‘মৌলিকতা’ আর ‘অনুকৃতির’ দ্বন্দ্বে জয়ী কে— আসল, না কি তার নিখুঁত প্রতিরূপ? অনিবার্য এই প্রশ্নের এক ধ্রুপদী রূপক লুকিয়ে আছে ওভিদের ‘মেটামরফোসেস’ মহাকাব্যে, মরফিয়াস নামের এক আশ্চর্য নকলনবিশের আখ্যানে। মানুষের মুখাবয়ব, কণ্ঠস্বর, চালচলন, পোশাকআশাক— এমনকী কথনভঙ্গির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মুদ্রাও তাঁর অনুকরণে এমন জীবন্ত হয়ে উঠত যে আসল-নকল সব একাকার। কাহিনির এক পর্যায়ে তাঁর এই বিদ্যার চূড়ান্ত পরীক্ষাটি হয় এক মর্মান্তিক প্রেক্ষাপটে। সমুদ্রে জাহাজডুবিতে সেয়ক্স প্রাণ হারালেও, সে-খবর অজানা থাকায় স্ত্রী অ্যালসিওনে প্রতিদিন দেবী জুনোর বেদিতে স্বামীর নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের আশায় আকুল প্রার্থনা করে যাচ্ছিলেন। মৃত মানুষের প্রত্যাবর্তনের এই নিষ্ফল প্রার্থনা আর সহ্য করতে না পেরে জুনো স্বপ্নের মধ্যেই তাঁকে সত্য জানানোর নির্দেশ দেন। নিদ্রাদেব সোমনুস তখন সহস্র পুত্রের মধ্যে বেছে নেন মরফিয়াসকে— অনুকরণে যাঁর জুড়ি মেলা ভার।
অ্যালসিওনের স্বপ্নে মরফিয়াস আবির্ভূত হন মৃত সেয়ক্সের বিবর্ণ, বরফশীতল অবয়বে; তাঁরই কণ্ঠ, অঙ্গভঙ্গি, এমনকী অশ্রুবিন্দুটি পর্যন্ত ধার করে জানিয়ে দেন জাহাজডুবি ও মৃত্যুর কথা। অনুকরণ এতই নিখুঁত ছিল যে, ঘুম ভাঙার পর অ্যালসিওনের কাছে স্বপ্ন আর নির্মম সত্যের মধ্যে কোনও ফারাকই রইল না। শোকে বিহ্বল হয়ে তিনি ছুটে যান সমুদ্রসৈকতে; দেখতে পান তরঙ্গে ভাসছে স্বামীর নিথর পাঁশুটে দেহ। ভাসমান সেই দেহের কাছে পৌঁছতে বাঁধের ওপর পা রাখার মুহূর্তেই ঘটে এক আশ্চর্য রূপান্তর— অ্যালসিওনের শরীরে গজায় ডানা। এক শোকার্ত পাখি হয়ে উড়ে গিয়ে তিনি সেয়ক্সের শীতল ঠোঁটে ঠোঁট রাখেন। সবই দেবতাদের অভূতপূর্ব মতিগতি। দেবতাদের করুণায় সেয়ক্সও ‘হ্যালসিওন’ পাখির রূপ পায়। মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে উড়ে যায় দু’টি কিংফিশার।
আরও পড়ুন: এা আই কি ক্রমশ জলসংকটের কারণ হয়ে উঠছে?
