চোখ-কান খোলা: পর্ব ৩১

Representative Image

‘এআই’ ও জলসংকট

‘এআই’ কি আগামীদিনে জলসংকটের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে? প্রাথমিকভাবে এই প্রশ্ন চমকে দেওয়ার মতনই! বিশ্ব এখন এ-সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। একটা ডিজিটাল মাধ্যম, তাকে যখন যা প্রশ্ন করা হচ্ছে, কিছু-না-কিছু উত্তর সে অনায়াসে দিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তার সঙ্গে জল কিংবা জলসংকটের কী সম্পর্ক?

বিস্তারে আসা যাক; আসলে ‘এআই’ বলতে আমরা যা বুঝি, ‘চ্যাটজিপিটি’, ‘জেমিনি’, ‘কোপাইলট’, ‘ক্লড’ বা ‘মিডজার্নি’— এগুলি প্রতিটিই এক ধরনের ‘বৃহৎ ভাষা মডেল’, (লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল) যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই সামগ্রিক ‘এআই’-ব্যবস্থাপনার পেছনে কাজ করে— বিরাট বড় ডেটা-সেন্টার। মূলত তিনটি কারণে এই ডেটা-সেন্টারগুলি ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকে। এক, নতুন-নতুন বিষয়ে নিজেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, দুই, কয়েক হাজার কোটি ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর তৈরি করা এবং সর্বোপরি, বিরাট পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করা।

সমস্যা হল, একসঙ্গে বৃহৎ পরিমাণ কাজ করার জন্য, ডেটা-সেন্টার/সার্ভারগুলি প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন করে। এই তাপকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, সার্ভারগুলি বিকল হয়ে যাওয়ার প্রভূত সম্ভবনা। তাই, সার্ভারগুলিকে ঠান্ডা করার জন্য, ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক ‘কুলিং সিস্টেম’, যার একটা বড় অংশ নির্ভর করে জলের উপর। এই নির্ভরতা কিন্তু সামান্য নয়, বিপুল পরিমাণ। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রিভারসাইড প্রজেক্ট’-গবেষকদের তথ্য বলছে, ‘এআই’-কে ২০ থেকে ৫০টি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে, ডেটা-সেন্টারের কুলিং সিস্টেমের জন্য ব্যবহৃত হয়, প্রায় আধলিটার জল। এবারে সারাদিন, সারা পৃথিবীজুড়ে কয়েকশো কোটিরও বেশি প্রশ্ন এআইয়ের কাছে আসছে, সে তিনভাবে সে’টি প্রক্রিয়াকরণও করছে, এই সামগ্রিক ব্যবস্থায় কত পরিমাণ জল লাগতে পারে, সেই গাণিতিক আন্দাজটাই শিউরে ওঠার মতো!

কেন মানুষের উপরে বাঘের আক্রমণ দিন-দিন বেড়ে যাচ্ছে?
পড়ুন: চোখ-কান খোলা পর্ব ৩০…

সময় যত এগোচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের কাজেই অনেকাংশে ‘এআই’ নির্ভর হয়ে পড়ছে মানুষ। সে যখন যা চাইছে, ছবি নির্মাণ থেকে প্রেমপত্র লেখা, সামান্য থেকে সামান্যতম— সব প্রশ্নই এআইয়ের কাছে রাখছে। যেহেতু বহুল পরিমাণ এআই ব্যবহারের সমস্যা মানুষ সরাসরি বুঝতে পারে না, এ-বিষয়ে সচেতনতা তৈরিও মুশকিল হয়ে উঠছে পরিবেশবিদদের কাছে।

২০২৫ সালে ‘ওপেনএআই’ একটি পরিসংখ্যানে জানিয়েছিল, ‘চ্যাটজিপিটি’-কে প্রতিদিন গড়ে ২.৫ বিলিয়ন (২৫০ কোটি) প্রম্পট বা প্রশ্ন করা হয়েছে। আগের গাণিতিক হিসেব ধরলে, ডেটা-সেন্টারের জন্য বছরে প্রয়োজন হচ্ছে, প্রায় ৯১২ কোটি ৫০ লক্ষ লিটার জল, যা প্রায় ৩,৬৫০-টি অলিম্পিক সাইজ পুলের সমান। (একটি অলিম্পিক সাইজ পুলে, ২৫ লক্ষ লিটার জল থাকে) মানুষের কথা ধরলে, ভারতের মতো দেশে একজন শহুরে মানুষের ব্যবহৃত জলের গড় পরিমাণ, দৈনিক ১৩৫ লিটার। অর্থাৎ যে-পরিমাণ জল, ‘এআই’-তে এক বছরে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা দিয়ে ভারতের মতো দেশে, ৭ লক্ষ মানুষের দৈনিক এবং ২ কোটি ৫৬ লক্ষ ৮৫ হাজার মানুষের  বাৎসরিক জল-চাহিদা মেটানো সম্ভব। তাহলে যন্ত্র-মানুষের এই লড়াইতে জিতবে কে?

জাতিসংঘ (ইউনাইটেড নেশনস) প্রকাশিত সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ২০০ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন— বিশ্বের বহু অঞ্চলে জলের সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আফ্রিকার বহু দেশ, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, মেক্সিকো এবং আমেরিকার কিছু অংশ ইতিমধ্যেই চরম জলসংকটের মুখে পড়েছে। উল্টোদিকে বিভিন্ন বড়-বড় কোম্পানি, নতুন ডেটা-সেন্টার বানিয়ে চলেছ। তথ্যর ভারই কি মানবসভ্যতায় আগামীদিনের সংকট ঘনিয়ে আনছে? শিয়রে কিন্তু অশনি সংকেত!

