উত্তম ও আধুনিকতা

উত্তমকুমার মারা যাওয়ার মাসদুয়েকের মধ্যে ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮০ তারিখে প্রকাশিত ‘আনন্দলোক’ (ষষ্ঠ বর্ষ, সংখ্যা ১৪) পত্রিকায় অশোক মজুমদার একটা চিঠিতে লেখেন—“১৯৬২ সালে ‘সিনে ক্লাব অফ্ ক্যালকাটা’ প্রিয়া সিনেমায় সপ্তাহব্যাপী পোলিশ চলচ্চিত্রোৎসবের আয়োজন করেন। উত্তমকুমার এই নবগঠিত সিনে ক্লাবের আজীবন সদস্য হয়েছিলেন ক্লাবের শুরু থেকেই। ওঁর সভ্য নম্বর ছিল এক। উনি পোলিশ ছবির উৎসবের কথা শুনে, সব ছবিগুলি দেখবার ব্যবস্থা করবার জন্যে সাধারণ সম্পাদককে অনুরোধ করেন। উৎসবের ছবিগুলির মধ্যে আঁন্দ্রে ভাইদা পরিচালিত ‘অ্যাশেজ এ্যান্ড ডায়মন্ডস’ এবং য়েরজি ক্যাভালরবিচ পরিচালিত ‘নাইট ট্রেন’ ছবি দু’টি ওঁকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। উনি তখনকার পোলিশ ছবির জনপ্রিয় নায়ক সিবুলস্কির অভিনয় দেখতে খুব ভালবাসতেন, ও ‘অ্যাশেজ এ্যান্ড ডায়মন্ডস’, ‘নাইট ট্রেন’ ছবিতে সিবুলস্কির অভিনয় দেখে নিজেকে ওঁর সঙ্গে প্রায় একাত্ম করে ফেলেছিলেন, ওঁর পরবর্তী বাংলা ছবির অভিনয়ে। সিবুলস্কির ছবি এলেই উনি দেখবার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করতেন। পরবর্তীকালে ছবির কাজে ব্যস্ত থাকায় উনি সিনে ক্লাবের সব ছবি দেখতে পারতেন না, কিন্তু সব ভালো ছবির খোঁজ খবর রাখতেন, সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সে সব ছবি নিয়ে আলোচনা করতেন। এইভাবেই অস্কার পুরস্কার প্রাপ্ত চেক ছবি ‘ক্লোসলি গার্ডেড ট্রেন’ (পরিচালক: জিরি মেনজেল) সময় করে সরলা মেমোরিয়াল হলে দেখেছিলেন। সিবুলস্কি ব্যতীত উনি মার্চেলো মাস্ত্রিওয়ান্নির ছবির অভিনয় দেখতে ভালবাসতেন। ‘লা দলচে ভিতা’ দেখে উনি মুগ্ধ হন। সময় পেলে মার্চেলো মাস্ত্রিওয়ান্নির জনপ্রিয় ছবিগুলি যখনই কলকাতার কোনো প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হতো, উনি রাত্রির শোতে ছবিগুলি দেখতেন, উল্লেখ্য ছবিগুলি হলো— ‘ম্যারেজ ইতালিয়ান স্টাইল’, ‘ডিভোর্স ইতালিয়ান স্টাইল’, ‘ইয়েস্টারডে টুডে এ্যান্ড টুমরো’, ‘সানফ্লাওয়ার’, ‘দ্য প্রিস্টস ওয়াইফ’ প্রভৃতি ছবি।”

যে-কোনও সৃষ্টিশীল মানুষই, সম্পূর্ণরূপে ভ্রষ্ট না হয়ে গেলে, চেষ্টা করেন অবিরত শিখে যেতে, জীবন থেকে, মানুষের থেকে । তাই তাঁর সমসাময়িক বিদেশি বা দেশি চলচ্চিত্র, বা অভিনেতার কোনও কাজ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে নিজের অভিনয়ের ভঙ্গিতে তার কোনও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুরণন নিয়ে আসতে পারলেও বোঝা যায়, অভিনেতা নিরন্তর উন্নতির প্রচেষ্টায়। বাংলা ছবির সামগ্রিক চিন্তার দৈন্যে, এবং তাঁর নিজের ‘নায়ক’ ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তাঁর যে সংশয়— এই দুই চোরাবালির মধ্যেও অভিনেতা উত্তম চেষ্টা করেছিলেন তাঁর অভিনয়ের খাঁচাটিকে বিস্তৃত করতে।