গল্পের পরিণতি যা-ই হোক, মরফিয়াস নেহাতই দুর্ভাগা! পৌরাণিক জগতেই তাঁকে কীর্তিহীন সন্তুষ্ট থাকতে হল; আজ জন্মালে নির্ঘাত কোনও প্রথম সারির সাহিত্য পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জ্বলজ্বল করত তাঁর নাম। কারণ, কমপিউটার অ্যালগরিদম ইতোমধ্যেই মরফিয়াসের সেই গুরু-মারা বিদ্যাকে প্রযুক্তিগত দক্ষতায় রূপ দিয়েছে। মানুষের কল্পনা, উপমা ও শব্দের বুননকে গাণিতিক বিন্যাসে ভেঙে, তারপর গল্প উপন্যাসের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরূপ নির্মাণ করে বাঘা-বাঘা সাহিত্যবোদ্ধাদেরও বিভ্রান্ত করার কৌশল রপ্ত করছে।
বছর খানেক আগেই, রিয়ে কুদানের হাতে জাপানের শীর্ষ সাহিত্য পুরস্কার ‘আকুতাগাওয়া’ উঠতেই তিনি অকপটে স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, তাঁর পুরস্কৃত উপন্যাসের পরতে-পরতে রয়েছে চ্যাটজিপিটি-র কারসাজি। সেই স্বীকারোক্তির রেশ কাটতে-না-কাটতেই বিতর্কের ঝড় ওঠে এ-বছর কমনওয়েলথ ছোটগল্প প্রতিযোগিতায়। জামির নাজিরের পুরস্কৃত ছোটগল্প ‘দ্য সার্পেন্ট ইন দ্য গ্রোভ’-কে ঘিরেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, অ্যালগরিদম কি তবে পুরস্কার-নির্ধারক সাহিত্যিক ভঙ্গিটিকেও অবলীলায় পড়ে ফেলছে? ভাগ বসাচ্ছে স্রষ্টার একচেটিয়া অহংকারে? যদি তা-ই হয়, তবে এতদিন যাকে আমরা ‘মৌলিকতা’ বা লেখকের ‘গভীর অন্তর্দৃষ্টি’ বলে উদ্যাপন করে এসেছি, তার ভিত্তি তো বেশ নড়বড়ে ঠেকছে। যাকে একান্তই আত্মিক সৃজনশীলতা ভেবেছিলাম, তা এখন নিছকই ডেটা আর প্যাটার্নের পরিসংখ্যানগত খেলা; স্রেফ ঘুঁটি সাজানোর এক যান্ত্রিক নকশা ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না।
শিল্প সংক্রান্ত যে-পৌরাণিক কাহিনি আমরা বিশ্বাস করে এসেছি এ-যাবৎ, তা হল, শিল্পী আদতে একজন একক প্রতিভা। তাঁর মস্তিষ্ক যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, এবং তাঁর অন্তর্জগতের গোপন গহ্বর থেকে উজিয়ে আসছে মৌলিক অনুপ্রেরণা। কোনও পূর্বসূত্র, উত্তরাধিকার বা পরম্পরা ছাড়াই নিখাদ শূন্যতা থেকেই তিনি অনর্গল সৃষ্টি করে চলেছেন। অনুকরণ নয়, উদ্ভাবন করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের কতখানি সর্বনাশ করবে, সে-হিসাব ভবিষ্যৎ কষবে। কিন্তু ইতোমধ্যেই সে এই রোমান্টিক গোঁজামিলের পর্দায় একটি দৃশ্যমান ছিদ্র তৈরি করেছে।
একটি উপন্যাস যখন লেখা হয়, তখন লেখক কি সত্যিই সম্পূর্ণ নতুন কিছু সৃষ্টি করেন? নাকি, যুগ-যুগ ধরে সঞ্চিত সাংস্কৃতিক উপাদানকে তিনি নিত্যনতুন এবং সমসাময়িক বিন্যাসে সাজিয়ে দেন মাত্র? শিল্পের ইতিহাসে অবশ্য মৌলিকতার তথাকথিত ধারণাটিই তুলনামূলকভাবে আধুনিক। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় পৃথিবীতে সৃজনশীলতা ও জ্ঞানকে প্রায়শই একটি দীর্ঘ পরম্পরা, বা শাস্ত্রীয় ধারার অংশ হিসেবে গণ্য করা হত। মৌলিকতার চেয়েও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পূর্বসূরিদের সঙ্গে সংলাপ ও তাঁদের কাজের পুনর্ব্যাখ্যা। সেই বৃহত্তর ঐতিহ্যের ধারক ছিলেন একজন কবি, গায়ক বা কারিগর। অগ্রজদের কাছ থেকে গ্রহণ করতেন, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতেন, সম্প্রসারণ এবং পুনর্নির্মাণ করে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিতেন সেই উত্তরাধিকার। মহাকাব্য, লোককথা, ধর্মীয় আখ্যান কিংবা লোকসঙ্গীত— সবই ছিল সমষ্টিগত সৃজনের ফল। সেখানে ‘এই সৃষ্টি আমার’, এ-ধরনের দাবি ছিল প্রায় অযৌক্তিক। শিল্পীর ব্যক্তিগত পরিচয়ও সেখানে ছিল একেবারে অপ্রাসঙ্গিক।
