আমিষ-সফর

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এক ভয়ংকর ডিম-কাল শুরু হয়েছে বঙ্গজীবনে। তৃণমূলের ছোট-বড় নেতাদের দিকে ‘জনরোষ’ হিসেবে এন্তার ডিম ছোড়ার দৃশ্য দেখে-দেখে, কখন যে ডিমের দাম বেড়ে গেছে, সে-খেয়াল নেই। ইতিমধ্যে আবার কলকাতার বেশ কিছু স্কুলের মিড-ডে-মিলের দায়িত্ব ‘ইসকন’-কে দেওয়াতে এবং তাদের নিরামিষ আহারে শিশুর পাত থেকে ডিম বাদ পড়া নিয়ে প্রবল হইচই, নানা মতবাদ। ডিম, পনির, রাজমা, সোয়াবিন…! কে কার বিকল্প, কার কত পুষ্টিগুণ, সেসব নিয়েও সমাজমাধ্যমে চলছে নানান কাটাছেঁড়া। এমনকী, ওইসব ‘‘দুর্নীতিগ্ৰস্ত’‘ নেতাদের দিকে রাশি-রাশি ডিম ছোড়া, যে আদতে ‘পুষ্টি’ ছুড়ে তুষ্টি লাভ, সে-নিয়েও চর্চা চলছে সমানতালে।

শুধু কী ডিম, ভোটের আগে-আগে মাছ নিয়েও একপ্রস্থ চাপান-উতোর চলেছিল রাজনৈতিক দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে। ফলস্বরূপ ভোটের ফলে জিতে বিজেপিকে দিকে-দিকে তাদের জয়োল্লাসের আহারে প্রমাণ দিতে হল, তারা রীতিমতো মাছে-ভাতে বাঙালি। রাজনীতির ময়দানে এই ডিম, মাছের সূত্রে উঠে আসছে বাঙালির দীর্ঘকালের খাদ্য-সংস্কৃতি বা দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বাঙালির আজকের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে চর্চা।

বাঙালির রন্ধনচর্চার দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ১৮৩১ সালে প্রথম বাঙালির কলমে বাংলা ভাষায় লেখা রান্নার বই ‘পাক-রাজেশ্বর’, লেখক বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কার। সংস্কৃত ও বাংলায় লেখা সেই বইয়ের মধ্যে মাছ, মাংসের ছড়াছড়ি। আছে ভালভাবে মাছ ধোওয়া (মৎস্য ধৌতং) এবং কাঁটা বাছার পদ্ধতি (মৎস্যের কন্টক স্বিন্ন প্রকরণ), আছে মাংসের গুণমানে কচি পাঁঠা, বয়স্ক খাসির ভাল-মন্দ নির্ণয়। এছাড়াও পরিবেশন কালে, আহার-সজ্জা স্বরূপ বলা আছে— থালার মধ্যিখানে অন্ন। দালি-ঘৃত-মাংস-শাক-পিষ্টান্ন মৎস্য থাকবে ভোক্তার দক্ষিণে। ঝোল-দুধ-পানীয় জল, চোষ্য-লেহ্য-আচার থাকবে বামে। পঞ্চান্ন-পায়স, দধি ইক্ষুগুড়— মধ্যে দুই পংক্তি করে সম্মুখে দাতব্য।

আরও পড়ুন: বিরিয়ানির সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক আশ্চর্য এক সুতোয় গাঁথা!
লিখছেন সৌমিত দেব…

আমাদের নিত্য-আহারে মাছ-ডিম-মাংসের উপস্থিতিকে বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে চর্যাপদের কাল থেকে মাছ ধরা, পশু শিকারের বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায় সেই সময়কালেও মানুষের খাদ্যাভ্যাসে মাছ, মাংসের চল ছিল। পরবর্তী সাহিত্য নিদর্শন ‘চন্ডীমঙ্গল’-এর কালকেতু তো জাতে নিষাদ, ফলে তার খাবারে জংলি পশুপাখি তো আছেই, তার খাদ্যতালিকায় বুনো আলু-ওল, কচুর ঘন্ট যেমন আছে, তেমনই আছে হরিণ, বুনো শুয়োর, সজারু, এমনকী, গোসাপের মাংস পর্যন্ত। কবিকঙ্কণের কলমে— গোধিকা দেখিয়া বীর করিছে তর্জন/ তোমারে পোড়ায়্যা আজি করিব ভক্ষণ। বাড়ি ফিরে ফুল্লরার প্রতি— গোধিকারে বান্ধি আছি রাখি জালদড়া/ ছাল খসাইয়া প্রিয়ে কর সিকপোড়া।

