কলকাতার বেলুন বিলাস: পর্ব ১

Representative Image

বেলুন পুরাণ

ব্রিটিশ ক্যালকাটা থেকে আজকের কলকাতা। মধ্যবিত্ত মনের মেট্রোপলিটন স্বপ্ন। যে-কলকাতার মাটিতে ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাস লেখা হয়েছে, হচ্ছে। বাঙালির অশ্বমেধের ঘোড়ার যাত্রা শুরু কলকাতা থেকেই। প্রাসাদ থেকে বস্তি, রাজপথ থেকে গলিঘুঁজি, জমিদার থেকে কাঁটাতার, ভালবাসা-মিছিল থেকে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের এই বৈপরীত্যের বিচিত্র কলকাতার একটি চরিত্র রামচন্দ্র। কলকাতার রামচন্দ্র— রামচন্দ্রের কলকাতা।

ত্রেতার শ্রীরামচন্দ্র পুরাণ থেকে বাস্তব, মন্দির থেকে রাজনীতি সবদিকে প্রাসঙ্গিক স্মরণীয় এবং বরণীয়। কিন্তু কলির এই রামচন্দ্র কিছুটা বিস্মৃত। কলকাতার সাংস্কৃতিক বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগের এই রামচন্দ্র প্রমাণ করেছিলেন, মধ্যাকর্ষণ মানুষের ইচ্ছাতে অকেজো। এই রামায়ণের আগে গৌরচন্দ্রিকা প্রয়োজন। ব্রিটিশ রাজধানী কলকাতায় বিদেশি বেলুনের স্বদেশি কাহিনি।

‘হাজার হাজার কাতার কাতার লোক চলেছে ভাই।

ছেলে বুড়ো কানা খোঁড়া কেউ তো বাকী নাই॥

বেলুনবাজ সাহেব ভায়া, বেলুনে তুলবে কায়া,

উড়বে খুব লাগিয়ে হাওয়া, লুটবে টাকা তাই॥”

কলকাতার আকাশ তখন বেলুনের প্রমোদ কানন। সাহেব-মেমের জনপ্রিয় বেলুনবাজি কলকাতার আকাশ থেকে মানুষের মনে। এ-প্রসঙ্গে আসে উইনটল সাহেব-এর কথা। যিনি কলকাতায় ৬ ফুট ব্যাসের একটি বেলুন তৈরি করে, ১৭৮৫ সালের ৩০ জুলাই রাতের কলকাতায় এসপ্ল্যানেড থেকে উড়িয়েছিলেন। তবে নিজে তিনি চড়েননি।

১৮২৬-এর আগস্ট মাসে এন্টালির এক ব্যক্তি, যিনি ১৮ ফুট এবং ১২ ফুট— দু’টি বেলুন তৈরি করে উড়িয়েছিলেন। ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, দমদমের কাছাকাছি কোনও অঞ্চলে বেলুন দু’টি  নামে। 

কলকাতার প্রথম সার্থক নভশ্চর অভিজ্ঞ বেলুনবাজ, ফরাসি বংশোদ্ভূত ডি-রবার্টসন। যিনি কলকাতায় এসে, উড়ানের খরচ সংকুলানের জন্য এদেশীয় ধনীদের দ্বারস্থ হলেন। রাজা বৈদ্যনাথ রায় শর্ত দিলেন— রবার্টসন যদি তাঁর বাগান থেকে ওঠেন, তাহলে তিনি তাঁকে প্রচুর টাকা দেবেন। তবে এই ব্যাপারটির সঙ্গে ইংরেজ সাহেবদের কোনও সংস্রব থাকা চলবে না। রবার্টসন এই অসম্মানজনক শর্ত না মেনে, সিদ্ধান্ত নিলেন সাধারণ জনগণের সাহায্য নেওয়ার।

স্থির হয়, ১৮৩৬-এর ১৬ মার্চ মুচিখোলা [গার্ডেন রিচ] থেকে বেলুনে উঠবেন তিনি। সেই অনুযায়ী খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন, হ্যান্ডবিল বিলি ইত্যাদিতে প্রচারে জানানো হল— বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস পূর্ণ করে, বাদ্যযন্ত্রে ‘গড সেভ দ্য কিং’ গানের সুর বাজিয়ে, রবার্টসন বেলুনের সঙ্গে যুক্ত এক যানে আরোহণ করে আকাশে উঠবেন। এই যাত্রায়, প্রথম শ্রেণির টিকিটের মূল্য ১৬ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণির ৮ টাকা এবং বাগানে ঢোকার প্রবেশ মূল্য ২ টাকা ছিল।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে ট্রাফিক আইন, শোলে থেকে জুরাসিক পার্ক! দেশলাইয়ের বাক্সে যেভাবে ধরা থাকে ইতিহাস!
লিখছেন সৃজন দে সরকার…

বিবিধ সংবাদপত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী— সেইদিন যেন সারা শহর চলেছে মুচিখোলার দিকে। অজস্র মানুষের ভিড় রাস্তা থেকে নদীতে। যে-সুযোগে পালকিবাহক থেকে ডিঙিচালক সবাই ভাড়া বাড়িয়ে দিল। মানুষ চলেছে মানুষ-পাখি দেখতে।

‘জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকার সম্পাদকের মতে— ‘এ প্রকার লোকের ভিড় কখনও দৃষ্ট হয় নাই।’ ‘হরকরা’ পত্রিকার সংবাদদাতা লিখেছেন— জলে, স্থলে, গাছের উপর মানুষ আর মানুষ, হুগলি নদীতে নৌকোর ওপর অসংখ্য মানুষ হাঁ করে আকাশপানে তাকিয়ে।

