শচীন দেব বর্মণের সংগীতের বিশালত্বর নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। তবে খুব সহজভাবে ভাবলে, শচীন দেব বর্মণের গানকে দু’দিক থেকে দেখা যায়। এক, তিনি নিজে যখন গান করেন, ও দ্বিতীয়, যখন গানে তিনি সুর দেন। সুরস্রষ্টা শচীনকত্তার কাজের দিকে তাকালে দেখতে পাই, বাংলার যে চিরন্তন সংগীত, বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের লোকগান, পূর্ববাংলার লোকগান বিশেষত, এবং কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান নিয়ে তাঁর এত স্পষ্ট ধারণা, যে তাঁর সংগীতের মধ্যে সেইসব ধারাগুলো প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। তাঁর সংগীতে আশ্চর্য উদারতা রয়েছে, যা বিস্তীর্ণ হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে।
শচীন দেব বর্মণ যে ছোট-ছোট ‘স্টেকাটো’ (অর্থাৎ মাঝে সামান্য বিরতি দিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্যের খণ্ড খণ্ড নোট) নোট ব্যবহার করছেন, তা অসম্ভব আনন্দমুখর, উজ্জ্বল একঝাঁক স্বরলিপির মতো। কোনওকিছু না ভেবেই সেই সুরকে ভালবাসা যায়। সেই সুর, সেই গানের উদারতাটা রয়েছে এমনভাবেই, যেন মনে হয়, এই সুর আবহমানকাল ধরে, বহু, বহু বছর ধরে পৃথিবীর বুকে রয়ে গেছে। শুধু তা যেন কারও খুঁজে পাওয়া, কারও আবিষ্কারের অপেক্ষায় ছিল।

সলিল চৌধুরীর গান ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস! পড়ুন মৈনাক বিশ্বাসের সাক্ষাৎকার…
১৯৬৫ সালের কালজয়ী ছবি ‘গাইড’। দেব আনন্দ-ওয়াহিদা রহমান অভিনীত সেই ছবিতে সুরকার শচীন দেব বর্মণ একটি গান তৈরি করেছিলেন— ‘আজ ফির জিনে কি তামান্না হ্যায়’। বোঝা যায়, পরিচালক বিজয় আনন্দ হয়তো চেয়েছিলেন, গানটি তার অন্তরা থেকে শুরু হয়ে মুখরায় ফিরে আসবে, তাই গানের চলনটি তেমনই। এই সমগ্র গানটার সুরের কাঠামোটা খেয়াল করলে দেখা যাবে, বিশেষ করে ‘কাঁটো সে খিঁচ কে এ আঁচল/ প্যায়রো কে বন্ধন বাঁধি পায়েল’, এই অংশটুকুর দিকে তাকালেই যে চলনটা পাওয়া যায়— তার আভাস ইতিপূর্বে হিন্দি গানে ছিল না। পূর্ব ভারত থেকেই তা গিয়ে পৌঁছেছে সাগরপাড়ের শহরে, শচীনকত্তার সূত্রেই। এই সুর তিনি যখন চলচ্চিত্রের জন্য বাঁধছেন, তখন তো নিশ্চয়ই তিনি সচেতন হয়ে তা করেছেন! অথচ, এই আবহমানের সুর তো তাঁর অবচেতনেও বসত গড়ে বসে আছে। এই ভাবনাটা আমায় আরও আশ্চর্য করে।
দেব আনন্দের প্রযোজনা সংস্থা ‘নভকেতন ফিল্মস’ তাঁকে যেভাবে ব্যবহার করেছিল, তাও অকল্পনীয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তাদের প্রযোজনার প্রতিটি ছবিতে শচীন দেব বর্মণের নিজস্ব কণ্ঠে একটি করে গান থাকবে। এই সিদ্ধান্তই শচীন দেব বর্মণের সুরকে ভারতজুড়ে জায়গা করে দিয়েছিল। এমনকী, জানা যায়, শচীন দেব বর্মণের অসুস্থতার জন্য পিছিয়ে গিয়েছিল ‘গাইড’-এর কাজ, এতটাই অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন শচীন দেব বর্মণ।
আমার অবাক লাগে ভাবলে, পাঞ্জাবি, হিন্দি, উর্দু-ঘেঁষা এক সংগীত-দুনিয়ায় বাংলার সুরগুলো শচীন দেব বর্মণ কী অবলীলায়, কী স্মার্টনেসের সঙ্গে ব্যবহার করে গেলেন! শচীন দেব বর্মণের কোনও গান যদি কারও কাছে অশ্রুতও থাকে, তাও সে সেই গানকে অন্য কোনও সুরকারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবে না। বিস্মিত হতে হয় ভাবলে, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালির সুরকে শচীন দেব বর্মণ ব্যবহার করছেন এতটা পপুলিস্ট, এতটা জনপ্রিয় মাধ্যমে, যেখানে ছবির গান হিট হতেই হবে। ধরা যাক, ‘আরাধনা’-র গান যখন তৈরি করছেন, যেসব গান রীতিমতো জনপ্রিয় আজও, সেই গানে বাংলার সুরকে কী অপূর্ব নৈপুণ্যে নিয়ে আসছেন শচীন দেব বর্মণ!
শচীন দেব বর্মণের গায়কী অনন্য তো বটেই, কিন্তু তার ভিত শচীন দেব বর্মণের ধ্রুপদি সংগীতশিক্ষার ওপরেই প্রতিষ্ঠিত। অথচ, সেই শচীন দেব বর্মণের গান এখানকার গ্রামোফোন কোম্পানি কিন্তু প্রাথমিকভাবে রেকর্ড করতে চায়নি। কারণ, তাঁর নাসিকাপ্রধান কণ্ঠস্বর। কিন্তু বাংলার বাইরে তাঁর গান অবধারিত হয়ে উঠল। অথচ, শচীন দেব বর্মণ ভাল হিন্দি জানতেন না, কিন্তু তাঁর ওই সুরে শৈলেন্দ্রর মতো গীতিকাররা, মজরুহ সুলতানপুরীর মতো গীতিকাররা অপূর্ব সব লিরিক ব্যবহার করেছেন। এখানে হৃষীকেশ মুখার্জি থেকে দেব আনন্দ বা গুরু দত্তদের অবদানটাও তাই মনে রাখার মতো। তাঁদের শচীন দেব বর্মণের ব্যবহার করার মেধা ছিল বলেই শচীন দেব বর্মণকে আমরা এইভাবে পেয়েছি।
শচীনকত্তার সুর শুনলে মনে হয়, চিরায়ত ওইসব সুর যেন তাঁরই অপেক্ষায় বসেছিল। সুরের ভাষা, সীমানা যে হয় না, তার প্রমাণ আসলে সারাজীবন দিয়ে গেছেন শচীন দেব বর্মণ।




