ভিড়ের মাঝে এমন কয়েকজন ব্যতিক্রমী ও নিবেদিতপ্রাণ ইতিহাসবিদ থাকেন, যাঁরা কেবল অতীতকে ব্যাখ্যা করেই দায় সারেন না— বরং অতীতকে দেখার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই বদলে দেন। প্রয়াত সুমিত সরকার (১৯৩৯-২০২৬) ছিলেন তেমনই একজন ছকভাঙা ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক।
বলার অপেক্ষা রাখে না, আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসচর্চায় অধ্যাপক সরকার এক নক্ষত্রসম ব্যক্তিত্ব। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন, সেখান থেকেই গবেষণা করে ডক্টরেট উপাধি পান, এবং সেই বিভাগেই তিনি অধ্যাপক রূপে যুক্ত থেকেছেন জীবনের অনেকটা সময়। বিশ শতকের সাতের দশকের গোড়ার দিকে সুমিত সরকারের মতো কয়েকজন বাঙালি ইতিহাসবিদ এমন এক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন, যার একদিকে ছিল বাংলার নবজাগরণ, আর অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গৌরবময় ঐতিহ্য। জনপ্রিয় ধারণা এবং ভারতীয় ইতিহাসচর্চা— উভয় ক্ষেত্রেই যখন এই দুই অধ্যায় দীর্ঘকাল ধরে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্য ভোগ করে আসছিল, ঠিক তখনই যেন দলছুট হয়ে আগমন ঘটে অধ্যাপক সরকারের। তাঁর সারস্বতচর্চা গোড়া থেকেই মার্কসবাদী ও বামপন্থী বৌদ্ধিক পরম্পরার দ্বারা গভীরভাবে পুষ্ট ছিল, পরবর্তীতে অক্সফোর্ডে অধ্যাপক রণজিৎ গুহর সান্নিধ্যে নিম্নবর্গের ইতিহাস ঘরানাও ছুঁয়ে গিয়েছিল ওঁর চিন্তার পরিক্রমণ। বহু প্রজন্মের আধুনিক, উদারনৈতিক সামাজিক-ধর্মীয় সংস্কারবাদের চর্চায় সমৃদ্ধ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা; ভাবনার স্বকীয়তা ও প্রসারিত বৈদগ্ধের উত্তরাধিকার তাঁর চরিত্রে নিশ্চিতভাবেই বিকশিত হয়েছিল তাঁর পিতা, সমকালের আরেক বরেণ্য বামপন্থী অধ্যাপক, চিন্তক ও ইতিহাসবিদ সুশোভনচন্দ্র সরকারের সস্নেহ প্রশ্রয়ে। এই দুই ধারার প্রভাবে স্বভাবতই, তাঁর চরিত্র ও চিন্তাজগতে ‘বিদ্রোহী’ উপাদান সংযোজিত হয়েছিল।
আরও পড়ুন: নৃতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে মহাকাব্যকে দেখেছিলেন ইরাবতী কার্বে!
লিখছেন সম্প্রীতি চক্রবর্তী…

সমাজেতিহাসের প্রতি তাঁর ঐকান্তিক সমর্পণ, পাণ্ডিত্যের উৎকর্ষতা, গভীর অনুসন্ধিৎসা এবং বিশ্লেষণী, বামপন্থী মনন আধুনিক ভারতীয় ইতিহাস রচনায় এক নতুন মাত্রার সংযোজন ঘটিয়েছিল। একটা সময়ে যখন নয়া কেমব্রিজ ঘরানার একদল সম্ভাবনাময় ঐতিহাসিক ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের অন্তর্গত খুঁতগুলি খুঁজে বের করতে প্রয়াসী হচ্ছিলেন এবং জাতীয়তাবাদের তথাকথিত উচ্চ আদর্শের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ সমালোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছিলেন, তখন তার মুখোমুখি হয়ে অধ্যাপক বিপান চন্দ্র ও অন্যান্যরা যে প্রতিস্পর্ধী জ্ঞানচর্চার পথে হাঁটতে শুরু করেছিলেন, সুমিতবাবু সেই যাত্রার শরিক হননি। রাজনৈতিক ঘটনার জৌলুস কিংবা মহান, খ্যাতিমান ও ক্ষমতাবান জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের প্রচলিত বৃত্তের বাইরে গিয়ে তিনি আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে প্রাণিত করেছিলেন সমাজের অন্তর্গত কাঠামো, শ্রেণি-সম্পর্ক, গণআন্দোলন এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার দিকে— যে-সমস্ত উপাদান নিবিড়ভাবে প্রভাবিত করেছিল আধুনিক ভারতীয় জাতির নির্মাণকে।