আরও পড়ুন: ‘শুন বরনারী’-র হিমু-তে মিশে যান দুই উত্তমকুমার!
লিখছেন অমিতাভ নাগ…

এখানে, দুটো কথা স্পষ্ট বুঝে নেওয়া জরুরি, তা হল, এক, চলচ্চিত্র সম্পূর্ণরূপে পরিচালকের মাধ্যম । তাই সেখানে, পরিচালনা, চিত্রনাট্য বা ক্যামেরার কাজ খারাপ হলেও কোনও এক নায়ক অসাধারণ অভিনয় করেছেন ইত্যাকার কথা, যা আমাদের এই অশিক্ষিত মধ্যমেধার চত্বরে ঘোরে, বুঝতে হবে, সেটা ভুল, কারণ তার অর্থ— নায়ক তাঁরই পুরনো কোনও মুদ্রাদোষ, যা দর্শকধন্য, তাকে বারবার প্রয়োগ করে ওই এক মায়াবী বিভ্রম তৈরি করেছেন মাত্র। দ্বিতীয়ত, কোনও অভিনেতাই যে-কোনও চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারেন না। কারণ, সেটা অসম্ভব। যদি পরিচালকের কাজের মধ্যে, সাহিত্যিকের রচনায়, চিত্রকরের ব্রাশের টানে স্বকীয় শৈলী প্রত্যাশা করি, তাহলে অভিনেতা কোন জাদুবলে বারংবার নিজের স্বকীয় আচরণগত বৈশিষ্ট্যকে মুছে দিয়ে হবেন অন্য মানুষ? কেউ-ই হন না, তিনি যত বড় অভিনেতাই হন না কেন। হওয়ার প্রয়োজনও নেই। পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতা যদি চার্লি চ্যাপলিনকে ধরি, কই, তাঁকে তো বারবার বৈচিত্র্যের অভিসারী হতে হয়নি। কিন্তু জীবনের যে সত্যের কাছে তিনি আমাদের নিয়ে যান, সেই উপলব্ধির প্রান্তরে খুব কম অভিনেতাই তো নিয়ে যেতে পারেন— যে-কারণে গত প্রায় একশো বছর তাঁর নির্বাক থেকে সবাক ছবি প্রথম, দ্বিতীয় হয়ে তৃতীয় বিশ্বের মানুষের, আবালবৃদ্ধবণিতা— সকলের কাছেই সমান অর্থবাহী। তাই অভিনয়ের বৈচিত্র্যের চেয়েও বড় বিষয়, তা জীবনের গভীর সত্যকে উদ্ঘাটিত করতে পারছে কি না, আর সেই কাজটা পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সম্পাদক, চিত্রগ্রাহক ও অভিনেতার মিলিত অধ্যবসায়, একা অভিনেতার কর্ম নয়।

অশোকবাবুর উপরোক্ত চিঠির সত্যতা যাচাই করা আজ আর সম্ভব নয়। বিক্ষিপ্ত লেখাপত্র থেকে জানা যায়, উত্তমকুমার বিদেশি ছবি দেখতেন, হলিউড তো বটেই। এও প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানিতে জানা যায় যে, ‘আলো আমার আলো’ (১৯৭১)-র কোনও বিশেষ শটের পর নাকি উত্তমকুমার ও পরিচালক পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের কথোপকথন হয়েছিল ওই দৃশ্যের অভিনয় ‘জাজমেন্ট অ্যাট ন্যুরেমবার্গ’ (১৯৬১) ছবিতে কোর্টরুম সিনে মন্টেগোমারি ক্লিফটের অকৃত্রিম ও আবেগঘন অভিনয়ের সদৃশ। যাঁরা দুটো ছবিই দেখেছেন, তাঁরা বুঝবেন, এ-তুলনা অর্থহীন, এবং তার বড় কারণ, ওই যা বললাম, দু’টি ছবির চলচ্চিত্রীয় আবহের পরিষ্কার এবং সুস্পষ্ট তফাতের কারণেই এমনটি খুব সম্ভবপর নয়।

পাঁচের দশক থেকেই বিভিন্ন বিদেশি ছবির উৎসব এবং ছয়ের দশক থেকে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের জোয়ারে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র-অভিনয়ের কিছু-কিছু আধুনিক প্রবণতা কলকাতার দর্শকদের কাছে এসে পৌঁছেছিল। জিবগনেফ সিবুলস্কি ১৯৫৫-য় আঁদ্রে ভাইদার ‘আ জেনারেশন’-এ একটি গুরুত্বহীন রোলে পর্দায় নামলেও তাঁর আসল প্রকাশ ঘটে তিন বছর পরের ‘অ্যাশেজ এ্যান্ড ডায়মন্ডস’ ছবিতে। এই ছবিতে এবং পরে ‘ইনোসেন্ট সরসরার্স’ (১৯৬০)-এ সিবুলস্কির অভিনয়ে বারবার উঠে আসে অস্থিরতা, ভাঙা ছন্দ, গোপন ক্ষত— এক উত্তুঙ্গ শারীরিক অভিনয়, যার স্বর না হলেও, সুরের সঙ্গে হয়তো কোথাও মিল পাওয়া যাবে তোশিরো মিফুনের কিছু-কিছু অভিনয়ের, বা এক-দুই দশক পর ক্লাউস মারিয়া ব্রান্ডাউয়ারের, বিশেষ করে ইস্টভান জাবোর ছবিতে। অন্যদিকে সেই ষাটের শুরু থেকেই মূলত ফ্রেডেরিকো ফেলিনির ‘লা দলচে ভিতা’ (১৯৬০), ‘এইট এন্ড এ হাফ’ (১৯৬৩) এবং মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনির ‘লা নত্তে’ (১৯৬১) ছবিতে বাঙালিকে আচ্ছন্ন করেছিল মার্চেলো মাস্ত্রোইয়ান্নির পার্থিব অগম্য পুরুষত্ব— শহুরে ক্লান্তি, আত্ম-বিদ্রূপ, সৌন্দর্যের ভেতরে অনিশ্চয়তায় যার বিস্তার। আমরা এই লেখাতে দেখার চেষ্টা করব, সিবুলস্কি এবং মাস্ত্রোইয়ান্নি— এই দুই মেরুর আধুনিক অভিনয়কে উত্তমকুমার কি কোথাও বাঙালি ভদ্রলোকের সংযমে রূপান্তরিত করে তাঁর অভিনয়ের ব্যাকরণে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন?