এইদিন মুচিখোলা থেকে বেলুনে ঠিক বিকেল পাঁচটা পঁচিশে যাত্রা শুরু করলেন রবার্টসন। রবার্টসন ফ্ল্যাগ নেড়ে, টুপি নেড়ে, নিজের হাতে চুমু খেয়ে এবং আরও বিবিধভাবে ‘his continued state of convalescence’-এর নিদর্শন ব্যক্ত করে চললেন।

বেলুনটি প্রথমে উত্তরে বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে যাত্রা করে, কিছুটা যাওয়ার পর হাওয়ার বিপরীত প্রবাহের জন্য তার গতিপথ পরিবর্তন করে, বেলুনটি দক্ষিণদিকে চলতে থাকে। এইভাবে খানিকটা যাওয়ার পর রবার্টসন বেলুন থেকে কিছুটা ‘ব্যালাস্ট’ অর্থাৎ বালির বস্তা ফেলে দিলেন। এর কিছুক্ষণ পরে বেলুনটি দ্রুত নীচে নামতে লাগল।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘দ্য ইংলিশম্যান’-এর রিপোর্ট অনুসারে রবার্টসন দাবি করেছিলেন, এটি তাঁর ষোড়শ গগন-বিহার। কিন্তু তিনি বেশ তাড়াতাড়িই নীচে নেমে আসেন। কারণ হিসেবে রবার্টসন দাবি করেন, ওপরে গরম হাইড্রোজেন গ্যাস ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শ এসে সংকুচিত হওয়ার কারণেই দ্রুত নীচে নেমে আসে বেলুন। কিন্তু কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, বেলুনে ওঠার সময়ে তাড়াহুড়োয় গ্যাস ছাড়ার ভাল্ভ রবার্টসন খুলে দেন। ফলে বেলুনটি দ্রুত মাটিতে নেমে আসে।

কেউ বলেন, বেশি উপার্জন না হওয়ায় সাহেব বেশিদূর ওঠেননি। আবার কেউ বললেন— উত্তুরে বাতাস বেলুনকে দক্ষিণ দিকে নিয়ে যাওয়ায়, সমুদ্র দেখে ভয় পেয়ে সাহেব তাড়াতাড়ি নেমে পড়েন। বেলুন একেবারে মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়াতে ঠান্ডার চোটে বেলুনের মধ্যেকার বাষ্প জমে গেল, আর তাই বেলুন সঙ্গে-সঙ্গে নীচে নেমে এল—এমনও বললেন কেউ-কেউ।

আরেক পক্ষ বলল, মন্ত্রের জোরেই এবং আরকের তেজেই রবার্টসন এসব করতে পেরেছেন। কেউ বললেন, কলকাতার লোকেদের টাকাপয়সা হাত করার জন্যই এইসব রবার্টসন সাহেবের প্রতারণা। বিবিধ পত্রিকায় এই নিয়ে প্রকাশিত হয় বিবিধ সংবাদ।  কিন্তু রবার্টসন বিশেষ টাকা লাভ করেননি এই যাত্রায়। তাঁর ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য কেউ-কেউ সাহায্যের প্রস্তাব করলেন।

সবদিক বিচার-বিবেচনা করে রবার্টসন ঘোষণা করলেন— শিগগিরিই তিনি কেল্লার মাঠ থেকে আবার বেলুনে উঠবেন এবং গরিব লোকেরা যাতে তা দেখতে পায়, সে-জন্য টিকিটের দাম কম করবেন। দেশবাসীর কাছে সংবাদপত্র মারফত এক আবেদন পেশ করে তিনি এ-দেশের জনগণদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন— জনগণের সমর্থনে তিনি খুশি। কিন্তু সেই টাকা তিনি নিতে পারবেন না। বরং তাঁর দ্বিতীয় উড়ানে যেন সবাই তাঁকে সাহায্য করেন।

‘সমাচার দর্পণ’ লিখল— ‘এবার নগদ টাকা ছাড়া টিকিট বিক্রি করা হবে না এবং ঐ তাবৎ টাকা ইউনিয়ন বেঙ্কে জমা করা যাইবে। উদ্‌গত না হইলে সাহেবকে ঐ টাকা দেওয়া যাইবে না।’

কিন্তু, কলকাতা থেকে রবার্টসনের বেলুনে উড়ান নিয়ে খবর পাওয়া গেল না।  বরং তিনি এখান থেকে লখনউ, আগ্রায় বেলুনবাজিতে হাজার আটেক টাকা রোজগার করে, দিল্লির দিকে যাত্রা করেন। এবং বিলেতে যাওয়ার আগে ১৮৩৭-এর শেষের দিকে তিনি কলকাতায় ফিরে এসে তিনি ঠিক করেন, বেলুনের খেলা দেখাবেন। ২৫ নভেম্বর, ১৮৩৭-এর ‘সমাচার দর্পণ’ অনুযায়ী— ‘শ্রীযুত রবার্টসন সাহেব কলিকাতা হইতে বিলাতে প্রত্যাগমনের পূর্বে পুনর্বার বেলুনযন্ত্রের দ্বারা আকাশ পথগামী হইতে নিশ্চয় করিয়াছেন।…তাহাতে একটি বানর সঙ্গে করিয়া উঠিবেন। পরে ঐ ছত্রাকার যন্ত্রের দ্বারা বানরকে নামাইবেন।…এই ব্যাপার সুদৃশ্য হইবে। যদ্যপি রবার্টসন সাহেবের চাঁদা বিলক্ষণ পূর্ণ হয় তবে কলিকাতাস্থ কিল্লার মাঠ হইতেও একবার উঠিবেন এমত মানস আছে।’