প্রাচীন গ্রিসে শিল্পের সর্বোচ্চ আদর্শ ছিল ‘মাইমেসিস’। অর্থাৎ অনুকরণ বা প্রতিফলন। সেখানে শিল্পীর মূল দায় ছিল পূর্বপ্রতিষ্ঠিত আদর্শকে অনুসরণ করা এবং সমকালের আলোকে তার যুগোপযোগী রূপায়ণ। হোমারের মহাকাব্যগুলোর কথাই ধরা যাক। ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ কোনো একক লেখকের ব্যক্তিগত কল্পনার ফসল নয়; বরং তা বহু শতাব্দী ধরে লোকমুখে প্রচারিত আখ্যানের এক সুবিশাল সঞ্চয়। ‘হোমার’ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, একটি নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার নাম। একই কথা প্রযোজ্য মধ্যযুগীয় লোককথার ক্ষেত্রেও। ‘সিন্ডারেলা’ বা ‘স্নো হোয়াইট’-এর মতো রূপকথা কিংবা উপকথাগুলোর কোনও একক মালিকানা নেই। প্রজন্মের-পর-প্রজন্ম ধরে হাজারো মানুষের মুখে-মুখে এগুলো বিবর্তিত হয়েছে এবং নিত্যনতুন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
শিল্পীর ব্যক্তিগত স্বত্ব বা মৌলিকতার ধারণা কোনওকালেই যে একেবারে ছিল না, এমনটা অবশ্যই নয়। তবে ‘একক প্রতিভা’ ও ‘মৌলিক স্রষ্টা’র যে-ধারণাকে আমরা আজ প্রায় স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিই, তা মূলত ইউরোপীয় আলোকায়ন ও রোমান্টিকতাবাদের ফসল। সাহিত্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও বদলাতে শুরু করে মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার এবং আধুনিক প্রকাশনা শিল্পের উত্থানের সঙ্গে। বই যখন গণহারে উৎপাদিত ও বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হল, তখন প্রশ্ন উঠল— এর মালিক কে, মুনাফার দাবিদারই বা কে? এই প্রেক্ষিতেই কপিরাইট, এবং বৌদ্ধিক সম্পত্তির ধারণা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে ‘মৌলিকতা’ আর কেবল নন্দনতাত্ত্বিক গুণ রইল না; তা বাজার, মালিকানা ও অর্থনৈতিক অধিকারেরও সূচক হয়ে উঠল।
তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরুদ্ধে এই প্রবল প্রতিরোধ কি সত্যিই শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, না কি শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একচেটিয়া মালিকানার ধারণাকে সুরক্ষিত করার মরিয়া চেষ্টায়? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কে নৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন অবশ্যই আছে, কিন্তু তার পাশাপাশি একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্নও রয়েছে। যদি ভাষা, আখ্যান, প্রতীক, রূপক এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতির সবটাই সমষ্টিগতভাবে গড়ে ওঠে, তাহলে একজন লেখকের মালিকানা আসলে কোথা থেকে শুরু হয়? একটি ধারণা, একটি গল্প বা একটি শৈলীকে কতখানি পর্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলা যায়? যদি পুনর্লিখন শিল্প হয়, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-র বিরুদ্ধে আপত্তির প্রকৃত ভিত্তি কোথায়? ফুকো এক সাংঘাতিক প্রশ্ন করেছিলেন: ‘লেখক’ আসলে কে? লেখক কি একজন মানুষ, নাকি একটি সাংস্কৃতিক কার্যপ্রণালী?
