স্বদেশি নাট্যকল্প
বাংলায় জাতীয়তাবাদী নাট্যচর্চার সূচনা হয়েছিল দেশ-কালের উত্তেজনার আঁচে হাত পুড়িয়ে। সহায়-সম্বলহীন একদল বাঙালি যুবক তাঁদের ঐকান্তিক ইচ্ছায়, বিপুল উদ্যম ও শ্রমের বিনিময়ে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে যে সাধারণ রঙ্গমঞ্চ নির্মাণ করলেন, ঘটনাক্রমে সেই রঙ্গমঞ্চ ১৮৭২-এ খ্যাত হল ‘ন্যাশনাল’ নামে। এই পর্বে হিন্দুমেলার অধিবেশনগুলিতে মাতৃভাষার চর্চা, স্বদেশ-জাত শিল্প প্রদর্শনী, দেশজ শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য, ব্যায়াম, ধর্ম ও পুরাতত্ত্বের চর্চার মধ্যে দিয়ে বাঙালির লুপ্ত জাতীয় গৌরব ও দেশজ ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের যে হাতেকলমে শিক্ষা ও চর্চা চলত, সেই চর্চা-প্রকল্পের সহযোগী ছিল সদ্য-জন্ম-নেওয়া বাংলার জাতীয় নাট্যশালাও। ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৩, হিন্দুমেলার সপ্তম অধিবেশনে ন্যাশনাল থিয়েটার কর্তৃক অভিনীত হয়েছিল ‘ভারতরাজলক্ষ্মী’ ও ‘নীলদর্পণ’-সহ অন্যান্য কয়েকটি নাটকের অংশবিশেষ। বস্তুত, ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী সময়টি ছিল বাংলায় জাতীয়তাবাদী নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে সবথেকে অনুকূল। ১৮৭২-এর ৭ ডিসেম্বর ‘নীলদর্পণ’ দিয়ে শুরু করে, ন্যাশনাল ও গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে অভিনীত হয়েছিল— কিরণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভারতমাতা’ ও ‘ভারতে যবন’, হরলাল রায়ের ‘হেমলতা’ ও ‘বঙ্গের সুখাবসান’, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরুবিক্রম’ ও ‘সরোজিনী’, উপেন্দ্রনাথ দাসের ‘শরৎ-সরোজিনী’, ‘সুরেন্দ্র বিনোদিনী’-র মতো বেশ কিছু উগ্র দেশপ্রেমের নাটক।
অবশ্য উপেন্দ্রনাথের ‘শরৎ-সরোজিনী’ ও ‘সুরেন্দ্র বিনোদিনী’ বাদ দিলে, এই পর্বে অভিনীত দেশাত্মবোধক নাটকগুলিতে দেশপ্রেমের যে-চরিত্রটি তীব্র হয়ে উঠেছিল, তা মোটেও ইংরেজ-বিরোধী ছিল না, ছিল যবন অর্থাৎ মুসলমান-বিরোধী। জাতীয়তাবাদী নাট্যপ্রকল্পে হিন্দু বনাম মুসলমানের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের উপস্থাপনে নাট্যকাহিনির ছাঁচটি প্রায়শই একমাত্রিক। সেখানে মাতৃভূমি রক্ষার অসম লড়াইয়ে হিন্দু সন্তানেরা