কিন্তু এই উড়ান হয়নি। রবার্টসন দেশে ফিরে যান। ১৮৩৮-এর গোড়ার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি নিলামে ওঠে, নিলামে ২৪০০ টাকা খরচে প্রস্তুত তিনটি বেলুন মাত্র ৫০ টাকায় বিক্রি হয়। বেলুনে উঠে রবার্টসন লক্ষ্মীলাভ করতে না পারলেও, বাঙালির মন জয় করে নিয়েছিলেন।

‘জাল জোচ্চুরি মিছে কথা। এই নিয়ে কলকাতা।’ কিন্তু কলের শহর কলকাতা চলতে থাকে। ১৮৪৯-এ এই কলকাতায় বেলুন নিয়ে এলেন, ফরাসি পি মেগ্রি। বিবিধ পত্রিকায় তাঁর উড়ানের বিজ্ঞাপন থেকে জানা গেল— আগে কাটলে ৬, ৪ এবং ২ টাকার টিকিট পাওয়া যাবে কিন্তু আরোহণের দিন বাগানের গেটে কিনলে বেশি খরচ করতে হবে। বিশেষ আকর্ষণ উচ্চতায় ১২০ ফুট, বেষ্টনে ১৬০ ফুট— আগে দেখা-না-যাওয়া এমন বিবিধ বেলুন।  জানা যায়, ১৭,০০০ টাকার টিকিট পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল। স্থির হল— বৈদ্যনাথ রায়ের সিঁথির বাগান থেকে ৩০ জানুয়ারি এই বেলুন-উড়ান হবে। কিন্তু তা বাতিল হয়। পরবর্তীতে ৫ ফেব্রুয়ারি এবং ৭ ফেব্রুয়ারি বেলুন উড়ানও বাতিল হয়।

মেগ্রির এই প্রতারণা নিয়ে, ৮ ফেব্রুয়ারির সংবাদ ভাস্কর লেখে— ‘…দুই পিপা গ্যাস ধূমেতে কি এক বৃহৎ বেলুন উড়িতে পারে অতএব বেলুন উড়িতে পারে নাই। পাঁচ ছয় হস্ত উঠিয়া অমনি পড়িয়া মরিল, ইহাতে দর্শক লোকেরা তৎক্ষণাৎ মেগ্রি সাহেবের দড়ী ধরিয়া টানিতে আরম্ভ করেন। আমারদিগের স্মরণ হয় রবার্টসন সাহেব যখন বেলুনে উড্ডীয়মান হয়েন তখন ২৫ পিপা গ্যাসের ধূমে বেলুন পূর্ণ করেন…পরে বেলুন ধূম্রে পরিপূর্ণ হইলে রসারসী বন্ধনছেদন মাত্র বিশাল শব্দে একেবারে উড়িয়া গেল।”

‘ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’ থেকে জানা যায়— এই ঘটনায় কলকাতার ক্ষুব্ধ দর্শকরা বেলুনটিকে টুকরো-টুকরো করে দেয়। জনরোষ থেকে বাঁচতে মেগ্রি হাওড়ায় পালিয়ে গিয়ে, সেখান থেকে একটি ফরাসি জাহাজ ধরেন। যদিও পরে তিনি দাবি করেছিলেন যে, নিকৃষ্ট গ্যাসের কারণেই তিনি উড়তে পারেননি। হুজুগপ্রিয় দর্শকদের জন্য, এই ঘটনার দু’মাস পরে ১০ এপ্রিল মেগ্রি আবার বেলুনে উঠলেন, এবং দশ হাত উঠেই পড়ে গেলেন এবং ভিড়ের কারণে সে-দিন কালনা নিবাসী ঈশ্বরচন্দ্র ভট্টাচার্য নামক এক জন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত-এর ঈশ্বরপ্রাপ্তিও ঘটে।

ক্রুদ্ধ, ব্যথিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ লেখে— ‘গত মঙ্গলবাসরে পতিত ম্লেচ্ছ মন্সিয়র মেগর সাহেব শূন্যমার্গগামী হওনের সময় অত্যন্ত জনতা বশত শকট চক্রে পতিত হইয়া বেগর মেগর ভাল নগর পাইয়াছে, নগরীর লোকের ধন্য আমোদ, দুষ্টের চাতুর্যের প্রমাণ পাইয়াও তদর্থে অর্থ সামর্থের অপচয়ে বিরাগ মাত্র নাই, ধন্য চৈত্র মাস, রৌদ্রের প্রচণ্ডতায়  মহাশয়ের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি হইয়া থাকে, তৎপ্রমাণ কলিকাতা নগরীর লোকের কার্য দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া গেল, রাজপুরুষেরাও মন্দ নহেন, দুষ্টদমন বিষয়ে কিছু দৃষ্টি নাই…’

মেগ্রের প্রতারণার স্মৃতি না মিলাতেই, আসেন ফরাসি মাদাম দ্য লাসান্তা । ১৮৫০-র ২ মার্চ/এপ্রিল কলকাতায় প্রথম বিদেশিনীর বেলুন উড়ান উপলক্ষে প্রচুর টিকিট বিক্রি হয়। কিন্তু উড়ান ব্যার্থ। অবশেষে পুলিশি হস্তক্ষেপে ক্রুদ্ধ জনতার রোষ থেকে রক্ষা পেয়ে, মাদাম প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে যান। পরবর্তীতে ‘ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া’ থেকে জানা যায়— ফরাসি ভেকধারী মাদাম দ্য লাসান্তা আসলে চুনা গলির বাসিন্দা এক পর্তুগিজ মহিলা। নিজের বুজরুকি চালানোর জন্য যাকে রেখেছিলেন কুখ্যাত মেগ্রে। কিন্তু কলকাতার আকাশ খালি রইল না। এবার যিনি বেলুন নিয়ে হাজির হলেন, তাঁকে নিয়ে সবার সংশয়।

এ আবার কোথা হ’তে আইল “কাইট”?

