মৌলবাদ
সন্ধে ছ’টা। নীলা অফিস থেকে আগে বেরিয়েছিল, কারণ ওর মনে হয়েছিল আজ কলকাতার রাস্তায় ঝামেলা হতে পারে। কিন্তু সে-গুড়ে বালি। ধর্মতলার মোড়ে নীলার বাসটা প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। সামনে যতদূর চোখ যায় গাড়ির লম্বা সারি। বাস, মিনিবাস, উবার, ট্যাক্সি, বাইক—সবাই যে যার মতো হর্ন বাজিয়ে চলেছে। হর্ন বাজালেই সামনের গাড়িগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে, এমন একটা বিশ্বাস যেন সকলের মধ্যে কাজ করছে।
বাসের ভেতরে গরম। জানলা দিয়ে ধোঁয়া ঢুকছে। কন্ডাক্টর কয়েকবার দরজার কাছে গিয়ে উঁকি মেরে এসেছে, কিন্তু প্রতিবারই একই কথা বলেছে— ‘সামনে মিছিল আছে। কখন ছাড়বে বলা যাচ্ছে না।’ নীলা ফোনে ম্যাপ খুলে দেখে। ম্যাপ পুরো লাল। দশ মিনিটের রাস্তা আরও অন্তত চল্লিশ মিনিট দেখাচ্ছে। নীলা ভাবে, বসে থাকার চেয়ে হাঁটা ভালো। বাস থেকে নেমে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটতে শুরু করে সে। প্রথমে গাড়ির ফাঁক দিয়ে, তারপর ফুটপাথ ধরে। কিন্তু কিছুটা এগোতেই, ফুটপাথও যেন শেষ হয়ে যায় মানুষের ভিড়ে। সামনে বিশাল জমায়েত। রাস্তার মাঝখানে পুলিশের ব্যারিকেড। দু’দিকে দুটো আলাদা দল। একদল চিৎকার করছে— ‘ঘৃণার রাজনীতি চলবে না!’ অন্যদিক থেকে উত্তর আসছে—
‘বক্তৃতা বন্ধ করা চলবে না!’ কেউ প্ল্যাকার্ড ধরে আছে— ‘NO PLATFORM FOR HATE’। তার পাশেই আর একজনের হাতে লেখা— ‘WHO DECIDES WHAT IS HATE?’
পড়ুন পর্ব ২৮: জীবন কি শুধুই অ্যাচিভমেন্টের জন্য? লিখছেন অনুপম রায়…
কয়েকটা টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়ি দাঁড়িয়ে। ক্যামেরাম্যানরা ব্যারিকেডের ওপর দিয়ে ক্যামেরা তোলার চেষ্টা করছে। পুলিশ বাঁশি বাজিয়ে লোক সরানোর বৃথা চেষ্টা করছে। কেউ সরছে না। নীলা ওই জনসমুদ্রের মধ্যে দিয়ে এগোনোর চেষ্টা করে। কিছু একটার সঙ্গে জোরে ধাক্কা লাগে কাঁধে। আর একজন প্রায় তার পায়ের উপর উঠে যায়। সে বিরক্ত হয়ে পাশ কাটাতে গিয়ে হঠাৎ পরিচিত একটা মুখ দেখতে পায়। নীলাব্জ একটা চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। যেন মিছিল নয়, পাড়ার ফুটবল ম্যাচ দেখছে।
নীলা: তুমি এখানে কী করছ?
নীলাব্জ মুচকি হাসে, ‘আরে! আমি তো ভাবছিলাম এই ভিড়ের উত্তেজনার মধ্যে একমাত্র আমিই কর্মহীন।’
নীলা: আমি বাস থেকে নেমেছি। এই জ্যামে হাঁটাই ভাল। তোমার অজুহাতটা কী?
নীলাব্জ: আমি এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখলাম এত লোক একসঙ্গে চিৎকার করছে, ভাবলাম নিশ্চয় কোনও ভাল কথা বলছে!
নীলা: তুমি ভাল কথা শুনতে ভিড়ের মধ্যে ঢোকো?
