রহস্যের অন্য ধারা

Keigo Higashino Obituary

জাপান বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে, অ্যাভিনিউয়ের দু’ধার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা চেরি ব্লসমের গাছ, ফুজি পাহাড়ের বরফস্নাত চূড়া, ছিমছাম শহরের বুক চিরে ছুটে যাওয়া ট্রেন, আর ঝকঝকে, ঝলমলে শহরের সারি। 

ছবি, পোস্টকার্ডের বাইরে গিয়ে অবশ্য এক অন্য জাপানের সঙ্গে পরিচিতি হয় কেইগো হিগাশিনোর রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসের জগতে প্রবেশ করলে। যেখানে শহুরে ঘিঞ্জি এলাকায় ঠাসাঠাসি বসবাস, গলির কোনায় ছোট্ট ক্যাফে, রোজকার না-পরিষ্কার হওয়া গলি, ফ্ল্যাটের ইএমআই-এ আবদ্ধ রোজনামচা— মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাপনের দিনলিপি। স্বভাবে নিভৃতচারী, মুখচোরা হিগাশিনো জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটিয়েছেন লোকচক্ষুর আড়ালে। তাঁর একের পর এক গল্প ‘বেস্টসেলার’ হয়ে জাপান ও তার বাইরে সারা বিশ্বে হইচই ফেলে দিলেও, তিনি এই নিয়ে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেননি কোনওদিনই। শুধু চেয়েছেন, তাঁর প্রতিটা সৃষ্টিতে পাঠকেরা যেন নতুন করে চমকে ওঠার রসদ খুঁজে পায়। 

আরও পড়ুন: ফ্রানৎস কাফকার সাহিত্য কি আদতে হরর? লিখছেন শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য…

মাত্র ৬৮ বছর বয়সে কলোরেক্টাল ক্যান্সারে ভুগে মারা গেলেন জাপানের বিখ্যাত রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক কেইগো হিগাশিনো।অবশ্য কেবল জাপানের নয়, আরও বিভিন্ন দেশের অন্যতম সেরা রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক হিসেবেও তিনি খ্যাত। তাঁর লেখা মোট ১০৬টি বইয়ের কয়েকটি ইংরেজির সঙ্গে সঙ্গে, প্রায় ৪০টি ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— থাই, চাইনিজ, ফ্রেঞ্চ ও কোরিয়ান। চিরাচরিত জাপানি রহস্য-রোমাঞ্চ, যেখানে যুক্তির ভার অনেক বেশি, তার বাইরে গিয়ে মানসিক চেতনা ও আবেগের ওপর ভর করে তাঁর গল্পগুলোকে বুনেছিলেন হিগাশিনো।

পাঠক থ্রিলার বলতে যেখানে গতানুগতিক ‘হু ডান ইট’ বোঝে, সেই ভাবনার বাইরে গিয়ে ‘হোয়াই ডান ইট’-এর মাধ্যমে রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসের এক নতুন দিক পেশ করেছিলেন তাদের দরবারে— আর সেইখানেই লেখা হয়ে গিয়েছিল কিইগো হিগাশিনোর সাফল্যের গল্পটুকু। তাঁর লেখা অনেক সময়েই একরৈখিক হয়ে থাকেনি। অপরাধ আর অপরাধীর বাইরে গিয়েও, অপরাধের কারণ, অপরাধীর মানসিক অবস্থান, ভুক্তভুগীর পরিবার, অপরাধীর কাছের মানুষজন এবং তাদের মানসিক পরিস্থিতি— এই সবটাই স্থান পেয়েছে হিগাশিনো-র বেশিরভাগ কাহিনিতে। আবার সেই সঙ্গে কোনও কোনও গল্পে অপরাধের কিনারা করতে নামা গোয়েন্দার চিন্তাভাবনার সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ করিয়েছেন পাঠকের। তাঁর লেখা রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস বা গল্প কেবল রহস্য আর রোমাঞ্চের রসদ হয়েই থেকে যায়নি। হয়ে উঠেছে সেই সময়ের জাপানের কোনও শহরের এবং কোনও এক সমাজস্তরের বাস্তব চিত্র, যার সঙ্গে বেঁচে থাকার রাজনীতি ওতপ্রোত জড়িত। 

