সম্পাদকের মন

Representative Image

তিনি নাকি বলতেন— ‘জানো তো, এই ফ্যাক্টরিতে কোনো ভোঁ পড়ে না।’ কথাটা নেহাত আলটপকা চমক দেবার জন্য নয়। পুলিনবিহারী সেন একবার একটি সংবর্ধনাসভায় কেবল বলতে পেরেছিলেন— ‘আমি একজন শ্রমিক মাত্র।’ কেমন ছিল সেই ভাষাশ্রমিকের জীবন, তার খানিকটা আঁচ পাওয়া যায় পুলিনবিহারীর বন্ধুপুত্র ও ১৯৫৪ সাল থেকে প্রায় নিত্যসঙ্গী সুবিমল লাহিড়ীর ‘সংযোজিত আত্মজীবন’ লেখাটিতে চোখ বোলালে।

১৯৫৪ সাল থেকেই পুলিনবিহারী সেনের ৫৪/বি হিন্দুস্থান রোডের বাড়িটি হয়ে উঠেছিল সুবিমল লাহিড়ীর দ্বিতীয় ঠিকানা। ১৯৫৩-র ২৮ ডিসেম্বর সুবিমল বিশ্বভারতীর গ্রন্থনবিভাগে যোগ দেন। জোড়াসাঁকোর লালবাড়ি— ৬/৩ দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনে তখন গ্রন্থনবিভাগের দপ্তর। সন-তারিখ মিলিয়ে দেখলে তখনও অধ্যাপক চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য গ্রন্থনবিভাগের সম্পাদক। পুলিনবিহারী সেন শান্তিনিকেতনে সুবিমল লাহিড়ীর বাবা তারকনাথের সহপাঠী ছিলেন। সেই সূত্রে বন্ধুপুত্রকে তিনি নিজের বাড়িতে রাখার বন্দোবস্ত করেন।

উপলক্ষ্য বুঝতে গেলে সুবিমল লাহিড়ীর লেখায় একটু চোখ রাখতে হবে। সুবিমল লিখছেন— ‘যখন থেকে পুলিনবাবুর বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হল— অফিসের কাজকর্মের পর তাঁর সঙ্গেই ফিরতাম। ফিরেই কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে কাগজপত্র বের করে প্রেসকপির সঙ্গে বিভিন্ন বইয়ের প্রুফ মেলাতে বসে পড়তে হত।… সত্যি-সত্যি তিনি নিজেও কাজের মধ্যেই বিরাম খুঁজেছেন— তাঁর সঙ্গে যাঁরাই যুক্ত হয়েছেন সকলেই একথা স্বীকার করবেন— নিরলসভাবে রবীন্দ্রগ্রন্থের মুদ্রণের প্রতিটি পর্যায়ে কি শ্যেন নজর দিয়েছিলেন। বিভিন্ন গ্রন্থাগার থেকে ওঁর কার্যকালে নানান পত্রিকা থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয় নকল করা এবং তা আবার মিলিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ছিল। লাইব্রেরিতে বসে বা সেই সেই পত্রিকা বা বই বাড়িতে সঙ্গে করে নিয়ে এসে নকল করতে হত। তখন তো Xerox করার ব্যবস্থা ছিল না। কাজেই এক-একটা বইয়ের মুদ্রণযোগ্য জায়গায় পৌঁছতে কী পরিশ্রম যে করতে হয়েছিল তা এখনকার প্রকাশন-সংস্থা কল্পনা করতে পারবেন না।’ বোঝাই যাছে, কেন পুলিনবিহারী বন্ধুপুত্রকে বাড়ি যেতে না দিয়ে হিন্দুস্থান পার্কে রাখতে চেয়েছিলেন। এই যে নিরলস রবীন্দ্রচর্চা, আরও নির্দিষ্ট করে বললে রবীন্দ্র-পাঠচর্চা, পাঠের শুদ্ধতা ধরে রাখা, পাণ্ডুলিপি-সংস্করণ মিলিয়ে মূলানুগ থাকার চেষ্টা— এসব দেখেশুনে রবীন্দ্রনাথের ‘শারদোৎসব’-এর উপনন্দ-র কথা মনে পড়াটা অবশ্যম্ভাবী। বিশেষ করে যেখানে বালকের দল ছুটির নেশায় মাতোয়ারা কিন্তু লক্ষেশ্বরের কাছে প্রভুর ঋণ শোধবার দায়ে উপনন্দ একমনে পুঁথি নকল করছে। সন্ন্যাসী সেখানে বলেছিল— ‘…বল কী, এর চেয়ে সুন্দর কি আর কিছু আছে! ওই ছেলেটিই তো আজ সারদার বরপুত্র হয়ে তাঁর কোল উজ্জ্বল করে বসেছে। তিনি তাঁর আকাশের সমস্ত সোনার আলো দিয়ে ওকে বুকে চেপে ধরেছেন। আহা, আজ এই বালকের ঋণশোধের মতো এমন শুভ্র ফুলটি কি কোথাও ফুটেছে— চেয়ে দেখো তো! লেখো, লেখো বাবা, তুমি লেখো, আমি দেখি! তুমি পংক্তির পর পংক্তি লিখছ, আর ছুটির পর ছুটি পাচ্ছ! তোমার এত ছুটির আয়োজন আমরা তো পণ্ড করতে পারব না।…’