আসলে তিনি ছিলেন ইতিহাসের অন্তঃস্রোতের এক অনুসন্ধিৎসু অন্বেষক। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আধুনিক ভারত-ইতিহাসের সিরিয়াস পড়ুয়াদের কাছে তাঁর লেখা যে বইটি অবশ্য পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত— সেই ‘Modern India, 1885–1947’-র প্রথম সংস্করণের (১৯৮২ সাল) প্রস্তাবনায় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই কাজটি, তাঁর নিজস্ব গবেষণার আগ্রহের সাপেক্ষে ‘নিম্নবর্গের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ইতিহাস’ (history from below)-এর সম্ভাবনাগুলি অনুসন্ধান করে; যা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসচর্চায় প্রচলিত সেই প্রবণতা থেকে স্বতন্ত্র, যেখানে নেতৃবৃন্দের কর্মকাণ্ড, আদর্শ কিংবা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ও কৌশলগত চালচলনের ওপরই মূলত জোর দেওয়া হয়।
তাঁর কাজ বরাবরই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমাদের মনের মধ্যে উত্থাপন করেছে— কার ইতিহাস মনে রাখা হয়, আর কাদেরই বা ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়া হয়? আজকের ভারতে যেখানে ক্ষমতাবানরা ক্রমেই তথ্যানুসারী, যুক্তিনির্ভর ও অনুসন্ধানী ইতিহাসচর্চাকে মিথ ও মিথ্যার প্রশ্নাতীত বয়ানে ঢেকে ফেলতে চাইছে, সেখানে দাঁড়িয়ে সুমিত সরকারের অমোঘ প্রশ্নগুলি যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।


গোড়া থেকেই তাঁর ইতিহাস-দর্শনের বিশেষ তাৎপর্য নিহিত ছিল ইতিহাসকে সুস্পষ্ট রূপে একটি জটিল ও দ্বন্দময় সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে অনুধাবনের মধ্যে। সুমিতবাবুর কাছে জাতীয়তাবাদ নিছকই কোনও একমাত্রিক, সর্বসম্মত বা অপরিবর্তনীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না; বরং শ্রেণি, সামাজিক অবস্থান, মতাদর্শ, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক স্বার্থের পারস্পরিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই তার নির্মাণ ও অগ্রগমন ঘটেছিল। আসলে, স্বাধীনতার ঊষালগ্নের সেই উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতি যখন বিশ শতকের ছয়ের দশকের শেষভাগ এবং সাতের দশকের শুরুতে ম্লান হতে শুরু করে, এবং উপনিবেশ-পরবর্তী শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে বিভিন্ন রূপে গণসংগ্রামের এক নতুন ঢেউ শুরু হয়, তখন তাঁর মনে হয়েছিল যে, মূলধারার জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে এর নেতৃত্বের শ্রেণিগত দৃষ্টিভঙ্গি অন্বেষণ করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়ে চলমান ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং অন্য কিছু ঘটনা তাঁকে এই কথা ভাবতে একরকম বাধ্য করেছিল যে, জাতীয় ও সামাজিক মুক্তির জন্য শিক্ষিত অভিজাতদের দেওয়া নেতৃত্বের চেয়ে কৃষক ও শ্রমিকদের সংগ্রামই অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। এহেন দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে ঔপনিবেশিক ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসকে সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত করে দেখতে শিখিয়েছিল। বিশেষত, স্বদেশি আন্দোলন, ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি, গণ-রাজনীতি তথা জাতীয়তাবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাঁর কাজ ইতিহাসচর্চায় এক গভীর সমাজ-ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতার পরিচয় বহন করে।