অন্যদিকে সম্ভ্রান্ত সওদাগর ধনপতির দুই রন্ধন-পটিয়সী স্ত্রী লহনা আর খুল্লনার রান্নাবান্নায় উঠে আসে নানাবিধ স্বাদের অজস্র পদ। আমিষ পদ হিসেবে উল্লেখ্য— আলু আর কুমড়াবড়ি দিয়ে চিতলের ঝোল, আদার রস দিয়ে কই মাছ ভাজা, রুইমাছের মুড়ো, সরল-সফরী (পুঁটি) মাছ ভাজা এবং বদরি-সকুল (কুল দিয়ে শোল মাছের টক)। শুধু যে রকমারি মাছ, তা-নয়, সবান্ধবে ধনপতি সওদাগর বসেছেন খেতে, খুল্লনা রেঁধেছেন পঞ্চাশ ব্যঞ্জন অন্ন। পরিবেশনের প্রথমেই— ‘সুকুতা ঝোল সূপ ঘন্ট সাক’, তারপর ‘ভাজা মীন, শোল ঘন্ট, মাংসের বেঞ্জন’ আর শেষ পাতে— দধি পিঠা মিঠা মধুর পায়স। ‘চন্ডীমঙ্গল’ বাদ দিয়েও মধ্যযুগের অন্যান্য কাব্যসাহিত্যে মাছের বিচিত্র রান্নার সন্ধান মেলে, মরিচ দিয়ে রুই মাছের ঝোল, কাঁঠালবিচি দিয়ে চিংড়ির তরকারি, আম অথবা তেঁতুল দিয়ে শোল মাছের অম্বল, ভেটকি বা আড় মাছের ঝাল। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এ, ‘রন্ধন’-এর অপরূপ চিত্র মেলে— হাস্যমুখী পদ্মমুখী আরম্ভিলা পাক। শড়শড়ি ঘন্ট ভাজা নানামত শাক। তারপর ছোলা-অড়হরের ঘন ডাল, নারকেল কুরো দিয়ে কলা মুলার বড়া, শুক্তো, ডালনা, তিল-পাটালি দিয়ে লাউ-বেগুন-কুমড়োর তরকারি। এইভাবে— নিরামিষ তেইশ রান্ধিলা অনায়াসে। আরম্ভিলা বিবিধ রন্ধন মৎস্য-মাসে।।/ কাতলা ভেটকি কই ঝাল ভাজা কোল। সীকপোড়া ঝুরী কাঁটালের বীজে ঝোল।।/ কন্ঠা রান্ধি রান্ধে কই কাতলার মুড়া। তিত দিয়া পচামাছে রান্ধিলেক গুঁড়া।।/ আম্র দিয়া শৌলমাছে ঝোল চড়চড়ি। আরি রান্ধে আদা-রসে দিয়া ফুলবড়ি।।/ রুই-কাতলার তৈলে রান্ধে তৈলশাক। মাছের ডিমের বড়া মৃতে দেয় ডাক।।/ বড়া কিছু সিদ্ধ কিছু কাছিমের ডিম। গঙ্গাফল তার নাম অমৃত অসীম।।/ অন্য মাংস সীকভাজা কাবাব করিয়া। রান্ধিলেন মুড়া আগে মশলা পুরিয়া।। — মাছ-মাংসের পর অম্বল, চাটনি তারপর পিঠা-মিঠা ও পরমান্ন।

মহাভারতেও ঘিয়ে পাক করা মাংস-মিশ্রিত অন্নের প্রসঙ্গ আছে। নল-দময়ন্তীর যে সুপরিচিত কাহিনি, সেখানে নল একজন দক্ষ পাচক। ১৮৩১-এ বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কার তাঁর ‘পাক-রাজেশ্বর’ গ্ৰন্থের ভূমিকায় নিষধরাজ্যের নৃপতি নল-বিরচিত ‘পাকদর্পণ’ গ্ৰন্থের উল্লেখ করেছেন। এই গ্ৰন্থে রন্ধন-সংক্রান্ত শ্লোকগুলিই সর্বাধিক প্রাচীন রান্না চর্চার নিদর্শন। এখানেও, মাংসমেশানো ভাত রান্নার প্রসঙ্গ আছে এবং পদটিকে সুগন্ধি করার জন্য কেয়াফুলের পাপড়ি, কর্পূর ও কস্তুরী মিশিয়ে অল্প আঁচে রেখে গরম-গরম পরিবেশন করার কথা আছে। এই সুগন্ধযুক্ত পলমিশ্রিত অন্ন তো আদতে আজকের বিরিয়ানির রেসিপি।