জিবগনেফ সিবুলস্কি— ইউরোপীয় তরুণের নব্য আধুনিকতা 

সিবুলস্কি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পোলিশ চলচ্চিত্রে প্রচলিত প্রথাগত অভিনয়ের ধারাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর এই অস্থির, চঞ্চল শারীরিক ভঙ্গিতে হয়তো হলিউডের জেমস ডিন ও মার্লন ব্র্যান্ডোর মিল পাওয়া যেতে পারে । একধরনের কুঁজো হয়ে হাঁটার ভঙ্গি, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো, আপাত শান্ত অবস্থার ঠিক পরেই এক অনিয়ন্ত্রিত উন্মত্ততা। ভাইদা-র স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় সিবুলস্কি ‘অ্যাশেজ এ্যান্ড ডায়মন্ডস’-এ মাচেক চরিত্রটির মধ্যে নিজের অঙ্গভঙ্গি, আচরণ ও ব্যক্তিত্ব ঢুকিয়েছিলেন। এবং ক্রমাগত তাঁর হাঁটা, চকিতে ঘোরা, সামনে এগিয়ে আবার পিছিয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তাকে ধরতে ক্যামেরাকে বেশিরভাগ সময়েই দূর থেকে তাঁকে ধরতে হত। অর্থাৎ, ব্র্যান্ডোর মতোই সিবুলস্কির অভিনয়ের প্রধান ঘটনাটি মুখে নয়, গোটা শরীরে। এই যে অভিনয়ের ধরন, তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য ‘বিরোধ’। মাচেক প্রেমিক, অথচ খুনি; কৌতুকপ্রবণ, অথচ মৃত্যুর খুব কাছে; আকর্ষণীয়, অথচ গভীরভাবে বিপর্যস্ত। সে মনের মধ্যে যে অনুভূতি বহন করছে, অন্যদের সামনে, এমনকী, যে মেয়েটির সান্নিধ্যে সে সবচেয়ে নিরাভরণ, সেখানেও সে তার মধ্যেকার প্রকৃত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ প্রায় করেই না। শোকের জায়গায় ঠাট্টা, ভয়ের জায়গায় চঞ্চলতা, অন্তরঙ্গতার মুহূর্তে হঠাৎ দূরত্ব। আবেগকে সরাসরি ঘোষণা না করার ফলে দর্শক সংলাপের চেয়ে এই শারীরিক আচরণের মাধ্যমে চরিত্রের গভীরতাকে, তার উদ্বেগ-আশঙ্কাকে পড়তে শেখে।

উত্তমকুমারের পাঁচের দশকের যে রোম্যান্টিক অভিনয়, তার ভিত সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই অভিনয়ের রীতিতে তাঁর শরীর ও কণ্ঠ দর্শককে আশ্বস্ত করে। তাঁর নয়নাভিরাম হাসি, মাথার সামান্য ঝোঁক, মসৃণ উচ্চারণ, নায়িকার দিকে কোমল, মনোযোগী দৃষ্টি— সব মিলিয়ে আবেগের একটি ধারাবাহিক প্রবাহ তৈরি হয়। এই যে অনুপম দেবতুল্য পুরুষ, যে সহায় এবং সম্বল, তাই তো উত্তমকুমারের ‘মহানায়ক’ হয়ে ওঠার অবিসংবাদিত অভিজ্ঞান। কিন্তু ছয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর অভিনয়ের এই ধারাবাহিকতার ভেতর ফাটল দেখা যায়। চরিত্র যা বলছে এবং যা অনুভব করছে— দু’টির মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে। এই জায়গাতেই সিবুলস্কির সঙ্গে তুলনা হয়তো ফলপ্রসূ।

