খল রেফারির কলকাঠি
তুরিন থেকে সাও পাওলো, বুয়েনোস আইরেস থেকে কলকাতা, সেদিন ফুটবল জ্বরে থরথর করে কেঁপেছিল। ১৯৯০-এর ২৪ জুন। ব্রাজিলের আক্রমণে কোণঠাসা আর্জেন্টিনার রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে সমর্থকরা তখন প্রার্থনা করছেন, একবার জ্বলে উঠুন তাদের উপাস্য নক্ষত্র— দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। ম্যাচের ৮১ মিনিটে সাড়া দিলেন আর্জেন্তেনীয় জিনিয়াস। তুরিনের স্তেদিও দেলে আল্পি স্টেডিয়ামের সেন্টার সার্কেলে, নিজের অর্ধে একটি বল ধরে এগতে শুরু করলেন। এড়িয়ে গেলেন তাঁর ক্লাব দল, নাপোলি-র টিমমেট আলেমাও-এর ট্যাকেল। শরীরের দোলায় ছিটকে দিলেন দুঙ্গাকেও। প্রায় ৩৫-৪০ মিটার এগিয়ে ডানদিকে সামান্য বাঁক নিয়ে টেনে আনলেন, পুরো ব্রাজিলীয় ডিফেন্সকে। ডানদিকে ঝুঁকে পড়ে রিকার্ডো গোমেজ আর রিকার্ডো রোচা-র ফাঁক দিয়ে ফাইনাল পাসটি গলিয়ে দিলেন ব্রাজিল বক্সে। বলটিতে যেন লেখা ছিল, পিছন থেকে তাড়া করে আসা ক্লদিও ক্যানিজিয়ার নাম। ক্যানিজিয়া বলটি ধরে, ঠান্ডা মাথায় আগুয়ান ব্রাজিলীয় গোলকিপার ক্লদিও টাফারেলকে বৃত্তাকারে কাটিয়ে নিয়ে, জালে জড়িয়ে দিলেন! বিস্মিত সারা মাঠ!
সেদিন ব্রাজিল দাপিয়ে খেলেছিল, প্রায় নব্বই মিনিট ধরে। কারেকা-দুঙ্গা-আলেমাওদের শট বা হেড বারচারেক ক্রসবারে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। চোটের জন্য গোড়ালি ফুলে ঢোল, এই অবস্থায় মারাদোনা খেললেন ওই ন-দশ সেকেন্ড! ওই একটি ‘ডাউন দ্য মিডল’ দৌড় ও ফাইনাল পাস। যা থেকে এল ক্যানিজিয়ার গোল— আর ওই বারো-চোদ্দো সেকেন্ডের ফসলই আর্জেন্টিনাকে ইতালিয়া ’৯০-এর কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে গেল। শেষ ষোলোর এই মহারণ জয়ে ছিল মারাদোনার জিনিয়াস, ছিল না কোনও বিতর্ক। মারাদোনা-ক্যানিজিয়ার এই যুগলবন্দি বিরাট অঘটন ঘটিয়ে প্রতিযোগিতার হেভিওয়েট ব্রাজিলকে দেশে পাঠিয়ে দিল, সব হিসেব ওলটপালট করে। আর প্রথম ম্যাচ ক্যামেরুনের কাছে হেরে ধুঁকতে থাকা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের শিবিরে নতুন প্রাণের সঞ্চার করল। পরপর দু’বার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করল কার্লোস বিলার্দোর টিম।
এই পর্যন্ত কোনও বিতর্ক স্পর্শ করেনি ইতালিয়া ’৯০-কে। কিন্তু এরপর প্রতিযোগিতা যত এগতে থাকল, ততই চড়তে থাকল টেনশনের পারদ। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাঠ ও মাঠের বাইরে ঘন হতে শুরু করল বিতর্কের কালো মেঘ। একাধিক বিতর্ক, যা আপাতভাবে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু যোগসূত্র খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে এক জটিল যোগসূত্র। ওই একইদিনে সন্ধ্যায়, মিলানের সানসিরোতে ,পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-২ তে হেরে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে গেল রুড গুলিট-ভন বাস্তেন-ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের ইউরো-সেরা নেদারল্যান্ডসেরও। প্রথমার্ধে ম্যাচ যখন গোলশূন্য, তখন রাইকার্ডকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি, রুডি ভোলারকে ফাউল করার জন্য। ভোলার রাইকার্ডকে এমন অপমানজনক কিছু বললেন, যে ঠান্ডা মাথার ফুটবলার হিসেবে পরিচিত কালো রাজহাঁসকে তার চুলে, থুতু ছেটাতে দেখা গেল। আর্জেন্টিনার রেফারি লুই কার্লোস লুস্তাউ পত্রপাঠ দু’জনকে লাল কার্ড দেখিয়ে, বের করে দিলেন, তারপরও দু’জনের উত্তেজিত ঝগড়া থামল না; মাঠ ছেড়ে বেরনোর সময়ে আবার থুতু ছেটালেন রাইকার্ড! সেকেন্ড হাফে ডাচ মাঝমাঠে রাইকার্ডের অভাব প্রতি মুহূর্তে অনুভূত হয়; তা কাজে লাগিয়ে ক্লিন্সম্যান-ব্রেমহারা গোল করে ম্যাচ বের করে নিয়ে যান।
কেন পেলেকে বিশ্বকাপ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করা হয়েছিল? পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ৪…
প্রথম বিতর্ক: থামানো হয়েছিল ক্যামেরুনের স্বপ্নের দৌড়?
ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান হওয়ার মুহূর্তে, এই ইতালিয়া ’৯০ পর্ব ঐতিহাসিক। এর কয়েকমাস পরেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বার্লিন প্রাচীর, তাই লোথার ম্যাথাউজরা শেষবারের জন্য পশ্চিম জার্মানি হিসেবে বিশ্বকাপ খেললেন। কয়েক বছরের মধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল যুগোস্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধ, তাই অবিভক্ত যুগোস্লাভিয়াকে শেষবার দেখা গিয়েছিল এই বিশ্বকাপে। একইভাবে চেকোস্লোভাকিয়ারও শেষ কাপ অভিযান। দু’বছরের মধ্যে ‘ভেলভেট ডিভোর্স’-এর মাধ্যমে দেশ চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়াতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। স্লাভ ঘরানার ফুটবল প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল, পরে আবার ক্রোয়েশিয়ার হাত ধরে ফিরে এল ’৯৮ থেকে। আবার চেসেস্কুর পতনের পর নতুন আঙ্গিকে রোমানিয়া দল সাড়া জাগিয়েছিল ওই পর্ব থেকে। এই সন্ধিক্ষণে, ঘরের মাঠে কাপ জিততে সেবার মরিয়া ছিল ইতালি। রেনেসাঁসের দেশ ইতালি, পরে এই বৈচিত্র্যময় শিল্প-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অংশ হয়ে গিয়েছিল ইতালির কাতানেচিও ঘরানার ফুটবল সংস্কৃতিও, যা ওদেশের মানুষের কাছে কালচিও নামে পরিচিত। মারাদোনা থেকে লোথার ম্যাথাউস, গুলিট-বাস্তেন থেকে কারেকা— সবাই তখন ইতালীয় সিরি আ লিগের প্লেয়ার।
রোমে আজ্জুরিরা, পরপর ম্যাচ জিতেও চলেছিল মেজাজে। আর ওই বিশ্বকাপে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কেশর ফুলিয়ে এগিয়ে চলেছিল আফ্রিকার সিংহ ক্যামেরুন। প্রথম ম্যাচেই ওমাম বিয়িকের গোলে মারাদোনার আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শুরু হয় ক্যামেরুনের স্বপ্নের দৌড়। পরের ম্যাচে রোমানিয়াকেও হারিয়ে দিল তারা। পরিবর্ত হিসেবে নেমে গোল করলেন বছর আটত্রিশ পেরনো রজার মিল্লা। নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচে তারা মুখোমুখি হল কার্লোস ভালদেরামা-ফ্রেডি রিঙ্কনদের নিয়ে গড়া কলম্বিয়ার সোনার প্রজন্মের দলের সঙ্গে। প্রবল উত্তেজক ম্যাচে নির্ধারিত সময় গোলশূন্য থাকার পর, অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে দেখা গেল মিল্লা-ম্যাজিক। গোল করে করে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে দৌড়ে গিয়ে চল্লিশ ছুঁইছুঁই মিল্লার নাচ যেন ছিল ইতালিয়া ’৯০-এ ক্যামেরুনের জয়যাত্রার প্রতীক। এই ম্যাচেও পরিবর্ত হিসেবে নেমে জোড়া গোল করলেন মিল্লা; যার দ্বিতীয়টি নাটকীয়। কলম্বিয়ার গোলকিপার রেনে হিগুইতা আজও দর্শকদের মনে রয়ে গিয়েছেন তার বিচিত্র স্টাইলের জন্য। গোলকিপার হিগুইতা দলের হয়ে ফ্রিকিক-পেনাল্টি মারতেন, আবার প্রবল আত্মবিশ্বাসে কখনও বক্সের বাইরে বেরিয়ে আসতেন সুইপারের ভূমিকায়। গোলরক্ষকের এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ওই ম্যাচে বিপদ ডেকে আনল ভালদেরামাদের। বক্সের বাইরে এসে হিগুইতা বল ধরে ড্রিবল করতে গেলেন মিল্লাকে। ক্যামেরুনের নায়ক চোরাশিকারির মতো ছোঁ মেরে বলটি ছিনিয়ে নিয়ে ফাঁকা গোলে ঠেলে দিলেন, তারপর স্বকীয় ভঙ্গিমায় মেতে উঠলেন নাচে। নাচল সারা ক্যামেরুন, সমগ্র আফ্রিকাও। প্রথমবার বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার দোড়গোড়ায় পৌঁছে। শেষ মুহূর্তে ভালদেরামারা একটি গোল শোধ করলেও, আফ্রিকার সিংহকে আর আটকানো গেল না।