নীলাব্জ: না, সাধারণত ভাল কথা এত চিৎকার করে বলতে হয় না। তাই একটু কৌতূহল হল। কী হয়েছে এখানে?
নীলা একটু অবাক, ‘তুমি জানো না?’
নীলাব্জ: জানলে কি তোমাকে জিজ্ঞেস করতাম?
নীলা: না, তুমি সবজান্তা কিনা, তাই ভাবলাম। (হেসে নেয়) ওই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আজ একজনের বক্তৃতা ছিল। ছাত্রদের একটা দল তাকে ঢুকতে দেয়নি।
নীলাব্জ: কেন?
নীলা: লোকটা ধর্মীয় মৌলবাদী। বিভিন্ন জায়গায় ঘৃণা ছড়িয়ে বেড়ায়। মেয়েদের নিয়ে জঘন্য কথা বলে, অন্য ধর্মের লোকেদের বিরুদ্ধে মানুষকে উসকে দেয়। আজ নাকি এখানে এসে সংস্কৃতি আর জাতীয় পরিচয় নিয়ে বক্তৃতা দিত।
নীলাব্জ: তুমি শুনেছ তার বক্তৃতা?
নীলা: আজকেরটা তো হয়নি। আগের অনেক বক্তব্যই তো আছে অনলাইনে। তুমি জানো না? না কি ন্যাকা সাজছ?
নীলাব্জ হাসে, ‘তুমি এসব শোনো?’
নীলা একটু বিরক্ত হয়, ‘আমি চললাম। একে এই ভিড়…’
নীলাব্জ: চলো, এই গলি দিয়ে পালাই। হাঁটতে-হাঁটতে কথা বলি।
ওরা দুজনে একটা পাতলা গলি দিয়ে ওই জমায়েত কাটিয়ে এগোতে থাকে।
নীলাব্জ: আচ্ছা, তুমি যে এত খুশি ওকে বলতে দেওয়া হয়নি বলে, আজ ও কী বলত, সেটা কি তুমি জানতে?
নীলা: জানার দরকারও নেই। বিষের বোতল খুলে বিষ কি না, একটু চেখে দেখো তুমি?
নীলাব্জ চায়ের ভাঁড়টা ফেলে দেয়, ‘বোতলের গায়ে বিষ লেখা ছিল?’
নীলা: তোমার আবার শুরু হয়ে গেল?
নীলাব্জ: না, সত্যিই জানতে চাইছি। কে লিখেছে বিষ?
নীলা: সবাই জানে লোকটা কেমন।
নীলাব্জ চারদিকে তাকায়, ‘এই যে দুটো দল দাঁড়িয়ে আছে, এরা সবাই জানে?’
নীলা: যারা ওর বিরোধিতা করছে, তারা নিশ্চয় জানে।
নীলাব্জ: আর যারা বক্তৃতা হতে দিতে চাইছে?
নীলা: তারা হয় ওর সমর্থক, নয় বোকা।
নীলাব্জ হেসে ফেলে, ‘বেশ সুবিধার ব্যবস্থা। তোমার সঙ্গে একমত হলে সচেতন, না হলে হয় মৌলবাদী নয় বোকা।’
নীলা: তুমি ব্যাপারটা ইচ্ছে করে হালকা করছ। এই লোকগুলো শুধু মতামত দেয় না, মানুষের মাথায় ঘৃণা ঢোকায়। এদের একটাকেও মঞ্চ দেওয়া উচিত নয়। একজন এসে যদি বলে একটি বিশেষ ধর্মের মানুষকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া উচিত, তুমি বলবে সেটা তার বাক্স্বাধীনতা?
নীলাব্জ: আমি বলব, সে কথাটা প্রকাশ্যে বলুক।
নীলা অবাক হয়ে তাকায়, ‘কী?’
