রসনাবিলাসীর কলকাতা

খাওয়া-দাওয়া নিয়ে দেশে উৎসাহ ঠিক কতখানি বৃদ্ধি পেয়েছে, সে-হিসাব দাখিলের চেষ্টা না করাই ভাল। তবে, গণমাধ্যমের ঝড়-ঝাপটা যেহেতু কাউকেই রেয়াত করে না, তাই সদ্য-যুবার হেলাফেলার পোস্ট থেকে বিখ্যাত পাচকের সাজানো-গোছানো ভিডিয়োর অনেকটাই দেখি, পালানোর পথ একরকম নেই বলেই। সবাই নিজেদের সামনে যে সাজানো পেলেটের তসবিরই দেখান তা নয়, মশলার ইতিহাস থেকে ফ্রোজ়ন ‘মাছ-মাংস’-এর খাদ্যগুণও ইদানীং অনুসন্ধিৎসু খাদ্যরসিকের বিষয়। তবু, কোভিডের সময়ে একটানা নিরন্ন মানুষের ছবি-ভিডিয়োর পাশে কোপ্তা-কালিয়া গিলে মধ্যবিত্তের দাঁত-কেলানো অশ্লীল আস্ফালন বাধ্য করেছিল ভোজনবিলাস নিয়ে লেখায় ইতি টানতে।

একমুঠো আনাজের জন্য বা একঢোক পানীয় জলের লাইনে পুলিশ নির্মম লাঠি চালাচ্ছিল বেএক্তিয়ার। রিকশাওয়ালার তিনটে বাচ্চা ঘাস খেয়ে মারা গেল রাজধানীর বস্তিতে। সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত অকুতোভয় ভারতীয় সৈনিকরা পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে-ফেরার মিছিল থেকে বৃদ্ধ, চলচ্ছক্তিহীন, মৃতপ্রায় (অথচ স্বাধীন) নাগরিকদের হিঁচড়ে টেনে, পোটলা-পুঁটলি, হাঁড়ি-কুড়ি, প্লাস্টিকের প্যাকেট, আমুলের জং-ধরা কৌটো রাস্তায় ছড়িয়ে জাতীয় নিরাপত্তার যে-নজির সৃষ্টি করছিল, তা দেশবাসী দেখেছে। ওই আপন্ন সময়ের ইতিহাস, না-খেয়ে থাকা, একটানা উপোসের ফলে মৃত্যু বা বাজারদর ধরে রাখতে বেশ কয়েক কোটি টন মুরগির মাংস এবং দুধ নষ্ট করে ফেলার ‘গৌণ’ অংশগুলো কীভাবে ইতিহাসের পাতা থেকে ছাঁটা হল, তাও দেখলাম। প্লেগ, চেঙ্গিজ় খানের জয়যাত্রা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অথবা ভিয়েতনামের শস্যক্ষেতে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে এজেন্ট অরেঞ্জ ছড়ানোর পর ওই ঘটনাগুলোকে বাদ দিয়ে যেমন মানুষের ইতিহাস লেখা সম্ভব হয়নি, ভারতীয় উপমহাদেশের রোজনামচা থেকেও আগামী বেশ কয়েক দশক কোভিড-টিকা-মহামারী ইত্যাদি শব্দগুলোকে ছাঁটা যাবে না। ফলে দেবাদিত্য চৌধুরীর ‘স্ট্রিক্টলি ডিলিশাস’ বইটির শেষ কয়েক পৃষ্ঠার দিকে যত এগিয়েছি, ততই নিজেকে বুঝিয়েছি, সে-প্রসঙ্গ এই এল বলে।

আরও পড়ুন: কোথা থেকে আমাদের দেশে এসে পড়ল ‘সিঙাড়া’ আর ‘জিলিপি’?
লিখছেন পিনাকী ভট্টাচার্য…