সান-পাওলো, নেপলসে শেষ আটে এবার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। এই বিশ্বকাপে ততদিনে যে ডিফেন্সিভ, ম্যান মার্কিং ভিত্তিক কৌশলগত খেলার প্রাধান্য দেখেছে, তার অন্যতম কারণ ববি রবসনের দল। ইতালির সিরি আ ও ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের তারাদের সংখ্যাধিক্য ও ভারের প্রভাবও আর একটা কারণ। এর একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিলেন মিল্লা-সিরিল ম্যাকানাকিরা। মিল্লার মতো জনাচারেককে বাদ দিলে, পুরো ক্যামেরুন দলটাই ছিল স্বদেশের মাঠঘাট থেকে উদ্ভুত। তাই তাদের স্টাইলেও ফুটে উঠত প্রতিপক্ষকে আগ্রাসী ছোবল মারার মানসিকতা। পল গ্যাসকোয়েন-গ্যারি লিনেকারের মতো ইপিএল সুপারস্টারদের জন্য নিজেদের সেরা ফুটবলটা তুলে রেখেছিল ক্যামেরুন। সঙ্গে ট্যাকটিকাল লড়াইতেও সেয়ানে-সেয়ানে টক্কর দিলেন ওমাম বিয়িক-ইউজিন একেকেরা। কোয়ার্টার ফাইনালে নতুন একটি দলকে পেয়ে কিঞ্চিত আত্মতুষ্ট ছিলেন পিটার শিলটনরা। তা আরও বাড়ে পঁচিশ মিনিটে ডেভিড প্ল্যাটের গোলে ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর। ইংল্যান্ড অবশ্য গ্রুপ লিগে মিশরকে নামমাত্র গোলে হারানো ছাড়া তখনও পর্যন্ত আর একটিও ম্যাচ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জিততে পারেনি। নেদারল্যান্ডস ও আয়ারল্যান্ড, গ্রুপের অপর দুই দলের সঙ্গে তারা ড্র করে। দ্বিতীয় রাউন্ডে অতিরিক্ত সময় এই প্ল্যাটের গোলেই তারা বেলজিয়ামকে হারিয়েছিল। তাই প্রতিযোগিতার সবথেকে আকর্ষক টিমের বিরুদ্ধে ববি রবসনের দলের এই আত্মতুষ্টির পিছনে কোনও ফুটবলীয় যুক্তি ছিল না। আবার ‘বিখ্যাত’ ইংল্যান্ড সমর্থকদের নিয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিল ইতালির প্রশাসন। মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে তাদের থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল ক্যাগলিয়ারি শহরে। বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগ করা হয়েছিল এই ‘গুন্ডা সমর্থকদের’ নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
ক্যামেরুনকে হালকা করে নেওয়ার মানসিকতা যে ভুল ছিল, তা প্রমাণ হল যখন সেকেন্ড হাফে, মিল্লা নেমে দৃশ্যটা আমূল পাল্টে দিলেন। পুরো ক্যামেরুন দলটি এই সময়টাকে বেছে রেখেছিল ঝড় তোলার জন্য। মিনিট বারোর একটি পর্বে ইংল্যান্ডকে ছিঁড়ে খেল ক্যামেরুন। মিল্লার সঙ্গে লেফট উইং-এ দুরন্ত হয়ে উঠলেন ঝাঁকড়া চুলের ম্যাকানাকি। বক্সের মধ্যে একটি থ্রু বলের ওপর মিল্লা যখন থাবা বসাতে যাচ্ছেন, তখন তাঁকে ফাউল করলেন গ্যাসকোয়েন। পেনাল্টি থেকে ইমানুয়েল কুন্ডে সমতা ফেরালেন ৬২ মিনিটে। এর মিনিটচারেকের মধ্যেই আবার মিল্লা-ম্যাজিক। বুটের সোল দিয়ে একটি বল রিসিভ করে একজন ইংরেজ ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে একটি মাপা থ্রু বাড়ালেন তিনি। ইউজিন একেকে সামনের দিকে ডাইভ দেওয়া মরিয়া শিলটনের শরীরের ওপর দিয়ে নিখুঁত লব করে বলটি জালে জড়িয়ে দিলেন। শুরু হল গ্যালারিতে উপস্থিত ক্যামেরুন সমর্থকদের উচ্ছ্বাস।