নীলাব্জ: প্রকাশ্যে বলুক। যাতে সবাই জানতে পারে লোকটা কী ভাবে।
নীলা: তারপর? পাঁচশো ছাত্র শুনবে। তাদের মধ্যে পঞ্চাশজন প্রভাবিত হবে। পাঁচজন গিয়ে সত্যি-সত্যি কারও বাড়িতে আগুন দেবে। তখন তুমি বলবে, অন্তত আমরা জানতে পেরেছি লোকটা কী ভাবে?
নীলাব্জ: তুমি ধরে নিচ্ছ মানুষ শুনলেই বিশ্বাস করবে।
নীলা: মানুষ বিশ্বাস করে বলেই তো এই লোকগুলোর এত অনুসারী! মৌলবাদীরা কি আকাশ থেকে পড়ে? বক্তৃতা, ধর্মসভা, সোশ্যাল মিডিয়া, সংগঠন— এইসব দিয়েই তো তৈরি হয়। তুমি একটা বিপজ্জনক মতাদর্শকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চ দিচ্ছ মানে তাকে সম্মান দিচ্ছ। তাকে বলছ, তোমার কথাও আলোচনার যোগ্য।
নীলাব্জ: সব কথা আলোচনার যোগ্য নয়?
নীলা: না। সব কথা নয়। ঈশ্বর আছে নাকি নিছক মানুষের কল্পনা, সেটা নিয়ে তুমি বিতর্ক করতেই পারো। কিন্তু কোনো একটি জাতির মানুষ মানুষই নয়, তাদের মেরে ফেলা উচিত— এটা বিতর্কের বিষয় না।
নীলাব্জ: কে বলেছে, লোকটা আজ মানুষ মারার কথা বলত?
নীলা: যে আগে বার বার ঘৃণা ছড়িয়েছে, সে আজ হঠাৎ প্রেমের কবিতা পড়তে আসবে?
নীলাব্জ: হতেও পারে।
নীলা থেমে যায়, ‘তুমি কি সত্যিই এত সরল, না কি অভিনয় করছ?’
নীলাব্জ: আমি শুধু ভাবছি, লোকটাকে আটকিয়ে তোমরা কী পেলে?
নীলা: একটা বিষাক্ত বক্তৃতা বন্ধ হল। সেটাই অনেক।
নীলাব্জ: আর লোকটা পেল প্রমাণ যে তাকে কথা বলতে দেওয়া হয় না। আজ রাতেই ভিডিও বানাবে—‘দেখুন, সত্যি কথা বলি বলে আমাকে ওরা ভয় পায়।’ কাল তার অনুসারী দ্বিগুণ হবে। ভিকটিম কার্ড বোঝো তো? এই খেলে-খেলেই কত মানুষ কেরিয়ার বানিয়ে ফেলল। সাফল্যের শীর্ষে বসেও কিছু মানুষ এই ভিকটিম কার্ড খেলে। সেই সুবিধেটাই করে দিলে তোমরা।
নীলা: তাহলে কী করতে হবে? তাকে ফুলের মালা দিয়ে মঞ্চে তুলতে হবে, যাতে সে নিজেকে অত্যাচারিত বলতে না পারে?
নীলাব্জ: মঞ্চে তুলে প্রশ্ন করতে হবে।
নীলা: তুমি ভাবছ মৌলবাদীরা প্রশ্নের উত্তর দিতে আসে? তারা আসে আরও সমর্থক বানাতে। তারা যুক্তি মানে না।
নীলাব্জ: তাহলে প্রশ্নে, প্রশ্নে তাদের মুখোশ খুলে দাও।
নীলা: মুখোশ খুলে যাওয়ার পরেও মানুষ তাদের অনুসরণ করে। তুমি কি ইতিহাস পড়োনি? হিটলার ভোটে জিতেছিল। গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়েই গণতন্ত্র ধ্বংস করেছিল। তখনও কি সবাই বসে বিতর্ক করত?