তপন সিংহ-র ১৯৬৪-র ছবি ‘জতুগৃহ’-র দিকে তাকালে দেখা যাবে, কীভাবে উত্তমকুমার মেলোড্রামার ঘোষণামূলক অভিনয় থেকে সরে আসছেন, অবশ্যই পরিচালকের বেঁধে দেওয়া অভিনয়ের মাত্রায়। ভেঙে যাওয়া দাম্পত্যের বেদনা তিনি কিন্তু শারীরিক উন্মত্ত অঙ্গভঙ্গি বা কণ্ঠের অতিরিক্ত কম্পনে প্রকাশ করেন না। বরং তিনি বসে থাকেন দীর্ঘ সময়, সংলাপের শেষে চোখ সরিয়ে নিয়ে প্রক্ষেপ করেন কোনও অনির্ণীত কোণে, বাক্যের শেষে একটি বিরতি দীর্ঘায়িত হয়। কখনও শরীর যেন সংলাপের আগেই জেনে গিয়েছে, সম্পর্কটি শেষ। এই অসম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়াই চলচ্চিত্র-অভিনয়ের আধুনিকতার লক্ষণ, যেখানে একধরনের অনিশ্চয়তা দর্শককে চমকিত করে— কারও অভিনয়ের উত্তুঙ্গ প্রকাশে, অন্য কারও আত্মনিমগ্ন স্বল্প প্রচারে।

সিবুলস্কির অভিনয়ের সঙ্গে এই পর্যায়ের উত্তমকুমারে অভিনয়ের পার্থক্য বোঝাটা এখানে জরুরি। সিবুলস্কি অন্তর্গত বিশৃঙ্খলাকে বাইরে বের করে আনেন শরীর-নিয়োজিত অভিনয়ের মাধ্যমে; উত্তমকুমার বহিরঙ্গের বিশৃঙ্খলাকে অন্তর্গত প্রায়-অনভিনয়ের অভিনয়ের অন্তরে টেনে নেন। সিবুলস্কির ছন্দ সংঘর্ষ, স্থৈর্য এবং বিস্ফোরণের দোলাচলে। উত্তমের ছন্দ সংযম, বিরতি, বিচ্যুতি এবং আত্মসংবরণে। বাঙালি ভদ্রলোকের সামাজিক শরীর প্রকাশ্য বিশৃঙ্খলাকে অনুমতি দেয় না; তাই উত্তমের কাছে সংযমই হয়ে ওঠে আবেগের বাহক।

উত্তমের অভিনয়ের এই দীর্ঘায়িত বিবর্তনের সবচেয়ে পূর্ণ প্রকাশ ঘটে দু’বছর পর সত্যজিত রায়ের ‘নায়ক’ ছবিতে। সিবুলস্কি অভিনীত মাচেকের কালো চশমা (যদিও তাতে চোখ দেখা যায়) যেমন মুখোশ, ‘নায়ক’-এর অরিন্দম মুখার্জির ক্ষেত্রে ‘উত্তমকুমার’ নামের তারকা-ব্যক্তিত্বই প্রকৃত ছদ্মবেশ। সত্যজিৎ রায় উত্তমকুমারের জনপ্রিয় ইমেজ মুছে না ফেলে তাকে নিজের মতো করে আরও পরিণত করেছেন। ট্রেনে যাত্রাকালে সহযাত্রীদের সঙ্গে সামাজিক মুহূর্তে অরিন্দমের মুখ স্থির, কণ্ঠস্বর মাপা, হাসি পেশাদার। যে-মুহূর্তে স্মৃতিচারণ বা স্বপ্নদৃশ্যে পদার্পণ, তখনই আপাত-সামাজিক ছন্দ ভেঙে যায়। অদিতির সঙ্গে কথোপকথনে তাই বিরতি একটু দীর্ঘ হয়, চোখ সামনের মানুষটির কাছ থেকে সরে যায়, মুখের তৈরি করা হাসি নিভে আসে। এই অভিনয়রীতিতে কোথাও সিবুলস্কির সঙ্গে গভীর আত্মীয়তা অলক্ষিত থাকে না: চরিত্র নিজের সম্পর্কে যে পরিচয় বহন করে, তার শরীর সেই পরিচয়কে পুরোপুরি সমর্থন করে না। কিন্তু সত্যজিৎ-উত্তমের অরিন্দমের বিস্ফোরণ হয় না, তিনি সামলে নেন, নিজেকে, পরিস্থিতিকে। দর্শককে তিনি অনুভূতি দেখান না; অনুভূতি গোপন করার শ্রম দেখান। এই ক্ষমতাই উত্তমকুমারের পরিণত অভিনয়ের অন্যতম স্বাক্ষর।