দেশের জন্য প্রাণ বলিদানে প্রস্তুত। অন্যদিকে মুসলমানমাত্রই সে বহিরাগত অর্থাৎ তারা এ-দেশীয় বাঙালি মুসলমান নয়, বরং স্বদেশ আক্রমণকারী বিদেশি শক্তি— বিধর্মী ম্লেচ্ছ-যবন। রাজ্য দখলের সঙ্গে-সঙ্গে এই যবনেরা হিন্দুর ধর্মীয় অধিকার বলপূর্বক হরণ করে, তাঁদেরকে যবনের ম্লেচ্ছধর্ম গ্রহণে বাধ্য করে। সুতরাং যবন আক্রমণের লক্ষ্য একইসঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতাদখল এবং বলপূর্বক ধর্মের প্রসার। হিন্দুর ধর্মরক্ষার নিমিত্ত প্রতাপশালী যবন সৈন্যের বিরুদ্ধে সেই অসম লড়াইয়ে হিন্দু সন্তানেরা কীভাবে প্রাণপণ লড়াই করছে, কতখানি সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করছে, সেটাই এই জাতীয় নাটকগুলির উপজীব্য। হরলাল রায়ের ‘হেমলতা’ নাটক যেমন, অনিবার্য পতন সত্ত্বেও নায়ক সত্যসখার বীরত্ব এবং সৈন্যদলের উদ্দেশে তার উদ্দীপ্ত ভাষণ— ‘যদি পরমেশ্বরের ইচ্ছা হয়, আমরা প্রত্যেকে ধর্মের জন্য প্রাণ দেব। স্বাধীনতার কাছে জীবন কি? ধর্ম্মের কাছে জীবন কি? যদি তোমরা স্ত্রী পুত্র পরিবারকে স্নেহ কর, যদি তোমাদের স্বদেশের প্রতি অনুরাগ থাকে, যদি স্বাধীনতাকে তৃণ জ্ঞান না কর, যদি হিন্দুধর্ম্মে তিলার্দ্ধ শ্রদ্ধা থাকে, সকলে চল ম্লেচ্ছদিগকে দূরীভূত করি।’ যবন-বিরোধী এই রক্ত-গরম-করা সংলাপ মোটামুটি এই সময়ের সমস্ত দেশাত্মবোধক নাটকেই খুব সাধারণ বিষয় ছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরুবিক্রম’ নাটকে যেমন রাজকুমারী ঐলবিলা তার বিবাহ-স্বয়ংবর সভায় বলে— “আমি… এই প্রতিজ্ঞা করেছি যে, যে রাজকুমার যবনদিগের সহিত যুদ্ধে সর্বাপেক্ষা বীরত্ব প্রদর্শন করবেন, আমি তারই পাণি-গ্রহণ করব।” দেশরক্ষার প্রশ্নে বঙ্গললনার কাছে তার পাণিপ্রার্থী পুরুষটির একমাত্র যোগ্যতা হয়ে উঠছে যবনদের বিরুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর ‘সরোজিনী’ নাটকেও চিতোর-রক্ষায় রাজা লক্ষ্মণ সিংহের কর্তব্যবোধ, রাজকুমারী সরোজিনী-সহ অন্যান্য পুরনারীদের সতীত্বরক্ষার্থে আত্মবলিদান এবং মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ সব সংলাপ ব্যবহার করে স্বাদেশিকতার এমন এক ছক নির্মাণ করলেন, যার প্রভাব বিশ শতকের স্বদেশি-বয়কটের যুগেও সমানভাবে অনুসৃত হয়েছে।
আরও পড়ুন: দেশীয় চিত্রকলায় কীভাবে ধরা পড়েছে সেই সময়?
লিখছেন সুশোভন অধিকারী…


শিক্ষিত বাঙালি হিন্দুর কাছে তখনও পর্যন্ত ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি কোনও রাজনৈতিক তাৎপর্যে রঞ্জিত হয়ে আসেনি, অন্তত ১৮৭৫-এর আগে তো নয়ই! তখনও পর্যন্ত হিন্দুমেলা-প্রসূত ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বাঙালির মর্মে-মর্মে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। শিক্ষিত বাঙালির রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার দৌড় তখন মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাছে আবেদন-নিবেদনের আকুতি ও প্রার্থনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মিনীর উপাখ্যান’ কাব্যেই আমরা প্রথম বাঙালি কবির কণ্ঠে স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষার বাণী শুনেছিলাম— ‘স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়?/দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়?’ সেখানে দিনেকের স্বাধীনতাকেও স্বর্গসুখের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ হেন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও স্বদেশসংগীত যে কাব্যে আছে, আমরা নিশ্চয় মাথায় ধরে রাখব। কিন্তু যবন-আক্রমণের বিরুদ্ধে এই উদ্দীপনাসংগীত কি সত্যিই উনিশ শতকীয় বাঙালির সত্যিকারের স্বাধীনতার স্পৃহা থেকে এসেছিল? আলাউদ্দীন কর্তৃক চিতোর অধিকারের পর কাব্য যেখানে শেষ হচ্ছে, সেই সমাপ্তিপৃষ্ঠায় রঙ্গলাল খুব সচেতনভাবেই লিখছেন এই ক’টি পঙ্ক্তি: ‘ভারতের ভাগ্য জোর, দুঃখ-বিভাবরী ভোর/ ঘুম-ঘোর থাকিবে কি আর?/ইংরাজের কৃপাবলে, মানস-উদয়াচলে,/জ্ঞানভানু প্রভায় প্রচার॥/শান্তির সরসী-মাঝে সুখ-সরোরুহ রাজে,/মনোভৃঙ্গ মজুক হরিষে।/হে বিভো করুণাময় বিদ্রোহ বারিদচয়,/আর যেন বিষ না বরিষে॥’ কবি যেন অতীতের পরাধীনতার দুঃখ ভুলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত হতে বলছেন: চেয়ে দ্যাখো, ইংরেজের রাজত্বে এখন জ্ঞানের সূর্য উঠেছে। চারিদিকে শান্তি বিরাজ করছে, এই সময়ে বাপু তোমরা আর বিদ্রোহ-টিদ্রোহ করে সুখের সময়টিকে বিষময় করে তুলো না। হয়তো বাঙালির কাছে তখন পর্যন্ত স্বাধীনতার স্পৃহা বলতে বোঝাত ধর্মীয় স্বাধীনতার স্পৃহা— রাজনৈতিক স্বাধীনতার বোধ তখন বাস্তবিকই দূর অস্ত। রাজনৈতিক স্বাধীনতার বোধ বড়জোর রানি ভিক্টোরিয়ার কাছে সকাতর প্রার্থনা ও আবেদন-নিবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
১৮৭০-এ হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত স্বদেশপ্রেমের কবিতা ‘ভারত-সঙ্গীত’ প্রকাশিত হয়। এই কবিতার বিষয় ছিল— মোগলশাসনে পদানত ভারতভূমির দুরবস্থা দেখে ব্যথিত মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ মাধবাচার্য-কর্তৃক নগরে-নগরে পর্বতে-পর্বতে বীরত্বব্যঞ্জক উৎসাহ-প্রবর্ধক গান গেয়ে প্রচার: ‘বাজ্ রে শিঙ্গা বাজ্ এই রবে,/শুনিয়া