আবার দ্বাদশ শতাব্দীর কবি শ্রীহর্ষ তার ‘নৈষধচরিত’ কাব্যে, নল-দময়ন্তীর জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহের ভোজসভায় প্রচুর শাকসবজি, মাছের অজস্র পদের সঙ্গে হরিণের মাংস ও ছাগল-ভেড়ার মাংসের উল্লেখ করেছেন। তবে এগুলি সবই সংস্কৃত ভাষায় বর্ণিত। বাংলা ভাষায় বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কারের পর উল্লেখযোগ্য গ্ৰন্থ হল ১৮৫৮ সালে গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের ‘ব্যঞ্জন-রত্নাকর’। মনে রাখা দরকার, বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কারের ‘পাক-রাজেশ্বর’ এবং গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের ‘ব্যঞ্জন-রত্নাকর’ উভয় গ্ৰন্থের নেপথ্যে উৎসাহ ও আর্থিক ব্যয় জুগিয়েছিলেন তৎকালীন বর্দ্ধমানাধিপতি মহাতাব চন্দ।

‘সুবর্ণরেখা’ প্রকাশিত (২০০৪) ‘পাক-রাজেশ্বর’ ও ‘ব্যঞ্জন-রত্নাকর’ বাংলা ভাষায় প্রথম দু’টি গ্ৰন্থের ‘প্রসঙ্গ কথা’-য় শ্রীপান্থর লেখনী সূত্রে জানা যায়, উক্ত গ্ৰন্থটি সম্পর্কে লঙ সাহেবের বক্তব্য— ‘ভাত, সবজি, মাছ, ডিম ইত্যাদি রান্নার যে প্রণালী বইটিতে বিবৃত, সেগুলি শুধু যে আঠেরোশো বছরের পুরানো তাই নয়, তা অনায়াসে ফরাসী রন্ধনশিল্পের সাথে পাল্লা দিতে পারে।’ সংস্কৃতজ্ঞ তর্কবাগীশের গ্ৰন্থটিতেও নানাবিধ মাছ-মাংসের কালিয়া-কোর্মা-কাবাব তৈরির ঢালাও বন্দোবস্ত আছে। এরপর রন্ধনক্ষেত্রে হাতাখুন্তিকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সহজ-সরেস ভাষায় খাতা-কলমে আনলেন খ্যাতনামা বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় তার বিপুল রান্নার সম্ভার নিয়ে। ‘পাক-প্রণালী’ নামে ছ’-খণ্ডে গ্ৰন্থ (১৮৮৫ থেকে ১৮৯৩) লিখেছেন, আবার ‘পাক-প্রণালী’ নামে একটি খাদ্য-পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন, উনিশ শতকের শেষার্ধে। পাশাপাশি দুই ভাগে ‘মিষ্টান্ন-পাক’ (১৮৯৯) নামে অজস্র সুস্বাদু মিষ্টির সমাহারে লিখেছেন এক অসামান্য স্বাদু গ্ৰন্থ। এছাড়াও তার রচিত গ্ৰন্থ— ‘রন্ধনশিক্ষা’, ‘শুভবিবাহতত্ত্ব’, ‘গৃহস্থালী’, ‘সব্জীশিক্ষা’, ‘কলম-প্রণালী’ প্রভৃতি। নানা বিষয়ে নানারকম গ্ৰন্থ রচনার শেষে বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের পাকাপোক্ত পরিচিতি কিন্তু ‘পাক-প্রণালী’-র প্রণেতা পরিচয়েই। সেই ‘পাক-প্রণালী’ সিরিজ-গ্ৰন্থেও নিরামিষের সমান্তরালে আছে অজস্র আমিষ পদের তাক্-তরিবৎ। ‘পাক-প্রণালী’/প্রথম হইতে পঞ্চম খণ্ড/ ১৯০৬/ ৫ম সংস্করণের বইটিতে পড়ে পাওয়া ৮০ প্রকারের ব্যঞ্জন। ২৪ প্রকারের দাইল (ডাল)। ৫৩ প্রকারের ভাতে, পোড়া, ভাজা, ছেঁচকি। আট প্রকারের অন্ন। ১৭ প্রকারের খেঁচরান্ন (খিঁচুড়ি)। এবং ৮৩ প্রকারের পলান্ন। উল্লেখ্য, পলমিশ্রিত অন্নের পাশাপাশি বিপ্রদাস মহাশয় মৎস্যমিশ্রিত অন্ন-মৎসান্ন রান্নার প্রণালীও রেখেছেন। আর সুগন্ধি পোলাও হিসেবে বেলফুল, জুঁইফুল, চামেলি ফুল, এবং গোলাপফুলের গন্ধ জড়ানো পোলাওয়ের রন্ধনপ্রণালী রেখেছেন সযত্নে। ডিম রান্নার ৩৫ খানা পদ ও পদ্ধতি বাতলেছেন তিনি। আছে ৬৩ প্রকারের কালিয়া, কোর্মা। ৫৭ প্রকারের কাটলেট, কাবাব। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আমিষ-পদ— পিসপাস বা অন্ন-মাংস, হোসেঙ্গাকাবাব, ডিমের বাদশাভোগ, মৎস্যের মাখনামৃত, মাছের হরিহর, মাছের দেলখোস, মাছের চমচম, মেষ-মাংসের মোরব্বা, কই-মৌরি, মাংসের বরফি, মাংসের ষষ্ঠরঙ্গ ইত্যাদি-ইত্যাদি। আসলে এত-এত রান্নার হদিশ দিয়েছেন বিপ্রদাস, যে আমাদের রীতিমতো অবাক হতে হয়। শুধু যে রকমারি পদ, তা-নয়, কত যে নতুন-নতুন আহারের পথে তিনি আমাদের বিহার করাচ্ছেন, তা অতুলনীয়। ইদানীং, রান্নার ক্ষেত্রে ‘ফিউশন কুজিন’ লব্জটি খুব জনপ্রিয়। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই ‘হাঁসজারু’ সেই পদটি গলধঃকরণ করা খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠে। নামীদামি রেস্তোরাঁয় যথেষ্ট রেস্তের বিনিময়ে নেওয়া ‘ফিউশন’ যখন শুধু ‘কনফিউশন’ বাড়ায়। তখন উনিশ শতকের শেষভাগে রচিত ‘পাক-প্রণালী’-তে থাকা নতুন স্বাদের পদ, আমাদের বিস্মিত করে, নানা খাইবার পাসের মধ্য দিয়ে আমাদের নিয়ে চলে এক অনাস্বাদিত ভুবনে।

