‘ইতিহাস আমাদের পথ দেখায়… কীভাবে প্রতি যুগে যুগে ভারতে নতুন জনজাতি এসেছে আর এই দেশকে আপন করে নিয়েছে… এমন গবেষণার পথ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। আমরা ভারতীয় বলতে কী বুঝি? তা অনুধাবন করা…একটি জনজাতির পূর্বসূরি কারা বা তাদের পৈতৃক বাসস্থান চিহ্নিত করে একটি জায়গার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য দাবি করা অত্যন্ত অন্যায়। যারা আজ ভারতে থাকে, নিজেকে ভারতীয় ভাবে, তারাই এ-দেশের সদস্য… একটা মাল্টি-কালচারাল, মাল্টি-লিঙ্গুয়াল দেশ, যারা পাশাপাশি সহাবস্তানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সখ্যতা গড়ে তুলেছে…’
ভারতের প্রথম মহিলা নৃতত্ত্ববিদ, ইরাবতী কার্ভে, ১৯৬৩ সালে ‘The Racial Factor in Indian Social Life’ বইয়ে এই কথাগুলি লেখেন। কার্ভে-র জন্ম ১৯০৫ সালের বর্মায়। মায়ানমারে বয়ে যাওয়া নদীর নাম থেকেই মা-বাবা নাম রেখেছিলেন ইরাবতী। মাত্র সাত বছর বয়সে পুনেতে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হন, তারপর ফার্গুসন কলেজ, বম্বে বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯২৭ সালে সোজা বার্লিন। যে-সময় ভারতীয় মহিলাদের গৃহ, সংসার আর বিয়ে ছাড়া গতি হত না, সেই সময় ইরাবতীর জীবন সম্পূর্ণ অন্য পথে বাঁক নেয়। এমন বিদুষী রত্নকে যত্নে মানুষ করেন তাঁর বাবা, মা এবং যাঁকে ইরাবতী ডাকতেন ‘আপ্পা’ বলে। পুরুষোত্তম পারাঞ্জপে, প্রখ্যাত ভারতীয় গণিতজ্ঞ ও তাঁর পরিবার ইরাবতীর বৌদ্ধিক চর্চায় ক্রমশ সহায় হয়ে ওঠে। সহোদর পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ইরাবতী ছিলেন একমাত্র কন্যা, কিন্তু মেয়ে হওয়ার কারণে বাবা-মা তাকে আলাদা চোখে দেখেননি।
আরও পড়ুন: রবীন্দ্র রচনাবলি প্রকাশের কৃতিত্ব ছিল পুলিনবিহারী সেনের!
লিখছেন শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়…

মাস্টার্স শেষ করে কার্ভে যখন জার্মানি যাচ্ছেন, হিটলারের তখনও উত্থান হয়নি। কিন্তু ‘গ্রেট ওয়ার’ পরবর্তী জার্মানি অনেকটাই পর্যদুস্ত, দিকে-দিকে অ্যান্টি সেমিটিজমের ত্রাস ছড়াতে শুরু করেছে। ইরাবতীর বয়ান থেকে জানা যায়, কীভাবে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টেই এক ইহুদি যুবককে হত্যা করা হয়, যাঁর নিথর দেহ ফুটপাথে পড়ে থাকতে দেখা গেছিল। ভয়াবহ সে-দৃশ্য ভোলার নয়। নিজের দেশে হয়ে চলা বর্ণবিদ্বেষবাদের সঙ্গে জার্মানির ইহুদি নিধনের কিছু মিল নিশ্চয়ই পেয়েছিলেন ইরাবতী। শ্বেতাঙ্গ ও আর্য জাতিরাই হল সর্বশ্রেষ্ঠ, বাকিরা হীন, আর তাই তারা অধীন, কখনও জার্মানদের হাতে, কখনও বা ব্রিটিশদের করতলে। এমন কুখ্যাত তত্ত্ব কার্ভে যে শুধু বাস্তবায়িত হতে দেখেছিলেন, তা নয়, বরং প্রাণপণে এর বিরোধিতায় উদ্যত হয়েছিলেন।
