মনস্টার আর কনেবউ
যুগে-যুগে মেরি শেলি-র লেখা ‘ফ্র্যাংকেনস্টাইন’ নিয়ে ছবি তৈরি হয়েছে, আবার ফ্র্যাংকেনস্টাইনের মনস্টার এক সঙ্গিনী চায়, তা নিয়েও হয়েছে। ‘ব্রাইড অফ ফ্র্যাংকেনস্টাইন’ (১৯৩৫) নামে ছবির অনুসরণে তৈরি হল ‘দ্য ব্রাইড!’ (রচনা ও পরিচালনা: ম্যাগি ইলিনহল, ২০২৬), যাকে একটা নারীবাদী গল্পে উড়ান দেওয়া হল।
পুরনো ছবিতে মনস্টারের পাত্রী (মানে, বৈজ্ঞানিক কেরামতিতে মৃতদেহকে জাগিয়ে তুলে তৈরি-করা নারী) মনস্টারকে দেখে প্রীত হয়নি (এবং সে-নারী পর্দায় ছিল মাত্র মিনিট-তিনেক)। নতুন ছবিতে এই নারী রীতিমতো দাপুটে নায়িকা এবং তার সঙ্গে মনস্টারের প্রেম হয়ে যায়। ছবির গোড়াতেই মেরি শেলি বলেন, তাঁর ‘ফ্র্যাংকেনস্টাইন’ গল্পটার পর, মনস্টারকে নিয়ে আরও লেখার ইচ্ছে ছিল। পরের দৃশ্যেই তিনি এক নারীর (তার নাম আইডা) দেহে ভর করেন। এক পানশালায় অনেকের মধ্যে বসে থাকা আইডা অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে, মেরি শেলি তার মুখ দিয়ে কথা বলেন, কখনও সে যৌন গা-মোড়ামুড়ি দেয়, এমনকী, ওখানে উপস্থিত ভয়াবহ মাফিয়া বস-এর বিরুদ্ধে বিষোদ্গারও করে (সেই মহাপরাধী তার বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী গণিকাদের জিভ কেটে নেয়, অর্থাৎ নারীকে আক্ষরিক নীরব রাখে)।
কিছুক্ষণ পর ঝামেলা এড়াতে আইডাকে বাইরে, সিঁড়ির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তর্কাতর্কি ও ধাক্কাধাক্কির জেরে সে নিচে পড়ে মারা যায়। এদিকে ফ্র্যাংকেনস্টাইনের মনস্টার, যে নিজেকে ডাকে ফ্র্যাংকেনস্টাইন (পিতার পদবি পুত্র ব্যবহার তো করবেই), এক মহিলা-বৈজ্ঞানিকের কাছে আসে, যিনি মৃতের পুনরুজ্জীবন নিয়ে গবেষণা করছেন। মনস্টার তাঁর শরণাপন্ন হয়, যদি তিনি উপযুক্ত সঙ্গিনী জোগাড় করে দেন। কবর খুঁড়ে আইডার মৃতদেহ বের করা হয়, প্রাণসঞ্চারের পর দেখা যায়, সে সব স্মৃতি হারিয়েছে। সে ভাবতে থাকে, এক দুর্ঘটনায় তার স্মৃতি লোপ পেয়েছে, এবং বিক্ষত মনস্টার তার স্বামী। শুরু হয় তাদের দু’জনের অভিযান।
‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ ছবিতে কীভাবে গড়ে ওঠে বাবা ও মেয়ের সম্পর্ক?
