এই মুহূর্তে চারদিকে লিও নিয়ে শোরগোল চলছে। না, না, মেসি না। বলছি ‘লিও দাস’-এর কথা। লোকেশ কানাগরাজের নতুন ছবি। যার সমুদ্রপারের আগাম বুকিং ‘পাঠান’-এর সমস্ত রেকর্ড ভাঙার দিকে দৌড়চ্ছে। অনিরুদ্ধ রভিচন্দরের বানানো ‘ব্যাডঅ্যাস’ অ্যান্থেম ঘুরছে লোকের মুখে-মুখে। শুধুমাত্র দক্ষিণ ভারতে হলে ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক হত না কিন্তু একই হাল ভারতের বাকি জায়গাগুলিতেও।
দক্ষিণী সিনেমার প্রেমে সকলেই প্রায় হাবুডুবু। তবে প্রশ্ন হল, এমনটা হল কীভাবে। রাতারাতি? কোনও ম্যাজিকে? হঠাৎ ওভারনাইট সাকসেস? নাকি এর পিছনে রয়েছে বহু বছরের কাহিনি? বিষয়টা বোঝার জন্য আমাদের বেশ খানিকটা পিছিয়ে যেতে হবে। সাল ১৯৯৮। সেই প্রথম কোনও দক্ষিণ ভারতীয় ছবি হিন্দি ডাব্ড হয়ে উত্তর ভারতে মুক্তি পায়। তামিল ছবি ‘চন্দ্রলেখা’ দক্ষিণের সঙ্গে-সঙ্গে উত্তরেও চরম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর থেকে মাঝমধ্যে দক্ষিণী ছবি হিন্দিতে মুক্তি পেয়েছে৷ আটের দশকে দক্ষিণী প্রযোজকদের আগমনের কারণে প্রচুর দক্ষিণী ছবির রিমেকও তৈরি হয়েছে বলিউডে কিন্তু সেখানে হিন্দি ছবির প্রথম সারির নায়ক-নায়িকারাই কাজ করতেন। দক্ষিণ ভারতীয় তারকা বা অন্যান্য অভিনেতাদের সঙ্গে হিন্দি ছবির দর্শকদের সম্পর্ক এতটা গাঢ় হয়নি কখনওই। কমল হাসান বা রজনীকান্ত হিন্দিতে কাজ করায় তাদের নামের সঙ্গে শুধু পরিচিতিটুকু গড়ে উঠেছিল। নয়ের দশকে মণিরত্নম, তার পরবর্তী যুগে প্রিয়দর্শন, গৌতম বাসুদেব মেনন, এ আর মুরুগাদোস সকলেই হিন্দিতে সাফল্যর সঙ্গে কাজ করেছেন৷ প্রথম একশো কোটির গণ্ডি পেরনো হিন্দি ছবি ‘গজনি’, এ আর মুরুগাদোসের নিজেরই তামিল ছবির রিমেক। তবুও উত্তর ভারতের দর্শক হিন্দি ছবির তারকাদের সঙ্গেই একাত্মবোধ করত। কোথা থেকে কোন ছবির রিমেক হচ্ছে, এ-বিষয়ে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না।

অতঃপর এই ঝিমিয়ে-আসা গল্পে টুইস্ট নিয়ে আসেন এক প্রযোজক। ২০০৫-’০৬ সাল নাগাদ বলিউডি সিনেমা ধীরে-ধীরে তার মশালা-সিনেমা কালচার ছেড়ে একটা পশ্চিমি ঘরানার দিকে ঝুঁকে পড়তে শুরু করে। অধিকাংশ সিনেমার শুটিং-লোকেশন হয়ে ওঠে বিদেশ৷ মশালা-সিনেমা তৈরির বিশেষ অভাব দেখা দেওয়ার ফলে, মনীশ শাহ্ দক্ষিণ ভারতীয় প্রযোজকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের ছবিকে সরাসরি হিন্দিতে ডাব করার পরিকল্পনা করেন। সোনি ম্যাক্স চ্যানেলের সঙ্গে টেলিকাস্টের চুক্তি হয়। ঠিক হয়, প্রথমে শুধু বড় তারকাদের ছবি ডাব করে দেখানো হবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী মনীশ শাহ্-র গোল্ডমাইন্স টেলিফিল্মস ২০০৭ সালে প্রথম তেলেগু ছবি ডাব করে, যা সোনিম্যাক্সে টেলিকাস্ট হয়৷ আর আজ, নাগার্জুনের ‘মেরি জাং: ওয়ান ম্যান আর্মি’ দেখেনি এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