যে-কোনও রান্নার শেষকথা খাদ্যরসিকের রসনা তৃপ্তিতে। বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের সমকালে সাহিত্য সৃষ্টিতে, কমলাকান্তের মনের ছাঁচে ধরা পড়েছে সাহিত্যসম্রাটের রসনা-বিলাস। বঙ্কিমচন্দ্রের মানসজাত শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্তী তো স্বীকারই করছেন যে তার মন পাকশালার আশেপাশে ঘুরঘুর করে, যেখানে পোলাও, কাবাব, কোফতার সুগন্ধ… যেখানে ইলিস-মৎস্য সতৈল অভিষেকের পর ঝোলগঙ্গায় স্নান করে, সেখানে তার মন প্রণত হয়ে পড়ে, যেখানে ছাগ-নন্দন (কচি পাঁঠা)-এর মাংস ও কোরমা তার খিদে মেটায় সেখানে ইন্দ্রত্বলাভের জন্য তিনি একঠায় বসে থাকেন। বঙ্কিম-সূত্রে স্মরণে আসবে ইন্দ্রমিত্রের উপস্থাপনায় তারকনাথ বিশ্বাসের লেখা থেকে জানা বিদ্যাসাগরের রন্ধনপ্রেম ও তার হাতে বানানো পাঁঠার ঝোল এবং আম আদা দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি পাঁঠার মেটের অম্বল। সেই ভোজসভায় ‘বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বহস্তে উপবীত গলায় জড়াইয়া সহাস্যে পরিবেশন করিতেছেন।’ এবং সেই রান্না খেয়ে বঙ্কিমচন্দ্র বলছেন— ‘এমন সুস্বাদু অম্ল ত কখনো খাই নাই।’

খাদ্যরসিকের প্রশস্তিই রান্নার সার্থকতা। শোনা যায়, রামমোহন রায় একাই একখানা পাঁঠার মাংস উদরসাৎ করতেন। বিবেকানন্দও ভোজনরসিক ছিলেন। বাড়িতে বাবুর্চি এনে মোগলাই খাবার খেতেন। হাঁসের ডিম দিয়ে আলু-মটরের ভুনি খিচুড়ি, ছিল খুবই পছন্দের। কচুরি-সিঙাড়া প্রীতিও ছিল যথেষ্ট। বিবেকানন্দ সেই সন্ন্যাসী, যিনি আজীবন বিশ্বাস করেছেন আমিষ খাবারের সঙ্গে ধর্মের কোনও বিরোধ নেই। তাঁর মাংসপ্রীতি প্রশ্নাতীত। বিডন স্ট্রিটে অবস্থিত পীরুর দোকানের মুরগির ডালনা ছিল বরাদ্দ। নিজের হাতে পোলাও-মাংস রাঁধতেন। আর তাঁর কাছে ইলিশ ছিল এই পৃথিবীর এক অতুল্য জিনিস। আর এই রূপোলি মৎস্য-সম্পদের সূত্রে এসে যায় বুদ্ধদেব বসুর ইলিশপ্রীতি‌। তিনি বলছেন— ‘… রজতবর্ণ মনোহর দর্শন মৎস্যকুলরাজ ইলিশ, সে এক দেহে এতটা প্রতিভা ধারণ করে যে শুধু তাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হতে পারে বিচিত্র ভোজ।’ বাস্তবিক ভাপা, ভাজা, সর্ষের ঝোল অথবা পাতুরি, অম্বল। এছাড়াও ইলিশের ডিম অথবা ল্যাজা-মুড়ো দিয়ে হাজারও লটপটি, চটপটি মিলিয়ে ফি-বর্ষায় তার জমজমাটি পারফরমেন্স অবশ্যই অনস্বীকার্য।