পড়ুন ‘ছায়াবাজি’-র আগের পর্ব…

হলিউডে বেশ কিছু ছবি হয়েছে, যেখানে দু’জন মিলে (তারা নারী এবং পুরুষ হতে পারে, আবার সম-লিঙ্গের দু’জনও হতে পারে) একের পর এক খুন-জখম রাহাজানি করছে ও আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় পালাচ্ছে, যেন একটা হই-হই সফরে বেরিয়েছে, কিছুদিনের মধ্যেই দেশ জুড়ে তাদের নিয়ে উচ্ছ্বাস, কারণ আইনকে একেবারে তোয়াক্কা না-করার মধ্য দিয়ে তারা হয়ে উঠছে বাঁধভাঙা স্বাধীনতার, নিজত্ব উদযাপনের, নিপীড়িতের বিদ্রোহের প্রতীক। এই পুরুষ ও নারীও তা-ই হয়ে ওঠে। না, দু’জনের মধ্যে বিশেষত নারীই আইকন হয়ে ওঠে। আইডা নিজের নাম জিজ্ঞেস করতে, মনস্টার বানিয়ে বলে: পেনিলোপি। হয়তো গ্রিক মহাকাব্য ওডিসি-র ওই নামের নায়িকা বহুদিন স্বামীর জন্য অনুগত অপেক্ষা করেছিল বলে। এই যুগল, ফ্র্যাংক ও পেনি— যারা মৃত অথচ জীবিত, ঈশ্বর-সৃষ্ট আবার মানুষ-নির্মিত, প্রকৃতির সন্তান আবার বিজ্ঞানের ফসল— ১৯৩৬-এর আমেরিকা জুড়ে পালাতে থাকে। কারণ তারা কয়েকটা খুন করেছে।
নতুন জন্মের পরেই পেনি বৈজ্ঞানিকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। ‘চায়’ না বলে ‘দাবি করে’ বলাই ভাল, সে দুর্মুখ এবং অত্যন্ত ইংরেজি-দড় (মেরি শেলির আত্মা তাকে ধরে রেখেছে)। বৈজ্ঞানিকের আপত্তি সত্ত্বেও ফ্র্যাংক তাকে সাহায্য করে, দু’জনে পালায়। প্রথমে যায় সিনেমা হল-এ। একশো বছরেরও বেশি সময় ফ্র্যাংক এই পৃথিবীতে আছে, পরিত্যক্ত, নিঃসঙ্গ, তার চেহারা দেখলেই সবাই আতঙ্কে মুচ্ছো যায়। সে একমাত্র স্বস্তিতে থাকে অন্ধকার সিনেমা হল-এ, সে বিশেষ ভক্ত এক নাচিয়ে-নায়কের। সিনেমা দেখার পরে, তারা যায় নাইটক্লাবে। ফ্র্যাংক নাচে না, বসে থাকে। পেনির বাঁধছাড়া নাচ দেখে অনেক পুরুষ তাকে আঁকড়ে-পাঁকড়ে ধরে, খাবলে নিতে চায়, একসময় পেনি চেঁচিয়ে ওঠে, ফ্র্যাংক তাকে নিয়ে ক্লাবের বাইরে যায়, সেখানে দু’জন পুরুষ তাদের লকলকিয়ে ঘিরে নেয় ও পেনিকে ধর্ষণ করতে চায়। ফ্র্যাংক গোড়ায় নিজেকে সামলে রাখলেও একসময় ক্রোধে দু’জনকেই খুন করে। ফ্র্যাংক ও পেনি যখন পালাচ্ছে এবং একটা ট্রেনে উঠেছে, সার্চ-পার্টির এক পুলিশ সেই কামরায় উঠে আসে, ফ্র্যাংক আত্মসমর্পণ করা সত্ত্বেও সে মনস্টারের বীভৎস মুখ দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে, গুলি করতে উদ্যত হয়। পেনি তাকে ঠেলে ফেলে দেয় চলন্ত ট্রেন থেকে।