এল না। অথচ কোভিডের, যারে কয়, মূল পানিপথ, শহরের রাস্তা, পাড়ার গলি, জাতীয় সড়ক, বিভিন্ন গ্রামের দিকে এঁকেবেঁকে চলা মেঠো পথ— সাধারণ মানুষ সেখানেই নিজের অদৃষ্টের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে নামে। সব সময়ে গাদা-গাদা ডেডবডি চারপাশে পড়েছিল তা নয়, চালাক-চতুর নাগরিকরা ফালতু বখেরা এড়াতে সেসবের ঠ্যাং ধরে টেনে নদীনালায় ভাসিয়ে দিয়েছে; তারপর বিসমিল্লা বলে নিজেদের ডেরায় ফিরেছে, যেন কিছুই হয়নি। অবশ্য, সত্যিই তো কিছু হয়নি, তাই না? অগত্যা ফাঁকা রাস্তাও নিজের মনে কথা কইতে, গল্প বলতে শুরু করেছিল একটা সময়ে। শ্মশানের নিস্তব্ধতা আর সহ্য হচ্ছিল না বলে। দেবাদিত্য যে-রাস্তার, বর্ধমান থেকে ফেরার পথে ল্যাংচা বা স্টক এক্সচেঞ্জের স্মৃতি উসকে দিল এই বইয়ে, তার সবটাই পুরোপুরি পালটে গেছে গত এক দশকের খানিকটা কম সময়ে। কিছুই আগের মতো নেই আর। ফলে তাঁর যৌবনে-দেখা শহরটিকে উধাও ছবি-আখ্যান-মানুষের নজ়রিয়া থেকেও দেখানোর দায় কথকের ওপরেই বর্তায়— যেহেতু লেখকের সম্পর্ক প্রথম যৌবনের কলকাতার সঙ্গে ক্ষীণ হয়ে এলেও, কথক সেই সময়ের ভেতর যাতায়াত করেন স্বচ্ছন্দে— এবং ‘না-দেখানো’র সচেতন সিদ্ধান্তের কারণও দর্শানোর দায়ও তাঁর।

এই বইয়ের অনেকখানি রাস্তার খাবারের গল্প। লেখক-কথকের যুক্তি অদৃশ্য মানুষগুলিকে পাঠকদের সঙ্গে, ভ্যানিশ-হয়ে-যাওয়া জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই সম্পর্কের বাঁধন ছাড়া— ফাঁস হিসেবে নয়— খাদ্যরসিকদের পক্ষে শহরের রেস্তোরাঁবাজির খোঁজ পাওয়া মুশকিল। কোন দোকানে কী মেলে, তা তো মেনুকার্ডেই ছাপানো থাকে! মজাদার মানুষগুলোকে তাদের জীবনের গল্পসমেত পেতে হলে, নামজাদা রেস্তোরাঁর পাশের দেওয়ালে সাঁটা পানের দোকানে দাঁড়াতে হয় দু’দণ্ড, ফটাস জল খেতে হয় কর্পোরেশনের বাড়ির সামনে থেকে, কাবাবের স্কিউয়ার নিয়ে দরাদরি করতে হয় নিউ মার্কেটের পিছনের দোকানে হেলান দিয়ে।

অথচ কোনও ‘বাঁধন’-এর ইঙ্গিতই মিলল না বইটিতে। শুরুটা হয়েছিল চমৎকার। খুব ভোরে সেন্ট জ়েভিয়ার্সে ক্লাস করতে যাওয়া, সদ্য যুবার চোখে কলকাতার নির্জন সকাল, মালাই টোস্ট, বম্বে হোটেলের খুশবুদার ছোটা হাজরি— খুব আশা করেছিলাম, দেবাদিত্য এইরকম শব্দে গাঁথবে আখ্যানের সুর, যেহেতু সে সাজিয়ে ফেলেছিল  এক জমজমাট রঙ্গমঞ্চ। কিন্তু আম্রকাননে কামানের গর্জন তো দূরের কথা, একটা এয়ারগান ফাটল না। অতএব, বারবার প্রশ্ন জেগেছিল, ঠিক কতখানি নির্জনতা বহন করেন দেবাদিত্য। শহরের সমস্ত কোনার দোকানই হোক বা ফুটপাথের চা-টোস্ট-মালাইয়ের স্টল— এই খাবার-সাজিয়ে-বসা বিপণিগুলির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ যদি হয় খানিকটা উৎকেন্দ্রিক দোকানি, তাহলে কখনও দ্রুত, কখনও ঢিমা-ঠেকার কাজটি সারেন দু’একজন প্রাইম আড্ডাবাজ খদ্দের। ঠেলাওয়ালা, মুটে, মেকানিক, মিস্তিরি, বিভিন্ন হৌসের কেরানি, পিওন এবং দারোয়ান, পাঞ্জাবি তালা সারাইওয়ালা থেকে ঝট করে মোটরবাইক থামিয়ে চট করে চারটে ডালপুরি আর সবজি-গোস্ত মেরে হু-হু করে জেলার-পথে-বেড়িয়ে-যাওয়া মেডিকাল রিপ্রেজ়েনটেটিভদের প্রিয় ঠেক এটি। দেবাদিত্যর বর্ণনায় এরা কেউ নেই। কেউই নেই!