যদিও ‘ভোজনবিলাসী বাঙালি’ বুদ্ধদেব বসু শুধুমাত্র ইলিশ নয়, তিনি বিশুদ্ধ মৎস্যপ্রেমী। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য— ‘মৎস্যকুলের প্রতিটি প্রতিনিধির জন্য আলাদা আলাদা সব্জি মশলার সমন্বয়, আর কুচো মাছ রান্নার এমন সব মেধাবী টেকনিক, যাতে পেঁয়াজকলির সঙ্গে অঙ্গুষ্ঠ সমান ট্যাংরা দিয়েই এক থালা ভাত খেয়ে ওঠা যায়।’ এরপর ‘উচ্চকুলীন মৎস্য’ সম্পর্কে বসুমহাশয় রসেবশে নিদান দিয়েছেন উৎকৃষ্ট দই-মাছে পাকা-রুইয়ের পেটি চাই ‘নির্ঘাৎ’, নারকেলের দুধ দিয়ে মালাইকারির জন্য বাগদা চিংড়ি ভীষণ দরকারি, বড় কইয়ের মাথা যোগেই একমাত্র হতে পারে সঠিক তেল-কই। আর ইলিশের কোনও পদে আলুর সংযোগ ঘটালে, শুধু যে স্বাদ বিপথগামী হবে তা নয়, তা-হবে মহাপাতকের কাজ।

খ্যাতনামাদের খাদ্যপ্রেম তথা আমিষ-প্রিয়তার অনুসন্ধানে জানতে ইচ্ছে করে রবীন্দ্রনাথের খাদ্যাভ্যাস। নানাজনের স্মৃতিকথায় উঠে আসা তথ্য থেকে জানা যায়, সজনে দিয়ে সোনামুগের ডাল, নারকেল কোরা দিয়ে এঁচোড়, দুধ দিয়ে শুক্তো, ঝিঙেপোস্ত ছিল তার খুব পছন্দ। কবি নিরামিষ-প্রিয় হলেও পাঁঠার মাংস, ইলিশের ঝোল, চিতলের মুইঠ্যা, নারকেল চিংড়ি, মাছের কালিয়া খেতে ভালই বাসতেন তিনি। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী তার ‘স্মৃতিকথা’-য় বলছেন— ‘হরিণের মাংস কেউ আনলে বাবামহাশয় খুব খুশি হতেন।’ ১৯৩৭-এ প্রকাশিত জ্ঞানদানন্দিনীর ‘স্মৃতিকথা’-য় শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, যশোরের মেয়ে ঠাকুরবাড়ির বউয়ের কলমে উঠে এসেছে তাঁর সময়ের (জন্ম ১৮৫০-মৃত্যু ১৯৪১) রান্নাঘর ও খাওয়া-দাওয়ার প্রসঙ্গ। তিনি লিখছেন, ‘এখনকার স্বাস্থ্যের নিয়ম সম্বন্ধে যা শুনি ও পড়ি, আমার মনে হয় ছেলেবেলায় অনেকটা সেইরকম নিয়মেই আমাদের খাওয়া-দাওয়া হত।’— তাতে কী কী ছিল? পুকুরে ধরা টাটকা মাছ, কখনো কচ্ছপের মাংস, কচ্ছপের ডিম, ঘরের গরুর দুধ, মাঝে-মাঝে জলের পাখি বা অন্য কিছু শিকার করে আনলে তার মাংস, বাড়িতে বলির মাংস প্রায়ই হত। (কালীর কাছে মানত করলে মদ আর মাংস অবধারিত ছিল। জ্ঞানদানন্দিনী কালীর প্রসাদ স্বরূপ পুরোহিতের সঙ্গে ভক্ত-মহিলাদেরও মদ আর ভাজাভুজি খাওয়ার কথা লিখেছেন অবলীলায়।) ‘আমার বাপের বাড়ী ভক্ত শাক্ত পরিবার। হিন্দুর নিষিদ্ধ মাংস ছাড়া আর সব মাংসই সেখানে খাওয়া হত।’ জ্ঞানদানন্দিনীর বাপের বাড়ি যশোর জেলার নরেন্দ্রপুর গ্ৰামে, তৎকালীন সেখানের সাধারণ খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে উঠে আসছে, সকালে উঠেই ‘আনালে’ ভাত (স্নান না করে যে ভাত রান্না), দুপুরবেলা ভাতের সঙ্গে শাক-তরকারি, টাটকা মাছের ঝোল, কচ্ছপের ডিমের বড়া বা কচ্ছপের মাংসের ঝোল, বিকেলে ঘরের সর বসানো দুধ আর গরম গরম মুড়কি। রাত্রে মাছের ঝোল ভাত, কোনও-কোনওদিন পাঁঠার ঝোল।