বিনা সূত্রে উড়িয়াছে কেমন “কাইট”।

পাখা নাই শূন্যে এসে কেমন “ফাইট” ।

নাহি বলে, বলে চলে কলের “কাইট”।

মত্ত্যলোকে শব্দ করে, “কাইট, কাইট” ।

ঘোর ক্রুদ্ধে এসে উর্দ্ধে যুদ্ধের “মাইট”।

হরিয়া লইবে শশী করিয়া “ফাইট”।

মনে এই ভাবিয়াছে হইলে “নাইট”।

কেড়ে লবে আমাদের চাঁদের “রাইট”।

চেলেছে নূতন কল জ্বেলেছে “লাইট”।

[ব্যোম-যান— ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত]

সেই সংশয়, সতর্কবার্তা দেখা যায় তৎকালীন ‘ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া’ থেকে ‘সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়’-এর লেখায়। মেগ্রের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, যাকে উপদেশ দেওয়া হল, টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা যেন বিশ্বস্ত একটি ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্থতায় হয়। উড়ান ব্যর্থ হলে যেখান থেকে দাম ফেরত পেতে ক্রেতাদের কোনও অসুবিধা না হয়। সঙ্গে সাবধান করা হল— উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যাবস্থা রাখার। কারণ, প্রতারকদের সঙ্গে কলকাতাবাসী, দুর্ব্যবহার করতে পিছপা হবে না। যার প্রমাণ আগে পাওয়া গেছে।

তিনি বেলুনবাজ ফিজহাবার্ট কাইট। কাইট আশ্বস্ত করলেন, প্রকৃতি সহায় থাকলে তাঁর অত্যাধুনিক ব্যবস্থা সংবলিত হাইড্রোজেন বেলুনটির সঙ্গে আরোহণের সাফল্য নিয়ে তাঁর কোনও সন্দেহই নেই। বিক্রি হল বেশ কিছু টিকিট। উড়ানের জায়গা সেই সিঁথির বৈদ্যনাথ রায়ের বাগান।

এ-প্রসঙ্গে ১৮৫০-এর ২ নভেম্বর ‘সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়’ লিখেছিল— ‘এবারকার বেলুনের সাহেব ঐ বিষয় আপনার পারগতা সাধারণ লোকের বিদিতনিমিত্ত আদৌ প্রচার করিয়াছেন যে প্রকৃত গ্যাস বা বাষ্প দ্বারা বেলুন পূর্ণ করিবেন এবং পূর্ব্বকার মেগ্রি সাহেব যে যে সময় বেলুন উঠাইবার জন্য ধার্য্য করেন তাহারও পরিবর্তন করিয়াছেন…এ বিষয়ে একটা সন্দেহ আছে যে এই সাহেব স্থান পরিবর্তন করেন নাই, মেগ্রি সাহেব যেখানে ভূয়োভূয়ঃ কৃতকার্য্য হইয়া সাধারণের বিরাগভাজন হইয়াছিলেন সেই স্থানেই ইনি উড়িবেন স্থানপ্রভাবে পাছে লোকদের অসন্তোষ করা হয়।’

কিন্তু কাইট সাহেব কথা রেখে, নিজের কাজে কৃতকার্য হয়েছিলেন। ৫ নভেম্বর সকাল ঠিক সাড়ে ন’টায় কাইটকে নিয়ে তাঁর বেলুন উড়ে গেল। তিনি হতাশ করেননি দর্শকদের। সেই বেলুন প্রথমে উড়ে গিয়েছিল দক্ষিণ দিকে, তার পরে পূর্বে ঘুরে উত্তর-পূর্ব দিকে মোড় নেয়। ক্রমে চোখের আড়ালে চলে যায়।

ছবিঃ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বিবিধ সংবাদপত্র এবং কাইটের থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী— দশটা নাগাদ কাইট দমদমের আকাশ পেরিয়ে যান এবং দুপুর একটা নাগাদ বারাসতের অদূরে কুদুমগাছিয়ার কাছে কোটরা নামে এক স্থানে অবতরণ করেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই জন্য তাঁকে ‘বড়শা’ বা হগ্‌-স্পিয়ার দিয়ে বেলুন থেকে গ্যাস বের করতে হয়েছিল। কারণ, গ্যাস বার-করার চাবি খোলার জন্য যে-সুতো থাকে সেই হুইপ কর্ডটি ছিঁড়ে গেছিল। অবতরণের সময়ে বেলুন থেকে লোহার নোঙর ছুঁড়ে ফেলার পর সেই জায়গায় উপস্থিত গ্রামবাসীদের, পঁচিশ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে কাইট তাঁদের সাহায্য পান। পাশাপাশি বারাসাত অবধি বেলুন বয়ে আনার জন্যেও মাথা পিছু চার টাকা করে দিতে হয় কাইটকে। সেখান থেকে তিনি পায়ে হেঁটে যান জাগুলিয়া গ্রামে। যেখানে জমিদার রাধামাধব বিশ্বাসের আতিথেয়তায় সেখানে রাত্রি কাটিয়ে, পরের দিন বেলুন-সমেত কাইট কলকাতায় ফিরে আসেন।

‘সত্যার্ণব’, ‘ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া’ বিবিধ পত্রপত্রিকা থেকে কাইট প্রসঙ্গে “…তিনি অনেক দূর পর্যন্ত ঊর্ধ্বে গমন করিয়াছিলেন, কেননা অতিশয় শীতল বায়ু প্রাপ্ত হওয়াতে তাঁহার কর্ণকুহর কন কন করিয়াছিল ঐ সময়ে তিনি একটা চুরুট জ্বালিয়া ধূমপান করত কালহরণ করিতে লাগিলেন।…” এ-জাতীয় উড়ানের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল। 