‘নায়ক’-এর একটি দৃশ্য

এখানে স্মরণ করব নিশ্চয়ই, সেই অবিস্মরণীয় চার মিনিটের স্বপ্নদৃশ্য, যেখানে অরিন্দম প্রথমে টাকার সমুদ্রে আত্মহারা হয়ে অচিরেই প্রলোভনের ফাঁদ বুঝতে পেরে পাগলের মতো পালতে গিয়েও শেষে টাকার চোরাবালিতে তলিয়ে যায়। ‘অ্যাশেজ এ্যান্ড ডায়মন্ডস’-এর শেষ তিন-চার মিনিটে আমরা দেখতে পাই এক ঘাতকের জীবন থেকে সাধারণ নাগরিকের জীবন পেতে মরিয়া মাচেক কারফিউ চলাকালীন অসাবধানতাবশত এক চেকপয়েন্টের মধ্যে ঢুকে পড়ে সামরিক প্রহরীদের গুলিতে আহত হয়। আমরা দেখতে পাই, আহত অবস্থায় টলমল পায়ে মাচেক এমন একটি প্রাঙ্গণে গিয়ে পড়ে যেখানে সাদা চাদর ঝোলানো ছিল—সেই চাদরগুলো তার রক্তে ভিজে যেনপোলিশ পতাকার সাদা-লাল রঙের আবহ তৈরি করে, এবং শেষ পর্যন্ত ছুটতে-ছুটতে মাচেক এক বিস্তীর্ণ আবর্জনার স্তূপের ওপর লুটিয়ে পড়ে মারা যায়, অনেকটা অরিন্দমের স্বপ্নদৃশ্যের মতোই।

১৯৬৩ সালের ‘শেষ অঙ্ক’-তে বিপত্নীক সুধাংশু সোমাকে বিয়ে করতে চায়, কিন্তু বিয়ের দিন একজন মহিলা এসে দাবি করে, সেই সুধাংশুর মৃতা স্ত্রী কল্পনা। যতবার সুধাংশু প্রমাণ করতে চায়, এই মহিলা কল্পনা নয়, বারংবার সে ব্যর্থ হয়। নিঃসঙ্গ, নগরজীবনের একাকিত্বে বিপর্যস্ত সুধাংশু চরিত্রে উত্তম যে-ধরনের নিরাসক্ত, প্রায়-অসাড় ভঙ্গি ব্যবহার করেন— কাঁধ ঝুঁকিয়ে হাঁটা, সিগারেটে টান দেওয়ার সময় চোখ আধবোজা রাখা, সংলাপের মাঝে দীর্ঘ বিরতি, এবং সবচেয়ে লক্ষণীয়, ক্যামেরার দিকে সরাসরি না-তাকিয়ে তির্যক কোণ থেকে দৃশ্য গ্রহণ করার প্রবণতা, সিবুলস্কির মাচেকের সঙ্গে আশ্চর্য মিল দেখা যায়, চরিত্রের প্রকাশভঙ্গির সুযোগের তারতম্য মেনেই। একই বছরের ‘উত্তরায়ণ’-এও যুদ্ধ-প্রত্যাগত এক সৈনিকের মানসিক বিপর্যয় ফুটিয়ে তুলতে উত্তম যে সংযত, প্রায়-স্তব্ধ অভিনয়শৈলী ব্যবহার করেন, তাতে পোলিশ ফিল্ম স্কুলের যুদ্ধোত্তর মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদের ছায়া স্পষ্ট— বিশেষত, নদীর সামনে একা বসে থাকা বা কলকাতার রাস্তায় একা হাঁটার দৃশ্যে, যেখানে সংলাপ প্রায় নেই বললেই চলে, অথচ শরীরী ভাষাই সমস্ত অন্তর্দ্বন্দ্ব বহন করে। আবার রতনের রূপ ধরে প্রবীর যখন প্রথম রাতে থেকে যায় রতনের স্ত্রী সতীর সঙ্গে, সেই রাতে আয়নায় নিজের মুখ দেখে দায়িত্ব, পুত্রহীনার প্রতি মমত্বে এত বড় মিথ্যের বোঝা বয়ে বেড়ানোর অন্তর্দ্বন্দ্বের দৃশ্যে আয়না ভেঙে ফেলার আবেগায়িত উন্মোচনে উত্তম বহির্মুখী। এখানে বলা যেতে পারে, পাঁচের দশকের মধ্যভাগের বেশিরভাগ ছবির তুলনায়, অর্থাৎ যে যুগ তাঁকে ‘মহানায়ক’ করে তুলেছিল, ছয়ের দশকের প্রথম দিক থেকেই উত্তমকুমারের সাজপোশাকেও একটি পরিবর্তন আসে, ধুতি-পাঞ্জাবির অনেকটাই পাল্টে খাটো বুশ শার্ট, চোখে মাঝেমধ্যে রোদচশমা, এবং ঠোঁটের কোণে এক বিশেষভাবে সিগারেট ধরার ভঙ্গি। পাঁচের দশকের পরিপাটি ধুতি-পাঞ্জাবি, এমনকী, স্যুট-পরা নায়কসুলভ ভাবমূর্তি থেকে এ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নাগরিক, প্রায়-বোহেমিয়ান ব্যক্তিত্ব। এই বাহ্যিক পরিবর্তনও সিবুলস্কির আইকনিক ভাবমূর্তির সঙ্গে একধরনের নান্দনিক সংলাপ স্থাপন করে এই অর্থে যে, নিজের প্রথাগত বাঙালিয়ানার বদলে উত্তম বিস্তৃত করতে চান তাঁর আধুনিক নাগরিক সত্তাকে। যেভাবে সিবুলস্কি প্রসারিত করেছিলেন যুদ্ধ-পরবর্তী পোলিশ নায়কের ভাবমূর্তিকে। লক্ষ্যণীয়, ক্যামেরার সঙ্গে উত্তমকুমারের সম্পর্কও কিয়ৎ বদলে যায়। আগে যেখানে ক্যামেরা সরাসরি তাঁর মুখের আবেগ ধারণ করত, এই পর্বে পরিচালকরা প্রায়ই তাঁকে আধো-অন্ধকারে, জানালার শিকের ছায়ায়, বা আয়নার প্রতিফলনে দেখাতে শুরু করেন। এ যেন একধরনের দৃশ্যগত রূপক, যা ইউরোপীয় আর্ট-হাউস চলচ্চিত্রের আলো-ছায়ার ব্যবহারের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।  