পেনি গবেষণাগারে দ্বিতীয় জন্মের পর কালো বমি করে, সেই বমির চিহ্ন তার গালে লেগে থাকে উল্কির মতো, গোটা ছবি জুড়ে। তার ঠোঁট ও জিভের রংও কালো (সমাজের চোখে বুরি নজরওয়ালের মুখ তো কালো হবেই)! পালাতে-পালাতে এক সময় তারা ঢুকে পড়ে একটা বিখ্যাত হোটেলে, সেখানে ওয়েটার সেজে পার্টিতে ঘুরতে-ঘুরতে ফ্র্যাংক আচমকা মুখোমুখি পড়ে যায় তার পূজ্য নর্তক-তারকার। ফ্র্যাংক থমকে-থমকে কিছু কথা বলে, কিন্তু তারকা পাত্তা দেন না। ফ্র্যাংক রেগে-কেঁদে আর্তনাদ করে ওঠে, তারপর ওই নায়কের ঢঙেই নাচতে আরম্ভ করে। তা শীলিত নৃত্য নয়, বরং মনস্টার-নাচের মতোই, উদ্ভট, কিন্তু অনাড়ষ্ট, যথেচ্ছ, এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তাতে যোগ দেয় শুধু পেনি নয়, আরও অভ্যাগত (যাদের ওপর মেরি শেলির ভূত— না কি পেত্নি— ভর করে)। প্রলয়নৃত্য চলাকালীনই এসে পৌঁছয় পুলিশ, গোয়েন্দা, তারা ফ্র্যাংককে গ্রেফতার করতে উদ্যত। তখন পেনি একটা পিস্তল উঁচিয়ে পুলিশবাহিনীকে বলে ফ্র্যাংককে ছেড়ে দিতে, এবং তারপর (মেরি শেলির প্রভাবে) একের পর এক উপস্থিত পুরুষের নাম ধরে বলতে থাকে, কে কীভাবে কোন নারীকে নিগ্রহ করেছে, এও বলে, মাফিয়া বস কীভাবে বিভিন্ন মেয়েকে খুন করেছে, কিন্তু পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগসাজশের ফলে তাকে কেউ-ই ঘাঁটাচ্ছে না। দীর্ঘ সংলাপের সময় লুকিয়ে এক পুলিশ পেনির ওপর চড়াও হতে চায় এবং পেনি চমকে তাকে গুলি করে। তারপর বহু হুড়ুদ্দুমের ফলে ফ্র্যাংক ও পেনি পুনরায় পালাতে সক্ষম হয়। এবং পেনির প্রভাবে দেশময় মেয়েরা গালে কালো উল্কি এঁকে, ঠোঁট ও জিভ কালো রঙে চুবিয়ে, ‘ব্রেন অ্যাটাক!’ চেঁচাতে-চেঁচাতে একটা নারীবাদী হইহই গড়ে তোলার চেষ্টা করে।
এদিকে ফ্র্যাংক ও পেনির ঘটনার তদন্ত করছে এক গোয়েন্দা-জুটি, এক পুরুষ ও এক নারী, নারী অধিক বুদ্ধিমতী। সে, পুলিশবাহিনী (এবং তাদের অজান্তে মাফিয়া বস-এর এক অনুচর) তাড়া করে চলে এই পলায়নরত যুগলকে। সিনেমার শেষদিকে, যখন সব্বাই হাজির বৈজ্ঞানিকের গবেষণাগারে (কারণ ফ্র্যাংক গুলি খেয়ে মারা গেছে, তার মৃতদেহ এবার পেনি এনেছে বৈজ্ঞানিকের কাছে, পুনরুজ্জীবনের আর্জি নিয়ে, আর তাকে তাড়া করে এসেছে অন্য সকলে), পেনিকে গুলি করে মারে মাফিয়ার চ্যালা (এবং পুলিশেরাও), মহিলা-গোয়েন্দা তখন সবাইকে ওখান থেকে বের করে দেয় এবং বৈজ্ঞানিককে আবছা ইঙ্গিত করে যায়। আবারও এই দুই মৃতকে জীবিত করার চেষ্টা করেন বৈজ্ঞানিক, এবং আমরা দেখি পুনরুজ্জীবিত দুই শরীর পরস্পরের হাত আঁকড়ে ধরছে। তারা পূর্বপরিচয় ভুলে যাবে কি না, নতুনতর আদম-ইভ হয়ে ফের পরস্পরকে চিনে নেবে ও অনুরক্ত হবে কি না, আমরা জানি না। কিন্তু এটুকু জানা যায়, দেশময় নারী-রোষ ও দ্রোহ-তেজ এমন তুঙ্গ-পর্যায়ে, সেই মাফিয়া বসও পর্যুদস্ত।

