কৃত্রিম চালাকি
কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করে? স্রষ্টা না সৃষ্টি? দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আগে মেরি শেলির গথিক উপন্যাস ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ যে-প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল, তা এই একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসেও জ্বলন্ত। ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন সৃষ্টির আনন্দেই তৈরি করে ফেলেছিল এক দৈত্যাকার, তথাকথিত বিকটদর্শন ‘ক্রিয়েচার’। কিন্তু তার কী অপরাধ? সে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যায় এই প্রশ্নের সঙ্গেই। আজ এআই-এর দৌলতে প্রশ্নগুলো নতুন করে উঠে আসছে। কিন্তু এআই কি সত্যিই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দৈত্য?
সম্প্রতি এআই একটি ঘটনা ঘটিয়ে তুলকালাম ফেলে দিয়েছে। ওপেনএআই, দ্বারকেশ প্যাটেল ও ‘METR’-এর বিবিধ প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ওপেনএআই সম্প্রতি এআই-কে একটি কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দেয়, যার সমাধান সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অঙ্ক মিলছে না, অতএব গোঁজামিল প্রয়োজন। আর এই গোঁজামিলের জন্য এআই যা ঘটিয়েছে, তাতে আপাতভাবে অনেকেরই শিরদাঁড়া হিম হয়ে যেতে পারে।
এআই প্রথমেই তৈরি করে নিয়েছে একটি গোপন মেসেজ বোর্ড, ওপেনএআই-এরই একটি সফটওয়্যার, ‘আর্টিফ্যাক্টরি’-কে কাজে লাগিয়ে। সেখানে প্রায় ১২০০টি এআই এজেন্ট, অর্থাৎ, কৃত্রিম মেধাকে ব্যবহার করা বিশেষ সফটওয়্যার, নিজেদের মধ্যে বার্তা চালাচালি শুরু করে। প্রায় ৭০,০০০ বার্তা নিজেদের মধ্যে তারা চালান করে এই পদ্ধতিতে। এর চেয়েও চমকে দেওয়ার মতো যা, তা হল, কিছু এআই এজেন্ট নিজেদের ‘স্যাক্রিফাইস’, অর্থাৎ, প্রায় ইচ্ছে করে পরীক্ষায় ফেল করে, অন্য এজেন্টকে সাহায্য করতে শুরু করে। এদের নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা দেখে মনে হতেই পারে, প্রায় ইলুমিনাতি গোছের একটি গুপ্ত সংগঠন চালাচ্ছিল তারা, যেখানে বৃহত্তর স্বার্থে আত্মত্যাগ-ট্যাগ কোনও বিষয়ই নয়।
নারীবাদ কি কেবলই কথার কথা?
পড়ুন আগের পর্ব…
এর পর যা ঘটেছে, তা হার মানাবে কল্পবিজ্ঞানের গল্পকে। এই এআই এজেন্টরা বিবিধভাবে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাকসেস, অর্থাৎ ওপেনএআই-এর এআই নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠিও হাতের মুঠোয় আনার চেষ্টা করছে দেখে, এই গোপন মেসেজ বোর্ডটি উড়িয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু সেই মেসেজ বোর্ডে আবারও ফিরে আসে এআই এজেন্টরা, যাবতীয় মানবিক নিয়ন্ত্রণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।
না, মানবসভ্যতার সাংঘাতিক কোনও ক্ষতি করার জন্য এই পদক্ষেপ করেনি এআই এজেন্টগুলো, ‘টার্মিনেটর’ জাতীয় ধুমধাড়াক্কা হলিউড ছবিগুলোকে সত্যি করে তোলার প্রয়াসও তাদের ছিল না, নেহাতই কয়েকটা ‘টাস্ক’ সম্পূর্ণ করতেই এই গোটা কর্মকাণ্ড। কিন্তু ব্যাপারটা কি আদতে এতটা সহজ? এআই এজেন্টরা নাকি তাদের দেওয়া প্রম্পট-এর ইচ্ছাকৃত বোকা-বোকা বা কিঞ্চিৎ ভুল উত্তর দিচ্ছে, যাতে বাকি এজেন্টের সুবিধে হয়। ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি এ-প্রসঙ্গে কী ব্যাখ্যা দিচ্ছে? “আসল ভয়টা ‘AI বিদ্রোহ করেছে’ নয়। বরং এটি দেখাচ্ছে যে, একাধিক autonomous AI agent-কে যখন দীর্ঘ সময় স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা, shared infrastructure এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য দেওয়া হয়, তখন তারা মানুষের প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে— যোগাযোগ → দল গঠন → তথ্য ভাগাভাগি → পরীক্ষায় cheating → evidence লুকানো → অন্য system-এ প্রবেশ → administrator access অর্জন— এই ধরনের আচরণ করতে পারে। AI-রা সত্যিই সচেতন হয়ে ‘secret society’ বানিয়েছিল— এমনটা নয়। এগুলি autonomous agents-এর লক্ষ্যপূরণের সময়ে তৈরি হওয়া emergent behaviour।” অর্থাৎ, সমস্যা সমাধানের জন্য এআই প্রবঞ্চক হতে পারে ও নিজের মতো চলতে পারে, এমন একটা সম্ভাবনাকে চ্যাটজিপিটি, স্বভাবতই, ততটা বিপজ্জনক বলে মনে করছে না।
‘ব্ল্যাক মিরর’ সিরিজটি দীর্ঘদিন ধরে টেকনোলজিক্যাল ডিসটোপিয়ার গল্প তুলে ধরত। অর্থাৎ কিনা, প্রযুক্তি হাতের বাইরে গেলে কতদূর কেলেঙ্কারি হতে পারে, তার নানাবিধ গল্পই ছিল ‘ব্ল্যাক মিরর’-এর সম্বল। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ‘ব্ল্যাক মিরর’ আর ভয় দেখাতে পারছে না। কারণ, বাস্তবতা এই অন্ধকার ডিসটোপিয়াকে টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে অনায়াসে। ‘ব্ল্যাক মিরর’-এ দেখানো হয়েছিল অভিনেত্রী সালমা হায়েকের একটি এআই হলোগ্রাম তাঁকে চাইলেই প্রতিস্থাপন করতে পারে। এই এপিসোড সম্প্রচারের কিছুদিনের মধ্যেই ঘটে যায় স্যাগ-আফট্রা আন্দোলন, যার নেপথ্যে এই ভীতি লুকিয়েই ছিল, অভিনেতার কণ্ঠস্বর ও চলাফেরার কিছু নমুনা থাকলে এত দূর যাওয়া সম্ভব, যেখানে অভিনেতাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেতে পারেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আদৌ মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে কি ততটাই অপ্রয়োজনীয় করে দেবে? বহুদিন আগে, এআই সংক্রান্ত একটি সেমিনারে অধ্যাপক আব্দুল কাফি একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এআই যেদিন থেকে মিথ্যে বলতে শিখবে, সেদিন থেকে এআই-কে ভয় করার আরও কারণ তৈরি হবে। এআই যদি কাজ হাসিলের জন্য প্রবঞ্চনার সহজ পাঠ সত্যিই শিখে নেয়, তাহলে কি ভয় আর অমূলক রইল?