মার্চেলো মাস্ত্রোইয়ান্নি— ক্লান্তির অন্তর্গত সৌন্দর্য

সিবুলস্কির অস্থির তারুণ্যের অস্তিত্ববাদ যদি উত্তমকুমারের ছয়ের দশকের অভিনয়ে একধরনের অন্তর্মুখী গাম্ভীর্য যোগ করে, তবে মার্চেলো মাস্ত্রোইয়ান্নির প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবহ নিয়ে আসে। ফ্রেডেরিকো ফেলিনির ‘লা দলচে ভিতা’-য় মার্চেলো রুবিনি চরিত্রে মাস্ত্রোইয়ান্নি যে প্রাচুর্যময়, অথচ আত্মিকভাবে শূন্য আধুনিক জীবনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেন, তার মধ্যে একধরনের পরিশ্রমহীন ক্লান্ত সৌন্দর্য ও দিশাহীন, নিরাসক্ত পর্যবেক্ষকের ভঙ্গি ছিল। অনিতা একবার্গের সঙ্গে ত্রেভি ফাউন্টেনের বিখ্যাত দৃশ্যে তাঁর নির্লিপ্ত, প্রায়-শিশুসুলভ বিস্ময় এবং সাংবাদিক-জীবনের একঘেয়েমির প্রতি তাঁর ক্লান্ত ব্যঙ্গোক্তি, যার থেকে এই সাময়িক নিষ্কৃতি, এই দুইয়ের মধ্যে যে দ্বৈততা, তা মাস্ত্রোইয়ান্নির অভিনয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু। পরের বছর পিয়েত্রো জের্মির ‘ডিভোর্স ইতালিয়ান স্টাইল’-এ মাস্ত্রোইয়ান্নি এক সিসিলীয় ব্যারন চরিত্রে অভিনয় করেন, যেখানে গম্ভীর, আবারও আপাত নিষ্ক্রিয় মুখাবয়বের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তীক্ষ্ণ প্রহসন, যা কমিক অভিনয় না-করেও তৈরি করে এক কমিক আবহ। ১৯৬৪ সালে ভিত্তোরিও ডি সিকা-র ‘ম্যারেজ ইতালিয়ান স্টাইল’-এ সোফিয়া লরেনের বিপরীতে মাস্ত্রোইয়ান্নি এক দীর্ঘমেয়াদি প্রেম ও প্রতারণার জটিল রসায়ন ফুটিয়ে তোলেন হালকা, প্রায়-নির্লিপ্ত কমিক টাইমিং দিয়ে। তার আগের বছর আবার ডি সিকা-র ‘ইয়েস্টারডে, টুডে অ্যান্ড টুমরো’-তে তিনটি ভিন্ন ছোট আখ্যানে তিনটি ভিন্ন প্রেমিক দম্পতির চরিত্রে অভিনয় করেন লরেন ও মাস্ত্রোইয়ান্নি। নেপলসের দরিদ্র পাড়া থেকে মিলানের ধনী শিল্পপতি পরিবার পর্যন্ত একই ধরনের সূক্ষ্ম কৌতুকবোধের বিভিন্ন স্তরে অভিনয় করেন মাস্ত্রোইয়ান্নি। সন্দেহ নেই, অচিরেই মাস্ত্রোইয়ান্নি ‘ল্যাটিন লাভার’ প্রতিমার আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা হয়ে ওঠেন। কিন্তু তা শুধু তাঁর যৌন আকর্ষণের কারণে নয়, বরং অনেক বেশি করে আধুনিক জীবনের নিষ্করুণ বৈপরীত্য ও ক্লান্তির এক সুন্দর অথচ ভয়ংকর প্রকাশ তাঁর অভিনয়ে ছিল বলেও। মাস্ত্রোইয়ান্নির অভিনয়ের আরোহণ এখানেই যে, তিনি কৌতুকের মাধ্যমে তাঁর উত্তুঙ্গ গ্ল্যামার নষ্ট করেন না, তিনি নৈরাশ্যের প্রান্তে দাঁড়িয়ে গ্ল্যামারের ভেতরেই শূন্যতা তৈরি করেন। শরীরের সামান্য ঢলে পড়া, দীর্ঘ দৃষ্টি— যা কখনও সরল, অন্যত্র বাঙ্ময়, উত্তর দেওয়ার অনীহা, কথিত সংযোগ যেন অবান্তর, এবং ঠোঁটে ধরা সিগারেটের সঙ্গে তাঁর অলস প্রীতি, সব মিলিয়ে আধুনিক পুরুষের নাগরিক ক্লান্তিকে মাস্ত্রোইয়ান্নি ফোটোজেনিক করে তোলেন।