ছবিটা বেশ কেতায় তোলা, গতিশীল, চমক দিতে আগ্রহী, দেখতে ভাল। সমাজ, আইন ও ব্যক্তির (বিশেষত নারীর) বেপরোয়াপনার পারস্পরিক সম্পর্ক হলিউডি ছবির চেনা ছকেই চলে, কিন্তু ফ্র্যাংকেনস্টাইনের কাহিনিটাকে এখানে এনে ফেলার মধ্যে একটা বিস্ময় আছে। যখন পেনি জানতে পারে, সে ফ্র্যাংকের পূর্বপরিচিতা নয়, সে একটি মৃতদেহ, যাকে পাওয়া গেছিল ফতুরের গোরস্থানে— সে তার পিতৃদত্ত নাম আইডা, বা প্রেমিক-প্রদত্ত নাম পেনিলোপি পরিত্যাগ করে, নাম নেয় ‘ব্রাইড’। ফ্র্যাংক তার হৃদয়বত্তায় মুগ্ধ হয়ে হাঁটু গেড়ে তাকে বিবাহ-প্রস্তাব জানালে, সে বলে আমি নতুন বউ, কিন্তু কারও নিজস্ব বউ নই। মুশকিল হল, ছবি জুড়ে এই নারীবাদ এতটা প্রত্যক্ষ, এতটাই চিৎকৃত, মনে হয় চিত্রনাট্যে যেন প্রতি আড়াই পাতা অন্তর একটু নারীবাদ লেপে দেওয়াটা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একঘেয়ে লাগে। ছবির গোটা কাণ্ডটা ঘটিয়ে তোলেন এক নারী-লেখক, অলৌকিক কীর্তির বৈজ্ঞানিক এক নারী (যিনি তাঁর লেখা বইয়ে শুধু নামের আদ্যক্ষর ব্যবহার করেন, পুরুষশাসিত সমাজে ঝামেলা এড়াতে), প্রখরতর বুদ্ধির গোয়েন্দা এক নারী (যাকে পুং-পুলিশেরা কিছুতে পাত্তা দিতে চায় না), এবং ফ্র্যাংকেনস্টাইনের মনস্টারের বদলে তার কাঙ্ক্ষিত নারীকে কেন্দ্রে রেখে ছবি রচিত হয়— সবই ভাল প্রয়োগ, কিন্তু সবগুলো প্রয়োগ একসঙ্গে করে দেওয়ার ফলে, ছবিটা একটু গাঁকগাঁকে।
এই মুহূর্তে বিশ্ব জুড়ে নারীবাদী ছবি তৈরি হচ্ছে, হরর-ঘরানাতেও, তার বেশ কিছু ছবিই সূক্ষ্মতা পরিহার না করেই নারীর কথা বলছে, হৃদয়গ্রাহী ও তীব্রভাবে। এই ছবি লিখেছেন ও করেছেন নারী-পরিচালক, প্রচলিত কাহিনিকে ঝুঁটি ধরে টেনে নারীমুক্তির খোপে ফেলার সময় তাঁর মনে রাখা ভাল: ইস্তেহারের পক্ষে যা সুবিধেজনক, তা শিল্পের পক্ষে ক্ষতিকর। পেনির পুরুষবিদ্বেষ কীভাবে এত সংক্রামক হয়ে উঠল (ওই সময়ে বাড়িতে-বাড়িতে টিভি নেই, পেনিকে দেখা যাচ্ছে খবরকাগজে জ্যালজ্যালে ছবিতে, শুধু তার কথাবার্তার সময় উপস্থিত কিছু লোক সাক্ষী) তাও স্পষ্ট নয়। পেনি সিনেমা হল-এ ঢুকলেও লক্ষ করে দর্শকের মধ্যে এক পুরুষ সঙ্গিনীর সম্মতি ব্যাতিরেকে জোর-যৌনতা চাইছে, গবেষণাগারে মোক্ষম দৃশ্যে ‘মি টু’ বলে চেঁচায়, তখন মনে হয়, স্লোগান-বাড়াবাড়ি হচ্ছে। তাছাড়া অনেক ঘরানার অনেক ধারাকে একসঙ্গে গুলে দেওয়ার চেষ্টা খুব সফল নয়, জগাখিচুড়ি উৎপন্ন হয়েছে। ভূত, প্রেম, নারীবাদ, গ্যাংস্টার-ঝঞ্ঝাট, চোর-পুলিশ দৌড়, মিউজিকালের নাচ-গান, সিনেমা-মাধ্যমের মাহাত্ম্য-কীর্তন (মনস্টারের প্যানিক-অ্যাটাক হলে তাকে তক্ষুনি সিনেমা দেখতে হয়, নতুবা ফিল্মস্টারের কাটিং অবলোকন করতে হয়): সমস্ত এক জায়গায় জড়ো না করলে হত। অনেক সিনেমার মতে, অনেক মানুষের অংশ জুড়ে ফ্র্যাংকেনস্টাইনের মনস্টার তৈরি হয়েছিল। তার ভাগ্য তো সুবিধের হয়নি।