আরও পড়ুন: জমিদার রবীন্দ্রনাথ বাধ্য হয়েছিলেন প্রিয় বাড়িকে বিদায় জানাতে! লিখছেন তপশ্রী গুপ্ত…

‘শুষ্কং কাষ্ঠং’ শব্দবন্ধকে এড়িয়ে ‘নীরস তরুবর’ বললেও পাঠশুদ্ধি বা তথ্য কিংবা সূচি-পঞ্জি সংকলনের কাজটা আদৌ আরামপ্রদ হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, সে-কাজ সব সময়ে প্রতিষ্ঠান পরিপোষিত হয় না— পুলিনবিহারীর ক্ষেত্রেও বেশিরভাগ সময়ে হয়নি; পাঠকসমাজের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ ছাড়া সে-কাজের রসিক পাওয়াও দুষ্কর; আর সম্মান-সম্মাননা— জীবদ্দশায় সে-আশা না-রাখাই ভাল।

যদি একুশ শতকের নবীন পাঠক প্রশ্ন করেন, কে এই পুলিনবিহারী সেন? তাঁদের অবগতির জন্য সংক্ষেপে বলি— পুলিনবিহারী সেনের জন্ম ১১ অগাস্ট ১৯০৮ সালে অবিভক্ত ভারতের ময়মনসিংহে। সেখানকার জাতীয় বিদ্যালয়ের পর আসেন শান্তিনিকেতনে। ১৯২৬-এ ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর। প্রথমে কিছুদিন একটি বিমা কোম্পানিতে কাজ করলেও অচিরেই ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে যোগ দেন। তখন ‘প্রবাসী’র সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। ‘প্রবাসী’তে কর্মরত অবস্থাতেই ১৯৩৯-এ তিনি যোগ দেন বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগে। সেই সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথের রচনাবলি থেকে শুরু করে বিবিধ বইপত্র সম্পাদনা— নানা সময়ে সম্পাদনা করেছেন ‘বিশ্বভারতী পত্রিকা’, ‘সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা’, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ‘তত্ত্বকৌমুদী’, ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টের অবনীন্দ্র-সংখ্যা এবং গগনেন্দ্র-সংখ্যা। আর তাঁর ‘রবীন্দ্রায়ণ’ বা ‘রবীন্দ্রগ্রন্থপঞ্জী’র প্রথম খণ্ড হল পুলিনবিহারীর আজীবনের সাধনার ফসল।

বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগের পঞ্চাশ বছরে প্রকাশিত (১৭ জুলাই ১৯৭৪) ‘বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ পঞ্চাশৎবর্ষ-পরিক্রমা’ পুস্তিকার ‘উপসংহার’ অংশে তাঁর সম্পর্কে লেখা হয়েছিল— ‘উত্তরকালে রবীন্দ্র-গবেষণায় এসে যোগ দিলেন শ্রীপুলিনবিহারী সেন… গ্রন্থনবিভাগের সঙ্গে তাঁর প্রাণের ও কাজের যোগ দিনে দিনে বেড়েই চলল (শান্তিনিকেতন আশ্রম বিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগ আরও আগের) এবং কিশোরীমোহন সাঁতরার অকালবিয়োগে তাঁর অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব নিতে হল তাঁকেই। নানা দিকে, নানা ভাবে সে কর্মের প্রসার ও পুষ্টি সাধন করে গেছেন তিনি রবীন্দ্রশতবর্ষপূর্তির সময় পর্যন্ত, এবং তার পরেও। গ্রন্থনবিভাগের বহুমুখী উন্নয়নে তাঁর প্রযত্ন আর সফলতা অল্প নয়— বিস্তারিত আলোচনা এ-স্থলে অনাবশ্যক— তার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দেয় রবীন্দ্র-রচনাবলীর প্রতি খণ্ডে সংকলিত গ্রন্থপরিচয়, চিঠিপত্রের অনেকগুলি খণ্ড (৬-৯), গল্পগুচ্ছ-৪, রূপান্তর, সংগীত-চিন্তা, জাপান-যাত্রী, পারস্য-যাত্রী ও অন্যান্য গ্রন্থ… এ কথা বললে একটুও অত্যুক্তি হয় না যে, তাঁরই প্রায় দুই-দশক-ব্যাপী একনিষ্ঠ কর্মের বিশেষ ফলভাগী হয়েছেন গ্রন্থনবিভাগ ও গ্রন্থনবিভাগে তাঁর অনুগামী ও অনুব্রতী কর্মীগণ— আজও হচ্ছেন।’

প্রসঙ্গত উল্লেখ থাক হীরেন্দ্রনাথ দত্তর একটি মন্তব্যের— রবীন্দ্রনাথের হাতে যখন প্রথম পৌঁছল ‘রবীন্দ্র-রচনাবলী’র প্রথম খণ্ড— একটি চেয়ারে বসে রচনাবলির পাতা উলটোচ্ছেন কবি, রীতিমতো খুশিই দেখাচ্ছিল তাঁকে। সে-সময়ে তাঁর চেয়ারের পিছনেই দাঁড়িয়ে পুলিনবিহারী। সেটা খেয়াল করেই কবি নাকি বলে উঠেছিলেন— ‘ইস! ভাবটা যেন কৃতিত্বটা ওঁরই।’

মনে হয় প্রকৃত সম্পাদকেরা এই প্রেরণাতেই কাজ করেন। হাতের বইটি সম্পাদকের নিজের লেখা নয়, অন্যের লেখায় প্রবেশের অধিকারও তাঁর নেই— তবু কেন তিনি সে-বইয়ে নিবিষ্ট হয়ে কাজ করেন দিনের-পর-দিন? আমার ধারণা, এ এক বিশিষ্ট মনোভঙ্গি। সাময়িকপত্রের সম্পাদকের নাম তবু জনমানসে থাকে, কিন্তু বইয়ের সম্পাদনা কাজটা আজও পাঠক তো বটেই, বাংলা বইয়ের প্রকাশক-লেখকের কাছেও খুব স্পষ্ট নয়। আর সংকলন-সম্পাদনার ফারাক-না-বোঝা, বইয়ের মলাটে লেখকের নামের সমান মাপের হরফে নিজের নাম-ছাপানো সম্পাদকেরা কী বুঝবেন পুলিনবিহারী সেনেদের মতো মানুষকে! সম্পাদিত রবীন্দ্র-গ্রন্থে নিজের নাম ছাপানোয় এমনই অনীহা ছিল পুলিনবিহারীর যে, বুদ্ধদেব বসু একটি চিঠিতে তাঁকে লিখেছিলেন— ‘…এই অনামিতা অনুচিত, কেননা কোনো চিরায়ত গ্রন্থের নতুন সংস্করণের মূল্য তার সম্পাদনায়।’