তবে ম্যাচটির চিত্রনাট্য একটু ভিন্নভাবে নির্মিত ছিল। এতক্ষণ সেভাবে নজরে পড়েননি, কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার দশ মিনিট আগে থেকে ম্যাকানাকি-গ্যাসকোয়েনরা নন, ‘মঞ্চের’ কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠলেন রেফারি এডগার্ডো কডেসাল মেন্ডেজ। মেক্সিকোর এই রেফারি পেশায় একজন চিকিৎসক। স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ। তার পিতা জুলিও মারিয়াও রেফারি ছিলেন, রেফারিং করেছিলেন ১৯৬৬ জুলে রিমে কাপে। ইংল্যান্ডের মাথার ওপর তখন ঝুলছে আরও একটি ব্যর্থতার খাঁড়া, ইতিহাস আর ক্যামেরুনের মধ্যে ফারাক মাত্র সাত মিনিটের। এমন সময় ছিটকে আসা একটি বল ধরতে গেলেন লিনেকার। দু’জন ডিফেন্ডার তাঁকে বাধা দিতে গেলে, বেঞ্জামিন ম্যাসিং-এর পায়ের সঙ্গে সংযোগের জেরে বক্সের মধ্যে পড়ে গেলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। কডেসাল পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়ে দিলেন। এবং পেনাল্টিতে ‘ক্র্যাকশট’ লিনেকার খেলায় সমতা ফিরিয়ে আনলেন। ম্যাচ আবার গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। পঞ্চাশ-পঞ্চাশ পরিস্থিতিতে লিনেকারের পক্ষে সিদ্ধান্তটা দিয়েছিলেন মেক্সিকান রেফারি।
অতিরিক্ত সময় অ্যাটাক-কাউন্টার অ্যাটাকে ম্যাচ জমে উঠল। ১০৫ মিনিটে গাজ্জার (গ্যাসকোয়েনের ডাকনাম) একটি থ্রু ধরতে ছ’গজ বক্সের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। অভিজ্ঞ ক্যামেরুনের গোলকিপার থমাস এন’ কোনো এগিয়ে এসে সামনের দিকে শরীর ছুড়ে দিলেন বলের নাগাল পাওয়ার জন্য। সামনে ডাইভ দিলেন লিনেকার; এন’ কোনোর প্রসারিত হাত লিনেকারকে স্পর্শ করেছে কি না, পরিষ্কার বোঝা গেল না! কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই কডেসাল বাঁশি বাজিয়ে ছুটে এলেন পেনাল্টি স্পটের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। সুযোগটা কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করলেন ইংরেজ অধিনায়ক। বাকি সময় ক্যামেরুন আর ম্যাচে ফিরতে পারল না! ১৯৬৬-র পর ইংল্যান্ড প্রথমবার বিশ্বকাপে শেষ চারের ছাড়পত্র আদায় করল। আর প্রবল বিতর্ক আর হতাশার মধ্যে শেষ হয়ে গেল মিল্লা-একেকেদের ‘গোল্ডেন রান’।
কডেসাল এই ম্যাচে তিনটি পেনাল্টি দিলেন; এবং বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ পেনাল্টির ম্যাচের সঙ্গে টাই করলেন। তার তিন নম্বর পেনাল্টির সিদ্ধান্তের পাশে আজও একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গিয়েছে। কৌশলগত ডিফেন্সিভ ফুটবলের আবহে ক্যামেরুনের খেলার আকর্ষক স্বকীয় স্টাইল যেন ছিল একরাশ মুক্ত বাতাস। রহস্যময়ী আফ্রিকার দেশটির হয়তো আরও দেওয়ার ছিল, কিন্তু জটিল সিদ্ধান্তের ঘেরাটপে তাদের থামিয়ে দেওয়া হল!