ইউজেনিক্স থিওরি, যেখানে জিনতত্ত্ব দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় কোন জাতি উত্তম আর কারা নিকৃষ্ট (যার ওপর ভিত্তি করেই হিটলারের হেরেনভক থিওরি গড়ে উঠেছিল), তাকে অনেকাংশে নাকচ করেছিলেন কার্ভে। ইউজিন ফিশার ছিলেন ইরাবতীর ডক্টরাল সুপারভাইজার, যিনি ইউজেনিক্স নিয়ে ইতিমধ্যে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পরবর্তীকালে এই ফিশারই যুক্ত হবেন নাৎসি-বাহিনীর সঙ্গে, এবং তার গড়ে তোলা অপবিজ্ঞানের সাহায্যেই মৃত্যু হবে প্রায় দু-কোটি মানুষের। এমন ব্যাক্তির তত্ত্বাবধানে কাজ করতে হয়েছিল ইরাবতী কার্ভেকে। তাঁর ডক্টরাল গবেষণার অংশ ছিল ইউরোপ, রোয়ান্ডা, তানজানিয়া: নানা জাতির মানুষের মাথার খুলি মেপে দেখা, সেগুলিকে পর্যবেক্ষণ করে শেষমেষ সিদ্ধান্তে আসা যে আর্য ইউরোপীয়রাই বুদ্ধিমান। আরও বিশদে বললে এই অপবিজ্ঞান (যদিও সে-সময় এটিকেই বৈজ্ঞানিক প্রতিপন্ন করে সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদে কাজে লাগানো হয়েছিল) এর ভাষ্যে বলা হত, মস্তিষ্কের ডান দিকের ফ্রন্টাল লোব ও তার আকার দেখে সেই জাতির লজিক ও রিজনিং করার ক্ষমতা জানা যায়। অর্থাৎ, যে জাতির রাইট ফ্রন্টাল লোব যত বর্ধিত বা উন্নত, সে তত বেশি যুক্তিবাদী বা বুদ্ধিমত্তার প্রকাশক। ১৪৯টা মস্তিষ্ক পরীক্ষা করার পর ইরাবতী যে-সিদ্ধান্তে আসেন, তা জার্মানির উক্ত ইনস্টিটিউশনে আগে কখনও বলা হয়নি। কার্ভে বলেন যে, মস্তিষ্কের আয়তন আর কোনও জনজাতির শ্রেষ্ঠত্বর মধ্যে কোনও সরল সম্পর্ক থাকতে পারে না। উপরন্তু একটি জাতির সকল মানুষের মস্তিষ্কের গঠন যে একরকম হবে, তাও নয়; এখানে হেরেডিটি, জলবায়ু ও আরও নানা বিষয় কাজ করে থাকে। ইরাবতীর তত্ত্ব ফিশারের থিসিসকে অস্বীকার করে। তার অবশ্য ফলও ভুগতে হয় কার্ভেকে। পিএইচডি সম্পন্ন হয় ঠিকই, কিন্তু গ্রেড থাকে নিচের দিকে, সুপারভাইজারের রিমার্কে মেলে না কোনও উচ্চ প্রশংসা।

তাঁর এই রেস থিওরি নাকচ পরবর্তীতে কাস্ট নিয়ে গবেষণার পথও প্রশস্ত করে। ভারতের বিবিধ আদিবাসী সম্প্রদায়, যেমন মাহার, ধাঙ্গার এবং নানা উচ্চজাতির রক্তের স্যাম্পেল পরীক্ষা করে কার্ভে সিদ্ধান্তে আসেন যে, রেস বা কাস্ট, কোনওটাই একজন মানুষের জৈবিক পরিচিত নয় (biological Identity), বরং এগুলি সামাজিক নির্মাণ। যুগে যুগে সন্তর্পণে যা বানানো হয়েছে, যা ‘ইনহেরেন্ট’ বা জন্মগত নয়। Kinhsip বা জ্ঞাতি সম্পর্ক নিয়ে তাঁর কাজ অ্যাকাডেমিয়াতে সবথেকে বেশি সমাদৃত। কার্ভে-র আগে জাতি বা কাস্ট নিয়ে প্রচুর কাজ হলেও, ‘কিনশিপ’ নিয়ে আলাদা করে সেভাবে গবেষণা হয়নি। সমগ্র ভারতকে মোট চারটি ‘linguistic zones’ (ভাষাগত অঞ্চলে) ভাগ করে তিনি ‘কিনশিপ’ নিয়ে আলোচনা করেন। এক্ষেত্রে সোর্স হিসেবে ব্যবহৃত হয় সংস্কৃত টেক্সট, জনজাতির রূপকথা থেকে আরম্ভ করে নানা ধরনের উপকরণ। এই কাজ, বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডির সূত্রপাত ঘটায়। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য পরিচালনায় কার্ভের ছিল বিশেষ আগ্রহ। ভারতের মতো দেশে যেখানে শিক্ষাখাতে বা গবেষণায় সব সময়ই লগ্নি কম, সেই পরিস্থিতিতে কোনও অ্যাসিস্ট্যান্ট ছাড়াই চলে যেতেন এক্সকেভেশনে। প্রত্নতত্ত্ববিদ ধীরাজ শাঙ্কালিয়ার সঙ্গে গুজরাতে নানা জায়গায় ফিল্ডওয়ার্কে থেকেছেন ইরাবতী। নিজেরাই মাটি খুঁড়ে, রেকর্ড রেখে, ফোটো তুলে, সেগুলিকে বিশেষভাবে সংরক্ষণে সচেষ্ট হয়েছেন। কাজের প্রতি এতটাই দায়বদ্ধ মনে করতেন নিজেকে যে, কখনও-কখনও নিজের বড় ছেলেকেও নিয়ে যেতেন ফিল্ডে, কিছু শ্রমসাধ্য কাজ করানো গেলে সেটাও কম সাহায্য নয়।
ব্যক্তিগত জীবনে ইরাবতী কেমন ছিলেন, তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় কার্ভে-র নাতনি উর্মিলা দেশপান্ডের লেখা বায়োগ্রাফি ‘Iru: The Remarkable Life of Irawati Karve’ বইয়ে। পৌত্রীর লেখায় ধরা পড়ে ইরাবতীর ব্যাতিক্রমী জীবন, পুনের রাস্তায় ল্যামব্রেটা স্কুটার চালিয়ে নিয়মিত যাতায়াত, সাঁতার শিখতেন সুইমিং কস্টিউম পরে, বিবাহের পরেও বৈবাহিক কোনও চিহ্ন (হাতে বালা, মঙ্গলসূত্র) রাখতেন না। তাঁর স্বামী ছিলেন মুক্তমনষ্ক, নাস্তিক এবং লিঙ্গসাম্যে বিশ্বাসী। বার্লিন যাওয়ার সময় নিজের বাবা থেকে শ্বশুর সকলেই যখন আপত্তি জানান, তখন তাঁর স্বামী দিনকার কার্ভে ছিলেন তাঁর পাশে।

কিনশিপ, সংস্কৃত ভাষা কিংবা হিন্দু সমাজের নানা দিককে অ্যানথ্রোপোলজিকাল পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা ছাড়াও ইরাবতীর জনপ্রিয় কাজ ‘যুগান্ত’ নামক বইটি। মারাঠি ভাষায় এটি প্রকাশ পায় ১৮৬৭ সালে। এই বইতে দ্রৌপদী, গান্ধারী, কুন্তী, কৃষ্ণ: বিবিধ মহাভারতের চরিত্রকে কিংবদন্তি হিসেবে না দেখে নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বলা হয়, বাঙালি নাট্যকার শাঁওলী মিত্র তাঁর বিখ্যাত ‘নাথবতী অনাথবৎ’ এই ‘যুগান্ত’ পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েই লেখেন। কার্ভে-র বইয়ে ঐশ্বরিক বা অলৌকিক পর্বগুলির নিবিড় পাঠে উঠে এসেছে জলজ্যান্ত কিছু মানুষের গল্প। মহাভারতকে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উপাখ্যান হিসেবে না দেখে, ‘sociolgical document’ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন ইরাবতী। এই মহাকাব্য পড়ে, এর বিভিন্ন চরিত্র অনুধাবন করে, তৎকালীন সমাজকে বুঝতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এহেন সামাজিক