নীলাব্জ: শেষপর্যন্ত কিন্তু তাকে বক্তৃতা বন্ধ করে হারানো যায়নি।
নীলা: তাকে যুদ্ধ করে হারাতে হয়েছে নীলাব্জ। অর্থাৎ একটা চরম শক্তির বিরুদ্ধে আর একটা চরম শক্তি দাঁড়িয়েছে। সেটাই তো আমি বলছি। মৌলবাদী সংগঠন যদি শৃঙ্খলাবদ্ধ, আক্রমণাত্মক আর নিষ্ঠুর হয়, তুমি ফুল হাতে দাঁড়িয়ে তাকে আটকাতে পারবে না।
নীলাব্জ: যুদ্ধ করা আর বক্তৃতা বন্ধ করা এক জিনিস?
নীলা: একই ধারার আলাদা স্তর। শুরুতেই আটকালে যুদ্ধ পর্যন্ত যেতে হয় না।
নীলাব্জ: অর্থাৎ কেউ ভবিষ্যতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে এখনই তার মুখ বন্ধ করবে?
নীলাব্জ: প্রতিটি চরমপন্থী দলই নিজেকে দুর্বলদের রক্ষাকর্তা ভাবে। দুর্বল না হলেও, প্রোপাগান্ডা করে বলে এরা দুর্বল! কেউ ধর্ম বাঁচায়, কেউ জাতি বাঁচায়, কেউ বিপ্লব বাঁচায়, কেউ গণতন্ত্র বাঁচায়। সবাই কিছু-না-কিছু বাঁচাতে গিয়ে শেষমেশ মানুষ মারে।
নীলা: যার অতীতটাই বিপজ্জনক, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুমান করতে খুব বুদ্ধি লাগে না।
এই সময়ে পাশের দল থেকে কয়েকজন যুবক একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে— ‘ফ্যাসিস্টদের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও!’ নীলাব্জ সেদিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে, ‘ওরা মৌলবাদের বিরুদ্ধে?’
নীলা: হ্যাঁ।
নীলাব্জ: হাত ভেঙে, গুঁড়িয়ে?
নীলা: ওগুলো স্লোগান। আক্ষরিক অর্থে বলছে না।
নীলাব্জ: ওই বক্তাও যদি বলে তার কথাগুলো আক্ষরিক নয়?
নীলা: দুটো এক কোরো না।
নীলাব্জ: কেন? তোমার দলের হুমকি রূপক, অন্য দলের রূপক হুমকি?
নীলা: এরা দুর্বলদের বাঁচাতে লড়ছে। আর সে দুর্বলদের আক্রমণ করতে চায়।
নীলাব্জ: প্রতিটি চরমপন্থী দলই নিজেকে দুর্বলদের রক্ষাকর্তা ভাবে। দুর্বল না হলেও, প্রোপাগান্ডা করে বলে এরা দুর্বল! কেউ ধর্ম বাঁচায়, কেউ জাতি বাঁচায়, কেউ বিপ্লব বাঁচায়, কেউ গণতন্ত্র বাঁচায়। সবাই কিছু-না-কিছু বাঁচাতে গিয়ে শেষমেশ মানুষ মারে।
নীলা: তুমি আবার দুই পক্ষকে সমান করে দিচ্ছ। একজন আক্রমণকারী আর একজন প্রতিরোধকারী এক নয়।
নীলাব্জ: অবশ্যই এক নয়। কিন্তু প্রতিরোধ করতে-করতে সে কখন আক্রমণকারী হয়ে যাচ্ছে, সেটা কীভাবে বুঝবে?
নীলা: যখন উদ্দেশ্য বদলে যাবে।
নীলাব্জ: উদ্দেশ্য তো কেউ খারাপ বলে না। যে ধর্মস্থান ভাঙে, সে বলে সত্য রক্ষা করছি। যে বই পোড়ায়, সে বলে সমাজ রক্ষা করছি। যে লেখককে জেলে ঢোকায়, সে বলে শান্তি রক্ষা করছি। উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করলে সবাই সাধু।
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘তাহলে তোমার মতে কিছুই করা যাবে না?’
নীলাব্জ: আমি তা বলিনি।
নীলা: বক্তৃতা বন্ধ করা যাবে না। সংগঠন নিষিদ্ধ করা যাবে না। উসকানি আটকানো যাবে না। তারপর যখন দাঙ্গা লাগবে, তখন?