মাস্ত্রোইয়ান্নির অভিনয়ের কেন্দ্রেও থাকে দ্বন্দ্ব, সিবুলস্কির মতোই, কিন্তু ভিন্ন গোত্রের। মাস্ত্রোইয়ান্নির ক্ষেত্রে তা চরিত্রের আত্মবিশ্বাস ও অভিনেতার সূক্ষ্ম আত্ম-বিদ্রূপ। উত্তমের ছয়ের দশকের পরিণত অভিনয়ের সঙ্গে এই সূত্রটির বিশেষ মিল। তাঁর অভিনীত ভদ্র, সুসজ্জিত, শিক্ষিত পুরুষেরা ক্রমশ আর নিশ্চিত নন। ‘জতুগৃহ’-র শতদল বা ‘নায়ক’-এর অরিন্দম— দু-জনেরই বাহ্যিক সভ্যতার আবরণটি হয়ে ওঠে ভেতরের ভাঙনের ধারক। উত্তমকুমার ‘নায়ক’-এ যে অভিনয় করেন, বিশেষ করে স্বপ্নদৃশ্যে আত্মবিলোপের আতঙ্ক, বালিশে মুখ গুঁজে ঘুমের মধ্যেও অস্থিরতার প্রকাশ, অদিতির সামনে ধীরে-ধীরে আত্মরক্ষার বর্ম খুলে ফেলা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিজের তারকা-ভাবমূর্তি নিয়ে একধরনের আত্মপরিহাসমূলক দূরত্ব বজায় রাখা, এর মধ্যে নায়ক নিজের গ্ল্যামারকেই বিশ্লেষণের বিষয় করে তোলেন। এবং মদ্যপ দৃশ্যে উত্তমকুমারের শরীরী ভাষা, কথার মাঝে দীর্ঘ থমকে যাওয়া, চোখে এক বিশেষ ক্লান্ত-কৌতুকময় দৃষ্টি, এসবই সরাসরি মাস্ত্রোইয়ান্নির বিখ্যাত ভঙ্গিকে স্মরণ করায়, যেখানে বিপর্যয়ও একধরনের কমনীয়তা নিয়ে উপস্থিত হয়, নাগরিক পুরুষের বিড়ম্বনার মধ্যে নিহিত থাকে মাধুর্য। ‘নায়ক’-এর অরিন্দম কখনওই সহানুভূতি প্রার্থনা করে না, নিজের দুর্বলতাকে প্রায় হালকা চালে, কৌতুকমিশ্রিত আত্মবিদ্রুপের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে, যা বাংলা ছবির প্রথাগত ট্র্যাজিক নায়কের কান্নাভেজা আত্মকরুণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নিবেদন। অবশ্যই, গোড়ার কথা মতো, এই পুরোটাই সাধিত হয়েছে সত্যজিতের প্রখর নির্দেশে, যেমন মাস্ত্রোইয়ান্নি উন্মোচিত হয়েছেন কখনও ফেলিনি, কখনও ডি সিকা বা কখনও আন্তোনিওনির অন্তর্দৃষ্টির আলোকে। মাথায় রাখতে হবে, অরিন্দম উত্তম নয়, কিন্তু সত্যজিৎ বিলক্ষণ জানতেন, দর্শকের উত্তম-স্মৃতি ছাড়া অরিন্দমের পূর্ণ অর্থ তৈরি হয় না। নারীরা অরিন্দমের দিকে তাকায়, কারণ বাংলা দর্শক উত্তমের দিকে তাকাতে অভ্যস্ত। তার হাসি কারুণ্যের মধ্যেও বিশ্বাসযোগ্য, কারণ তা বহু বছরের রোম্যান্টিক স্মৃতি বহন করে চলেছে, তাই সেই হাসি যখন মুখোশে পরিণত হয়, তার আঘাতও তীব্র হয়ে ওঠে দর্শকের মনে।

‘নায়ক’ তাই শুধু উত্তমকুমার-অভিনীত একটি মহানায়ক বিনির্মাণের ছবি নয়, বরং বাংলা তারকা-প্রথার সঙ্গে ইউরোপীয় ব্যক্তিত্ববাদী অভিনয়-দর্শনের এক সচেতন যোগসূত্র। এই যোগাযোগের ভিত্তিস্থলেই আমরা সিবুলস্কি ও মাস্ত্রোইয়ান্নি, দুই ভিন্ন ইউরোপীয় ঐতিহ্যের এক আশ্চর্য মিলনস্থল খুঁজে পাই। সিবুলস্কির তুলনাযোগ্য অরিন্দমের ভেতরের দমবন্ধ অস্থিরতা, বিরতি, চরিত্র ও আচরণের অসামঞ্জস্য। আর মাস্ত্রোইয়ান্নির তুলনাযোগ্য তারকা-ইমেজের আত্মসমালোচনা, শহুরে ক্লান্তি, এক যৌন-শ্রান্ত আকর্ষণীয় পুরুষের নাটকীয় অনিশ্চয়তা। কিন্তু উত্তমকুমারের নিজস্বতা হল— তিনি কোনওটিই সম্পূর্ণ গ্রহণ করেন না। মাচেকের মতো তাঁর শরীর ছিটকে পড়ে না, মার্চেলোর মতো সম্পূর্ণ নৈরাশ্যে ভেসেও যায় না। সত্যজিৎ-উত্তমের অরিন্দম নিজেকে সামলায়, কারণ সেই সামলানোর ভেতর দিয়েই ভাঙন দৃশ্যমান হয়।