পাঠ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে হয়তো খুব বিপজ্জজনক। কার্ভে আজ বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই প্রবল সমালোচনার শিকার হতেন। কারণ মহাকাব্য নিয়ে আজকাল যে ‘standerdization’ বা প্রমিতকরণের চেষ্টা দেখা যায় (রামরাজ্য থেকে মহাভারতের যুদ্ধ, সবক্ষেত্রেই একমাত্রিক, একপেশে অবয়ব গুরুত্ব পাওয়া)— তার বিপরীতে গিয়ে তিনি ইন্টারপোলেশনের কথা বলছেন। (Interpolation অর্থে অরিজিনাল কোনও টেক্সটে পরে নতুন করে কিছু সংযোজন করা)।
একটু উদাহরণ দেওয়া যাক, যেমন কার্ভে দেখাচ্ছেন, ভীষ্মের সঙ্গে পরশুরামের যে তিন সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধ হল মহাভারতে, সেটি খানিক গোলমেলে। কারণ অন্যান্য পুরাণ বলছে পরশুরামের জন্ম সত্যযুগে। তাহলে এই চরিত্রটি মহাভারতের দ্বাপর যুগে এল কী করে? কার্ভে-র অনুমান যে পরশুরাম আসলে ভৃগু বা ভারগভ বংশের পূর্বসূরি। তাই তারা নিশ্চয়ই নিজেদের প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য মহাভারতে এই অংশটি পরে সংযোজন করেন।
আগেও উল্লেখ করা হল, ভারতীয় মহাকাব্যকে আজকে যে এককেন্দ্রিকতায় বেঁধে ফেলা হয়েছে; গুড অ্যান্ড এভিল, উত্তম-অধম, দেবতা- রাক্ষস, এমন নানা বাঁধাধরা ছকে কিছু চরিত্রকে মহিমান্বিত করার রাজনীতি আজ দেশে মান্যতা পেয়েছে, কার্ভে-র মহাভারত পাঠ ঠিক তার উল্টো বয়ান তুলে ধরে। মহাভারতে যেভাবে মরালিটি বা নীতি-নৈতিকতার দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে, হিরো-ভিলেনের গতানুগতিক সীমারেখাকে নস্যাৎ করে, সেটি ধরতে চেয়েছিলেন ইরাবতী। উনি মনে করেছেন, এই দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংশয়গুলোই রক্তমাংসের মানুষ তৈরি করে। সেই মানুষের ইতিহাসকেই এগিয়ে রাখতে চেয়েছেন কার্ভে। তাই তাঁর কথা লিখতে বসে ‘যুগান্ত’ বইটির (যেখানে মহাভারত নিয়ে তাঁর ১১টি মৌলিক রচনা আছে) প্রসঙ্গ উঠে আসেই। বিশেষ করে আজকের দিনে, যেখানে নোলান হেলেনকে কৃষ্ণাঙ্গ দেখানোর স্বাধীনতা রাখেন, কিন্তু আসন্ন ভারতীয় মহাকাব্যের রিলিজ নিয়ে কোনও নিজস্ব মতামত বা পাঠ (কার্ভে-র মতো) সমূহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। রুপোলি পর্দায় মহাকাব্যের নক্ষত্রখচিত চিত্রায়ন নিয়ে ইতিমধ্যে কী কী বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভারতে, তা খবরের শিরোনাম পড়লেই জানা যায়। তাই আজ, ইরাবতী কার্ভের মৃত্যুদিনে, তাঁর নাৎসি ইউজেনিক্স থিওরি প্রত্যাখ্যান যতটা গুরুতর, ততোধিক জরুরি তাঁর ‘যুগান্ত’ পড়ে দেখা।
চেনা ছকের তত্ত্বায়নকে অস্বীকার করেই গড়ে উঠেছিল ইরাবতী কার্ভে-র তত্ত্ববিশ্ব। তাই ইরাবতী কার্ভে বারবার প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠেন।