পুলিনবিহারী সম্পাদনা বিষয়টাকে আদৌ লঘুভাবে দেখতেন না। তবে তিনি আসলে উপনন্দই— গুরুদেবের ঋণ শুধে গেছেন আজীবন। রবীন্দ্রনাথও তো এমনটাই চেয়েছিলেন! নইলে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে অন্য শিক্ষাসত্রের তফাতই-বা কোথায়! ছাত্র-শিক্ষকে মিলে সমগ্রসত্তার প্রতিফলন পুলিনবিহারীর কাজে। বন্ধুজনেরা যাকে খানিকটা মজা করে বলতেন ‘পৌলিন্য’। পুলিনবিহারীর ভাষায় অবশ্য তাঁর কাজটুকু ‘সিজার আর গামেই’ সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও নিজেকে নিয়ে এমন মজা করা খুব সহজ কথা নয়। সন্ধিৎসু পাঠকের জানা যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শুধু গ্রন্থনির্মাতা হিসেবে দেখতেন এমনটা নয়। তাঁর সাহিত্যবোধকেও গুরুত্ব দিয়েছেন নানা সময়ে। তাঁরই প্রস্তাবে কবি ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’-এ একটি অপ্রত্যাশিত ছত্র জুড়েছিলেন। ‘নামহীনতার দিকে’ প্রবন্ধে শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন— ‘কর্ণের শেষ সংলাপে মিলছুট একটি লাইনকে দোসর জুটিয়ে দেবার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান রবীন্দ্রনাথ, ‘সঞ্চয়িতা’য় (১৯৩১) নতুন লিখে বসিয়ে দেন ‘চরম বিশ্বাসে ক্ষীণ ব্যর্থতায় লীন’। অতিসংহত সেই সুঠাম সংলাপের মধ্যে আকস্মিক এই অনুপ্রবেশ বিষয়ে বলতেন পুলিনবিহারী: ‘ভাবো একবার! একটা ছুঁচ গলাবার জায়গা নেই যেখানে, সেখানে আস্ত একটা লাইন!’ আবার পুলিনবিহারীর চিঠির উত্তরেই ১৯৩৭ সালের ২০ নভেম্বর যে-চিঠিটি রবীন্দ্রনাথ লিখবেন, সেটিও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘জনগণমন অধিনায়ক’ গানটি যে আদপেই পঞ্চম জর্জের কলকাতায় আসা উপলক্ষ্যে রচিত নয়, এই চিঠি সে-সাক্ষ্য দেয়।

পুলিনবিহারী সম্পাদনা বিষয়টাকে আদৌ লঘুভাবে দেখতেন না। তবে তিনি আসলে উপনন্দই— গুরুদেবের ঋণ শুধে গেছেন আজীবন। রবীন্দ্রনাথও তো এমনটাই চেয়েছিলেন! নইলে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে অন্য শিক্ষাসত্রের তফাতই-বা কোথায়! ছাত্র-শিক্ষকে মিলে সমগ্রসত্তার প্রতিফলন পুলিনবিহারীর কাজে। বন্ধুজনেরা যাকে খানিকটা মজা করে বলতেন ‘পৌলিন্য’।

বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ থেকে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত পুলিনবিহারী সেনের ‘রবীন্দ্রগ্রন্থপঞ্জী’র প্রথম খণ্ড বেরুনোর চার বছর আগে মাসিকপত্রে ছাপা এই পঞ্জির একটি বাঁধানো খণ্ড হাতে পেয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। জ্যোতির্ময় দত্ত সম্পাদিত ‘কলকাতা’ পত্রিকার ২২ ডিসেম্বর ১৯৬৯ সংখ্যায় বুদ্ধদেব জানিয়েছিলেন— ‘ভাবতে ভালো লাগে যে তিনি— বর্তমান বাংলার সর্বাগ্রগণ্য রবীন্দ্র-বিশারদ… লোকচক্ষুর অন্তরালে এক অতি সাধু পরিশ্রমে তিনি লিপ্ত হ’য়ে আছেন। যে-কর্ম প্রকাশিত হ’লে বৃহত্তর পাঠকসমাজে কোনো রেখাপাত হবে না, এক সহস্র পাঠকের মধ্যে হয়তো মাত্র একজন যা লক্ষ করবেন, তা-ই তিনি রচনা ক’রে যাচ্ছেন তিলে-তিলে, বছরের পর বছর ধ’রে, স্বাধীন ও স্বপ্রণোদিতভাবে, শুধু নিজের আন্তরিক উৎসাহে, শুধু রবীন্দ্রনাথের প্রতি আসক্তিবশত এবং সুনির্বাচিত অনুধ্যায়ীদের সাহায্যকল্পে। তাঁর পরিকল্পিত রবীন্দ্র-গ্রন্থপঞ্জির কথা আমি অনেক আগেই শুনেছিলাম; আজ তার প্রথম ফলাফল ছাপার অক্ষরে দেখতে পেয়ে আমার আনন্দ হচ্ছে। এবং শ্রীযুক্ত সেনের প্রতি নতুন ক’রে কৃতজ্ঞতাবোধ।’