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী গোড়ায় ‘স্বাস্থ্যের নিয়ম’ মেনে খাওয়ার কথা বলেছেন, আমরা তার সময়কালেই (১৯২১) প্রকাশিত ‘স্বাস্থ্য সমাচার পুস্তকাবলী’ সিরিজের ৫ম সংখ্যায়, চিকিৎসক-লেখক শ্রীনরেন্দ্রনাথ বসুর ‘খাদ্য-কথা’ থেকে একটু উদ্ধৃতি তুলে আনি- ‘গো-মাংস অপেক্ষা মেষ মাংস সহজে পরিপাক হয়, ইহা সাধারণ ধারণা। কিন্তু এ সম্বন্ধে স্থির করিয়া কিছু বলা যায় না। ছাগ ও মৃগ মাংস অপেক্ষাকৃত লঘুপাক। অধিক পরিমাণে ঘৃত ও মসলা সহযোগে পাক করিলে সকল মাংসই গুরুপাক হইয়া থাকে। কুক্কুট ও অন্যান্য পক্ষীর মাংস সকল পশু মাংস অপেক্ষা সহজ পাচ্য। দুর্ব্বল পাকশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে পক্ষীমাংসই সমধিক উপযোগী।… পুষ্টিকারিতার হিসেবে ডিম্ব প্রায় মাংসেরই অনুরূপ।’

ইসকনের কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চয়ই জানেন, কিন্তু মানেন না। চিকিৎসক নরেন্দ্রনাথ তো তাদের কাছে ছার, সন্ন্যাসী নরেন্দ্রনাথকেই তাঁরা পাত্তা দেন না।

যাই হোক, জ্ঞানদানন্দিনীর লেখায় আমরা সেই সময়ের স্বাস্থ্যগুণসম্মত খাবারের তালিকা পেয়েছি। কিন্তু তারও আগে ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ (প্রথম খণ্ড, ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯০০) নামে একটি তথ্যসমৃদ্ধ গ্ৰন্থ। লিখেছেন রবীন্দ্রনাথের সেজদা বিজ্ঞানী হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পূর্ণিমা দেবীর সুযোগ্যা কন্যা প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী। যিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন অসমিয়া সাহিত্যিক লক্ষ্মীনাথ বেজবড়ুয়ার সঙ্গে। যদিও স্বামীর উৎসাহে তিনি রান্না-বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে মুক্ত বিহার করেছেন। আর বাঙালির রসনা তৃপ্তিতে প্রায় আড়াইহাজার পদের হদিশ দিয়েছেন। ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ গ্ৰন্থের দ্বিতীয় খণ্ড ও তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়, যথাক্রমে মার্চ-এপ্রিল ১৯০৩ এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯০৭। এই দ্বিতীয়-তৃতীয় খণ্ডে আছে মূলত আমিষ-মুলুকের সুলুকসন্ধান। তার আগের খণ্ডেও বেশ কিছু নিরামিষের পদে-পদে মিলেমিশে আছে আমিষের পদ। ‘রামমোহন দোর্ম্মা পোলাও’, ‘দ্বারকানাথ ফির্নি পোলাও’ ‘কবি সম্বর্ধনা সন্দেশ’— প্রজ্ঞাসুন্দরীর স্পেশাল আইটেম। আবার অকালপ্রয়াত মেয়ের নামে নাম রেখেছেন ‘সুরভি পায়েস’। ভিন্নমাত্রার আমিষ পদ ‘মাংসের বিরিঞ্চি’, গুঁড়োমশলা ছাড়া ‘মাটন কোর্মা’। এছাড়া মাছ, ডিম নিয়ে দেশবিদেশের বহু প্রকার রান্না তিনি তুলে এনেছেন বাঙালির পাকশালায়। পরবর্তীকালেও ঠাকুরবাড়ির রন্ধনচর্চার এক মনোহর পরম্পরা লক্ষ করা যায়, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়মেয়ে সৌদামিনীর নাতি সুপ্রকাশ গঙ্গোপাধ্যায়ের বউ তনুজা গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৪৯-এ লিখলেন ‘পাঁচমিশালী’ নামে একটি গ্ৰন্থ। যে-বইয়ের মুখপত্র লিখেছেন ইন্দিরা দেবী। তিনি লিখেছেন— ‘খাওয়াতেই খাদ্যের পরিচয়।… বাঙালী স্বভাবতঃ ভোজনবিলাসী জাত ও সর্ব্বদেশকালের মুখরোচক খাদ্য সমভাবে আত্মসাৎ করতে ওস্তাদ।’