অধ্যাপক সরকারের অসামান্য গবেষণা এবং অত্যন্ত যত্নসহকারে নির্মিত গ্রন্থগুলিতে ‘ভারতীয় জাতি’ (নেশন) বা ‘জাতীয়তাবাদ’-এর মতো বৃহৎ আদর্শায়িত ধারণাগুলিকে কখনও স্বতঃসিদ্ধ বলে গ্রহণ করা হয়নি; বরং সেগুলি কীভাবে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে নির্মিত, বিনির্মিত, প্রচারিত এবং সামাজিকভাবে আত্মস্থ হয়েছিল, সেই প্রশ্নই ছিল তাঁর অনুসন্ধানের কেন্দ্রে। তাঁর পিএইচডির গবেষণা অভিসন্দর্ভ, যা কিনা ১৯৭৩ সালে বই হয়ে প্রকাশিত হয়— ‘The Swadeshi Movement in Bengal, 1903–1908’ বাংলা তথা ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বৈচিত্র্য ও জটিলতা বোঝার ক্ষেত্রে আজও এক অপরিহার্য গ্রন্থ। বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকের ব্রিটিশ শাসনবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনকে কোনও একক বা সরলরৈখিক রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন না করে শ্রীসরকার এখানে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, সামাজিক ভিত্তি, মতাদর্শগত টানাপোড়েন এবং সীমাবদ্ধতাগুলিকেও উন্মোচিত করেছিলেন তথ্য ও শাণিত যুক্তির মারপ্যাঁচে। এমনকী, যখন পদ্ধতিগত শ্রমিক ইতিহাসচর্চার শুরুয়াতই হয়নি, তখন তাঁর এই বইতে শ্রমিক অভ্যুত্থান নিয়ে একটি পৃথক অধ্যায় রাখা হয়েছিল।
তাঁর ‘Modern India, 1885–1947’ বইটিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা থেকে দেশের স্বাধীনতালাভ পর্যন্ত জাতীয় আন্দোলনের বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই যুগে সাম্প্রতিকতম গবেষণার ভিত্তিতে ঔপনিবেশিক শাসন এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উত্থানকে তিনি এখানে এক গভীর, বিশ্লেষণাত্মক ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিতে, কিন্তু অত্যন্ত সাবলীল গদ্যে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যা খুবই চিত্তাকর্ষক।
১৯৮৫ সাল নাগাদ প্রকাশিত হওয়া তাঁর ‘A Critique of Colonial India’-র লেখাগুলি বঙ্গীয় রেনেসাঁ এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের তথাকথিত ‘মহান’ ভাবমূর্তিকে কঠোরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ‘Rammohun Roy and the Break with the Past’ প্রবন্ধে জাতপাতের প্রশ্নে রামমোহন রায় আরও বেশি কিছু করতে পারতেন— এই সমালোচনা করেছিলেন। “The ‘Women’s Question’ in Nineteenth-Century Bengal” শীর্ষক অন্য একটি প্রবন্ধে উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণকে ঘিরে নারী-মুক্তির যে দাবিগুলি প্রচলিত ছিল, সেগুলিকে সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন। তাৎপর্যের বিষয় হল, সেই সময়ে মূলধারার ইতিহাসচর্চায় ‘লিঙ্গ’ বা gender-এর প্রশ্নটি তখনও কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠেনি; নারীবাদী ইতিহাসবিদদের পথচলা তখন সবে শুরু হয়েছে মাত্র। আবার, ‘The Logic of Gandhian Nationalism’ প্রবন্ধে তিনি গান্ধীবাদী জাতীয়তাবাদের পিছনকার ‘logic’ খুঁজতে উদ্যত হয়েছিলেন। তাঁর এই সমস্ত লেখাপত্র যে সমকালীন বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও বাম-উদারপন্থীদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল, সে-কথা বলাই বাহুল্য!