কলকাতা কাইটকে খ্যাতি দিল, দিল স্বীকৃতি। কিন্তু দিল না অর্থ। জানা যায়— টিকিট বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৭৬টাকার। বিশেষজ্ঞদের মতে মেগ্রের প্রবঞ্চনাই ছিল কলকাতার মানুষের আগ্রহে ভাঁটার কারণ। ‘সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়’, ‘বেঙ্গল হরকরা’ প্রভৃতি পত্রিকা কাইটের দক্ষতার প্রশংসা করে, তাঁকে পরবর্তী উড়ানের জন্য উৎসাহ দিতে থাকল, এমনকী সরকারের কাছে আবেদন জানায় সাহায্যের জন্য। স্থানীয় ধনী ব্যক্তিরা পরবর্তী আরোহণের সময়ে কাইটকে উদার হস্তে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিলেন।

এদিকে কুখ্যাত মেগ্রে ‘স্পহি গ্লাস্’ ছদ্মনামে বেঙ্গল হরকরার সম্পাদককে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন যে— ‘মেগ্রে বলাবলি করছিল যে কাইটের বেলুন তার বেলুনের চেয়ে ওপরে উঠতে পারবে না। কয়েক বস্তা ব্যালাস্ট হতচ্ছাড়ার মাথায় এসে পড়তে দেখলে তবে খুশি হতাম!’

কাইটের পরবর্তী উড়ানের বিজ্ঞাপন সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয় পত্রিকায় ২৫ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছিল। আগের জায়গা থেকেই সকাল আটটায় আরোহণ।— ‘ভদ্রলোক এবং বিবিদিগের পক্ষে কৌতুক প্রদর্শনীর স্থানে গাড়ি শুদ্ধ উপনীত হইবার প্রতি টিকিটের মূল্য ৫ টাকা। বালক বালিকাদের পক্ষে ঐরূপ ২ টাকা। গাড়ি বহির্ভাগে রাখিয়া প্রবেশ করণীয় টিকিটের মূল্য ২ টাকায় এক টিকিট বিক্রয় করা যাইবেক।’

এমনকী কাইটের জন্য উড়ানের আগের দিন এই পত্রিকার সম্পাদক স্বয়ং লিখেছিলেন— ‘… তিনি ঐ কর্ম্মে নিপুণ এবং মেং মেগরের ন্যায় ঠগাইতে চাহেন না ইহার প্রমাণ লোকে পাইয়াছেন…এবং যেমত দুঃসাহসিক কৰ্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়াছেন তদর্থে উপযুক্ত পুরস্কার প্রাপ্ত হইতে পারেন ইহার নিমিত্ত বহুতর লোকে অদ্য তাঁহার টিকিট ক্রয় পূর্ব্বক বেলুন দৃষ্টি করিবেন আমরা এমত ভরসাযুক্ত রহিলাম।’ তবে কলকাতা কাইটের প্রতি বিরুপ ছিল।

“চঞ্চল চকোরচয় চঞ্চুর আঘাতে।

“কাইট, বাইট” করি দিলে অধঃপাতে ।।

খোঁচা খেয়ে ধূম লাগে, ধূম কিসে আর।

পুনর্ব্বার এসে করে ধরায় বিহার ।

কেহ বলে আছে এই শাস্ত্রের বচন।

অতি উচ্চে উঠিলেই পশ্চাতে পতন॥”

দমদমের দিকে উড়ে যাওয়ার সময়ে কলকাতার দক্ষিণাঞ্চলে কাইট সাহেবের বেলুনের আবরণ ফেটে গ্যাস বেরিয়ে, বেলুনটি আছড়ে পড়ে ধানক্ষেতে। কিন্তু তার আগেই কাইট ঝাঁপ দিয়েছিলেন। যাকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। কাইটের সাহায্যের জন্য চাঁদা তোলা শুরু হয়। এ-প্রসঙ্গে বিবিধ জন বিবিধ মতামত দিল। কেউ বলল, নিছক কৌতুক-এর জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করার তাঁর কোনও অধিকার নেই। কেউ বললেন— পাশ্চাত্যের মতো বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে বেলুন ব্যবহার উচিত।

কিন্তু মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার পরেও কিন্তু নিরস্ত করা যায়নি কাইটকে। [২০ ফেব্রুয়ারি ১৮৫১] ‘ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’-য় প্রকাশিত কাইটের চিঠি থেকে জানা যায় যে, প্রথম দুই আরোহণের আর্থিক ক্ষতিপূরণের আশাতেই প্রধানত তিনি আবার ওড়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি লেখেন— টিকিট বিক্রির বদলে চাঁদা তোলার আয়োজন করেও বিশেষ সাড়া পাচ্ছেন না। জীবনহানির ভয় আছে এমন কাজে মদত দিতে অনেকেই রাজি নয়। আবার অনেকের মতে বিনা পয়সাতেই যখন খেলা দেখা সম্ভব চাঁদা দিয়ে লাভ কী! তিনি জানান, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে পারলে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কাজ করতে তিনি সত্যিই আগ্রহী।

তিনি আরও বলছেন— ‘হাইগ্রোমিটার, ব্যারোমিটার, এন্ট্রিন্ডওমিটার বা অন্য কোনো মিটার…আসলে এইসব উপকরণ কেনার মতো সামর্থ্য নেই আমার। তা ছাড়া নিজে নিজের ঢাক পিটিয়ে বলা যে, আমি এসব ব্যবহার করতে পারি, সেটাও রুচিসম্মত নয়। তবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে প্রাচ্যের বায়ুমণ্ডলের অনেক আকর্ষণীয় তথ্য এবং ঘটনা এখনও অনাবিষ্কৃত রয়েছে।’