তবে এই বইয়ের বিশেষ অলংকার হল— ১৯৩০-এ, বরোদায় থাকাকালীন কবি রবীন্দ্রনাথ, তাঁর এই নাতবউয়ের হাতে তৈরি সন্দেশ খেয়ে খুশি হয়ে লিখেছিলেন একটি মিষ্টি-প্রশস্তিযুক্ত পদ্য, যা গ্ৰন্থের ভূমিকায় ছাপা হয়েছিল। প্রসঙ্গত জানাই, প্রজ্ঞাসুন্দরীর বইয়ের বিষয়েও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন কবি। ১ জুন, ১৯০৬ কবি সুবোধচন্দ্র মজুমদারকে চিঠিতে লিখছেন— ‘বেলা প্রজ্ঞার আমিষ আহারের বইটা (অর্থাৎ ২য় খণ্ড) চেয়ে পাঠিয়েছে, সেটা আমাদের লাইব্রেরিতে আছে— খোঁজ করে নিশ্চয় তাকে পাঠিয়ে দিও…।’ আবার ৩ জুন চিঠিতে তাগাদা— ‘বেলাকে আমিষ রান্নার বই পাঠিয়েছ ত?’ এ থেকে এ-ও প্রমাণ হয় ঠাকুরবাড়ির মধ্যেও বইগুলির চাহিদা ছিল। আর, প্রজ্ঞাসুন্দরী, তনুজা দেবীর পরেও ঠাকুরবাড়ি থেকে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে পূর্ণিমা ঠাকুরের ‘ঠাকুরবাড়ির রান্না’ গ্ৰন্থটি। এই গ্ৰন্থটির ক্ষেত্রেও ইন্দিরা দেবীর হাতে লেখা ‘রান্নার খাতা’-র ভূমিকা আছে। তার সঙ্গে লেখিকা ঠাকুরবাড়ির রান্না-সংস্কৃতি সহ বিভিন্ন পদের সন্ধান দিয়েছেন। যেখানে নিরামিষ ডিমের ডালনা, চিঁড়ে-ভেটকির পোলাও, দুধ-রুইয়ের মতো নানাবিধ ভিন্নমাত্রার পদ তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন।

ঠাকুরবাড়ির রন্ধনচর্চার সমান্তরালে এ-ও মনে রাখা দরকার, অঞ্চলভেদে, আর্থিক সংগতির সঙ্গে সঙ্গত রেখে রান্নার ধরন ধর্ম পাল্টায়, দেশকাল জুড়ে। এই নিরিখে ১৯২১ -এ প্রকাশিত কিরণলেখা রায়ের ‘বরেন্দ্র-রন্ধন’ এক মূল্যবান গ্ৰন্থ (‘বরেন্দ্র-জলখাবার’ গ্ৰন্থটিও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত)। কিরণলেখা রায়ের অকালমৃত্যুর পর, এই গ্ৰন্থকে আমাদের সম্মুখে এনেছেন তাঁর স্বামী বিশিষ্ট সাহিত্যসেবী শরৎকুমার রায়। তিনি রন্ধনকে ভাপা, ভাজা, সেদ্ধ, চচ্চড়ি, ঘন্ট ইত্যাদি মাধ্যমে ভাগ করে, তারপর নিরামিষ এবং আমিষের ভিন্ন-ভিন্ন পদ ও প্রকরণ সাজিয়েছেন। ‘বরেন্দ্র-রন্ধন’ থেকে কিছু বিশেষ আমিষি পদ— টাকি মাছ পোড়া, ইলিশ মাছ চৌ চৌ, পক্ষীর ডামপ্লিং, ছোটো মাছের পুড়পুড়ী, রুইমাছের টিকলি ভাজি, কাঁকড়ার বড়া, মেষের জিহ্বা, মাছের তিত-চড়চড়ি, মাছের সুক্তো, চিতল-গাদার জলবড়া, পাঁঠার কালিয়া, আম-শোল, হরিণ-মেটের ঝাল প্রভৃতি। সত্যিই নালেঝোলে অবস্থা, অভিনব সব পদের নাম শুনে।