ওসাকায় জন্ম, ১৯৫৮ সালে। ছোট থেকে লেখালিখির অভ্যেস থাকলেও হিগাশিনো-র পড়াশোনা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে, ওসাকা এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর ইঞ্জিনিয়র হিসেবেই চাকরিতে যোগ দেন, নিপ্পন ডেনসো-তে। তবে চাকরির সঙ্গে সঙ্গে সপ্তাহান্তে লেখালিখির অভ্যেস ছাড়তে পারেননি কোনওদিনই। ১৯৮৫ সালে ‘হোকাগো’ (আফটার স্কুল) উপন্যাসের জন্য জাপানে রহস্যকাহিনির জন্য সেরা ‘এডোগাওয়া রাম্পো’ পুরস্কার পান। আর এরপরেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন কেবল লেখালিখিকেই প্রাধান্য দেওয়ার। চাকরি ছেড়ে টোকিও চলে আসেন, এবং রহস্য-কাহিনি লেখায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন।

সাফল্য ও জনপ্রিয়তা অবশ্য আসেনি সঙ্গে সঙ্গেই। বলা চলে, ২০০৫ সালে ‘দ্য ডিভোশন অফ সাস্পেক্ট এক্স’ (ইয়োগিশা এক্স নো কেনশিন) প্রকাশ পাওয়ার সময় থেকে পাঠকের নজরে আসতে শুরু করেন লেখক। কিইগো হিগাশিনোর নিয়মিত পাঠকদের কাছে এটি নতুন কিছু নয় যে, তাঁর দু’টি স্বতন্ত্র গোয়েন্দা সিরিজ রয়েছে— একটিতে ডিটেকটিভ গ্যালিলিও, অন্যটিতে ডিটেকটিভ কাগা। দ্য ডিভোশন অব সাসপেক্ট এক্স একাধারে পদার্থবিদ ও ডিটেকটিভ গ্যালিলিও বা মানাবু ইউকাওয়া সিরিজের প্রথম উপন্যাস।

টানটান উত্তেজনায় ভরা থ্রিলার। গল্পের শুরুতেই একক মা ইয়াসুকো তার কিশোরী মেয়েকে প্রাক্তন নির্যাতনকারী স্বামীর হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে তাকে মেরে ফেলে। আর এখান থেকেই শুরু হয় আসল গল্প। প্রতিবেশী ইশিগামি— যে একজন অসাধারণ গণিতবিদ এর সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসুকোর নীরব অনুরাগীও বটে, সে এগিয়ে আসে মা-মেয়ের সাহায্যে। অপরাধটি এমনভাবে আড়াল করার দায়িত্ব সে নেয় যাতে ভবিষ্যতে কেউ ধরতেই না পারে, আসল অপরাধী কে।

‘হিনহনকাকু’ (নিও-অথেন্টিক) ধারার এক অনবদ্য রহস্যোপন্যাস। এখানে পাঠক শুরু থেকেই জানে কে খুনি, এবং খুনের কারণ। কিন্তু রহস্য আসলে অন্য জায়গায়। খুনি কি সত্যিই আইনের চোখ এড়িয়ে যেতে পারবে? আর সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার জন্য ইশিগামি ঠিক কতদুর যেতে রাজি? এই উপন্যাস হিগাশিনোকে এনে দেয় ২০০৫ সালে ‘নাওকি’ এবং ২০০৬ সালে ‘হোনকাকু মিস্ট্রি’ পুরস্কার। ইংরেজি-সহ আরও বেশ কিছু ভাষায় অনুবাদ হওয়ার ফলে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাড়তে থাকে তাঁর অনুরাগীর সংখ্যাও। কেবল তাই নয়, পরবর্তীকালে এই বই থেকে বিভিন্ন ভাষায় চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। লেখকের মতে অবশ্য কেবল রহস্যই নয়, রোমাঞ্চের আড়ালে যে নিখাদ ভালবাসার গল্প রয়েছে এই উপন্যাস জুড়ে— সেইটাই মূলত আকর্ষিত করেছে পাঠককে, এবং পরে ছবির মাধ্যমে দর্শককেও। (ভারতে জীতু জোসেফ পরিচালিত মালয়ালম ছবি ‘দৃশ্যম’ এই ছবি থেকে অনুপ্রাণিত এবং সুজয় ঘোষের হিন্দি ছবি ‘জানে জান’ এই উপন্যাসের সরাসরি অভিযোজন)। 