তখনও কিন্তু ইউরোপেই কাপ রেখে দেওয়া নিশ্চিত হয়ে যায়নি।
বিতর্ক দুই: ‘আর্জেন্টিনার জেতার দরকার নেই’
রোমে টানা পাঁচটি ম্যাচ জিতে নেপলসে সেমিফাইনাল খেলতে এল ইতালি। দুরন্ত ছন্দে থাকা সালভাতোর স্কিলাচ্চি-রবার্তো বাজ্জিওরা চ্যাম্পিয়নশিপ দৌড়ে হট ফেভারিট; ফ্রাঙ্কো বারেসি-পাওলো মালদিনি সমৃদ্ধ ডিফেন্স পাঁচ ম্যাচে খায়নি একটিও গোল। অন্যদিক থেকে সের্জিও গয়কোচিয়ার দস্তানায় ভর করে যুগোস্লাভিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শেষ চারের পৌঁছল আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বে দু’টি গোল হজম করলেও, নকআউটে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সও কোনও গোল খায়নি। গ্রুপের রাশিয়া ম্যাচে সতীর্থ হুলিও ওলার্তিকয়চিয়ার সঙ্গে সংঘর্ষে নেরি পোম্পিদোর পায়ের জোড়া-হাড় ভাঙায়, দ্বিতীয় গোলকিপার গয়কোচিয়ার ওপরই আস্থা রাখতে বাধ্য হন কোচ বিলার্দো। দলকে সেমিফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা নিয়ে কোচের আস্থাকে সম্মানিত করেছেন গয়কোচিয়া।
নেপলসে এসেই একটি বোমা ফাটালেন ন্যাপোলির ব্লু-আইড বয় মারাদোনা। কয়েকমাস আগেই তাঁর হাত ধরেই ইতালির ঘরোয়া লিগ জিতেছে ন্যাপোলি। ’৮৪-তে নেপলসে পা দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই মারাদোনা বুঝেছিলেন, যে দক্ষিণ ইতালির এই অঞ্চলের মানুষদের উত্তর ইতালীয়রা বৈষম্যের চোখে দেখেন। ন্যাপোলি টিম মিলান, তুরিন বা জেনোয়ায় খেলতে গেলে তিনি দেখতেন, যে ‘ওয়েলকাম টু ইতালি’ ব্যানার নিয়ে সমর্থকরা যে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন, তাতেও রয়েছে বৈষম্যের সুর। যার অন্তর্নিহিত অর্থ, ন্যাপোলিটানদের ইতালীয় বলেই মনে করতেন না অপেক্ষাকৃত ধনী উত্তর ইতালীয়রা। বুয়েনাস আইরেসের এক কোণার বসতি ভিল্লা ফিওরিতোয় বেড়ে ওঠা মারাদোনা, ছেলেবেলার নিজেও বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। তাই নেপলসের তরুণদের এই অপমান অনুভব করতে পেরেছিলেন দিয়েগো। এই ম্যাচের আগে তিনি ন্যাপোলিটানদের আবেদন করে বলেন, “একদিনের জন্য ওরা তোমাদের ইতালীয় হতে বলছে। আর বাকি ৩৬৪ দিন তো ওরা তোমাদের আফ্রিকান বা ‘তেরোনি’ (ইতালীয় ভাষায় অপমানজনকভাবে চাষাভুষো) হিসেবে দেখে! তাই তোমরা আমাদের টিমকে সমর্থন করো!” ন্যাপোলিতে প্রথম মরশুমেই মারাদোনা জানিয়েছিলেন যে, তিনি নেপলসের এই অবহেলিত ছেলেমেয়েদের ‘আইকন’ হতে চান! তাই ৩ জুলাই মারাদোনার আবেদনে সাড়া দিয়ে সেমিফাইনালে সান-পাওলোর ৬০,০০০ দর্শকের প্রায় অর্ধেক সেদিন আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেছিলেন। আবার, ‘দিয়েগো, নেপলস তোমাকে ভালবাসে, কিন্তু ইতালি আমাদের জন্মভূমি’, ‘মারাদোনা তুমি আমাদের হৃদয়, কিন্তু ইতালি আমাদের গানে’; এইরকম বহু ব্যানারও গ্যালারিতে দেখা গিয়েছিল। তবে মারাদোনার এই বক্তব্যে ইতালির অন্যান্য শহর, বিশেষ করে উত্তর ইতালির নাগরিকরা বেজায় ক্ষিপ্ত হন। যার প্রভাব ফাইনাল পেরিয়ে তার পরেও পড়ে আর্জেন্টিনা ও মারাদোনার ওপর।

স্টিলাচ্চির গোলে শুরুতেই এগিয়ে যাওয়ায় ইতালির ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। অন্যদিকে, ফোলা গোড়ালি নিয়ে ব্রাজিল ম্যাচ থেকেই খেলে যাচ্ছিলেন মারাদোনা। এর সঙ্গে পায়ের একটি নখও সম্পূর্ণ উঠে যায় সেমিফাইনালের আগে। পেন-কিলার ইনজেকশন নিয়ে খেলে যাচ্ছিলেন আর্জেন্টিনা দলের অবিসংবাদিত নেতা। প্রথমার্ধে অনেকটাই নিষ্প্রভ থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে ছন্দ ফিরে পেলেন বিশ্ব-চ্যাম্পিয়নরা। বল মাটিতে রেখে খেলতে শুরু করলেন বুরুচাগা-ক্যানিজিয়ারা। সেই