স্মার্টফোনের পর্দায় যখন অবিরাম নোটিফিকেশনের শব্দ আছড়ে পড়ে, যখন অ্যালগরিদমের অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা খবরের স্রোত আমাদের স্নায়ুকে প্রতি মুহূর্তে উত্তেজিত করে তোলে, তখন একশো বছরেরও বেশি পুরনো একটি দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন। দৃশ্যটি দক্ষিণ আফ্রিকার ফিনিক্স আশ্রমের। একটি ছাপার যন্ত্র, যার নাম ট্রেডল প্রেস, তা চালানোর জন্য জনাকয়েক মানুষ পালা করে ঘাম ঝরাচ্ছেন। তেলের ইঞ্জিনটি হঠাৎ বিকল হয়ে গেছে, অথচ সকালেই পত্রিকার নতুন সংখ্যাটি পাঠকদের হাতে তুলে দিতে হবে। উপায়ান্তর না দেখে বছর পঁয়ত্রিশের এক তরুণ ব্যারিস্টার তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে নিজেই সেই ট্রেডল প্রেসের ভারী চাকা হাতে ঘোরাতে শুরু করলেন। সারারাত হাড়ভাঙা খাটুনির পর ভোরের আলো যখন ফুটল, তখন নির্দিষ্ট সময়েই পত্রিকা প্রস্তুত। কালির দাগ আর ঘামে মাখামাখি সেই সম্পাদকের নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
ইতিহাসের পাতায় তাঁকে আমরা মূলত এক অতিকায় রাজনৈতিক নেতা, অহিংস আন্দোলনের প্রবক্তা বা ‘মহাত্মা’ হিসেবেই চিনে থাকি। কিন্তু এই সুবিশাল পরিচয়ের আড়ালে প্রায়শই ঢাকা পড়ে যায় তাঁর অন্য একটি সত্তা— এক আপসহীন, দূরদর্শী এবং প্রবলভাবে পেশাদার পত্রিকা সম্পাদকের সত্তা। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে নিছক খবর পরিবেশন বা জীবিকা অর্জনের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল একাধারে রাজনৈতিক শিক্ষা, সমাজ-সংস্কার এবং জনমত গঠনের সবচেয়ে ধারালো অথচ অহিংস হাতিয়ার। আজকের দিনে, যখন সংবাদমাধ্যম মূলত কর্পোরেট পুঁজি, অ্যালগরিদম এবং নিরন্তর মনোযোগ আকর্ষণের দৌড়ে হাঁসফাঁস করছে, তখন চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গান্ধীর এই সম্পাদনা ও প্রকাশনার ইতিহাস কেবল অতীত রোমন্থন নয়। এটি আসলে সংবাদমাধ্যমের সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে এমন কিছু মৌলিক প্রশ্ন উসকে দেয়, যা ২০২৬ সালের ডিজিটাল-সর্বস্ব ভারতের বুকেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
আরও পড়ুন: গান্ধী ও একটি প্রশ্ন! লিখছেন কবীর চট্টোপাধ্যায়…

পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে গান্ধীর আত্মপ্রকাশ ঘটে দক্ষিণ আফ্রিকায়। যদিও এর আগে লন্ডনে থাকাকালীন ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ পত্রিকায় তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন এবং ভারতে এসে ‘গ্রিন প্যামফ্লেট’ প্রকাশের মাধ্যমে প্রচারের শক্তি অনুধাবন করেছেন— তবু, তাঁর প্রকৃত সাংবাদিক রূপটি ফুটে ওঠে ১৯০৩ সালে। মদনজিৎ ব্যবহারিক এবং মনসুখলাল নাজারের উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন’ পত্রিকাটির দায়িত্ব খুব দ্রুতই নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি। একটি অভিবাসী সম্প্রদায়ের মুখপত্র হিসেবে এর কাজ ছিল দ্বিমুখী। প্রথমত, শ্বেতাঙ্গ শাসকদের কাছে ভারতীয়দের বঞ্চনা ও দাবিদাওয়াগুলি যুক্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরা। দ্বিতীয়ত, এবং আরও তাৎপর্যপূর্ণভাবে, দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী তামিল, গুজরাটি, হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত ভারতীয়কে একটি ছাতার তলায় নিয়ে আসা এবং তাদের নিজেদের ত্রুটিবিচ্যুতি সম্পর্কে সচেতন করা। এই কারণেই শুরুতে ইংরেজি, গুজরাটি, হিন্দি এবং তামিল— এই চারটি ভাষায় পত্রিকাটির প্রকাশ শুরু হয়। গান্ধীর কাছে এই পত্রিকা ছিল সত্যাগ্রহের সমার্থক। তাঁর আত্মজীবনীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ‘ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন’ ছাড়া সত্যাগ্রহ হয়তো অসম্ভবই হত।