জীবন তো কেবল সাদা-কালোয় ভরা নয়, তার ধূসর সত্যগুলোকে মেনে নেওয়াটা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলির মধ্যে অন্যতম। তাই ভালবাসা হোক বা ঘৃণা, অপরাধবোধ হোক বা লজ্জা— এই আবেগের তাড়নায় মানুষ ঠিক কতদুর যেতে পারে, সেও এক চর্চার বিষয় বইকি! সারা বিশ্বের বেশিরভাগ রহস্য-রোমাঞ্চ লেখকরা যেখানে আবেগের গভীরতাকে বিসর্জন দিয়ে কেবল দ্রুতগতির কাহিনি ও সাসপেন্সের ওপর নির্ভর করেছেন, সেখানে কিইগো হিগাশিনো হেঁটেছিলেন ভিন্ন রাস্তায়। তাঁর আগ্রহ ছিল কেবল কে অপরাধী; এই প্রশ্নে নয়; বরং মানুষ কেন অপরাধী হয়ে ওঠে, সেই মানসিক ও নৈতিক জটিলতাকে অনুসন্ধান করায়। এই গভীর মানবিক অনুসন্ধান খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর লেখা ‘স্যালভেশন অফ আ সেইন্ট’, ‘ম্যালিস’, ‘নিউকামার’, ‘ইনভিসিবল ফেলিক্স’ এবং অন্যান্য রহস্য উপন্যাসেও। 

জাপানি সাহিত্য রহস্যকাহিনির প্রকৃত ধারা ‘হনকাকু’-র জন্য বরাবরই বিখ্যাত। মূলত পশ্চিমি সাহিত্যের ‘হু ডান ইট’-এর কাঠামো মাথায় রেখেই এই ধারার প্রচলন। তবে পরবর্তীকালে (১৯২০ সালের পর) জাপানি সাহিত্যিকেরা ‘হিনহনকাকু’-র মাধ্যমে রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনি লেখার ধারণাটুকু আমূল বদলে ফেলে। এই ধারায় যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের গুরুত্ব অনেক বেশি। হিগাশিনো এই ধারা অনুসরণ করেই তাঁর লেখক হওয়ার যাত্রা শুরু করেন। তবে তাঁর বিশেষত্ব ছিল, এই ধারাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ না করে, তাতে এক নতুন মাত্রা নিয়ে আসার। ফলে, তাঁর গল্পে অপরাধ ও অপরাধী— দুই মজুত থাকলেও সেই সঙ্গে সমান গুরুত্বে বিচরণ করেছে সহমর্মিতা ও নৈতিক দ্বন্দ্ব। 

হিগাশিনো-সৃষ্ট ইউকাওয়া বা গোয়েন্দা গ্যালিলিও পদার্থবিদও বটে। তাই তার যে কোনও তদন্তে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ গুরুত্ব পায়। তার শীতল মাথা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের প্রতীক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে তারই আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কিওইচিরো কাগা হত্যাকাণ্ড-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তার তদন্তের ধরন গ্যালিলিওর চেয়ে অনেকটাই আলাদা। সে হেঁটে বেড়ায় টোকিওর পুরোনো, সময়ের ভারে নুয়ে পড়া অলিগলি ধরে। তার তদন্তের মূলে থাকে দোকানদার, কারখানার শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড। পুঁজিবাদের আগ্রাসনে ক্ষয়ে যাওয়া জাপানের কেন্দ্র শহরগুলির আর-এক মুখ বেড়িয়ে পড়ে সেখানে। 