কাইটের তৃতীয় উড়ানের জায়গা স্থির হয় উড স্ট্রিটের কাছে একটি ফাঁকা মাঠ থেকে,  দিন ঠিক হয় ৩ মার্চ ১৮৫১। বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়— ‘শ্রীযুত বাবু গোবিন্দ্রচন্দ্র সেন মহাশয় ইহা স্বীকার করিয়াছেন ঐ বেলুন যে পর্যন্ত না উঠিবেক তাবৎ কাল স্বাক্ষরকারিদিগের স্থান হইতে দাতব্য টাকা আদায় করিয়া আপনার নিকট রাখিবেন ইতি।’

কিন্তু কাইটের তৃতীয় আরোহণে বারবার বাধা এল। কখনও চাঁদার টাকা না পাওয়া, কখনও গ্যাস বিক্রেতার প্রতারণা, কখনও অত্যুৎসাহী জনতার কারণে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেলুনযাত্রা পিছোতে থাকে। সঙ্গে ছিল আর্থিক ক্ষতি। ইংরেজি এবং বাংলা বিবিধ সংবাদপত্রে চিঠি পাঠিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে কাইট লিখলেন— ‘সাধারণে বিবেচনা করিবেন যে, গত বারের ন্যায় পতনাশঙ্কায় ভীত হইয়া শূন্য সাহসে কেবল অর্থোপার্জন জন্য প্রবঞ্চনা করিয়াছি কিন্তু এইক্ষণে প্রতিজ্ঞা পূর্ব্বক কহিতেছি যদি ইতিমধ্যে আমার দৈহিক কোন ব্যাঘাত না হয় তবে আগত ২২ মার্চ শনিবার প্রাতে বেলা ৮ ঘণ্টার সময়ে বেলুনের চতুঃপার্শ্বে কাটরার ভিতর কাহাকেও আসিতে না দিয়া উক্ত যন্ত্র সহকারে শূন্যে উঠিব…’

কাইটের চিঠি থেকে জানা যায়, প্রথম দুই আরোহণে তিনি যথাক্রমে— একশো সাত এবং সাড়ে উনআশি টাকা পেয়েছিলেন আর খরচ হয়েছিল সবশুদ্ধ বারোশো টাকা।

কিন্তু কাইটের উড়ান পিছোতেই থাকে। এই নিয়ে  কাইটকে সংবাদপত্র থেকে রঙ্গালয় সবার প্রশ্ন এবং ব্যাঙ্গ-বাণের মুখোমুখি হতে হয়। বিদেশি রঙ্গালয়ের নামকরা ম্যানেজার ডেভকাক্সন কাইটকে নিয়ে একটি প্রহসন মঞ্চস্থ করে। ‘ইংলিশম্যান’ সংবাদপত্র অনুযায়ী— ‘It is a pity to waste money in such fruitless efforts and Mr. Kight should make his bow and be thankful he has firm ground under him.’ কিন্তু সব সন্দেহের নিরসন ঘটিয়ে কাইট ৩১ মার্চ সত্যিই বেলুনে চড়েন এবং নিরাপদে সার্কুলার রোডে নামেন। শেষ হয় কাইটের কলকাতা অধ্যায়।

এরপরে ১৮৬২-এর ডিসেম্বর মাসে ডিনসাহেব কলকাতাবাসীকে বেলুনবিহার উপহার দেয়। ‘সোমপ্রকাশ’ থেকে জানা যায়— ‘গত শুক্রবার অপরাহ্ন পাঁচ ঘটিকার সময়ে ইডেন-বাগানে নিরূপিত সময়ে ডিনসাহেব তাহার পুত্র এবং ম্যাম মেরিয়ান ব্যোমযানে আকাশমার্গে উত্থিত হইয়াছিলেন। ব্যোমযান ক্রমশ পূর্ব-দক্ষিণভাগে গমন করিয়া চৌরঙ্গির নিকট নিরাপদে পতিত হইয়াছে।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য— ম্যারিয়নই এই দেশের প্রথম মহিলা নভশ্চর।

এরপর জানা যায়— ১৮৭৮-এর প্রথম দিকে জোসেফ সিমন্স লিন, গড়ের মাঠ থেকে বেলুনে চড়েছিলেন, যা  সাড়া জাগাতে পারেননি।

এই বেলুন অধ্যায়ের পরবর্তী মানুষটি পার্সিভাল স্পেনসার। যার উদ্যম পরবর্তীতে বাংলা এবং ভারতের সাহসিকতার রূপরেখা ঠিক করেছিল। বোম্বেতে সফল খেলা দেখিয়ে, তিনি এলেন ফেব্রুয়ারির কলকাতায়। ঠিক হল টিভোলি গার্ডেনে তিনি উড়ান নেবেন— ২ মার্চ শনিবার, ১৮৮৯-এ। বিকেল ৪-৩০ মিনিটে। সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনে তিনি বললেন— ‘এমপ্রেস অব ইন্ডিয়া’ নামে নবনির্মিত একটি বেলুনে তিনি ২০০০ ফিট উঠবেন, তারপর সেখান থেকে লাফ দিয়ে মেঘের মধ্যে বজ্রের মতো পড়বেন এবং ১০০ ফিট ওপরে সামনে অবতরণ করবেন। প্রবেশমূল্য ১ টাকা, সংরক্ষিত আসন ২ এবং ৩ টাকা। দেশীয়দের জন্য একটা নির্দিষ্ট আলাদা জায়গার প্রবেশমূল্য ধার্য হল আট আনা।