এই পর্বেই তাঁর মধ্যে তৈরি হচ্ছিল সাংবাদিকতার এক নিজস্ব নীতিবোধ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ‘সাংবাদিকতার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত জনসেবা। সংবাদপত্র এক প্রবল শক্তি, কিন্তু শৃঙ্খলমুক্ত জলোচ্ছ্বাস যেমন গোটা গ্রাম ভাসিয়ে দেয় ও ফসল নষ্ট করে, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন কলমও কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে।’ (উৎস: ‘মহাত্মা গান্ধী: দ্য জার্নালিস্ট’)
গান্ধীর সাংবাদিকতার অন্যতম বৈপ্লবিক দিক ছিল এর অর্থনৈতিক মডেল। ‘ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন’ চালানোর সময় তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীলতা পত্রিকার স্বাধীনতাকে খর্ব করে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি একসময় সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞাপন বর্জনের নীতি গ্রহণ করেন। তাঁর স্পষ্ট বিশ্বাস ছিল, যে পত্রিকা বিজ্ঞাপনের টাকায় চলে, সে কখনও স্বাধীনভাবে সত্য প্রকাশ করতে পারে না। তিনি মনে করতেন, ক্ষতিকারক বা চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সমাজের কোনও মঙ্গল হতে পারে না; এটি একধরনের পরোক্ষ ও অন্যায্য কর আদায়, যা সাধারণ মানুষকে অযাচিত পণ্য কিনতে বাধ্য করে— ‘আমার বিনীত মতে, জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্রকে ব্যবহার করা অনুচিত। যখন সংবাদপত্রকে নিছক মুনাফা লাভের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়, তখন তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হয় মারাত্মক দুর্নীতি।’ (উৎস: ‘মহাত্মা গান্ধী: দ্য জার্নালিস্ট’)



কর্পোরেট পুঁজির যুগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দিকে তাকালে গান্ধীর সেই আশঙ্কার এক নির্মম বাস্তব রূপ আমরা দেখতে পাই। বর্তমান মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞাপন এবং স্পনসরশিপের ওপর নির্ভরশীল। ক্রস-ওনারশিপ বা মালিকানার বিপুল কেন্দ্রীকরণের ফলে টেলিভিশন ও খবরের কাগজ আজ ক্রমশ গুটিকয়েক বড় কর্পোরেট পরিবারের কুক্ষিগত। ফলে, সম্পাদকীয় স্বাধীনতার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যালান্স শিটের মুনাফা। সম্পাদক ও মালিকপক্ষের এই নীরব দ্বন্দ্বে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর আজ সংকুচিত, যেখানে খবরের পাতায় জায়গা করে নিচ্ছে ‘পেইড নিউজ’ বা বিজ্ঞাপনী মোড়কে ঢাকা খবর।
ভারতে ফিরে আসার পর, বিশেষত রাওলাট আইন-বিরোধী আন্দোলন এবং জালিয়ানওয়ালাবাগের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর, গান্ধীর সাংবাদিকতা এক নতুন মোড় নেয়। ১৯১৯ সালে তিনি প্রায় একই সঙ্গে ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ এবং গুজরাটি ‘নবজীবন’-এর সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়পর্বে গান্ধী সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক শিক্ষার উন্মুক্ত ক্লাসরুম হিসেবে। অসহযোগ আন্দোলন, বয়কট, স্বদেশী এবং খাদি— এই সমস্ত কর্মসূচির অন্তর্নিহিত দর্শন তিনি দিনের পর দিন নিজের পত্রিকার পাতায় ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর সাংবাদিকতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ভাষার পরিমিতি ও সারল্য। সে-যুগে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বা অরবিন্দ ঘোষের মতো নেতাদের ইংরেজি ছিল অত্যন্ত অলংকৃত এবং বিদ্বজ্জনোচিত। বিপরীতে, গান্ধীর ভাষা ছিল বাহুল্যবর্জিত, তীক্ষ্ণ এবং সোজাসাপটা। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর তাগিদেই তিনি দেশীয় ভাষার ওপর জোর দেন। একটা সময়ে ‘নবজীবন’ এবং ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’-র প্রচারসংখ্যা সে-যুগের নিরিখে অভাবনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