হিগাশিনো-র গল্পগুলির অন্যতম অনুবাদক গিল মুরে-র কথায়, টোকিও শহর, তাঁর রহস্য-রোমাঞ্চগুলির অন্যতম চরিত্র হয়ে উঠেছে। নিহনবাশি, হামাচো— এই সব এলাকার পুরনো দোকান, ছোট এবং ছিমছাম ক্যাফে, মন্দির, সরু রাস্তা— এই সবকিছু এমন এক জাপানের চিত্র তুলে ধরে, যা নস্টালজিক লাগলেও, আসলে ভীষণভাবে বাস্তব। আর-এক অনুবাদক কেরিম ইয়াসার-এর কথায়, হিগাশিনো রহস্য-সাহিত্যকে কেবল ধাঁধা সমাধানের বিনোদন হিসেবে দেখেতে চাননি। সমাজকে অনুসন্ধানের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর রচনায় বারবার উঠে এসেছে ভাঙাচোরা পরিবার, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাএবং দুর্বল হয়ে পড়া সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। তাই তাঁর লেখা কেবল জাপান নয়, বিশ্বের বিভিন্ন সামাজিক স্তরের পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে তাঁর ‘মিরাকেলস অফ নামিয়া জেনারেল স্টোরস’ (২০১২)-এর মতো উপন্যাস মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্বগুলি তুলে ধরে। এই গল্পে কিছু অপরিচিত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসে অপ্রত্যাশিত পরামর্শদাতা, যাদের সাহায্যে তারা জীবনে নতুন পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায়। অর্থাৎ, মানুষের জীবনের রহস্যগুলিকে বিভিন্ন আঙ্গিকে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি। 

একথা সকলেরই জানা যে, কোনও লেখকই তাঁর পারিপার্শ্বিক সমাজ, পরিকাঠামো ও রাজনীতিকে অস্বীকার করতে পারেন না। হিগাশিনো নিজেও কখনও চাননি তাঁর সৃষ্টিগুলিকে অরাজনৈতিক তকমা দিতে। তাঁর রহস্য-উপন্যাস ভীষনভাবে সামাজিক এবং মানুষের মনস্তত্বের এক গভীর অনুধাবনের চেষ্টা। ফলে, বিশ্বসাহিত্যে ‘মিস্ট্রি লিটারেচার’-এর ধারায় এক অনন্য উজ্জ্বল নাম হয়ে থেকে যাবেন তিনি। 

হিগাশিনো-র গল্পগুলির অন্যতম অনুবাদক গিল মুরে-র কথায়, টোকিও শহর, তাঁর রহস্য-রোমাঞ্চগুলির অন্যতম চরিত্র হয়ে উঠেছে। নিহনবাশি, হামাচো— এই সব এলাকার পুরনো দোকান, ছোট এবং ছিমছাম ক্যাফে, মন্দির, সরু রাস্তা— এই সবকিছু এমন এক জাপানের চিত্র তুলে ধরে, যা নস্টালজিক লাগলেও, আসলে ভীষণভাবে বাস্তব। আর-এক অনুবাদক কেরিম ইয়াসার-এর কথায়, হিগাশিনো রহস্য-সাহিত্যকে কেবল ধাঁধা সমাধানের বিনোদন হিসেবে দেখেতে চাননি।

তাঁর বেশ কিছু লেখা এখনও অনুবাদ হওয়া বাকি। সারা বিশ্বের হিগাশিনো-অনুরাগীদের কাছে এটাই আপাতত তাঁদের প্রিয় লেখকের সঙ্গে নিজেদের জুড়ে রাখার একমাত্র সুতো। মৃত্যুর পর পরই ডিটেকটিভ গ্যালিলিও-র ১১তম ও লেখকের শেষ বই ‘ইটারনাল মেমরি’ (ইয়েন নো কিয়োকু) মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জাপানি অনুরাগীরা বইয়ের দোকানে ভিড় জমিয়েছে। লেখকের কলম থেমেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর প্রিয় পাঠকদের কাছে হিগাশিনোর শব্দ আজও ফুরিয়ে যায়নি।