ভারতে জাগুক্ সবে,/সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে,/সবাই জাগ্রত মানের গৌরবে,/ভারত শুধু কি ঘুমায়ে রবে?” এই কবিতায় বন্ধন-শৃঙ্খল ছিঁড়ে স্বাধীন হওয়ার আহ্বান আছে, কিন্তু সে-আহ্বান কি কোনওভাবে ইংরেজ রাজত্বের বন্ধন-শৃঙ্খল ভাঙতে ইঙ্গিত করে? না কি মোগল শাসনকে লক্ষ্য করেছে বলেই তা এতখানি উদ্দীপ্ত? হেমচন্দ্র যে কোনওভাবেই ব্রিটিশশাসনের বিরোধী ছিলেন না, তিনি যে আর পাঁচজনের মতোই নিতান্ত রাজভক্ত প্রজা— সে-প্রমাণ তিনি রেখেছেন ‘ভারত-সঙ্গীত’ লেখার ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৮৭৫-এ যুবরাজ প্রিন্স অব ওয়েল্স্-এর কলকাতায় আগমনকে উপলক্ষ্য করে দীর্ঘ বন্দনা-সংগীত ‘ভারত-ভিক্ষা’ লিখে। এই দীর্ঘ কবিতাটির শুরুতে হেমচন্দ্র যুবরাজ আগমনের ক্ষণটিকে দরদ দিয়ে এঁকেছেন, চারিদিকে কেন এত আনন্দধ্বনি? কীসের কারণে উড়ছে শত-শত পতাকা, নগর-নগরে অট্টালিকা সেজে উঠেছে কেন? কেননা, ‘আসিছে ভারতে বৃটন-কুমার’, যে-‘বৃটন’বাসী ‘হেলায়ে তর্জ্জনী লইল অযোধ্যা’, ‘প্রচণ্ড সিপাহী-বিপ্লবে যে বহ্নি/নিবাইল তীব্র প্রচণ্ড দাপে,’। এবং তাই— ‘পড়িয়া যাহার চরণ-নখরে/ভারত-ভুবন আজি লুটায়’— সেই ‘বৃটন-কুমার’ আসছেন কলকাতায়। কবিতার শেষে কবি ‘আমি, বৎস, তোর জননীর দাসী,/দাসীর সন্তান এ ভারতবাসী’ হিসেবে নিজেকে সম্বোধন করে ‘বৃটন-কুমার’-এর কাছে তাঁর মর্মবেদনা প্রকাশ করেছেন। প্রার্থনা করেছেন— ব্রিটিশরাজের এই প্রচণ্ড তেজ যেন কুমার নিবারণ করেন, প্রজার চোখের জল মুছিয়ে দেন। এবং ‘ভারত-সন্তানে লয়ে একবার/ভাই বলে ডাক্, হৃদি জুড়ায়!’ ‘ভারত-সঙ্গীত’ কাব্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষী কবিকে এখানে আমরা নিতান্ত অনুগত এক রাজভক্ত-প্রজা হিসেবেই আবিষ্কার করি, যিনি ব্রিটিশ-বিরোধী বিদ্রোহ-বিপ্লবে নয়, আস্থা রাখেন রাজসমীপে আবেদন-নিবেদনের রাস্তায়।
আবেদন-নিবেদনের একইরকম প্রকাশ আমরা পাই ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৭২, ন্যাশনাল থিয়েটারে অভিনীত কিরণচন্দ্র দত্তের ‘ক্ষুদ্র রূপক-দৃশ্য’ ‘ভারতমাতা’ নাটকে। দীনবন্ধুর ‘জামাই বারিক’ প্রহসনের সঙ্গে আফটার-পিস হিসেবেই এই ‘রূপকনাট্য’র একটি দৃশ্য সেদিন অভিনয় হয়েছিল। ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ এই অভিনয়ের সমালোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছিল— ‘… উহা দেখিয়া শোতৃবর্গ প্রকৃত প্রস্তাবে মোহিত হইয়াছিলেন। কোন অভিনয়ে পঞ্চশতাধিক লোকের ১৫ মিনিটকাল এরূপ আগ্রহ ও স্তম্ভিতভাব আমরা কখন প্রত্যক্ষ করি নাই। … সেদিন ন্যাশনাল থিয়েটারে যাঁহারা উপস্থিত হইয়াছিলেন, তাঁহারা সেখান হইতে এমন একটি ভাব অর্জন, ও এমন একটি শিক্ষা লাভ করিয়া আসিয়াছেন, জাহা কস্মিনকালে বিনষ্ট হইবে না”। কী ছিল ‘ক্ষুদ্র রূপক-দৃশ্য’ এই নাটকটিতে, যা অভিনীত মূল নাটক ‘জামাই বারিক’ অপেক্ষা দর্শকদের মোহিত করেছিল?