মারাদোনা, আর কে? ইতালি বক্সের কিছুটা বাইরে একটি বল ধরে বাঁ-দিকের উইংয়ে ঠেলে দিলেন হুলিও ওলার্তিকয়চিয়াকে। দেখেশুনে বলটা ছ’গজ বক্সের মাথায় চিপ করলেন আর্জেন্টিনার লেফট ব্যাক। ইতালীয় গোলকিপার ওয়াল্টার জেঙ্গার বাড়ানো হাতের ওপর লাফিয়ে হেডে ফ্লিক করে বল জালে পাঠিয়ে দিলেন ক্যানিজিয়া! প্রতিযোগিতায় প্রথম গোল খেয়ে কেঁপে গেল ইতালি। মিনিটদশেকের একটা স্পেল দুরন্ত খেলল আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময়ের বাকিটা, আর অতিরিক্ত সময় খেলা হল সেয়ানে-সেয়ানে, মূলত মাঝমাঠে। ইতালির প্রাধান্য উধাও। কিন্তু তুরুপের তাস হয়ে ওঠা ক্যানিজিয়াকে রেফারি কার্ড দেখিয়ে দিলেন, যার অর্থ দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের জন্য ফাইনালের বাইরে চলে গেলেন সোনালি চুলের ফরোয়ার্ড।
টাইব্রেকারে আবারও ত্রাতা গয়কোচিয়ার বিশ্বস্ত হাত। শেষ দু’টি শট সেভ করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলে দিলেন সের্জিও। মারাদোনা-সহ আর্জেন্টিনার চারজনই অবশ্য নিখুঁত পেনাল্টি মারলেন।
রোমের স্তেদিও ওলিম্পিকোতে আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত শোনাই গেল না দর্শকদের সিটি আর টিটকিরিতে! ঠিক যেমন সান-সিরোতে উদ্বোধনী ম্যাচে আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত শোনা যায়নি দর্শকদের চিৎকারে। গোটা ম্যাচে দর্শকরা সমর্থন জুগিয়ে যান ক্যামেরুনকে। সেদিন হারার পর ক্ষুব্ধ মারাদোনা বলেছিলেন, ‘আজ দুপুরে একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। ইতালীয়রা বৈষম্যমুক্ত হয়েছে। প্রথমবার আফ্রিকানদের সমর্থন করেছে!’
নেপলসের হার ইতালীয়রা স্বাভাবিকভাবে নেননি। জ্বালা ধরিয়েছিল মারাদোনার মন্তব্যও। এর জন্য ইতালি সমর্থকরা তাঁকে দশগুণ ভোগাতে চেয়েছিলেন। তাই রোমের এক লাখের গ্যালারি ফাইনালের শুরু থেকেই গাঢ় নীল জার্সির আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে গলা ফাটাতে শুরু করে। টেলিভিশন ক্যামেরায় দেখা যায় মারাদোনা গ্যালারির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলছেন ‘হিজোস দে পুতা’ (স্প্যানিশে অশ্রাব্য গালাগাল)! এবং ফাইনালে বাঁশি হাতে পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সেই মেক্সিকান রেফারি— এডগার্ডো কডেসাল। ম্যাচের শুরুতেই তর্ক করার জন্য আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড গুস্তাভো ডিজোটিকে হলুদ কার্ড দেখিয়ে তিনি ইঙ্গিত দিলেন, ‘মোক্ষম সময়’ যে-কোনও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে তিনি পিছপা হবেন না!
কার্ড সমস্যায় নেই প্রথম দলের চারজন। মারাদোনা ছাড়াও চোট ছিল অভিজ্ঞ স্টপার অস্কার রুগেরি। এই অবস্থায় কার্লোস বিলার্দো দল সাজাতে হিমশিম খেলেন। চার বছর আগের অ্যাজটেকার ফাইনালে প্রথম এক ঘণ্টায় যে নীল-সাদা আক্রমণের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল পশ্চিম জার্মানির বক্সে, রোমের বিলার্দোর টিম ছিল সেই আর্জেন্টিনার ছায়ামাত্র! ডিফেন্সে প্রাচীর করে প্রতি-আক্রমণনির্ভর কৌশল নিয়েছিলেন মারাদোনাদের কোচ। লোথার ম্যাথাউসের নেতৃত্বে জার্মানরা আক্রমণে ঝাঁজ বাড়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু জার্মান আক্রমণে ছিল উদ্ভাবনী শক্তির অভাব। তাই প্রথমার্ধে গোলমুখ খুলল না।