এই উপলক্ষে, অজস্র দর্শক এলেন। ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’-এর মতে দর্শকসংখ্য ১০ লক্ষের কম নয়-এর মধ্যে টিকিট কেটেছিলেন হাজার পাঁচেক লোক। কিন্তু উপস্থিত দর্শকদের হতাশ করে, উড়ান বাতিল হয় ‘গ্যাস ফেল্’ করার জন্য। দর্শকরা অধৈর্য হয়ে ঘণ্টা চারেক অপেক্ষা করার পর ফিরে যায়। ক্ষুব্ধ জনতার একাংশ সাহেবকে গালিগালাজ করে, অনেকে পয়সা, ফেরত চায়— জনতাকে শান্ত করতে পুলিশকে রীতিমতো বেগ পেতে হয়।

১৮৮৯-এর ৩ মার্চ ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকা থেকে জানা যায়— বিকেল চারটের মধ্যে বালিগঞ্জ ময়দানের আবেষ্টনীর মধ্যে পুরো পাঁচ হাজার লোকের ভিড় জমেছিল। আর বাইরে দর্শকদের সংখ্যা লক্ষ পেরিয়েছিল। সম্ভ্রান্ত মানুষ বহু ছিলেন, ছিলেন ভাইসরয় এবং তাঁর পার্টি। বেলা দুটো থেকে গ্যাস ভরা শুরু হয় কিন্তু বেলুন আর কিছুতেই ফুলতে চায় না। বেলুন ছাড়ার সময় সাড়ে পাঁচটা বাজল, তখনও সেটার অবস্থা জেলি ফিশের মতো। নির্দিষ্ট আকার হীন। সোয়া ছ’টায় ব্যালাস্ট [বালির বস্তা] ফেলে বেলুন খোলা হলো, মাঝ আকাশে কিছু আকর্ষণীয় হেলাদোলা দেখল লোকে, কিন্তু নভশ্চর তাঁর অভিযানে যেতে পারলেন না।

এই ঘটনায় ব্যর্থ হয়ে স্পেনসার দায়ী করলেন ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানিকে। বললেন, গ্যাস লাইন ঠিক না থাকার জন্য উপযুক্ত প্রেসার সৃষ্টি হয়নি— এই কারণেই তিনি উড়তে পারেননি। 

এর প্রতিবাদ জানিয়ে গ্যাস কোম্পানির ম্যানেজার ডি. কোটস নিভেন ‘স্টেটসম্যান’-এ এক চিঠিতে বললেন— স্পেনসারকে আগে ট্রায়াল দিয়ে দেখে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা শোনেননি। ওই চিঠিতে তিনি প্রস্তাব দিলেন, তিনি স্পেনসারকে ব্যক্তিগতভাবে ২০০০ টাকা  এবং বিনামূল্যে গ্যাস সরবরাহ করবেন। পরিবর্তে ওই একই জায়গা থেকে স্পেনসারকে গগনবিহার করতে হবে এবং আগের দিনের টিকিট ক্রেতাদের সবাইকে বিনামূল্যে ঢুকতে দিতে হবে। কিন্তু স্পেনসার এই প্রস্তাবে বিশেষ আগ্রহ দেখাননি।

স্পেনসার পরবর্তী অনুষ্ঠানের দিন ধার্য করলেন ৭ মার্চ। ঘোষণা করলেন, ঐ দিন তিনি দু’জনকে সঙ্গে নেবেন। কিন্তু ইচ্ছুক ব্যক্তিকে ১,০০০ টাকা দিতে হবে।

পরে অনুষ্ঠানের দিন পিছিয়ে ১৯ মার্চ করা হয়। কলকাতা রেসকোর্স ময়দান থেকে বেলা পাঁচটা তিরিশে-এ যাত্রা শুরু হবে। সংবাদপত্রে জানা গেল, অনুষ্ঠানে লর্ড এবং লেডি ল্যান্সডাউন উপস্থিত থাকবেন। ১৯ মার্চ, মঙ্গলবার রেসকোর্স ময়দানে স্পেনসার বেলুনে উড়ানের তোড়জোর শুরু করেন। এবার রেসকোর্সে সালফিউরিক অ্যাসিড এবং জিঙ্ক দিয়ে, নিজে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন স্পেনসার। হাইড্রোজেন ভরতি বেলুনে চড়ে স্পেনসার অদৃশ্য হয়ে গেলেন। যখন অনেকক্ষণ পরও স্পেনসার ফিরলেন না, চিন্তার সঙ্গে শুরু হল গুজব। স্পেনসারের সন্ধানে চারিদিকে লোক পাঠানো হয়, থানাগুলিকেও সতর্ক করে দেওয়া হয়। স্বয়ং লাটসাহেব উদ্বিগ্ন হয়ে পুলিশ কমিশনারকে ভালভাবে খোঁজ করার নির্দেশ দিলেন। গুজব শোনা গেল তিনি পোর্ট ক্যানিঙে নেমেছেন, তারপর শোনা গেল, সুন্দরবনের কাছে। কেউ বলে, কাঁচড়াপাড়ায়। বিস্ফোরণের আশঙ্কা করল কেউ-কেউ। সকলেরই জিজ্ঞাসা সাহেবের হল কী?

২১ মার্চের ‘স্টেটসম্যান’ লিখল— ‘এই দুঃসাহসের প্রশংসা না করে যদিও উপায় নেই তবু এর পরিণতি যে প্রাণঘাতী ছাড়া আর কিছু হতে পারে তেমন আশা আমাদের ছিল না এবং নিশ্চয় ঘটেওছে তাই।’

কিন্তু সব উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে ২১ মার্চ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বসিরহাটের এস ডি ও, ত্রৈলোক্যনাথ সেন খবর পাঠান— স্পেনসার হাসনাবাদে অবতরণ করেছেন এবং তিনি সুস্থ আছেন।

‘স্টেটসম্যান’ এর প্রতিনিধি স্পেনসারের সঙ্গে দেখা করে লেখেন— ‘The missing aeronaut safe, Mr. Spencer, safe and sound stranded in the Sunderbans arrived in Calcutta today.’