বইটিতে প্রতিটি খাবারের দোকানের বিষয়ে যতটুকু লেখা হয়েছে, তা মোটামুটি টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত প্রাপ্ত তথ্যের চাইতে সামান্যই বেশি। এক্ষেত্রে লেখকের পরিমিতিবোধ সম্পর্কে বিস্ময়ের পাশাপাশি প্রকাশকের শব্দ-সংখ্যা সম্পর্কিত নিদান, হুঁশিয়ারির সন্দেহ যে একবারের তরেও উঁকি মেরে যায়নি, সে-কথা সর্বাংশে সত্য নয়। তার কারণ, বইটির ‘অঙ্গশোভা’ বৃদ্ধির প্রতি বিশেষ মনোযোগ। বাঙালি বইয়ের বিষয়কে বরাবরই একটু বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অর্থাৎ ভাল কাগজ, ঝকমকে ছবি, খুব ভাল বাঁধাই তার প্রাথমিক প্রয়োজনের তালিকায় ছিল না কখনওই। বাঙালি যে খুব বেশি কফি-টেবিল বই ছাপিয়েছে, সে-দাবিও অনেকদূর অবধি অন্যায্য। হালে কিছু বই সে-অর্থে যত্ন সহকারে ময়ূরের মতো পেখম গুঁজে ছাপানো হলেও, প্রকাশকরা লেখার গুণে বই কাটবে এমনটা মনে করেছে বরাবর, এবং সেরকম আশা করাটাও যে একেবারেই নাজায়েজ, তাও নয়। দেবাদিত্যর বই ছাপিয়েছে ‘ব্ল্যাকলেটার্স’। প্রতি পাতায় ছবি, ব্লার্ব, প্রচুর জায়গা ছেড়ে একেবারে ডিজ়াইনার্স এডিশন বলতে যা বোঝায়— তা-ই। ফলে লেখার, গল্প বলার, বিষয়ের মধ্যে প্রবেশ করার পাশাপাশি মূল ‘প্লট’ জলাঞ্জলি দিয়ে একটু বড় মাপের সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ান্তরে প্রবেশের খোঁজ এই বইয়ের পরিকল্প কখনও ছিল, এমনটা মনে হয়নি। বড় শহরের টুকরো অংশ ছুঁয়ে গেছে বটে, তবে কোনও বৃহদাখ্যানে অংশ হয়ে ওটার সামান্যতম ইচ্ছে যে কোনও কালে ছিল না, তা পরিষ্কার। হয়তো উদ্দিষ্ট পাঠকের চরিত্র এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

‘বাংলার খাবার’ অথবা ‘পাক-প্রণালী’-র পাঠক এই বই ছোঁবে না— একচক্কর বইয়ের বাজার ঘুরলেই সে-সম্পর্কে দ্বিধাহীন তথ্য পেশ করবেন পুস্তক-ব্যবসায়ীরা। বাঙালি এই ব্যাপারে বেজায় পেশাদার। দেবাদিত্যর বইয়ের সঙ্গে সেরকম কোনও সম্পর্ক তৈরি হওয়া মুশকিল। ‘Unsullied’ শব্দটির বাংলা হয় বটে, তবে এক্ষেত্রে দেবাদিত্যর বই সম্পর্কে ওইটির প্রয়োগ যথাযথ মনে হল বাংলা প্রতিশব্দের চাইতে। অতএব বইটি এক শ্রেণির পাঠক যত্ন করে তাকে তুলে রাখবে, আশা করা যেতেই পারে।