নীলাব্জ: অপরাধ করলে শাস্তি দাও।
নীলা: আরে বাবা, অপরাধ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করব?
নীলাব্জ: চিন্তাকে অপরাধ বানাবে?
নীলা: সব নয়। যে-চিন্তা মানুষের সমান অধিকার অস্বীকার করে।
নীলাব্জ: জাতীয়তাবাদীদের নিষিদ্ধ করবে?
নীলা: উগ্র জাতীয়তাবাদীদের।
নীলাব্জ: কমিউনিস্টদের?
নীলা: যারা সশস্ত্র বিপ্লব চায়, তাদের।
নীলাব্জ: ধর্মীয় দল?
নীলা: যারা ধর্মের আইন রাষ্ট্রের উপর চাপাতে চায়। স্টপ ইট নীলাব্জ! আরে এত প্রশ্ন-উত্তর খেলে কী লাভ? এভাবে কিছু হয়? সব কিছু পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।
নীলাব্জ: তুমি বলছ…
নীলা: আমি বলছি, মৌলবাদকে ক্ষমতায় আসার আগে আটকাতে হবে।
নীলাব্জ: আর তারা বলবে, এইজন্যই তোমাকে ক্ষমতায় আসার আগে আটকাতে হবে।
নীলা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘তোমার এই অসীম আপেক্ষিকতার কোনও শেষ আছে? ভাল-মন্দ বলে কিছু নেই? সবাই একই? সবাই ধূসর?’
নীলাব্জ: ভাল-মন্দ আছে। কিন্তু আমি যে সব সময়ে ভালর দলে আছি, এই নিশ্চয়তাটাই মৌলবাদের শুরু।
নীলা: না। মৌলবাদের শুরু ধর্মান্ধতা থেকে।
নীলাব্জ: শুধু ধর্মে?
নীলা: মূলত ধর্মে। কারণ ধর্মের সঙ্গে ঈশ্বরের অনুমোদন জড়িয়ে থাকে। একজন যখন ভাবে ঈশ্বর তার পক্ষে, তখন তাকে বোঝানো অসম্ভব।
নীলাব্জ: আর যে ভাবে ইতিহাস তার পক্ষে? বিজ্ঞান তার পক্ষে? জাতি তার পক্ষে? বিপ্লব তার পক্ষে?
নীলা: বিজ্ঞানের সঙ্গে মৌলবাদ মেলাবে না।
নীলাব্জ: বিজ্ঞান নয়, বিজ্ঞানের নামে নিশ্চয়তা। যে-মুহূর্তে তুমি বলবে প্রশ্ন করা যাবে না, সন্দেহ করা যাবে না, বিরোধিতা মানেই শত্রুতা— সেখানেই তো মৌলবাদ!
নীলা: তুমি মৌলবাদ শব্দটাকে এত বড় করে দিচ্ছ যে তার অর্থটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একজন ধর্মীয় নেতা মানুষকে বলছে অন্য ধর্মের দোকান থেকে কিছু কিনবে না। মেয়েরা ঘরের বাইরে বেরোবে না। সমকামীদের শাস্তি দিতে হবে। আর তুমি বলছ, যারা তাকে আটকাচ্ছে তারাও মৌলবাদী হতে পারে! তুমি তো বিপদের গুরুত্বটাই কমিয়ে দিচ্ছ।
নীলাব্জ: আমি বলছি না দুজনের বিপদ সমান। বলছি, পদ্ধতিটা ধার করলে একদিন চরিত্রটাও ধার করতে হবে।
নীলা: সুন্দর-সুন্দর বাক্যে বাস্তব বদলায় না। ধরো, একটা মৌলবাদী দল অস্ত্র জোগাড় করছে। প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তাদের প্রকাশ্য সভায় বলা হচ্ছে, সময় এলে শত্রুদের শেষ করতে হবে। তুমি কী করবে?