শেক্সপিয়ার-কে বিশ্বের অন্যতম মৌলিক সাহিত্যিক বলা হয়। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ নাটকের কাহিনি-বীজ এর উৎস অন্যত্র। ‘হ্যামলেট’ প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভীয় কিংবদন্তির উপর দাঁড়ানো। ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ ইতালীয় আখ্যানের পুনর্লিখন। ‘কিং লিয়ার’-এরও পূর্বসূরি ছিল। তাহলে শেক্সপিয়ারের কৃতিত্ব কোথায়? নিশ্চয় কাহিনি আবিষ্কারে নয়। কাহিনির সমাসাময়িক পুনর্গঠনে। চরিত্রের মনস্তত্ত্বে। ভাষার ঘনত্বে। মানবিক জটিলতার স্তর সংযোজনে। একইভাবে জেমস জয়েস ‘ইউলিসিস’ লিখেছেন হোমারের ‘ওডিসি’-কে কেন্দ্র করে। টি. এস. এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ মূলত অসংখ্য পুরাণ, ধর্মীয় পাঠ, সাহিত্যিক উদ্ধৃতি এবং সাংস্কৃতিক ধ্বংসাবশেষের কোলাজ। মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ বাইবেলের পুনর্বিন্যাস।
শিল্পকে যদি আমরা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বলে ধরি, তাহলে কেন প্রায় একই সময়ে বিভিন্ন দেশে একই ধরনের সাহিত্য না শিল্প আন্দোলন জন্ম নেয়? কেন আধুনিকতাবাদ শুধু একজন লেখকের মাথায় আসেনি? কেন সুররিয়ালিজম শুধু একজন শিল্পীর কল্পনা ছিল না? কেন উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপ জুড়ে বিচ্ছিন্নতা, বিষণ্নতা, ভাঙন, এবং অবক্ষয়ের ভাষা হঠাৎ এত প্রবল হয়ে উঠল? কারণ শিল্পী একা সৃষ্টি করছেন না। তিনি একটি যুগের লক্ষণ ধারণ করছেন।
শেক্সপিয়ার-কে বিশ্বের অন্যতম মৌলিক সাহিত্যিক বলা হয়। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ নাটকের কাহিনি-বীজ এর উৎস অন্যত্র। ‘হ্যামলেট’ প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভীয় কিংবদন্তির উপর দাঁড়ানো। ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ ইতালীয় আখ্যানের পুনর্লিখন। ‘কিং লিয়ার’-এরও পূর্বসূরি ছিল। তাহলে শেক্সপিয়ারের কৃতিত্ব কোথায়? নিশ্চয় কাহিনি আবিষ্কারে নয়। কাহিনির সমাসাময়িক পুনর্গঠনে। চরিত্রের মনস্তত্ত্বে। ভাষার ঘনত্বে। মানবিক জটিলতার স্তর সংযোজনে। একইভাবে জেমস জয়েস ‘ইউলিসিস’ লিখেছেন হোমারের ‘ওডিসি’-কে কেন্দ্র করে। টি. এস. এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ মূলত অসংখ্য পুরাণ, ধর্মীয় পাঠ, সাহিত্যিক উদ্ধৃতি এবং সাংস্কৃতিক ধ্বংসাবশেষের কোলাজ।
শুধু সাহিত্য কেন, সংগীত বা চিত্রকলার ইতিহাসে তাকালেও এর অন্যথা কিছু দেখব না। চিনের জিয়াহু প্রত্নক্ষেত্রে প্রায় নয় হাজার বছরের পুরোনো, সারসের হাড়ে তৈরি একটি বাঁশি আবিষ্কৃত হয়েছিল, যার সুরবিন্যাসে ছিল পেন্টাটনিক স্কেলের ব্যবহার। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, বহু সহস্রাব্দ পরে এই পেন্টাটনিক কাঠামোই, বিশেষত মাইনর পেন্টাটনিকের সঙ্গে ‘ব্লু নোট’-এর সংযোজন— ব্লুজ ও জ্যাজ সংগীতের অন্যতম প্রধান সুরভিত্তি হয়ে ওঠে। সুরের ইতিহাসে উত্তরাধিকারের এই যে ধারা, রঙ-রেখার ইতিহাসেও তা সমান প্রাসঙ্গিক। রেনেসাঁ যুগের শিল্পীরা গ্রিক ও রোমান ভাস্কর্যের শৈলী ধার করেছিলেন। ইমপ্রেশনিস্টরা আবার একাডেমিক শিল্পের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন। কিন্তু তাঁদের বিদ্রোহও একটি পূর্বস্থিত ভাষার প্রতিক্রিয়া। কেউই শূন্য থেকে শুরু করেননি। রেনেসাঁর চিত্রকরদের কর্মশালায় শিষ্যরা ক্যানভাসের বড় অংশ আঁকত। অর্থাৎ শিল্পে “একক স্রষ্টা”র ধারণাটিও অনেকাংশে একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণ।
সুতরাং ‘খাঁটি মৌলিকতা’ বলে আদৌ কিছু আছে কি না, সে প্রশ্নের কোনও চটজলদি উত্তর নেই। আমরা যে ভাষায় চিন্তা করি, যে প্রতীকে পৃথিবীকে বুঝি, যে গল্প শুনে বড় হই, এমনকী যে আবেগ প্রকাশ করি, সেগুলোর কোনওটিই আমাদের নিজস্ব উদ্ভাবন নয়। শিল্পী সর্বদাই এমন এক সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারের ভিতরে কাজ করেন, যা তাঁর জন্মের বহু আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। ফলে অধিকতর জরুরি প্রশ্ন হল: কতটা রূপান্তর, কতটা পুনর্বিন্যাস ঘটলে আমরা একটি সৃষ্টিকে মৌলিক বলে স্বীকার করব?