আরও পড়ুন: ‘আমার মনে হয়, ভাল স্ক্রিপ্ট একটা জলজ্যান্ত মানুষ!’ হানি ত্রেহানের সাক্ষাৎকার…
সেই প্রথম কোনও দক্ষিণী ছবি, তাদের গল্প, তাদের অভিনেতারা— কোনওরকম মিডলম্যান কিংবা রিমেকের সাহায্য ছাড়া সরাসরি গোটা ভারতের ঘরে-ঘরে জায়গা করতে শুরু করে। এরপর মনীশ শাহ্ আর থেমে থাকেননি। আসতে থাকে একের পর এক সুপারহিট-ব্লকবাস্টার সিনেমার হিন্দি ডাব্ড ভার্সান। হিন্দি ছবির দর্শকদের রুচির কথা মাথায় রেখে, গোল্ডমাইন্স টিম সিনেমার দৈর্ঘ্য ছোট করার ব্যবস্থা করে। গান বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। তারা নিয়োগ করে কিছু অসামান্য ডাবিং আর্টিস্টকে, যাদের কণ্ঠস্বর নায়কের অভিনয়ে প্রাণ এনে দেয়৷ যার মধ্যে আজ সবথেকে জনপ্রিয় নাম সম্ভবত সংকেত মাত্রে। এক সময়ে বেন টেনের সমস্ত ভয়েস ডাব করা সংকেত, দক্ষিণের প্রায় সমস্ত নায়কের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। তার অসামান্য বাচনভঙ্গি, স্পষ্ট উচ্চারণ সিনেমাগুলিকে অন্য মাত্রা দেয়। শুরুর কয়েক বছর পর যখন গোল্ডমাইন্স নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খোলে, দক্ষিণী সিনেমার দর্শক-সংখ্যা আকাশ ছুঁতে থাকে। অল্লু অর্জুনের ‘সারাইনডু’, ডিজে সিনেমায় তিনশো মিলিয়নের বেশি লোক দেখে। গোল্ডমাইন্সের দেখাদেখি আরও বেশ কিছু মিডিয়া সংস্থা এই ডাবিং-এর কাজে নেমে পড়ে। আদিত্য মুভিজ, আর কে ডি মুভিজ, পেন মুভিজও সমানহারে দক্ষিণী সিনেমা ডাব করতে থাকে৷ এই ক্রমাগত সাফল্য এবং দর্শকদের অন্তহীন ভালবাসা ধীরে-ধীরে দক্ষিণী পরিচালক এবং প্রযোজকদের তাদের নিজস্ব ছবির চাহিদা আর বিষয়ের প্রতি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে৷

এবার চলে আসা যাক ২০১৫ সালে, যা সম্ভবত ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাইলফলক। মুক্তি পায় রাজামৌলি পরিচালিত ‘বাহুবলী: দ্য বিগিনিং’। অসামান্য সাফল্য পায় এই ছবি। দু’বছর পর, ২০১৭ সালে মুক্তি পায় ‘বাহুবলী: দ্য কনক্লুশন’। প্রকৃতপক্ষে এই দুই ছবিই প্রথম উত্তর ভারতের সাধারণ দর্শককেও দক্ষিণের সিনেমা সম্পর্কে উৎসাহিত করে তোলে। অর্থাৎ দক্ষিণের সিনেমার জন্য উত্তরের আগ্রহ তৈরি হয়। খুঁজে-খুঁজে তারা দেখতে শুরু করে বিভিন্ন পরিচালকের জনপ্রিয় ছবিগুলি। ফলে দক্ষিণের ছবির চাহিদা ও তাদের কাজের আকর্ষণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে৷ কোভিডের হামলা এবং ওটিটি কালচারে রমরমার ফলে, পরবর্তীতে দক্ষিণের ছবির জনপ্রিয়তা চরমে পৌঁছায়, এবং ফলস্বরূপ আজ লিও-র টিকিটের জন্য এই মাতামাতি।