নীলাব্জ: অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করব। প্রশিক্ষণ বন্ধ করব। হুমকির তদন্ত করব। যারা অপরাধের পরিকল্পনা করছে তাদের গ্রেফতার করব।
নীলা: সভা চলতে দেবে?
নীলাব্জ: সরাসরি হিংসার নির্দেশ দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
নীলা: আর ঘুরিয়ে বললে? রূপক ব্যবহার করলে? বলল, ‘দেশকে অপবিত্রতা থেকে পরিষ্কার করতে হবে।’ সবাই বুঝল তার মানে কী, কিন্তু আদালতে গিয়ে সে তো বলবে রাস্তা পরিষ্কার করার কথা বলেছিলাম।
নীলাব্জ: তাহলে প্রমাণ জোগাড় করতে হবে।
নীলা: এই এত ঘুরপাক খেলে, ওই সময়ের মধ্যে শয়ে-শয়ে মানুষ মরবে।
নীলাব্জ: কিন্তু প্রমাণ ছাড়া ধরলে নির্দোষ মানুষ জেলে যাবে।
নীলা: অর্থাৎ কিছু নির্দোষকে বাঁচাতে সম্ভাব্য খুনিদের ছেড়ে দেবে?
নীলাব্জ: আর কিছু সম্ভাব্য খুনিকে ধরতে হাজার নির্দোষকে শত্রু বানাবে?
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। সামনের দিকে হঠাৎ উত্তেজনা বাড়ে। একটা পুলিশের ভ্যান দ্রুত সামনে দিয়ে চলে যায়। কয়েকজন গাড়ির দিকে কাগজের বল ছোড়ে। একজন জুতো ছোড়ে। পাশের দেওয়ালে বক্তার কিছু পোস্টার দেখতে পায় দুজনে।
নীলাব্জ: লোকটাকে দেখতে কিন্তু খুব একটা ভয়ংকর না।
নীলা: ভয়ংকর লোকেদের কি মাথায় শিং থাকে?
নীলাব্জ: না… তবে…
নীলা: তুমি এখনও লোকটার পক্ষ নিচ্ছ?
নীলাব্জ: আমি লোকটার পক্ষ নিচ্ছি না। আমি তার কথা শোনার পক্ষ নিচ্ছি।
নীলা: সব কথা শুনতে হয় না।
নীলাব্জ: তাহলে কোন কথা শুনব, সেটা অন্য কেউ ঠিক করবে?
নীলা: সমাজ কিছু সীমা ঠিক করেই রাখে। তুমি শিশুর সামনে পর্নোগ্রাফি দেখাতে পারো না। জনসমক্ষে কাউকে খুনের হুমকি দিতে পারো না। মিথ্যে বলে দাঙ্গা বাধাতে পারো না।
নীলাব্জ: সেগুলো নির্দিষ্ট ক্ষতি। কিন্তু একটা ভাবনা তোমার অপছন্দ বলে তাকে নিষিদ্ধ করাটা আলাদা।
নীলা: ভাবনা না কচু! অপছন্দের ব্যাপার না নীলাব্জ, বিপজ্জনক।
নীলাব্জ: বিপজ্জনক কে ঠিক করল?
নীলা রেগে যায়, ‘আবার সেই একই প্রশ্ন! আচ্ছা, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। একজন লোক তোমার বাড়িতে ঢুকেছে। হাতে ছুরি। বলছে, তোমার পরিবার তার ধর্মের শত্রু। সে তোমার পরিবারের কাউকে মারতে যাচ্ছে। তখন তুমি কী করবে? তার সঙ্গে বসে বাক্স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করবে?’
নীলাব্জ একটু চুপ করে থাকে। দূর থেকে তখনও স্লোগানের আওয়াজ আসছে।
নীলাব্জ: না। আমি তাকে আটকাব।
নীলা: কীভাবে?
নীলাব্জ: যেভাবে পারি। দরকার হলে আঘাত করব।
নীলা: অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত শক্তি। চরম শক্তির বিরুদ্ধে শক্তি।
নীলাব্জ: হ্যাঁ। কিন্তু সে ছুরি নিয়ে আমার বাড়িতে ঢোকার পর।
নীলা: ততক্ষণ অপেক্ষা করবে?
নীলাব্জ: না। যদি জানি সে ছুরি নিয়ে আসছে, পুলিশকে বলব। যদি দেখি পরিকল্পনা করছে, থামাব। কিন্তু শুধু সে আমাকে ঘৃণা করে বলে তাকে মেরে ফেলব না।
নীলা: কেউ মেরে ফেলার কথা বলছে না। মঞ্চ না দেওয়ার কথা বলছি।
নীলাব্জ: আজ মঞ্চ। কাল বই। পরশু চাকরি। তারপর ভোটাধিকার। এরপর হয়তো কারাবাস। প্রতিটি নিপীড়ন খুব ছোট একটা যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ দিয়ে শুরু হয়।
নীলা: আর প্রতিটি গণহত্যাও ছোট-ছোট ঘৃণার বক্তৃতা দিয়েই শুরু হয়।
নীলাব্জ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
নীলাব্জ: ঠিক।
নীলা কিছুটা অবাক হয়। হয়তো সে ভেবেছিল নীলাব্জ আবার তর্ক করবে।
নীলাব্জ ধীরে বলে, ‘এইজন্যই কঠিন। তোমার ভয়টা মিথ্যে নয়। আমার ভয়টাও নয়।’
নীলা: তাহলে বিকল্প কী?
নীলাব্জ: শক্ত রাষ্ট্র, কিন্তু সীমাবদ্ধ রাষ্ট্র। শক্ত আইন, কিন্তু মতের বিরুদ্ধে নয়— হিংসা, হুমকি, বৈষম্যমূলক কাজ আর সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে। বক্তৃতা হলে পালটা বক্তৃতা। মিথ্যে হলে প্রকাশ্য তথ্য। আক্রমণ হলে প্রতিরোধ।
নীলা: অলীক! অলীক! শুনতে দারুণ কিন্তু বাস্তবে মৌলবাদীরা তোমার এসব থিওরি বা নিয়ম কিছুই মানবে না।
নীলাব্জ: গণতন্ত্রের নিয়ম মৌলবাদীদের সুবিধার জন্য নয়। আমাদের নিজেদের মৌলবাদী হয়ে যাওয়া আটকানোর জন্য।
নীলা: তাতে আমরা হেরে গেলে?
নীলাব্জ: তাহলে লড়ব।
নীলা: কতদূর?
নীলাব্জ: যতদূর প্রয়োজন।
নীলা: এই ‘প্রয়োজন’ কে ঠিক করবে?
নীলাব্জ একটু হেসে বলে: এই তো! এবার তুমি আমার প্রশ্নটা করছ।
নীলা মুখ ঘুরিয়ে নেয়, ‘ছ্যাবলামি কোরো না। তুমি কি মনে করো আজ ওকে বক্তৃতা করতে দেওয়া উচিত ছিল?’
নীলাব্জ: হ্যাঁ। কঠিন প্রশ্নের সামনে। লাইভ রেকর্ডিংয়ের মধ্যে। আর ও যদি সরাসরি হিংসা বা বৈষম্যের ডাক দিত, তখনই অনুষ্ঠান বন্ধ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।
নীলা: অর্থাৎ আগুন ধরার পর জল ঢালবে।
নীলাব্জ: তুমি আগুনের সন্দেহে পুরো রান্নাঘরটাই ভেঙে দিতে চাইছ।
নীলা: ধ্যাত! সেই এক বাজে তর্ক।
নীলাব্জ: মাথায় রেখো আজকের এই মঞ্চ না দেওয়া কিন্তু ভবিষ্যতের সেন্সরশিপ।
নীলা: না, নীলাব্জ না! মৌলবাদকে এভাবেই আটকাতে হয়!
নীলাব্জ: আর এক ধরনের মৌলবাদ দিয়ে?
নীলা: আমি আর পারছি না! আমি চললাম।
ছবি এঁকেছেন সায়ন চক্রবর্তী