কিরণলেখার সমকালে বা স্বল্প-পরবর্তী সময়ে বনলতা দেবী লিখছেন ‘লক্ষ্মীশ্রী’। বইটির সম্ভাব্য দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা (১.৩.১৯২৪) উদ্ধৃত করেছেন কল্যাণী দত্ত, তার ‘পিঞ্জরে বসিয়া’ গ্ৰন্থের অন্তর্গত ‘রান্নার বই’ রচনায়। ভূমিকা থেকে জানা যায় ‘লক্ষ্মীশ্রী’ গ্ৰন্থনে ও তন্মধ্য রন্ধনে একাধিক ইংরেজি বই হয়েছে সহায়ক। লেখিকার বক্তব্য— ‘যে সকল রন্ধন-প্রণালী প্রদত্ত হইল সে সকল ভাত ডাল রাঁধার ন্যায় সহজ ও মোটেই ব্যয়সাধ্য নয়।’ মনে রাখতে হবে, দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তীকালীন সময়, পরাধীন ভারতের মধ্যবিত্ত তথা উচ্চ-মধ্যবিত্ত বাঙালির রান্নাঘরেই এহেন রন্ধনচর্চার অকুস্থল। তাই আয়ব্যয় হিসেবে রেখেই স্বাদপূরণ। পরবর্তীকালে পাঁচশো রকম রান্নার প্রকরণ সাজিয়ে, এম.সি.সরকার অ্যান্ড সন্স থেকে ১৯৫৩-তে প্রকাশিত হল, সুলেখা সরকারের ‘রান্নার বই’। ওই প্রকাশনা থেকে প্রকাশ পেল ভিন্নস্বাদের গ্ৰন্থ, স্নেহলতা দেবীর ‘আচার ও মোরব্বা’, ভূমিকা লিখলেন কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র। তিনি লিখছেন— ‘…রসবোধ থেকে রসনাবিলাস খুব বেশী দূর নয় বলেই আমার ধারণা এবং সকল প্রকার রসের একটা আত্মীয়তা আছে বলে আমি মনে করি।… যে বইটির ভূমিকা লিখছি, সেটিকে রসনার কাব্য-সংগ্ৰহ বলা যায়। রসনা সাহিত্যে অন্ন-ব্যঞ্জনকে যদি গল্প-উপন্যাস বলা যায়, তাহলে আচার ও মোরব্বা তার গীতিকাব্য।…’

কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রর কথার অনুরণন খুঁজে পাই এই সময়ের বিশিষ্ট সুরকার শান্তনু মৈত্রের কথায়। তাঁর ‘ফেরারি মন’ (দে’জ পাবলিশিং, ২০১০) গ্ৰন্থের একটি বিশেষ প্রতিবেদন, ‘যে রাঁধে, সে গানও বাঁধে’। সেখানে গানবাজনার সমান্তরালে তাঁর রন্ধনপ্রীতির এক অসামান্য গল্প আছে। সেখানে শান্তনু বলছেন— ‘আমার কাছে কুকিং ইজ লাইক মিউজিক।’ কড়াইয়ে তেল দিয়ে, তেলের মধ্যে ফোড়ন বা অন্য কিছু দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিড়বিড় শব্দ, তারপর একে-একে আনাজপাতি বা মশলাপাতির যোগ এবং নাড়াচাড়াকে, মৈত্রমহাশয় বলছেন ‘অর্কেস্ট্রেশন’। বাস্তবিক তাই, সাত সুরে সংগীতের মতোই, রন্ধনে বন্ধনই শেষকথা। পদ ও পদ্য, উভয়ক্ষেত্রেই চাই সঠিক সঙ্গত। ছন্দপতন হলেই বেসুরো, বিস্বাদ।

পরিশেষে বলা যায়, খাদ্যরসিক বাঙালির পাকশালায় আজও নিত্যনতুন পদের সন্ধান তথা নতুন থেকে নতুনতর আস্বাদনের অভিযান এখনও শেষ হয়নি। রান্নাচর্চা তার অব্যাহত। রান্নার বই প্রকাশেরও শেষ নেই। রেণুকা দেবী, বেলা দে, কমলা চট্টোপাধ্যায়, লীলা মজুমদার, সাধনা মুখোপাধ্যায়… কলম থামেনি। হাতায়-কলমে রান্না ও চর্চা এখনও চলছে এবং চলবে।