সাতের দশকের মাঝ থেকেই কিছু ভূমিকায়, যেখানে বয়স ও অসুস্থতার ছায়া উত্তমকুমারের শরীরী ভাষাকে ধীর করে দিয়েছে, সেখানেও ‘সানফ্লাওয়ার’-এর সেই ক্লান্ত, স্মৃতিভারাক্রান্ত অথচ মর্যাদাপূর্ণ পুরুষের প্রতিমা যেন অলক্ষ্যে কাজ করেছে। বিশেষত এমন চরিত্রে, যেখানে অতীতের প্রেম বা সামাজিক সংকটের ক্ষত বহন করতে হয়, এবং যেখানে অভিনেতাকে শারীরিক ক্লান্তিকেই অভিনয়ের উপকরণ করে তুলতে হয়েছে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পার্থপ্রতিম চৌধুরীর ‘যদুবংশ’ (১৯৭৪), যা উত্তমকুমারের শ্রেষ্ঠতম অভিনয়ের তালিকায় একেবারে শীর্ষে থাকার উপযুক্ত। এমনকী, পরের বছরের ‘অমানুষ’-ও মনে আসতে পারে, যার নায়ক মধু রোম্যান্টিক নায়ক হয়েও তারুণ্য-উত্তর। কিন্তু উত্তমের ভাবমূর্তির জন্যই হয়তো দর্শক বিশ্বাসঘাতকতা, অপমান, মদ্যপান ও সামাজিক পতনে জর্জরিত উত্তর-তরুণ মধুর ভেতরে পুরনো আকর্ষণীয় নায়ক উত্তমকুমারকে দেখতে পায়। সেই স্মৃতি ছাড়া মধুর পতন এত বেদনাদায়ক হত না। এখানেই আবারও ‘সানফ্লাওয়ার’-এর সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী নান্দনিক সম্পর্ক: দুই ক্ষেত্রেই তারকার সৌন্দর্য বর্তমান না থেকেও সৌন্দর্যের এক অপরূপ স্মৃতি থেকে যায়। এই অতীত ইমেজের ভারই সত্তরের উত্তমের অভিনয়কে নতুন গভীরতা দেয়।

সিবুলস্কি ও মাস্ত্রোইয়ান্নির থেকে তাঁর অভিনয়ে প্রত্যক্ষভাবে উত্তমকুমার কিছু গ্রহণ করেছিলেন কি না (যেমন মন্টেগোমারি ক্লিফটের থেকে, যা নিজেই ঘোষণা করেন) তা জানা যায় না। কিন্তু  এঁদের অভিনয়ের প্রতি তাঁর আপাত, প্রচ্ছন্ন ভাল লাগা ধরে হাঁটলে তাঁর অভিনয়ের বিবর্তনের এক সম্ভাব্য হেতু অবশ্যই চোখে পড়ে। উত্তমকুমারের মুনশিয়ানা এই যে এই সম্ভাবনাগুলোকে তিনি বাংলা জনপ্রিয় ছবির রোম্যান্টিক ও মেলোড্রামাটিক ব্যাকরণের ভেতরে বসান। আর সেটা করতে গিয়েই তিনি আর শুধু অনুভূতি প্রকাশ করেন না, অনুভূতি গোপন করার পদ্ধতিও অভিনয় করেন। তিনি প্রৌঢ়ত্বে শুধু নায়ক নন, নায়ক হয়ে থাকার ক্লান্তিটাও অভিনয়ে নিয়ে আসেন। উত্তমকুমারের অভিনয়শৈলীর এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন, যা কিন্তু ‘নায়ক’-এর আগে থেকেই তিনি সচেতন অভিলাষে নিয়ে আসেন।

তাই, বাংলার নাগরিক মধ্যবিত্তের নিজস্ব সংকট, নিজস্ব রসবোধ ও নিজস্ব সংযমের ভাষা উত্তমকুমারের অভিনয়ের মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়। আন্তর্জাতিক নন্দনতত্ত্বের আত্মীকরণ ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক শিকড়ের প্রতি আনুগত্য, এই দ্বৈত অর্জন, এই ছায়ার আড়ালে ছায়া হয়ে থাকতে পারাই সম্ভবত উত্তমকুমারের অভিনয়-প্রতিভার সবচেয়ে কম আলোচিত, অথচ অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক।