মেটা-র মামলা, মেটাবে কে?
বাচ্চার হাতে একটা ফোন। সে ইনস্টাগ্রাম খুলেছে। প্রথমে একটা ছবি। তারপর একটা রিল। তারপর আর একটা। তারপর এমন একটা ভিডিয়ো, যেটা সে নিজে খুঁজেই নেয়নি— ইনস্টাগ্রাম তাকে দেখিয়েছে। তারপর আরও একটা। তারপর নোটিফিকেশন। তারপর বন্ধুর কমেন্ট। তারপর আবার রিল। বাচ্চাটি ভাবছে, সে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করছে। প্রশ্নটা একটু উলটো করে দেখা যাক— ইনস্টাগ্রাম কি বাচ্চাটিকে ব্যবহার করছে না?
এই প্রশ্নটাই এখন আমেরিকার আদালতে বেশ গুরুতর হয়ে উঠেছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় মেটা-র বিরুদ্ধে ২৯টি মার্কিন রাজ্যের করা মামলার বিচার চলছে। অভিযোগ, ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে শিশু ও কিশোররা যতটা সম্ভব বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে থাকে। অর্থাৎ ব্যবহারকারী যত বেশি সময় থাকবে, যত বেশি দেখবে, যত বেশি প্রতিক্রিয়া বা রিঅ্যাকশন জানাবে— ব্যবসার হিসাবে ততই সাফল্য। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, এই ‘ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার’ অ্যালগরিদম কিশোরদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং মেটা শিশুদের নিরাপত্তা ও তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ব্যাপারে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি। মেটা অবশ্য অভিযোগগুলি অস্বীকার করেছে। কিন্তু এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নয়। প্রশ্নটি অনেক বড়— একটি প্রযুক্তি সংস্থা কি এমন একটি পণ্য তৈরি করতে পারে, যার সাফল্যের মাপকাঠিই হল ব্যবহারকারীকে আরও কিছুক্ষণ আটকে রাখা, এমনকী ব্যবহারকারী যদি একজন শিশুও হয়?
আরও পড়ুন: কলম্বিয়ার আইনসভায় এক ‘পর্নতারকা’? ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩৮…
এই ‘আরও কিছুক্ষণ’-এর মধ্যেই আসল ব্যবসা। ‘ইনফিনিট স্ক্রল’-এর কথাই ধরা যাক। একটা বই শেষ হয়। একটা সিনেমা শেষ হয়। স্কুলের ক্লাস শেষ হয়। এমনকী মায়ের বকুনিরও এক সময়ে শেষ থাকে। কিন্তু ইনফিনিট স্ক্রলের কোনও শেষ নেই। আপনি শেষ রিলটি দেখেছেন কি না, প্ল্যাটফর্মের তাতে খুব একটা যায় আসে না। আর একটা দেখানো যায়। তারপর আর একটা। আপনার থামার সিদ্ধান্তটিকে যতটা সম্ভব পিছিয়ে দেওয়াই যেন সাফল্য। তার সঙ্গে যোগ হয় ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী সাজানো অ্যালগরিদম। শিশুটি কী দেখে, কোন ভিডিয়োতে একটু বেশি সময় থাকে, কোনটা দু’বার দেখে, কোথায় মন্তব্য করে, কোন বিষয় তাকে উত্তেজিত করে— এই আচরণগুলি থেকে অ্যালগরিদম ধীরে-ধীরে তার পছন্দের একটা মানচিত্র তৈরি করে। তারপর সেই মানচিত্র অনুযায়ী তাকে আরও কিছু দেখায়। এখানে একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার আছে। শিশু যত বেশি নিজের পছন্দের জিনিস পেতে থাকে, সে তত বেশি নিজের তৈরি করা ডিজিটাল ঘেরাটোপের ভিতর ঢুকে যেতে পারে।

আমেরিকার আদালতে এখন এই বৃহত্তর অ্যালগরিদম নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। সাম্প্রতিক শুনানিতে মেটা-র প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকও অভিযোগ করেছেন, সংস্থার অভ্যন্তরে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও তাদের ধরে রাখার বিষয়টি নিরাপত্তার তুলনায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। বিশেষ করে ১৩ বছরের কমবয়সি শিশুদের প্ল্যাটফর্মে ঢোকা আটকানো এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মেটা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। অর্থাৎ আদালতের সামনে এখন শুধু ‘ইনস্টাগ্রাম খারাপ কি না’—এই প্রশ্ন নেই। প্রশ্নটি অনেক সূক্ষ্ম— ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদমই কি এমন কিছু আচরণকে উৎসাহিত করে, যা শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিপজ্জনক?
ইউরোপীয় ইউনিয়নও অন্য পথে প্রায় একই প্রশ্ন করছে। ইউরোপীয় কমিশন ডিজিটাল পরিষেবা আইন-এর অধীনে মেটা-র ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। শিশুদের বয়স যাচাই, তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং এমন অ্যালগরিদম, যা ব্যবহারকারীকে অতিরিক্ত সময় ধরে রাখতে পারে— সবই সেই নজরদারির আওতায় এসেছে। অর্থাৎ আমেরিকা আদালতে জিজ্ঞেস করছে— এই অ্যালগরিদমর জন্য সংস্থাটি কতটা দায়ী? ইউরোপ জিজ্ঞেস করছে— এই অ্যালগরিদম এবং শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা, আইন মেনে চলছে তো?

আর ভারত? ভারত এখনও অনেকটাই দাঁড়িয়ে আছে তৃতীয় একটি জায়গায়— ‘বাচ্চাকে ফোনটা দিয়ো না।’ এই পরামর্শটি খুব পরিচিত। এবং খুব সহজ। এত সহজ যে, এতে সমস্যাটাই প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। ভারতীয় পরিবারে সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারকে আমরা এখনও মূলত অভিভাবকত্বের ব্যর্থতা হিসেবে দেখি। বাচ্চা সারাদিন ফোন দেখছে— মা-বাবা বলছেন, ‘ওর জেদ বেশি’, ‘ও পড়াশোনা করে না’, ‘ফোনের নেশা হয়ে গেছে।’ কিন্তু যদি সেই প্ল্যাটফর্মটির অ্যালগরিদমই এমন হয় যে তাকে বার বার ফিরিয়ে আনার জন্য নোটিফিকেশন, ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী ভিডিয়ো সাজানো, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরের ভিডিয়ো চালু হওয়া এবং অন্তহীন কনটেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন দায়টা শুধু শিশুর বা অভিভাবকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া কি যথেষ্ট? বিশেষ করে ভারতের মতো দেশে, যেখানে স্মার্টফোন বহু শিশুর কাছে শুধু বিনোদনের যন্ত্র নয়— পড়াশোনা, বন্ধুত্ব, তথ্য এবং সামাজিক পরিচয়েরও অংশ।
একজন ভারতীয় কিশোর হয়তো সকালে অনলাইন ক্লাস করছে, দুপুরে ইউটিউবে পড়ছে, সন্ধ্যায় ইনস্টাগ্রামে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে, রাতে রিল দেখছে। একই যন্ত্রের মধ্যে শিক্ষা, বিনোদন, বন্ধুত্ব এবং বিজ্ঞাপন একসঙ্গে ঢুকে গেছে। ফলে শুধু ‘স্ক্রিন টাইম কমাও’ বললে সমস্যার সমাধান হয় না। কোন স্ক্রিন, কী দেখছে, কোন অ্যালগরিদম তাকে দেখাচ্ছে, কোন সময়ে দেখছে—এই প্রশ্নগুলিও জরুরি।

আর ভারতীয় শিশুদের ক্ষেত্রে অ্যালগরিদমের ক্ষতির আরও একটি সামাজিক মাত্রা আছে। আমাদের পরিবারে পড়াশোনার চাপ প্রবল। শরীর নিয়ে অস্বস্তি, পরীক্ষার ফল, ভবিষ্যতের পেশা, বন্ধুদের সঙ্গে তুলনা— কৈশোরের স্বাভাবিক দুর্বল জায়গা অনেক। কোনও কিশোরী নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তিতে আছে। সে একবার রোগা হওয়ার বা শরীরচর্চা নিয়ে একটা ভিডিয়ো দেখল। অ্যালগরিদম বুঝল— এই বিষয়ে তার আগ্রহ আছে। তারপর আরও একটা। আরও একটা। আরও একটা। কয়েক সপ্তাহ পরে তার পর্দায় নিজের শরীর নিয়ে অসন্তুষ্ট হওয়ার মতো বিষয়গুলিই হয়তো স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াল।