১৯৯৭ সালে প্রকাশ পাওয়া অধ্যাপক সরকারের লেখা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই ‘Writing Social History’, যা তাঁর ইতিহাস-চর্চার পদ্ধতিগত ও বৌদ্ধিক পরিণতির এক চূড়ান্ত দিক নির্দেশিকা বলা চলে। এই বইয়ে সংকলিত লেখাগুলির তাৎপর্য কেবল ‘সামাজিক ইতিহাস’ (Social History)-কে একটি স্বতন্ত্র গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে নয়; বরং ইতিহাস কীভাবে লেখা উচিত— সেই মৌলিক প্রশ্নটিরও পুনর্বিবেচনার মধ্যে নিহিত। তিনি ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাসকে রাষ্ট্র, প্রশাসন কিংবা বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের কর্মকাণ্ডের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি; এই বিষয়সমূহ যে তাঁর চিন্তায় একেবারেই পরিত্যক্ত ছিল তাও নয়, কিন্তু এই একঘেয়ে ‘দেখা’-র বাইরে সময়ের অনুভব, শহরের রূপান্তর, নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজ, জাতপাত, ধর্মীয় চেতনা, পরম্পরাগত সংস্কার ও সামাজিক পরিচয়ের মতো আপাত-প্রান্তিক ও অবহেলিত বিষয়ের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর ঐতিহাসিক পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করবার চেষ্টা করেছেন। ‘The City Imagined: Calcutta of the Nineteenth and Early Twentieth Centuries’, ‘Renaissance and Kaliyuga: Time, Myth and History in Colonial Bengal’, ‘Vidyasagar and Brahmanical Society’ এবং ‘Identity and Difference: Caste in the Formation of the ideologies of Nationalism and Hindutva’-সহ তাঁর বহু প্রবন্ধে এই বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎকৃষ্ট পরিচয় মেলে।
তিনি একদিকে ইতিহাসের বস্তুগত ব্যাখ্যা ও সামাজিক ভিত্তির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন, অন্যদিকে ‘নিম্নবর্গীয়’ বা ‘সাবঅল্টার্ন’ অভিজ্ঞতাকে কোনও রোমান্টিক, স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনৈতিক চেতনা হিসেবে দেখার প্রবণতা সম্পর্কেও সদা-সতর্ক থেকেছেন। আসলে এটাই বোধহয় তাঁর ব্যক্তিত্বের সহজাত প্রবৃত্তি ছিল: প্রশ্ন করা। প্রশ্ন তোলা। তিনি কখনও কোনও তাত্ত্বিক কাঠামোকেই প্রশ্নাতীত বলে মেনে নেননি। এই কারণেই ‘Writing Social History’ একইসঙ্গে একটি ইতিহাসগ্রন্থ এবং ইতিহাস-চর্চার আত্মসমালোচনার দলিল— যেখানে বিষয়বস্তুর অনুসন্ধানের পাশাপাশি ইতিহাসবিদের ধারণা, পদ্ধতি ও বয়ান নির্মাণের সীমাবদ্ধতাও প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। তাঁর এই গভীরতর পদ্ধতিগত সতর্কতাই সুমিত সরকারের সমাজ-ইতিহাস চর্চাকে নিছক ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’ থেকে পৃথক করে একটি বৃহত্তর জটিল, সূক্ষ্ম এবং সমালোচনামূলক ইতিহাস-চর্চায় উন্নীত করেছে।
ইতিহাসের গৈরিকীকরণ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইতিহাস বিকৃতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং স্পষ্টভাবে বললে, হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান, চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সংখ্যাগুরুবাদী হিন্দু জাতীয়তাবাদকে নিছক একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করণ ও সমালোচনায় তপন বসু, প্রদীপ দত্ত, সম্বুদ্ধ সেন ও তাঁর স্ত্রী তনিকা সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত ‘Khaki Shorts and Saffron Flags: A Critique of the Hindu Right’, অধ্যাপক সরকারের অন্যতম দুঃসাহসিক কাজ। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ইতিহাস, সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক ভাষা, হিন্দুত্বের মতাদর্শ এবং রামজন্মভূমি-বাবরি মসজিদ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সংগঠনের কৌশল বিশ্লেষণ করা হয়। এমন একটা সময়ে, যখন ঘৃণা তৈরি করা এবং সংখ্যালঘু বর্জনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ইতিহাসের কুৎসিত রাজনীতিকরণ হচ্ছে, তখন প্রমাণ, জটিলতা ও সমালোচনামূলক অনুসন্ধানের ওপর সুমিত সরকারের প্রগাঢ় নির্ভরতা আরও তীব্রভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি আজীবন আমাদের দেখিয়েছেন, ক্ষমতাসীনরা যখন অতীতকে নিজেদের মতো করে পুনর্লিখনে উদ্যত হয়, তখন ইতিহাসগত সত্যকে রক্ষা করাও একধরনের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব হয়ে ওঠে। এখানেই তাঁর ব্যতিক্রমী অবস্থান।