আবার বলছি, সকাল-সকাল রাস্তার দোকান থেকে বেএক্তিয়ার এক রসনাবিলাসী-যাত্রায় পাঠককে ঠেলে ঢোকানোর উপাদান মজুত ছিল দেবাদিত্যর বাছাইপর্বে। খুশি হয়েই পাতা ওলটাতাম অবসর পেলে। মুশকিল হল, পাইস হোটেলে, এমনকী জগন্নাথ হোটেলেও যে ‘সাগ ভাজা’ নামক অবাঙালি পদটি বেড়ে দেওয়া হয় না, সেটা খেয়াল রাখা দরকার। ফলে, মাটিতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে জানা থাকলেও, ওই অংশটি বাঙালির পাইস হোটেলের খুব ভাল বিজ্ঞাপন নয়— অবাঙালির ধাবা বা লাইন হোটেলের কথা বলতে পারব না। আর মশাই, মাছের ডিমের বড়ার বাইরেটা মুচমুচে ‘ক্রিস্পি’ মানছি— তা বলে ভিতরটা ‘মোল্টেন’ মানে তো কাঁচা রয়ে গেছে, ভাল ভাজা হয়নি। একেবারেই অন্যরকম কিছু যদি হয়ে থাকে, তার আন্দাজ দেওয়া নেই। ভিতরটা ‘জুসি’ বলার সফট-পর্ন তরিকাটা মার্কিন-ইউরোপিয়ান শেফদের নিজেদের ঢাক পেটানোর কায়দা হয়ে দাঁড়িয়েছে— সব কিছুই যে-কারণে সেক্সি এবং যৌনতার পরিভাষায় পড়তে-বুঝতে হবে। আজকাল ইউটিউবে এরকমটা খুব চলছে— সবই বাইরেটা শক্ত আর ভিতরে ল্যাদল্যাদে। মহল হোটেলের মালিক এটা জানলে, ঠাকুরটিকে কান ধরে বের করে দেবেন যে!

শহরের বেকারি নিয়ে লেখার জন্য দেবাদিত্যকে ধন্যবাদ। কম পয়সায় টিফিন সারতে কেক-পাঁউরুটির জবাব নেই। তবে একবারও নাহুমের নাম করলেন না? আলগোছে, পাশ কাটানোর অছিলাতেও কি এই প্রতিষ্ঠানটিকে একবার ছোঁয়া যেত না? অথচ নিজেই বলেছেন কনফেকশনারদের ইতিহাসটিকে চিনি-মাখনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না করতে, তার পরতে-পরতে উদ্‌বাস্তু মানুষের স্মৃতি, যেভাবে কলকাতা এক টুকরো ইউরোপকে ধরে ফেলেছিল বিকেলের চায়ের আসরে। এরকম একটা লাইনের পর সে-সম্পর্কে একটু আলাপ-বিস্তার জমাবেন না? কলকাতার রাস্তায় বাঙালি খাবারের খোঁজে হাঁটলে, যেসব অমূল্য রতন আপনাআপনি ঝুলিতে জমে, সেসব বাদ দিয়ে বই লেখা সম্ভব?

সব শেষে বলি, এই ধরনের একটি বইয়ে ‘গরিব দোকানদার’-এর বক্তব্য তো বটেই, ব্লার্বের ভাষাও শুদ্ধ হতে হবে। কলকাতার ক্লাবগুলো ইংরিজি কেতায় তৈরি এবং আদ্যোপান্ত সাহেবি। তাদের বিষয়ে লেখার সময়ে অর্থহীন শব্দগুচ্ছ ব্যবহার না করাই শ্রেয়— তার মানে গরিব মুটের মুড়ি-চানাচুর নিয়ে ভুল ইংরেজি চালানো যাবে তা কিন্তু নয়। ক্যালকাটা ক্লাব সম্পর্কে দেবাদিত্য লিখেছেন, এখানে ‘food feels less like indulgence and more like inheritance’— এই ধরনের বাক্যের যদি কোনও পৌর্বাপর্য না থাকে, এবং শহরের মানুষ যদি এই বইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকে, তাহলে ‘ইনহেরিটান্স’ শব্দটার তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বইকি!

দেবাদিত্য নিজের মতো একটা সংকলন তৈরি করেছেন, এবং গোড়ায় সেটিকে বাহবা দিতে হবে। ডিজিটাল যুগে বইয়ের কথা ভেবেছেন, তা রীতিমতো বুক চিতিয়ে পথ চলার উদাহরণ। মনে রাখতে হবে, দু’মলাটের ভিতরে সব কিছু ঢোকাতে গেলে বই হয় না, এবং কোনও বই আজ অবধি সবাইকে খুশি করতে পারেনি। ফলে নিজের পছন্দ-সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ করাই শ্রেয়। আশা করা যাক, ভবিষ্যতে সমঝদার পাঠক তাঁর বইয়ের অপেক্ষায় থাকবে।

স্ট্রিক্টলি ডিলিশাস
দেবাদিত্য চৌধুরী
ব্ল্যাকলেটার্স
১০৯৯/-