আসলে স্পেনসারের অবতরণের খবর ২২ তারিখের আগে কলকাতায় পৌঁছয়নি। তার অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়— মঙ্গলবার তিনি সন্ধ্যা ৭-৩০ মিনিটে সুন্দরবনের বাস্তুলিয়াবাদে নিরাপদে অবতরণ করেন, নামার সময়ে বেলুনটির সামান্য ক্ষতি হয়। ভীত গ্রামবাসীদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একটি বাড়ির দাওয়ায় রাত কাটিয়ে, পরেরদিন অনেক কষ্টে একটি নৌকো জোগাড় করে হাসনাবাদ থানায় আসেন, এবং সাব ইন্সপেক্টর আব্দুল রহিম-এর সাহায্যে এক রাত কাটাবার পর তিনি বসিরহাটের এস ডি ও-কে ঘটনা জানিয়ে একটি চিঠি পাঠান। পরে বসিরহাটের এস ডি ও ত্রৈলোক্যনাথ সেনের সঙ্গে দেখা করলে, তিনি কলকাতায় খবর পাঠিয়ে দেন এবং সেখানে ফেরার সব ব্যবস্থা করে দেন। বসিরহাট থেকে বারাসত পর্যন্ত গাড়িতে এবং সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতা। সব উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে তিনি আবার গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে ফিরে আসেন।

স্পেনসারের ফিরতেই, অজস্র লোক তাঁকে দেখতে আসে। জানা যায়, শুক্রবার কমপক্ষে হাজার ছয়েক লোক হোটেলে স্পেনসারের সঙ্গে দেখা করে। ওইদিন বিকেলে টাউন হলে স্পেনসার তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। আর এই নিরাপদে প্রত্যাবর্তনের জন্য পরদিন তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়। সাহেব থেকে বাঙালি— গণ্যমান্য ব্যক্তিত্বরা তাঁকে উপহার এবং অভিবাদনে মুড়ে দেয়।পাশাপাশি বেঙ্গল থিয়েটর কর্তৃপক্ষ সংবর্ধনা জানায় তাঁকে। জনৈক এস পি দে, স্পেনসারকে উদ্দেশ্য করে একটি দীর্ঘ কবিতা লেখেন—

‘…Riding for full two hours on high

Spencer has landed Safe, we hear

He is a Pilot in the sky

So we give him a hearty cheer.’

স্পেনসারের কীর্তির ‘বাণিজ্যিকীকরণ’-এর দৌলতে অর্থাগম হয় বেশকিছুজনের। কেউ তাঁর ছবি বিক্রি করে। আবার বটতলার পুস্তক ব্যবসায়ীরা ‘উড়ল বেলুন গড়ের মাঠে। পড়ল বেলুন বসিরহাটে’-এই নামে এক পয়সার বই ছাপিয়ে বেশ কিছু অতিরিক্ত উপার্জন করলেন। 

সাফল্যের সঙ্গে বিতর্কও হল কিছু। বিষয় স্পেনসার  ঠিক কতটা উঠেছিলেন। তবে স্পেনসার সাহেবের অনুরাগীদের স্বরে সেইসব চাপা পড়ে গেল। 

এমন সময়ে দুই বাঙালি যুবক শরণাপন্ন হলেন স্পেনসার সাহেবের। অবতারচন্দ্র লাহা এবং অনিলচন্দ্র ব্যানার্জি। অবতারচন্দ্র লাহার সঙ্গে স্পেনসারের সাক্ষাৎ টাউন হলে [ডালহৌসি ইন্সটিটিউটে], যেখানে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত বেলুনটি সারাতে এসেছিলেন। সরাসরি তিনি ‘বেলুনিং’ শিখতে চান সাহেবের থেকে। আর একই উদ্দেশ্যে অনিলচন্দ্র ব্যানার্জি একটি পত্রিকায় সাহেবের উদ্দেশ্যে লেখেন এক খোলা চিঠি। কিন্তু এদের কারোর ইচ্ছেই পূরণ হয়নি। কিন্তু এই স্বদেশি ইচ্ছার সেতুবন্ধন করলেন রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যার হাতেখড়ি হয়েছিল এই স্পেনসারের কাছেই। তবে উল্লেখ্য, অবতারচন্দ্র লাহাই রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বেলুনিং’-এর প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং স্পেনসার সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। (ক্রমশ)

তথ্য ঋণ এবং কৃতজ্ঞতা
‘দেশ’ পত্রিকা ১৯৮৯—সিদ্ধার্থ ঘোষ এবং স্বপন বসু—উড়ল বেলুন গড়ের মাঠে।
‘কলের শহর কলকাতা’—সিদ্ধার্থ ঘোষ
‘কলিকাতার কাহিনী’—সুকুমার সেন
‘দ্য টেলিগ্রাফ’
‘বেঙ্গল হরকরা’, ১৮৫০-১৮৫১
‘ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া’, ১৮৩৬-৭, ১৮৪৯-৫০
‘দ্য ইংলিশম্যান’, ১৮৮৯-৯২
‘দ্য বেঙ্গলি’, ১৮৮৯-৯২
‘অমৃতবাজার পত্রিকা’, ১৮৮৯-৯২
‘স্ক্র্যাপ্স ফ্রম মাই ডায়েরি’—মেজর হ্যারি হব।
একশো কবির কলকাতা’— অমিতাভ চৌধুরী সরল দে।