তবে সেলাম জানাতে হয় ‘কলকাতা’ পত্রিকার সম্পাদককে— কারণ সে-পত্রিকার মলাটে ছিল পুলিনবিহারীর ছবি। অন্তত একটি বাংলা পত্রিকা সাহস দেখিয়েছিল নিভৃতের সাধনা করা মানুষকে সম্মান জানানোর, বাঙালির হয়ে এই রবীন্দ্রতাপসের কাছে ঋণ শোধ করার। শুধু তা-ই নয়, সে-সংখ্যার সম্পাদকীয়-তুল্য গদ্যে লেখা হয়েছিল— ‘…আমরা এই সংখ্যায় যা ব্যক্ত করতে চেয়েছিলাম তার প্রতীক হচ্ছেন পুলিনবিহারী সেন। এ কয় মাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া আরো ধূমায়িত হ’য়ে উঠেছে; যাঁরাই “জনসাধারণ”-এর নামে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মে লিপ্ত তাঁদের প্রত্যেককেই অশ্রদ্ধেয় মনে হচ্ছে। যে-কর্ম ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রকাশ্যে, বহুজনের সমর্থন নিয়ে করতে হয় তা ক্রোধ কি স্বার্থ-সঞ্জাত হ’তে পারে কিন্তু কিছুতেই সৎ কি বিশুদ্ধ হ’তে পারে না, এবং তাকে স্থায়ী করতে হ’লে হয় ক্রমাগতই শত্রু সৃষ্টি করতে নয়তো সমর্থকদের স্বার্থের রজ্জুতে বাঁধতে হয়। কেবল নিজের বশবর্তী হ’য়ে, গোপনে, কারো সমর্থন কি ভোট বিনা যে-কাজ করা যায় তাই কেবল সৎ ও বিশুদ্ধ হতে পারে। এই সংশয়ের কালে পুলিনবিহারীর নিঃস্বার্থ, নিঃশব্দ, অন্তরালবর্তী সাহিত্যসেবা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পরিবেশ যতোই প্রতিকূল হোক কি ধরণের আনন্দদায়ক ও সাধু জীবন সর্বসমাজেই সম্ভব।’

‘রবীন্দ্রগ্রন্থপঞ্জী’ প্রথম খণ্ডটির ২৮৭ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ‘কবি-কাহিনী’ (১৮৭৮) থেকে ‘রাজা ও রাণী’ (১৮৮৯)— মাত্রই এগারো বছরের বইপত্রের বিবরণী। তাঁর মতো ‘নৈখঁত্যুবাদী’র কাছ থেকে এমনটাই আশা করা যায়। একবার তাঁর অগ্রজপ্রতিম ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন— ‘অত খুঁতখুঁত করিবেন না।’ লেখা বাহুল্য, এই মন্তব্যকে পুলিনবিহারী প্রশংসাবাচক স্বীকৃতি বলেই ধরেছিলেন।

জীবনযাপনে সন্ন্যাসীপ্রতিম মানুষটির একমাত্র ধ্যান যেমন রবীন্দ্রনাথ, তেমনই একমাত্র আকর্ষণের বস্তু ছিল বই। ৫৪/বি হিন্দুস্থান পার্কের বাড়িতে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির পাশে-পাশে থাকত থরে-বিথরে বই। দু-খানা ঘর আর খাবারঘরেও যত্রতত্র বই। কিন্তু সুবিমল লাহিড়ী লিখেছেন— ‘দরকার পড়লে বলতেন, ‘খাওয়ার ঘরের র‍্যাক থেকে নিয়ে এসো’। একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার চোখ বেঁধে দাও’— সেই চোখ-বাঁধা অবস্থায় ঠিক বই বা পত্রিকাটি দেখিয়ে দিতেন।’ তাঁর আরেক নিকটজন এবং ‘সন্ধ্যাসংগীত’ বইটির পাঠান্তর সম্বলিত সংস্করণ নির্মাণে সম্পাদনা-সহযোগী শুভেন্দুশেখর মুখোপাধ্যায় লিখেছেন— ‘কোনো বই উপহার দিতে গেলে এক কপি বই পেয়ে তিনি তেমন খুশি হতেন না, চার পাঁচ কপি পেলেও তা যথেষ্ট নয়। একখানা কলকাতার বাড়িতে, এক কপি শান্তিনিকেতনে, আর এক কপি যাতে কাজের সময় হাতের কাছে বইখানি খুঁজে পাওয়া যায় সেজন্য, তা ছাড়া একান্ত আপনজনদের এক কপি না দিলেই যে নয়। লঘু পরিহাসেরসুরে মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে’— একথা মনে রেখে যেন তাঁকে কিছু দেবার কথা কেউ ভাবে।’