যদি মৌলিকতার মানে এই হয় যে, সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব কিছু, তবে ইতিহাসের প্রায় কোনও মহান শিল্পকর্মই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে না। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ জাপানি ‘উকিও-এ’ ছাপচিত্রের নির্যাস নিজের তুলিতে শুষে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, পল সেজানের ক্যানভাসেই পিকাসো ও ব্রাকের কিউবিজমের বীজ পোঁতা হয়েছিল। অথচ তাঁদের কাউকেই আমরা নকলনবিশ বলি না। কোনও ভাবনা থেকে উৎসারিত, তার চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হল নতুন প্রেক্ষাপটে তার নবজন্ম। উত্তরাধিকারের দীর্ঘ ছায়াকে সমকালের প্রবল অভিঘাতে শিল্পী বইয়ে দেবেন আনকোরা এক শাখায়। একমাত্র তবেই নিজস্বতার স্বাক্ষর বলে কিছু সম্ভব।
এবার, যদি কোনও পুরোনো আখ্যানকে ছেঁকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন কিছু সৃষ্টি করে, তবে নীতিগতভাবে তা প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিকদের নির্মাণ-প্রক্রিয়া থেকে ঠিক কতটা আলাদা? তর্ক উঠতে পারে— স্রষ্টার চেতনা আছে, যন্ত্র নিষ্প্রাণ। কিন্তু কার্ল জুং-এর ‘সমষ্টিগত অবচেতন’ তত্ত্ব এই যুক্তিকে খর্ব করে দেয়। মানবসত্তার গভীরে এমন কিছু আর্কিটাইপ বা আদিম কাঠামোর স্রোত প্রবাহিত, যা মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গণ্ডি পেরিয়ে সর্বদা সক্রিয়। শিল্পে ব্যবহৃত নায়ক, মাতৃসত্তা, নির্বাসন, পুনর্জন্ম, পতন বা আত্মত্যাগের এই চিরায়ত মোটিফগুলি একক কল্পনার ফসল নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির পুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার। এই তত্ত্ব যদি আংশিক সত্যও হয়, তাহলে এই বিতর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তো মানবজাতির সুদীর্ঘ ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সঞ্চয়ের নির্যাস থেকেই পুষ্ট। সে-ক্ষেত্রে তাকে কোনও ‘বহিরাগত সত্তা’ বলে খারিজ করে দেওয়ার অবকাশ কোথায়? সে তো বরং আমাদেরই সমষ্টিগত মেধা ও মননের আদলে গড়ে ওঠা এক প্রযুক্তিগত দর্পণ।
একটু খতিয়ে ভাবলেই বুঝব শিল্পের ইতিহাস আসলে প্রযুক্তির বিবর্তনেরই ইতিহাস। তেলরঙ আবিষ্কারের আগে ইউরোপীয় চিত্রকলায় একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা ছিল। আবার, ক্যামেরার উদ্ভাবনের আগে প্রতিকৃতি বা পোর্ট্রেট আঁকার সামাজিক তাৎপর্যও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। উনিশ শতকে যখন ফটোগ্রাফি আবিষ্কৃত হল, বহু শিল্পী তখন প্রমাদ গুনেছিলেন, চিত্রকলার দিন বুঝি শেষ! কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। শিল্পের ক্যানভাসে জন্ম নিয়েছিল ‘ইমপ্রেশনিজম’, ‘এক্সপ্রেশনিজম’ কিংবা ‘কিউবিজম’-এর মতো যুগান্তকারী সব নতুন ধারা। অর্থাৎ, প্রযুক্তি যখন কোনও পুরোনো দক্ষতাকে সস্তা বা সহজলভ্য করে দেয়, তখন শিল্প তার অনিবার্য মৃত্যুকে রুখতে নিজের সংজ্ঞাই বদলে ফেলে। প্রতিটি যুগেই শিল্প নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে অভিযোজিত করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই উত্থানও সম্ভবত সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারই আরেকটি অবধারিত পর্ব।
তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-কে ঘিরে এত উদ্বেগ কেন? তা কি শিল্পের উৎপাদনকে গণতান্ত্রিক করেছে, এবং একই সঙ্গে প্রতিভার পৌরাণিক মর্যাদাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলেই? নাকি শিল্পের কাঠামোগত স্তরটিকে উন্মুক্ত করে সে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে মানবসৃষ্টির অনেকখানি অংশই আসলে ছাঁচে ঢালা পুনরাবৃত্তি এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত রীতির সমন্বয়।
অনেকেই বলবেন, শিল্পের মূল্য শেষ পর্যন্ত শিল্পকর্মে নয়, শিল্পীর জীবনানুভবে। একজন প্রকৃত শিল্পী কেবল শব্দ সাজান না, কিংবা ক্যানভাসে রঙের পরত চড়ান না; তিনি একটি নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁর সৃষ্টির পেছনে থাকে অভিজ্ঞতার ভার, সামাজিক ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা। এর পাশাপাশি আরও একটি ফ্যাঁকড়া রয়েছে, যা নন্দনতত্ত্বের নয়, শ্রম-রাজনীতির। একজন শিল্পী সারাজীবন ধরে যে-শিল্প নির্মাণ করেছেন, যে ভাষা, শৈলী, কল্পনা ও দক্ষতা গড়ে তুলতে দশকব্যাপী নিরলস শ্রম দিয়েছেন, তাকেই ‘প্রশিক্ষণ-উপাদান’ (Training Data) হিসেবে ব্যবহার করে কর্পোরেশনগুলো বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি করছে। শুধু তা-ই নয়, পরবর্তীকালে সেই যন্ত্র নিয়েই তারা অবতীর্ণ হচ্ছেন খোদ শিল্পীরই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে! এমতাবস্থায় শিল্পীর বিরোধ অত্যন্ত সংগত। শিল্পীর এই নৈতিক ও অর্থনৈতিক আপত্তিকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
কিন্তু প্রশ্ন যদি এই হয়—মানুষ কি নীতিগতভাবে এআই-নির্মিত গল্প, ছবি বা সংগীতের নিছক অস্তিত্বের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করতে পারে? তবে বলতেই হয়, সেখানে যুক্তির ভাঁড়ারে বেশ টান। এ-বিষয়ে মানুষের প্রতিবাদ আংশিকভাবে ন্যায্য হলেও, আংশিকভাবে তা আত্মরক্ষামূলক। যেখানে শ্রম, সম্মতি, কর্পোরেট মুনাফার প্রশ্ন; সেখানে মতবিরোধ যথেষ্ট ন্যায্য। কিন্তু যেখানে প্রশ্ন কেবল এই— ‘একটি যন্ত্র কেন গল্প লিখবে?’ —সেখানে আপত্তি কি বড়ই ঠুনকো নয়? কারণ এই আপত্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে শিল্প সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের এক আরামদায়ক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অতর্কিতেই সেই বিশ্বাসের বেলুনে আলপিন ফুটিয়ে দিয়েছে। সে এই মর্মে দস্তাবেজ দাখিল করছে যে, শিল্প কোনোকালেই একক মানুষের নিঃসঙ্গ কীর্তি ছিল না। প্রতিটি সুরের গভীরে যেমন অনুরণিত হয় অসংখ্য পূর্বসূরির সুরের মূর্ছনা, প্রতিটি চিত্রের রঙ ও রেখায় যেমন বহমান থাকে বহু শতকের চিত্রভাষা; ঠিক তেমনি প্রতিটি গল্পের পরতে-পরতেও লুকিয়ে থাকে পূর্ববর্তী হাজারো আখ্যানের নিবিড় ছায়া।


