টেনিস, এথেলেটিক্স, সাঁতার, ভলিবল, বাস্কেট বলের কমেন্ট্রি করেছেন। আরও কত খেলার যে কমেন্ট্রি করেছেন, তার জুড়ি মেলা ভার। সত্যজিৎ রায়ের প্রয়াণের পর কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের কলকাতায় জনসভার মুহূর্তে তাঁর ধারাবিবরণী আজও কানে বাজে। নেলসন ম্যান্ডেলার ইডেনে গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অজয় বসুর সঙ্গে ধারাবিবরণী দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তখন দেখেছিলাম ‘হোম ওয়ার্ক’ কাকে বলে!
অজয়দার সঙ্গে বহু খেলার ধারাবিবরণী দেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে কলকাতা বেতার কেন্দ্র ও দূরদর্শন কর্তৃপক্ষের সৌজন্যে। বিবরণী দিয়েছি কলকাতার বহু ফুটবল ম্যাচে, শিলিগুড়িতেও। কোনওদিন ভুলতে পারব কি, প্রতিবার কমেন্ট্রি শুরুর আগে অজয়দার সেই অসাধারণ সৌজন্যের কথা— নাও, তুমি শুরু করো!
নিজেকে বিজ্ঞাপিত করার জন্য এই লেখা নয়। সহ-ভাষ্যকারের প্রতি তাঁর সম্মান প্রদর্শন আজ মিথ হয়ে গেছে। মনে পড়ে, আমার প্রথম দিনের ধারাবিবরণী দেওয়ার দিনটার কথা। আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে হরিপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল-কুমারটুলি ম্যাচে রিলে (তখন ধারাবিবরণীকে ওই নামেই ডাকা হত) করে ‘যুগান্তর’ অফিসে ঢুকেছি দুরুদুরু বুকে, কী জানি অজয়দা কী বলবেন! আমাদের ক্রীড়া দফতরের সহায়ক সতীশদা ভরসা দিলেন, ভাল বলেছেন! অজয়বাবু বলছিলেন! কিন্তু অজয়দা কেন কিছু আমাকে বলছেন না! ভাল-মন্দ কিছুই!
তখন আমি ব্যান্ডেলে থাকতাম। ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, হঠাৎ অজয়দার সেই জলদগম্ভীর হাঁক— জয়ন্ত, এদিকে এসো! গরুচোরের মতো দাঁড়ালাম অজয়দার টেবিলের সামনে। উনি বললেন, “ভালই বলেছ। কিন্তু, একটা সময়ে তুমি উলগার (উলগা নাথন) গতি বোঝাতে গিয়ে ‘তুরিয়ান’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলে। মনে রাখবে তোমার শ্রোতাদের মধ্যে বাংলার পিএইচডি যেমন আছেন, তেমনই আছেন বাংলার মাঠ-ময়দানে চাষ করা কৃষক। তুমি তুরিয়ান শব্দটি না ব্যবহার করে উলগা জোরে ছুটছেন বলতে পারতে না কী!”
অজয়দার এই শিক্ষা আর জীবনে ভুলিনি। কঠিন শব্দবন্ধ ব্যবহার করার চেষ্টা দ্বিতীয়বার আর করিনি। অজয়দা ছিলেন নির্ভেজাল বাঙালি। গরমের দিনে পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবির বাইরে তাঁকে কোনওদিন দেখিনি। শীতকালে টেস্ট ম্যাচ থাকলে পরতেন স্যুট। টাইটা হত স্যুটের সঙ্গে মামানসই। পরিমিতিবোধ ছিল তাঁর ধারাবিবরণীতে, জীবনেও। নিজে হাতে বাজার করতেন। ট্যাংরা মাছে ছিল তাঁর আসক্তি। আসক্ত ছিলেন তাস খেলার। প্রতি শনিবার নিয়ম করে চন্দননগরে বন্ধুর বাড়ি যেতেন তাস খেলার টানে। এর বাইরে পার্থিব কোনওকিছুতেই আসক্তি দেখিনি। হ্যাঁ, একটি বিষয়ে তাঁর আসক্তি ছিল, বাংলা ধারাবিবরণী দেওয়ার ক্ষেত্রে। অনেকেই জানেন না যে, অজয় বসুর সক্রিয় চেষ্টায় কলকাতা ফুটবল লিগের সব ম্যাচের ধারাবিবরণী চালু হয় একটি সময়ে। আসলে অজয় বসু বাংলা ধারাবিবরণীর একটি ইনস্টিটিউশন। তাঁর স্কুলে পড়েই আজ আমাদের এত রমরমা! কিন্তু, শেষ জীবনটা বড় কষ্টের ছিল অজয়দার। অমন কণ্ঠস্বর হারিয়ে গিয়েছিল। দেহপট সনে নট শুধু সকলি হারায় না— ধারাভাষ্যকাররাও হারায়। অজয় বসু তার জ্বলন্ত প্রমাণ!
আর্কাইভ
শুধু কবিতার জন্য: পর্ব ৫৪
ক্যাসেট কথা: পর্ব ৭
রাতবিরেতে সেই মোহিতে
সাক্ষাৎকার : শাশ্বত মুখোপাধ্যায়
মিহি মন্তাজ: পর্ব ১২
বিভাগ
সাম্প্রতিক লেখা