নাটকের শুরুতেই সূত্রধারের উক্তিতে নাটকটির উদ্দেশ্য ধরা পড়েছে— ‘ভারতভূমির ও ভারত-সন্তানগণের বর্তমান দুরবস্থা প্রদর্শনই ‘ভারতমাতার’ উদ্দেশ্য।’ নাটকের শুরুতে ভারতলক্ষ্মীর দু’টি দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে দিয়ে ভারতমাতার দুঃখ দুর্দশা দেখানো হয়েছে। প্রথম গান ‘মলিন মুখ চন্দ্রমা ভারত তোমারি’-তে বলা হয়েছে— ভারতমাতার সন্তানরা আজ— ‘সবে বলবীর্যহীন, অন্ন বিনা তনুক্ষীণ’, ফলে তারা ‘ঘুমায়ে রয়েছে সবে হয়ে হতজ্ঞান’। সন্তানদের এই দুঃখ-দুর্দশা দেখে ভারাতমাতা শোকাকুলা অস্থির। তিনি সন্তানদের উদ্দেশে আবেদন রাখছেন— ‘এ দুঃখ যন্ত্রণা হতে কররে মোরে উদ্ধার’, সন্তানরা স্বাধীনতা-মহাধন লাভ করার জন্য কেন তৎপর হচ্ছে না, সে নিয়ে মায়ের আক্ষেপ। ভারতলক্ষ্মীর গান শুনেও যখন সন্তানরা ঘুম থেকে জাগছে না, তখন স্বয়ং ভারতমাতা গান ধরলেন— ‘উঠ উঠ যাদুমণি কতকাল ঘুমাবে আর’। মায়ের গান শুনে ঘুম ভাঙলে সন্তানরা বেশ বিরক্তই হয়— ‘বেশ ঘুমাচ্ছিলাম, কেন জাগালে মা?’ মাতা তখন সন্তানদের কাছে আর্তনাদের মতোই তাঁর কী ঐশ্বর্য ছিল আর এখন কী হতদ্দশা হয়েছে বর্ণনা করে বলেন— ‘তোদের অভাগা জননীর দুরবস্থা একবার দেখ বাবা, অলংকারগুলি দস্যুতে অপহরণ কোরেছে, একটু তেল পাইনে যে চুলে দিই, এমন মলিন শতগ্রন্থি বস্ত্র আর কতকাল পোরতে হবে যাদু? বাবা, তোরা দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হয়ে তোদের মার এই দুর্দশা ঘোচা।’ মায়ের দুর্দশার বর্ণনা শুনে সন্তানরাও তাদের অসহায়তার কথা মা-র কাছে নিবেদন করল— তাদের চাকরির পথ বন্ধ, ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ বন্ধ, তাঁতগুলি বন্ধ, দেশের একটু নুনও তারা খেতে পায় না। কী করবে তারা?
পদাঘাত খেয়ে ভারতসন্তানগণ যখন আর্তনাদ করছে, ‘কোথায় হরিশ, কোথায় রামামোহন, কোথায় রামগোপাল’ বলে মূর্ছা যাচ্ছে, তখন একজন ভাল ইংরেজ প্রবেশ করেন। দুষ্টু সাহেবকে সে গলা টিপে ধরে— ‘রে দুরাচার দুর্বৃত্ত, ইংরাজ জাতির কলঙ্ক, তুই এখান হতে দূর হ’ বলে তাকে পদাঘাত করে দূর করে দেয়।
এবার মা-ই তাদের উপায় বললেন— ‘তোরা এখন একবার দয়াশীলা মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছে তোদের দুঃখ জানা, তিনি পরম দয়াবতী, অবশ্য তোদের প্রতি মুক্ তুলে চাইবেন।’ মা-র পরামর্শে উৎসাহিত হয়ে সন্তানরা রানি ভিক্টোরিয়ার উদ্দেশে হাঁক ডাক শুরু করলে একজন খারাপ ইংরেজ-এর কানে গিয়ে পৌঁছায়। সেই দুর্বৃত্ত দুষ্টু সাহেব ভারতবাসীদের তর্জন-গর্জন করেন— “মহারাণী কাদের? তিনি আমাদের মহারাণী। ইংলণ্ডেশ্বরী তা জানিস? … কিসে আমাদের উন্নতি হবে, কিসে আমাদের কোষ ধনে পরিপূর্ণ হবে, কিসে আমরা সুখে থাক্বো, মহারাণীর ইহাই ঐকান্তিক ইচ্ছা।’ এই বলে সেই দুষ্টু সাহেব ভারতবাসীদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে শুরু করেন— পদাঘাত করতে থাকেন।