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে একটা ফাটকা খেললেন বিলার্দো। চোট পাওয়া রুগেরিকে বসিয়ে তিনি নামালেন তরুণ পেড্রো মনজনকে। ম্যাচের ৬৫ মিনিটে স্টাড তুলে মনজন একটি ট্যাকেল করে বসলেন যুর্গেন ক্লিন্সম্যানকে। কডেসাল খুব দুরে ছিলেন না, তিনি সরাসরি মনজনকে লাল কার্ড দেখিয়ে দিলেন। মনজনই প্রথম ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপ ফাইনালে লাল কার্ড দেখেছিলেন। তবুও দশজনে লড়ে যাচ্ছিল আর্জেন্টিনা। ক্যানিজিয়ার অভাবে মারাদোনাকে বিপক্ষের পেনিট্রেটিভ জোনে একা লাগছিল। এছাড়া তাঁকে কড়া ম্যান-মার্কিং এ রেখেছিলেন জার্মানি কোচ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। তাই কাউন্টার অ্যাটাক দানা বাধছিল না! ’৮৬-র ফাইনালের বদলা নিতে উদগ্রীব ছিলেন ছিলেন কোচ বেকেনবাওয়ার-সহ জার্মান ফুটবলারা। কিন্তু তাদের সব আক্রমণই নীল-সাদা প্রাচীরে প্রতিহত হয়ে ফিরে আসছিল।
রোমের স্তেদিও ওলিম্পিকোতে আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত শোনাই গেল না দর্শকদের সিটি আর টিটকিরিতে! ঠিক যেমন সান-সিরোতে উদ্বোধনী ম্যাচে আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত শোনা যায়নি দর্শকদের চিৎকারে। গোটা ম্যাচে দর্শকরা সমর্থন জুগিয়ে যান ক্যামেরুনকে। সেদিন হারার পর ক্ষুব্ধ মারাদোনা বলেছিলেন, ‘আজ দুপুরে একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। ইতালীয়রা বৈষম্যমুক্ত হয়েছে। প্রথমবার আফ্রিকানদের সমর্থন করেছে!’
৮৫ মিনিটের মাথায় লোথার ম্যাথাউস একটি থ্রু বাড়ালেন রুডি ভোলারের উদ্দেশ্যে। আড়াআড়িভাবে ট্যাকেল করলেন রবার্তো সেনসিনি। তাতে পড়ে যান ভোলার, কিন্তু দু’জনের মধ্যে আদৌ কোনও ‘কন্ট্যাক্ট’ হয়েছিল কি না, তা আজও রহস্য। অদূরে পিছনে দাঁড়ানো কডেসাল তৎক্ষণাৎ পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়ে দেন। যদিও এর আগে আর্জেন্টিনার গ্যাব্রিয়েল ক্যালডেরনকে জার্মান বক্সের মধ্যে ক্লাউস অগেনথ্যালার একইরকম ট্যাকেল করা সত্ত্বেও, আর্জেন্টিনার পেনাল্টির দাবিতে কর্ণপাত করেননি মেক্সিকান ডাক্তারবাবু!
কোয়ার্টার ফাইনালেও নামমাত্র পেনাল্টি গোলে চেকদের হারিয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। গোল করেছিলেন ম্যাথাউস। কিন্তু এবার মারতে এলেন আন্দ্রেই ব্রেহমা। এবং নিখুঁত প্লেসিং-এ ফাইনালের গোল-খরা দূর করলেন; গয়কোচিয়া ঠিক দিকে ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পেলেন না। আসলে, ডিফেন্সিভ কৌশলের জন্য এমনিতেই এই বিশ্বকাপে গোল অনেক কম হয়েছিল। ৫২টা ম্যাচে মাত্র ১১৫, গড় ২.২১, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বনিম্ন। ফাইনালেও তার ব্যতিক্রম হল না। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটাই একমাত্র ফাইনাল, যেখানে জয়সূচক একটি মাত্র গোল এসেছিল পেনাল্টি থেকে।


বাকি পাঁচ মিনিটে আর বলার মতো ঘটনা একটিই। আর্জেন্টিনার থ্রো-এর আগে বল হাতে নিয়ে সময় নষ্ট করছিলেন যুর্গেন কোলার, ভিজোটি এসে তার থেকে বলটি কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টায় কুস্তির প্যাঁচের মতো তাঁর গলায় হাত জড়িয়ে তাঁকে ফেলে দিলেন। কডেসাল আর্জেন্তেনীয় ফরোয়ার্ডকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে বের করে দেন। আর্জেন্টিনা ফাইনাল শেষ করল ন’জনে; প্রতিবাদ করতে গিয়ে হলুদ কার্ড দেখলেন মারাদোনাও। যদিও কডেসালের এই শেষ সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। তবে রোমের এই ম্যাচ বিশ্বকাপের সবথেকে নিকৃষ্ট ফাইনাল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়ে গিয়েছে ইতিহাস বইতে।
আগেই ঘোষণা করে রেখেছিলেন, এই ফাইনালই কালো পোশাকে বাঁশি হাতে তাঁর শেষ ম্যাচ।