‘নীতি আয়োগ’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৬০ কোটি মানুষ, ‘চরম জলসংকটপূর্ণ’ অঞ্চলে বাস করেন। দেশের বড় শহরগুলিতে, ভূগর্ভস্থ জলস্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। বেঙ্গালুরু, চেন্নাই কিংবা দিল্লির মতো শহরগুলিতে, গ্রীষ্মকালে জলের অভাব এখন রোজকার সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় মানুষকে ট্যাঙ্কারের জলের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় ‘এআই’-এর জন্য অতিরিক্ত জল-ব্যবহার, ভবিষ্যতে আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে জলস্তরে।

একাধিক দেশে ‘এআই’ ও জলসংকট নিয়ে ইতিমধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, চিলির কথা বলা যায়। চিলির কিছু অঞ্চলে, প্রযুক্তি সংস্থাগুলির ডেটা-সেন্টার সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে, স্থানীয় মানুষ প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই ডেটা-সেন্টারগুলির অতিরিক্ত জল ব্যবহার, এলাকার ভূগর্ভস্থ জলস্তরের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই ধরনের উদ্বেগ দেখা গেছে আমেরিকার অ্যারিজোনা ও টেক্সাসের মতো শুষ্ক অঞ্চলগুলিতেও।

তবে এর একটা উল্টোদিকও আছে। বর্তমানে নানা জায়গায় ‘এআই’ ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিক্ষেত্রে, স্মার্ট সেচ ব্যবস্থায়। উদাহরণস্বরূপ, বেশ কিছু কৃষি প্রকল্পে, ‘এআই’ মাটির আর্দ্রতা বিশ্লেষণ করে ঠিক কতটা জল প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে সাহায্য করছে। এর ফলে জল অপচয় কমছে। আবার, অনেক শহরে, ‘এআই-ভিত্তিক’ সেন্সর ব্যবহার করে, পাইপলাইনের লিক শনাক্ত করা হচ্ছে, যার ফলে তৈরি হচ্ছে জল-অপচয় রোধের সম্ভবনা। ‘এআই’ ব্যবহার করে, বন্যা-পূর্বাভাস ব্যবস্থারও উন্নতি হয়েছে। কিন্তু, এসব ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে — ‘খাজনার থেকে বাজনা বেশি’— এ-জাতীয় পরিস্থিতি। একটু বাঁচাতে গিয়ে, নেপথ্যে তৈরি হচ্ছে বিরাট সংকট!

‘নীতি আয়োগ’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৬০ কোটি মানুষ, ‘চরম জলসংকটপূর্ণ’ অঞ্চলে বাস করেন। দেশের বড় শহরগুলিতে, ভূগর্ভস্থ জলস্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। বেঙ্গালুরু, চেন্নাই কিংবা দিল্লির মতো শহরগুলিতে, গ্রীষ্মকালে জলের অভাব এখন রোজকার সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় মানুষকে ট্যাঙ্কারের জলের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় ‘এআই’-এর জন্য অতিরিক্ত জল-ব্যবহার, ভবিষ্যতে আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে জলস্তরে।

উপরি ঝামেলা প্রতিযোগিতা! সারা বিশ্বে, নির্মাণ-স্তরে— ‘এআই’ মূলত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে এগোচ্ছে। বলা ভাল নিজেকে ‘উন্নততর’ করছে। কোন সংস্থা আরও শক্তিশালী ‘এআই’ তৈরি করতে পারবে, কার প্ল্যাটফর্মে বেশি ব্যবহারকারী থাকবে, কে দ্রুততর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে— এই প্রতিযোগিতার মধ্যে পরিবেশগত প্রশ্নগুলি গুরুত্ব হারাচ্ছে। ভারতে, ‘গুগল’, ‘মাইক্রোসফ্‌ট’, ‘আদানি’র মতো প্রযুক্তি-সংস্থাগুলি, বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে নতুন ডেটা-সেন্টার তৈরিতে; কিন্তু সেই ডেটা-সেন্টারগুলির দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত কুপ্রভাব নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক স্তরে কোনও নিয়ন্ত্রণ/আইন তৈরি হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশ বছরে ‘এআই’ ব্যবহারের হার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে ডেটা-সেন্টারের সংখ্যা, বিদ্যুতের ব্যবহার এবং কুলিং সিস্টেমের প্রয়োজনও বাড়বে। যদি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার না করা হয়, তাহলে ‘এআই’ ভবিষ্যতের অন্যতম বড় পরিবেশগত চাপ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে, যেখানে এখনও লক্ষ-লক্ষ মানুষ নিরাপদ পানীয় জল পান না, সেখানে এই সংকট আরও ভয়াবহ হতে পারে।

একুশ শতকে, ‘এআই’ হয়তো ভবিষ্যৎ বদলাচ্ছে, ‘টাইম ইজ মানি’— এই ধারণাটুকু ‘এআই’ উন্নত হওয়ার পর, আরও স্বীকৃতি পেয়েছে ইঁদুর দৌড়ের এই দুনিয়ায়। কিন্তু জলস্তর যে শুকিয়ে যাচ্ছে! মানুষ যদি এখনই সচেতন না হয়, সরকার কিংবা আন্তর্জাতিক স্তরে যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, সমূহ বিপদ আসন্ন। একসময়ে ছেলেমেয়েরা স্কুল-স্তরে রচনা লিখত, ‘বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ’, বর্তমানে ‘এআই’ এসে, সবটা প্রতিস্থাপন করে দিয়েছে। ‘এআই’ ভাল না কি মন্দ, আশীর্বাদ না কি অভিশাপ— সে-বিচারে না গিয়ে, কীভাবে সবচেয়ে কম পরিমাণ জল ব্যবহার করে, ‘এআই’কে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা যায়, বিজ্ঞানীমহলের সে-দিকে নজর দেওয়া উচিত।