একটি ছেলে খেলাধুলো বা কম্পিউটার গেম নিয়ে আগ্রহী। তাকে আরও সেই ধরনের ভিডিও দেখানো হল। আর একজন রাজনৈতিক উত্তেজনায় আটকাল। তাকে আরও উত্তেজক রাজনৈতিক কনটেন্ট দেওয়া হল। কেউ ভয় পেল। তাকে আরও ভয় দেখানো হল। কেউ রাগ করল। তাকে আরও রাগানোর মতো জিনিস এল। মূল কথাটা হল, অ্যালগরিদম কোনও শিক্ষক নয়। তার প্রধান দায়িত্ব আপনার চরিত্র গঠন করা নয়। তার দায়িত্ব আপনাকে আরও কিছুক্ষণ ধরে রাখা। তাই মেটা-র বিরুদ্ধে আমেরিকার মামলা বা ইউরোপের তদন্তকে ‘বিদেশের প্রযুক্তি সংক্রান্ত ঝামেলা’ বলে দূরে সরিয়ে রাখার কারণ নেই। এগুলি আসলে ভবিষ্যতের একটি মৌলিক প্রশ্নের মহড়া— শিশুর মনোযোগ কি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, না কি কর্পোরেট সম্পদ?

মেটা-র বিরুদ্ধে মামলা শেষ পর্যন্ত কী রায় পাবে, অভিযোগগুলি আদালতে প্রমাণিত হবে কি না— তা এখনই বলা যায় না। কিন্তু প্রশ্নটি ইতিমধ্যেই আমাদের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতে হয়তো আগামী দিনে বয়স যাচাইয়ের নিয়ম হবে। অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আরও শক্ত হবে। সামাকিকমাধ্যম ব্যবহারের বয়সসীমা নিয়েও বিতর্ক হবে। কিন্তু শুধু বয়স বেঁধে দিলেই কি সমস্যা মিটবে? কারণ ১৫ বছর ১১ মাস বয়সি একটি শিশুর অ্যালগরিদম বুঝতে পারলে কী ক্ষতি, আর ১৬ বছর বয়সে বুঝলে কী লাভ— এই প্রশ্নের উত্তর কোনও জন্মতারিখ দিতে পারে না।
আমাদের দরকার অ্যালগরিদম সম্পর্কে শিক্ষাও। শিশুকে বুঝতে হবে— এবং সেই বোঝানোর দায়িত্বটাও বড়দেরই নিতে হবে হবে— কেন এই ভিডিয়োটি তাকে দেখানো হল। কেন সে একই ধরনের জিনিস বার বার পাচ্ছে। কেন নোটিফিকেশন সেই ভিডিয়োর উল্লেখ ফিরিয়ে আনছে। কেন রাগও নেশার মতো হয়ে উঠতে পারে। কেন কোনও প্রভাবশালীর সাজানো জীবন বাস্তব জীবনের মাপকাঠি নয়। আর প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকেও একটা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে— একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য যে অ্যালগরিদম তৈরি করা হয়েছে, সেই একই অ্যালগরিদম কি একটি শিশুর ক্ষেত্রে নৈতিক?
শিশুকে আমরা বলি, ‘ফোনটা নামাও।’ হয়তো এবার যারা এই সব সংস্থায় নানা বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে নিখুঁত অ্যালগরিদম তৈরি করছে, যা তাদের লাভ ও সাফল্য বাড়াচ্ছে, তাদেও বলতে হবে— ‘অ্যালগরিদমটাকেও একটু থামানো হোক।’ কারণ শিশুর শৈশব কোনও ‘এনগেজমেন্ট মেট্রিক’ নয়। তার মনোযোগ কোনও পণ্য নয়। আর তার ভবিষ্যৎ— কোনও অ্যাপের ব্যবসার মডেল হওয়ার কথা নয়।