সুমিত সরকারের বই নিছক অ্যাকাডেমিক পাঠ্য ছিল না; সেগুলি ছিল ইতিহাসকে কীভাবে ভাবতে হয়, তার এক অনায়াস শিক্ষা। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণ করাই কেবল ইতিহাসবিদের কাজ নয়; বরং তার কাজ, সেই অতীতকে অনর্গল প্রশ্ন করতে থাকা, তার প্রেক্ষিত অনুধাবন করা এবং তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যগুলিকে তথ্যের দ্বারা উন্মোচিত করা।
ইতিহাসের একজন ছাত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সুমিত সরকারের ইতিহাস-চর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর প্রচলিত ঐতিহাসিক বয়ানকে প্রশ্ন করার সাহস। তাঁর জীবনচর্যা ও কাজ আমাদের শেখায়, প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে সহজে মেনে না নিতে, কোনও ধরনের অন্ধ আনুগত্যের বশবর্তী না হয়ে রাজনৈতিক অনুমানগুলিকে পুনর্বিবেচনা করতে এবং ঘটনাবলির দৃশ্যমান পৃষ্ঠের নিচে ঢাকা পড়ে যাওয়া সমাজের কাঠামো, ক্ষমতার কার্যপ্রণালী এবং প্রান্তিক বা অনুল্লিখিত মানুষের কণ্ঠস্বরের সন্ধান করতে।
এর জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ আমরা দেখতে পাই পশ্চিমবঙ্গের বিগত বাম সরকারের আমলে, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষি জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অপ্রীতিকর পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যখন তিনি নির্দ্বিধায় নিজের ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন— তখন। প্রসঙ্গত, তৎকালীন বাম-সরকার ২০০৪ সালে ‘Writing Social History’ গ্রন্থের জন্য তাঁকে রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত করেছিলেন। ইতিহাসের চেতনা বাস্তবের দায়বদ্ধতার সঙ্গে মিলে এভাবেই যেন ইতিহাস ও ঐতিহাসিকের নির্মাণ ও বির্নির্মাণকে সম্ভব করে তোলে। সরকারি ‘বাম’ তকমার পরোয়া না করে ইতিহাসের দ্বন্দ্বগুলিকে অবিরাম ছুঁয়ে চলা নিঃসন্দেহে একরকম দুঃসাহসের পরিচয় বইকি!
আমাদের মতো ইতিহাসের বহু ছাত্র ও গবেষকের কাছে সুমিত সরকারের বই নিছক অ্যাকাডেমিক পাঠ্য ছিল না; সেগুলি ছিল ইতিহাসকে কীভাবে ভাবতে হয়, তার এক অনায়াস শিক্ষা। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণ করাই কেবল ইতিহাসবিদের কাজ নয়; বরং তার কাজ, সেই অতীতকে অনর্গল প্রশ্ন করতে থাকা, তার প্রেক্ষিত অনুধাবন করা এবং তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যগুলিকে তথ্যের দ্বারা উন্মোচিত করা।
অধ্যাপক সরকারকে তাই আমরা শুধু একজন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ হিসেবে মনে রাখব না; মনে রাখব এমন এক মননশীল গবেষক হিসেবে, যাঁর বৌদ্ধিক অবদান আধুনিক ভারতের ইতিহাস-চর্চাকে গভীরভাবে ঋদ্ধ করেছে। তিনি যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছেন আজীবন, যে বিতর্কগুলি উসকে দিতে চেয়েছেন, যে-ভাবনাগুলির খোরাক জুগিয়েছেন এবং কয়েক প্রজন্ম ধরে যে অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে অতীতের দিকে আরও সংশয়ী, কিন্তু অনুসন্ধিৎসু ও ঐতিহাসিক কল্পনাশক্তিসম্পন্ন দৃষ্টিতে ফিরে দেখতে শিখিয়েছেন— তাঁর উত্তরাধিকার সেখানেই চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে বলে বিশ্বাস।
যে-কোনও ইতিহাসবিদের জীবন, কালের কাছে ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু তিনি যে প্রশ্নগুলি রেখে যান, সেগুলি সময়ের সীমানা অতিক্রম করে পরবর্তী প্রজন্মের চেতনায় জীবন্ত থাকে।