এ তো গেল বাইরের গল্প। অর্থাৎ, কীভাবে দক্ষিণের ছবি ছড়িয়ে পড়ল গোটা ভারতে। কিন্তু এই যে এত মানুষের ছবিগুলোর সঙ্গে একাত্ম বোধ করা, এর কারণ কী? সেই আলোচনায় আসা যাক। যদি ভাল করে লক্ষ করা যায়, তাহলে দেখা যাবে, ২০০০-পরবর্তী হিন্দি ছবিতে ক্রমাগত বাড়তে থাকে পশ্চিমি প্রভাব। দেশের বাইরে শুট থেকে শুরু করে গানের ব্যবহার, পোশাক, ডায়লগ— সবেতেই একটা ঔপনিবেশিক মানসিকতাকে ধারণ করার চেষ্টা দেখা যায়৷ অন্যদিকে দক্ষিণের পরিচালকরা চিরকালই মাটির কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা বলতে চেয়েছেন স্ব-ভূম বা নিজেদের শেকড়ের গল্প। বিদেশে শুট করা কিংবা আধুনিক পোশাকআশাক পরলেও, তাতে একটা মাটির টান ভীষণভাবে বজায় থেকেছে৷ একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহেরা ফারহান আখতারকে নিয়ে বানালেন ‘তুফান’, অন্যদিকে পা রঞ্জিত আর্যকে নিয়ে বানালেন ‘সারপাট্টা পারাম্বারাই’৷ দুটোরই মূল কাহিনি বক্সিংকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়৷ তবে ‘তুফান’-এর গল্প যেখানে সেই গতে-বাঁধা, ‘সারপাট্টা পারাম্বারাই’-তে পা রঞ্জিত সেখানে নায়কের গল্পের সঙ্গে-সঙ্গে তামিলনাড়ুর বক্সিং-এর ইতিহাস, সেখানকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, গোষ্ঠী গড়ে ওঠার গল্পগুলোও তুলে ধরেন দর্শকদের সামনে; যা সিনেমাটিকে অনেক বেশি নিজস্ব করে তোলে।

দ্বিতীয়ত, নায়ক-নায়িকাদের, দর্শক এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা। ‘ভিশ্বাসাম’ একটা গ্রামের গল্প হওয়াতে, সমগ্র সিনেমাজুড়ে অজিতকুমার লুঙ্গি এবং পাঞ্জাবি এবং নয়নতারা শাড়িতে অভিনয় করে যান। এছাড়া অভিনেতারা জানেন, ভক্তরা তাঁদের থেকে কী চাইছে। ফলে নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে ভক্তদের একটা আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয়ে যায়৷ তৃতীয়ত, এবং মূল বিষয়টি হল, ক্রমাগত নতুনদের সুযোগ এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা। নানি-র কথাই ধরা যাক৷ সিনেমাজগতের বাইরে থেকে এসে, নিজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, ক্রমাগত নিজস্ব প্রোডাকশনে নতুন পরিচালকদের সুযোগ দিয়ে গেছেন তিনি। করতে রাজি হয়েছেন ‘জার্সি’র মতো সিনেমায় হেরোর ভূমিকায় অভিনয়। ধনুশের জন্যই নিজের প্রথম বড় ব্রেক পান শিভাকার্তিকেয়ানও। আর আজ তিনি তামিলনাড়ুর অন্যতম তারকা৷ লোকেশ কানাগরাজ উঠে আসেন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। কার্তিক সুবরাজ শর্টফিল্ম প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান পেয়ে জোগাড় করেন নিজের প্রথম ফিচার ফিল্মে কাজ করার সুযোগ৷ ‘কালার ফটো’র মতো স্বাধীন সিনেমাকে প্রচার করতে সমগ্র তেলুগু ইন্ডাস্ট্রির সুপারস্টারেরা তা নিয়ে সমাজমাধ্যমে লেখালিখি করেন, যা হিন্দি ইন্ডাস্ট্রির পক্ষে এক অতিবিরল ঘটনা। কারিগরিবিদ্যাতেও দক্ষতা বাড়ে। অ্যাকশন, ক্যামেরা, ভিএফএক্স থেকে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর— প্রতিটা বিষয়ে নিজেদের ক্রমাগত এগিয়ে নিয়ে যান শিল্পীরা। শুধুমাত্র গল্পে না, গল্প বলাতে এবং সিনেমার ভাষাতেও পরিবর্তন এবং নতুনত্ব আনার চেষ্টা করে যান অবিরত। অনিরুদ্ধ, সন্তোষ নারায়ণ, স্যাম সি এস, রবি বসরুর, গোবিন্দ ভাসন্তের মতো সংগীত পরিচালকদের হাত ধরে দক্ষিণের গানও সমগ্র উত্তর ভারতে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে।

তবে এই চরম রমরমার ফলে যে তাদের ছবির মান একেবারে বিলীন হয়েছে, এমন নয়। বিগবাজেট সিনেমা যেমন হচ্ছে, ঠিক তেমনই তৈরি হচ্ছে ‘পেবেল্স’ কিংবা ‘কদাইসি ভিভাসাই’র মতো সিনেমাও। ‘মিন্নাল মুরালি’র মতো সিনেমার মাধ্যমে মালায়লম ছবি ভারতীয় মূলধারার ছবিতে এবং সুপারহিরো সিনেমা-সংস্কৃতিকে এক নতুন দিশা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা বানাচ্ছে ‘ভাইরাস’-এর মতো মেডিক্যাল থ্রিলার, আবার একইসঙ্গে তৈরি করছে ‘মায়ানদী’ কিংবা ‘চার্লি’র মতো ছবি। এই বৈচিত্র্যই তাদের সিনেমাকে এক আলাদা দিশা দিচ্ছে। নতুনদের সুযোগ দেওয়ার ফলে তারা একই গল্পকে নিজেদের মতো করে নতুন মোড়কে বলার সাহস দেখাচ্ছে, যা সামান্য বিষয়কেও দিচ্ছে এক ভিন্ন আঙ্গিক, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।
তবে নায়ক-নায়িকাদের ক্যারিশমা, পরিচালকদের দক্ষতা, এসব পেরিয়ে যা দক্ষিণের সিনেমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে— তা হল তাদের দর্শকদের সিনেমার প্রতি প্রেম। এই ওটিটির যুগেও সিনেমাহলে গিয়ে সিনেমা দেখার যে-নেশা, যে অপার ভালোবাসা— তা তাদের অভিনেতাদের, পরিচালকদের এবং নির্মাতাদের বাধ্য করে তোলে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার জন্য৷ যে-কারণে রজনীকান্ত তিয়াত্তরে এসেও স্বমহিমায় ফিরে আসার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে দেন। অজিত নিজের খ্যাতিকে মুলতুবি রেখে ভেট্রিমারানের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়ে যান একবাক্যে। নিজেদের কাজের প্রতি এই বিশ্বাস, নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি এই আনুগত্যই যে আজ সমগ্র দেশের মানুষের কাছে তাদের ভালবাসার পাত্র করে তুলেছে, এ-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না!