খবরের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সম্পাদক গান্ধীর নীতি ছিল আপসহীন। সাংবাদিকতার নামে কোনওরকম অনুমাননির্ভর খবর বা ‘কাইট-ফ্লাইং’-এর তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। বিন্দুমাত্র সংশয় থাকলে তিনি খবর ছাপতেন না, প্রয়োজনে অপেক্ষা করতেন। একবার এক অনভিপ্রেত গুজব ছড়ানোর প্রেক্ষিতে তিনি চরম ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছিলেন, ‘সংবাদপত্রকর্মীরা যেন এক চলন্ত মহামারীতে পরিণত হয়েছে, যারা প্রতিনিয়ত মিথ্যা ও কলঙ্ক ছড়াচ্ছে।’ এই কথাটি আজকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে কতটা প্রাসঙ্গিক, ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। এখন ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেলে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সবার আগে ‘ব্রেকিং নিউজ’ দেওয়ার যে ইঁদুরদৌড় চলছে, তাতে খবরের সত্যতার চেয়ে গতির কদর বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা এআই-চালিত সিন্থেটিক মিডিয়া ও ডিপফেক প্রযুক্তির দাপট। যাচাই না করা ভুল তথ্য বা ‘মিসইনফরমেশন’ এখন ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, যা নিমেষে দাঙ্গা বা গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটাতে সক্ষম। গতির নেশায় উন্মত্ত আজকের সাংবাদিকতায় গান্ধীর সেই ধৈর্য ও বস্তুনিষ্ঠার বড় অভাব।

অনেক ক্ষেত্রেই আমরা টিভি মিডিয়াতে দেখতে পাই, ‘আমরা এই ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করিনি!’ গান্ধী এক্ষেত্রে বলছেন, ‘It is better not to publish a report at all if it has not been found possible to verify it.’ তাঁর মতে, ‘সাংবাদিকতার প্রকৃত কাজ হল জনমানসকে শিক্ষিত করা, মানুষের মনকে প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় ধারণার স্তূপে পরিণত করা নয়।’
ভিন্নমতকে সম্মান জানানোর ক্ষেত্রেও গান্ধীর সাংবাদিকতা এক বিরল দৃষ্টান্ত। ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ বা ‘হরিজন’-এর পাতায় তিনি নিয়মিত নিজের তীব্র সমালোচকদের চিঠি প্রকাশ করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন অসহযোগ আন্দোলনের বয়কট নীতির কড়া সমালোচনা করেন, গান্ধী পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই সমালোচনা নিজের পত্রিকায় ছাপেন এবং তার যুক্তিপূর্ণ উত্তর দেন। এমনকী, কোহাট দাঙ্গার পর ঘনিষ্ঠতম রাজনৈতিক মিত্র শওকত আলীর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি তা গোপন করেননি, বরং তা অকপটে প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, এটি পারস্পরিক সহনশীলতার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অথচ আজকের অ্যালগরিদম-চালিত ডিজিটাল পরিসরে আমরা কেবল নিজেদের পছন্দের মতামতেরই প্রতিধ্বনি শুনতে চাই। বর্তমানের টেলিভিশন স্টুডিওগুলি পরিণত হয়েছে এক একটি ‘ইকো-চেম্বার’ বা প্রতিধ্বনি-কক্ষে, যেখানে ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করার বদলে চিৎকার করে থামিয়ে দেওয়া হয়। বহুত্বের এই সংকটের যুগে গান্ধীর সেই সহনশীল ও গণতান্ত্রিক বিতর্কের সংস্কৃতি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
সত্যের প্রতি এই নিরঙ্কুশ দায়বদ্ধতা মিডিয়া ট্রায়ালের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য। গান্ধীর লেখায় কোনও ব্যক্তি-বিদ্বেষ ছিল না, তিনি সমালোচনা করতেন ব্যবস্থার। ভুল হলে তা অকপটে স্বীকার করার সাহস তাঁর ছিল। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় গ্লেনকোর ঘটনার সঙ্গে ভুল তুলনা টানায় তিনি পরের সংখ্যাতেই তা সংশোধন করে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান ভারতীয় টেলিভিশন এবং ডিজিটাল সাংবাদিকতায় ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ এক নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুশান্ত সিং রাজপুত বা আরুষি তলোয়ারের মামলার মতো ঘটনাগুলি থেকে শুরু করে সমকালের অসংখ্য হাই-প্রোফাইল কেসে দেখা গেছে, আদালত রায় দেওয়ার আগেই স্টুডিওতে বসে বা ইউটিউবের ভিডিওতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করে দেওয়া হচ্ছে। এই আক্রমণাত্মক, টিআরপি-সর্বস্ব সাংবাদিকতা সমাজের বিচারবোধকে ভোঁতা করে দিচ্ছে।


তবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে রাষ্ট্রের তরফ থেকে। রাওলাট আইন বা ১৯১০ সালের প্রেস অ্যাক্টের মতো কালাকানুনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গান্ধী নিজস্ব পথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তিনের দশকের শুরুতে আইন অমান্য আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার পর, সমাজ-সংস্কারের লক্ষ্যে তিনি প্রকাশ করেন ‘হরিজন’ পত্রিকা। রাষ্ট্র যখন পত্রিকার গলা টিপে ধরে, তখন গান্ধীর প্রতিরোধ আজও আমাদের ভাবায়। ১৯৪০ সালে ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ চলাকালীন ব্রিটিশ সরকার যখন ‘হরিজন’-এর ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করে, তখন সরকারের কাছে মাথা নত না করে তিনি পত্রিকার প্রকাশনা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, ‘প্রত্যেকে নিজেই এক একটি চলন্ত খবরের কাগজে পরিণত হও এবং মুখে মুখে সত্য খবর ছড়িয়ে দাও।’ সেন্সরশিপের মুখে খবরের প্রবাহ অক্ষুণ্ণ রাখার এই বিকেন্দ্রীকৃত অহিংস মডেলই আজকের ‘সিটিজেন জার্নালিজম’-এর এক ঐতিহাসিক পূর্বাভাস।
আজ স্বাধীন ভারতেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার চিত্রটি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ (RSF)-এর ২০২৬ সালের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৫৭। ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আজ যে কেউ খবর সম্প্রচার করতে পারেন ঠিকই, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বা প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনার কথা তুলে ধরতে গিয়ে স্বাধীন ও মফসসলের সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত স্থানীয় মাফিয়া বা প্রভাবশালীদের রোষের মুখে পড়তে হচ্ছে। কখনও বা ভিন্নমত দমনে জাতীয় নিরাপত্তা আইন বা ইউএপিএ-এর (UAPA) মতো কঠোর আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, ‘সিটিজেন জার্নালিজম’-এর নামে যাচাই-বিহীন তথ্যের যে বন্যা বইছে, তা গান্ধীর আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। গান্ধীর ‘চলন্ত সংবাদপত্র’ হওয়ার আহ্বানের মূলে ছিল এক কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, যা আজকের উদ্দেশ্যহীন ভাইরাল কালচারে প্রায় অনুপস্থিত।
আজকের এই ‘পোস্ট-ট্রুথ’ যুগে দাঁড়িয়ে আমরা গান্ধীর প্রযুক্তি বা তাঁর বিজ্ঞাপন-বর্জনের সম্পূর্ণ মডেলটিকে হয়তো হুবহু ডিজিটাল নিউজরুমে ফিরিয়ে আনতে পারব না। আজ সাংবাদিকদের টিকে থাকার জন্য অ্যালগরিদম, এসইও (SEO), এবং সাবস্ক্রিপশন মডেলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। কিন্তু একজন সম্পাদক হিসেবে তাঁর মৌলিকত্ব ছিল এই যে, তিনি সাংবাদিকতাকে কোনো ‘প্রোডাক্ট’ বা পণ্য হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে এটি ছিল এক নৈতিক দায়িত্ব এবং পাঠকের প্রতি এক পবিত্র চুক্তি। তাই, খবরের এই বিপুল পণ্যমুখী চিৎকৃত কোলাহলের মাঝে সাংবাদিক গান্ধীর সেই দায়বদ্ধ নৈঃশব্দ্যের পাঠ আজ আমাদের বড় বেশি প্রয়োজন— ‘এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন একজন সাংবাদিক তাঁর নীরবতার মাধ্যমেই পেশার প্রতি সবচেয়ে বড় সুবিচার করতে পারেন।’ (উৎস: ‘মহাত্মা গান্ধী: দ্য জার্নালিস্ট’)