‘আমি যথারীতি সৎ এবং সাহসী ছিলাম। পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, রেফারিরা উদ্দেশ্য দেখেন না, কন্ট্যাক্ট দেখেন। তাই আমার মতে ওটা পেনাল্টি ছিল। এখনও তাই মনে করি। এটা এখন ক্লোজড কেস।’ পরে এক সাক্ষাৎকারে বলতে শোনা গিয়েছিল বিতর্কিত ফাইনালের রেফারিকে। যদিও সেনসিনির শরীর ভোলারকে স্পর্শ করেছিল কি না, তা আজও স্পষ্ট নয়। এবং ফাইনালে তাঁর প্রাক্তন বিশ্বকাপ রেফারি বাবার উপদেশ মাথায় রাখেননি কডেসাল। এই ফাইনালের বছরদশেক আগে তাঁর বাবা তাঁকে বলেছিলেন যে, ‘কখনও এমন পেনাল্টি দিও না, যার জন্য হাজার বার কৈফিয়ত দিতে হবে।’
কডেসাল সম্পর্কে মারাদোনার প্রতিক্রিয়া ছিল ‘ফাইনালে আমাদের সর্বস্ব লুট করে নিয়েছিল ও।’ অধিনায়কের কথার প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল বুয়েনোস আইরেসের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকেও। ফুটবলপ্রেমী রাষ্ট্রপতি কার্লস মেনেমও বলেছিলেন, ‘ফাইনালটা লুট করেছেন ওই রেফারি।’
কী করে কডেসাল ফাইনালের দায়িত্ব পেয়েছিলেন? তার আগে পর্যন্ত ওই বিশ্বকাপে দুটো ম্যাচ খেলিয়েছিলেন তিনি— গ্রুপ পর্বের ইতালি-ইউএসএ ম্যাচ ও শেষ আটের ইংল্যান্ড-ক্যামেরুন ম্যাচ। ফিফা অবজার্ভাররা তা পর্যবেক্ষণ করে যে ৮.৫ রেটিং দিয়েছিলেন কডেসালকে, তা অতি-সাধারণ। উরুগুয়েতে জন্ম, মেক্সিকোয় বড় হয়ে ওঠা রেফারির দাদুর জন্মস্থান আবার আর্জেন্টিনা! অ্যজটেকায় বসে ’৮৬-র ফাইনালে আর্জেন্টিনাকেই সমর্থন করেছিলেন কডেসাল। ’৯০-এর ফাইনাল তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া ফাইল বললেও এই নিয়ে বিতর্ক চলেছিল বহুদিন। মেক্সিকান রেফারি কমিশনের প্রাক্তন সভাপতি উমবের্তো রোজানো পরে বলেন, মেক্সিকান ফেডারেশনের রেফারি কমিশনের আরেক প্রাক্তন মুখ্য আধিকারিক জেভিয়ার আরিয়াগার সঙ্গে তাঁর একটি মিটিং হয়েছিল। আরিয়াগা ’৯০-এ ফিফা রেফারি কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ‘না জোর্নাদা’ কাগজে রোজানো বলেছিলেন, আরিয়াগার কাছ থেকে তিনি বিস্ময়কর ‘তথ্য’ পেয়েছিলেন। আরিয়াগার কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, ফাইনালের আগে আরিয়াগা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যে বার্তা পেয়েছিলেন, তাতে বলা ছিল যে, ‘আর্জেন্টিনার জেতার দরকার নেই।’ যদিও কর্তৃপক্ষ বলতে রোজিনা বা আরিয়াগা ঠিক কাদের বা কাকে বুঝিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট এই বক্তব্যে। তবে এটা বাস্তব যে, এই আরিয়াগাই সেই বিতর্কিত রেফারি কডেসালের শ্বশুরমশাই!


মারাদোনারা কডেসালকে কোনওদিন ক্ষমা করেননি। মেক্সিকান রেফারি তা বিলক্ষণ জানেন। তবে মারাদোনার নানা মন্তব্য নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘ও অত্যন্ত বিরক্তিকর একজন ব্যক্তি। ওইদিনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই।’
মেক্সিকান ডাক্তারবাবুর মনে সন্দেহ না থাকলেও, ওই দুই ম্যাচে তাঁর একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আজও বড় প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গিয়েছে বহু বিশেষজ্ঞ ও ফুটবলপ্রেমীর মনে। ইউরোপের মাটিতে পরপর দু’বার বিশ্বকাপ জিতুন মারাদোনারা, এটা বোধহয় চাননি কোনও ‘অদৃশ্য কর্তৃপক্ষ’। যেমন চাননি ইউরোপের মাটি থেকে বিশ্বকাপ যাক লাতিন আমেরিকায়। যা ইতিহাসে একবারই বাস্তবায়িত করেছিল পেলে-গ্যারিঞ্চার ব্রাজিল, ১৯৫৮-র সুইডেন বিশ্বকাপ জিতে।
দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার টিম শেষ পর্যায় পর্যন্ত এসেও শেষ করতে পারেননি; মেসিরা কী পারবেন পরপর দু’বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে? তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আর চার সপ্তাহ।