পদাঘাত খেয়ে ভারতসন্তানগণ যখন আর্তনাদ করছে, ‘কোথায় হরিশ, কোথায় রামামোহন, কোথায় রামগোপাল’ বলে মূর্ছা যাচ্ছে, তখন একজন ভাল ইংরেজ প্রবেশ করেন। দুষ্টু সাহেবকে সে গলা টিপে ধরে— ‘রে দুরাচার দুর্বৃত্ত, ইংরাজ জাতির কলঙ্ক, তুই এখান হতে দূর হ’ বলে তাকে পদাঘাত করে দূর করে দেয়। অতঃপর সেই ভাল সাহেবটি এই ভাষায় ভারতমাতাকে সান্ত্বনা দেন— ‘মা কিছু দুঃখ করোনা, তোমাদের দুঃখ-রজনী শীঘ্রই অবসান হবে। তুমি কি ফসেট টরেন্স প্রভৃতি মহাত্মাগণের নাম শোনোনি, যাঁহারা অভাগা ভারতসন্তানদের দুঃখ দূর কোর্তে প্রাণপন যত্ন করে থাকেন। আর এই যে সজ্জনপালক, প্রজারঞ্জক মহামতী লর্ড নর্থব্রূক গবর্ণর জেনারেল হয়েছেন ইনিই তোমাদের দুঃখ দূর কোর্বেন।’ কিরণচন্দ্রের এই ক্ষুদ্র রূপকনাট্যটি তখনকার বাঙালির রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার দৌড়— তার পথ ও উপায়টিকে— চিনিয়ে দেয়।
অবশ্য রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা— প্রত্যক্ষ ইংরেজ-বিরোধিতার রূপ ধরে প্রকাশ পেয়েছিল একমাত্র উপেন্দ্রনাথ দাসের নাটকদু’টিতেই। ‘শরৎ-সরোজিনী’ নাটকে শিক্ষিত যুবক শরৎ ব্যক্তিগত প্রেম-প্রণয়কে তুচ্ছ করে ইংরাজের শাসন হতে ভারত-উদ্ধারে আত্মোৎসর্গ করতে চায়। ‘সুরেন্দ্র বিনোদিনী’-র সুরেন্দ্রর মধ্যে সেই বীর্যবত্তা আরও তীব্র আকারে প্রকাশ পেয়েছে। দেশপ্রেম ও জাতিবৈরিতার প্রশ্নে উপেন্দ্রনাথ তাঁর নাটকে মোগল যুগের কাহিনি কিংবা শত্রুরূপে ইংরেজের পরিবর্তে মোগলের ছদ্ম আচ্ছাদন রাখেননি। তবে প্রথম নাটকটিতে শরৎ রাজমহল পাহাড়ের উপত্যকায় একদল মুসলমানের খপ্পরে পড়ে যারা ইংরেজ রাজত্ব লুপ্ত করে ভারতে মুসলমান রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের উদ্দেশে শরৎ যে-সংলাপ বলেছে, তাতে শাসক হিসেবে ইংরেজ ও মুসলমানের রাজত্বের তুলনামূলক বিচার ও সেক্ষেত্রে শিক্ষিত বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গিটাই প্রকাশিত হয়েছে— ‘আপনাদের বৃথা চেষ্টা। আপনারা কখন সফল হবেন না। আমাদের দেশের কাপুরুষেরা এখনও স্বাধীনতার জন্য ব্যগ্র হয়নি— স্বাধীনতা প্রাপ্ত হলেও বা যে আমরা তা বহুদিন রক্ষা করতে পারব তাও বিলক্ষণ সন্দেহের স্থল, আর স্বাধীনতার নামে আপনাদের অধীনতা স্বীকার করতে কেউ সম্মত হবে না।’ বিদেশি শাসকের অধীনতার প্রশ্নে ইংরেজ শাসনকে মেনে নিতে শিক্ষিত হিন্দুদের ততখানি আপত্তি নেই, কিন্তু বিধর্মী-ম্লেচ্ছ-যবন মোগলদের অধীনতা?— নৈব নৈব চ।


